তাম্রশাসন

তাম্রশাসন

তাম্রশাসন সমালোচনা

তাম্রশাসনের ইতিহাস

বিগত জানুয়ারি মাসের “কলিকাতা রিভিউ” পত্রে শ্রীযুক্ত শরচ্চন্দ্র মিত্র মহাশয় ‘তাম্রশাসনের ইতিহাস” সম্বন্ধে একটি সুলিখিত প্রবন্ধ প্রকটিত করিয়াছেন। এ পৰ্যন্ত ভারতবর্ষের নানা স্থানে নানা সময়ে যতগুলি খোদিত তাম্রফলক আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার সংখ্যা নিতান্ত অল্প নহে। তাহার কতক এদেশে এবং কতক বিলাতে নানা স্থানে রক্ষিত হইয়াছে। সকলগুলির পাঠ ব্যাখ্যা ও প্রতিকৃতি এ পৰ্য্যন্ত প্রকাশিত হয় নাই; যতগুলি প্রকাশিত হইয়াছে তাহারও যথারীতি সমালোচনা হইয়াছে বলিয়া বোধ হয় না। কোনো স্থলে কেবল মূল, কোথায়ও বা অনুবাদ এবং ক্কচিৎ যৎসামান্য টীকা মাত্রই প্রকাশিত হইয়াছে; তাহাতে সমস্ত জ্ঞাতব্যতর অবগত হওয়া যায় না। এই সকল তাম্রশাসনে আমাদের দেশের যে সকল ঐতিহাসিক তথ্য নিহিত রহিয়াছে তাহা বিস্তৃতরূপে আলোচিত হওয়া আবশ্যক।

মিত্র মহাশয় লিখিয়াছেন : ১ রাজানুশাসন ভিন্ন প্রজাবর্গের দান বিক্রয়াদি ব্যাপারও তাম্রফলকে উত্তীর্ণ হইত; ২ হিন্দু বা বৌদ্ধগণ ভিন্ন মোসলমানেরা তাম্রফলকের ব্যবহার করিতেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় না; মোসলমান নরপতিবর্গের একখানি তাম্রশাসনও আবিষ্কৃত হয় নাই; ৩ তাম্রপট্ট ভিন্ন পিত্তলাদি ধাতুপত্রও এই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হইত। এই কয়েকটি কথার উপর নির্ভর করিয়া মিত্র মহাশয় সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, “মোসলমানাধিকারের পূর্বে ভারতবর্ষে উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুতের প্রণালী অজ্ঞাত ছিল, তজ্জন্যই বোধ হয় ধাতুফলক ব্যবহৃত হইত।”

এই সিদ্ধান্ত কতদূর সঙ্গত হইয়াছে তাহার মীমাংসা করা সহজ নহে। মিত্র মহাশয় যে সকল কথার উপর নির্ভর করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, তদ্বারা এইরূপ সিদ্ধান্ত অনিবার্য হইলে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তদ্বারা এরূপ সিদ্ধান্ত অনিবাৰ্য বলিয়া বোধ হয় না।

মোসলমানাধিকারের পূর্বে ভারতবর্ষের লোকে উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুতের প্রণালী জানিত কিনা তাহার মীমাংসা করা যায় না। যে সমাজে লিখন পঠনের আদৌ প্রচলন হয় নাই তথায় বহুবিধ সুক্ষ্ম শিল্পের উন্নতি সাধিত হইলেও কাগজ প্রস্তুত প্রণালীর পরিচয় পাওয়া যায় না। কিন্তু যে সমাজে বহু পুরাকাল হইতে নানা শাস্ত্রের অধ্যয়ন অধ্যাপনা ও গ্রন্থরচনাদি চলিয়া আসিতেছিল, যাহাদের গ্রন্থাদি দেশবিদেশে নীত ও অনুবাদিত হইয়াছিল, তাহাদের দেশে যে কাগজ প্রস্তুতের প্রণালী সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল, মিত্র মহাশয় নিজেও ততদূর বিশ্বাস করিতে পারেন নাই। তিনি লিখিয়াছেন :

তালপত্র, ভূর্জত্বক ও মোটা কাগজের প্রচলন থাকিলেও ভারতবর্ষে উৎকৃষ্ট কাগজের প্রচলন ছিল না; তজ্জন্যই বোধ হয় ধাতুপট্টের ব্যবহার প্রচলিত হইয়াছিল।

মোসলমানাধিকারের পূৰ্ব্বে ভারতবর্ষের লোকে উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুতের প্রণালী জানিত না বলিয়া মানিয়া লইলেও মিত্র মহাশয়ের সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয় না। মোসলমানগণ উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুতের প্রণালী জানিত, কিন্তু তাহাদেরও পুরাতন কাগজ দেখিতে পাওয়া যায় না। কাগজ যতই উৎকৃষ্ট হউক, তাহা কালক্রমে ধবংস প্রাপ্ত হয়। কতদিনে কাগজ পচিয়া যায় অদ্যাপি তাহার পরীক্ষা শেষ হয়। নাই। কিন্তু ধাতুপট্ট যে তদপেক্ষা দীর্ঘকাল অক্ষুণ্ণ থাকে তাহা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং ভারতবর্ষের লোকে উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুতের কৌশল জানিত না বলিয়াই ধাতুপট্টের ব্যবহার করিত, কিম্বা কেবল স্থায়িত্বকামনাবশতই কাগজের ব্যবহার না করিয়া ধাতুপট্টের ব্যবহার করিত, তাহা নিঃসংশয়ে নির্ণয় করা যায় না। তাহারা ধাতুপট্টের ব্যবহার করিত, কেবল এই কথার উপর নির্ভর করিয়া কাগজ প্রস্তুত কৌশলের অজ্ঞতা প্রমাণীকৃত হয় না; বরং মোসলমানাধিকারের পরবর্তীকালে উৎকৃষ্ট কাগজ থাকিতেও ধাতুপট্ট ব্যবহৃত হইত দেখিয়া মনে হয়, স্থায়িত্বকামনাবশতই ধাতুপট্ট ব্যবহৃত হইত। মোসলমানেরা ধাতুপট্টের ব্যবহার করে নাই বলিয়াই যে উৎকৃষ্ট কাগজ প্রস্তুত করিতে জানিত এরূপ সিদ্ধান্তও অনিবাৰ্য্য নহে।

এ পর্যন্ত যতগুলি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে তদবলম্বনে ইতিহাস সঙ্কলনের আয়োজন করিতে হইলে এই সকল খোদিত লিপির কাল নির্ণয় করা আবশ্যক। দুর্ভাগ্যক্রমে তদ্বিষয়ে সম্পূর্ণ সফলকাম হইবার উপায় নাই। অনেক রাজাই আপন রাজত্বের অব্দেল্লেখে তাম্রফলক উৎকীর্ণ করাইতেন, প্রজাবর্গও সাধারণতঃ রাজাব্দের ব্যবহার করিত। সুতরাং রাজার সহিত রাজাব্দও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। ঠিক কোন সময়ে কোন শাসনলিপি খোদিত হইয়াছিল তাহা নির্ণয় করা অসম্ভব হইলেও, মোটামুটি কাল নির্দেশ করা একবারে অসম্ভব বলিয়া বোধ হয় না। মিত্র মহাশয় তাম্ৰশাসনাদির যে সুদীর্ঘ তালিকা প্রকাশিত করিয়াছেন। তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায় যে, অতি পুরাকালের কোনও তাম্রফলক এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই; যাহা কিছু আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার অধিকাংশই মোসলমানাধিকারের অব্যবহিত পূৰ্ব্ব বা পরবর্তী সময়ের; এবং সকলগুলিই বৌদ্ধাবির্ভাবের উত্তরকালে খোদিত।

ধাতুপট্ট অনাদরে মৃদগর্ভে প্রোথিত থাকিলেও সহসা মৃত্তিকাসাৎ হয় না। আবিষ্কৃত তাম্রশাসনের অধিকাংশই সুপাঠ্য, একখানিও একেবারে অপাঠ্য হইয়া যায় নাই। সুতরাং অতিপুরাকালে তাম্রপট্টের ব্যবহার থাকিলে–অনেক না হউক –দুই চারি খানি পুরাতন তাম্রফলক অবশ্যই দেখিতে পাওয়া যাইত। কিন্তু বৌদ্ধাবির্ভাবের পূর্ববর্তীকালের কোনও তাম্র বা ধাতুফলক অদ্যাপি আবিষ্কৃত হয় নাই।

কবে কি সূত্রে ধাতুপট্টে শাসনাদি খোদিত করিবার প্রথা প্রচলিত হইয়াছিল, তাহার অনুসন্ধান করা আবশ্যক। মিত্র মহাশয় তাহাতে হস্তক্ষেপ করেন নাই। লিখিত ইতিহাসের অভাবে এরূপ বিষয়ের অনুসন্ধান করা সহজ নহে বলিয়াই বোধ হয় সে চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়াছেন। কিন্তু যুক্তিমূলে এ বিষয়ে যতদূর তথ্যনির্ণয় করা সম্ভব তৎপক্ষে চেষ্টা করা অসঙ্গত নহে।

মানব-সমাজতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণ বলিয়া থাকেন,–মানব-সমাজের প্রাথমিক যুগে ব্যবহারগত অধিকারই একমাত্র অধিকার বলিয়া পরিচিত ছিল। এ কথা মানিয়া লইতে কোনো বাধা দেখিতে পাওয়া যায় না। যে ব্যক্তি যে ভূমিখণ্ড ব্যবহার করিতেছে তাহাতে যে তাহারই যথার্থ অধিকার, অদ্যাপি তাহা সভ্যসমাজে অনুমিত হইয়া থাকে; পুরাকালেও তদ্বিষয়ে কোনো বিতর্ক থাকিবার কথা নহে। যে সময় হইতে একের ভূমি অন্যকে দান বা বিক্রয় করিবার প্রয়োজন উপস্থিত হইয়াছিল, তখন অধিকার ত্যাগ মাত্রেই তাহা সম্পন্ন হইত। দাতা দিলে, গ্রহীতা গ্রহণ করিলে, তৃতীয় ব্যক্তি সাক্ষী না থাকিলেও চলিত। কালক্রমে তর্ক বিতর্কের সূচনা হইবার সময় হইতেই সাক্ষী রাখিবার প্রথা প্রবর্তিত হইয়াছে। সাক্ষী যত দিন সত্য কহিত, তত দিন বাচনিক প্রমাণই যথেষ্ট বলিয়া পরিগণিত হইত। সাক্ষী মিথ্যা কহিতে শিখিবার সময় হইতেই লিখিত দান পত্রাদির প্রয়োজন অনুভূত হইয়া থাকিবে। সুতরাং লিখিত দানপত্রাদির প্রচলন-কালের সহিত সকল দেশের ধর্মনীতির ইতিহাসের ঘনিষ্ঠ সংস্রব।

বৌদ্ধাধিকার প্রচলিত হইবার পূৰ্ব্বে দান বিক্রয়াদি ব্যাপার কিরূপে সম্পন্ন হইত তাহার কোনো লিখিত প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না। বৌদ্ধবির্ভাবের পরে গ্রীক রাজদূত মেগাস্থিনীস ও চৈনিক বৌদ্ধাচাৰ্য ফা হিয়ান ও হিয়াঙ্গথসাঙ্গ ভারতবর্ষে অবস্থান করিয়া যে সকল কথা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন, তাহাই একমাত্র লিখিত প্রমাণ। তাহাতে দেখা যায়, তৎকালে ভারতবর্ষের লোকে ধৰ্ম্মভয়ে মিথ্যা কহিত না, ঋণগ্রহণ করিয়া অস্বীকার করিত না, দানবিক্রয়াদি ব্যাপার মুখে মুখেই সম্পন্ন হইত। আরবীয় বণিকবর্গও এই কথার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন।

বৌদ্ধাধিকারের শেষ দশায় ভারতবর্ষের নানা বিপ্লব সমুপস্থিত হইয়াছিল;–গৃহবিবাদই তাহার মূল কারণ। সেই বিপ্লবে পুরাতন ধর্মনীতির বন্ধন শিথিল হইয়া পড়িতেছিল, লোকে ছল প্রতারণা অবলম্বন করিতে আরম্ভ করিয়াছিল, যে-কোনও উপায়ে হউক শত্ৰুনিপাতে অগ্রসর হইতেছিল, চাণক্যনীতিই সৰ্ব্বত্র সমাদর লাভ করিতেছিল। মুদ্রারাক্ষস নামক নাটকে সমাজের এই অবস্থার যে চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে, তাহা দর্শন করিলে, আৰ্য সমাজের অধোগতির পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই অধোগতি নিবারণ করিবার জন্য রাজবিধি ও ধর্মানুশাসন প্রচলিত হইয়াছিল।

বৌদ্ধাধিকারের পূর্ণ যৌবনে বৌদ্ধনরপতি অশোক শিলা ও স্তম্ভলিপির প্রচলন করেন। তৎপূৰ্ব্বে ভারতবর্ষের পর্বতগাত্রে কেহ কিছু খোদিত করিয়া যান নাই। অশোকের দৃষ্টান্তের অনুকরণ করিয়া বৌদ্ধ নরপতি ও বৌদ্ধাচাৰ্য্যগণ পৰ্ব্বতে, স্তম্ভে, প্রস্তুর ও ধাতুফলকে এমন কি বৌদ্ধমূৰ্ত্তিতেও শাসন, লিপি বা মন্ত্রাদি খোদিত করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। পৰ্বতগুহায়, লিপি বা মন্ত্রাদি খোদিত করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। পৰ্ব্বতগুহায়, মন্দিরদ্বারে, প্রতিমার গাত্রে এইরূপ অনেক খোদিত লিপি দেখিতে পাওয়া গিয়াছে। অশোকের পূৰ্ব্বে ইহার কোনো শ্রেণির খোদিত লিপিরই পরিচয় পাওয়া যায় না; অশোকের পর হইতেই খোদিত লিপির বাহুল্য দেখিতে পাওয়া যায়। দানাদি ব্যাপারে যে সকল খোদিত লিপি প্রচলিত হইয়াছিল তাহা এই সকল শিলা ও স্তম্ভলিপির আদর্শে গঠিত বলিয়াই বোধ হয়।

কিরূপে তাম্রফলকাদি সম্পাদন করিতে হইবে বৃহস্পতির সংহিতায় তাহা বিধিবদ্ধ রহিয়াছে। বাস্পত্য সংহিতার কালনিৰ্দেশ করিতে পারিলে তাম্র শাসনের কালনির্দেশ করা সহজ হইয়া উঠিবে। এই সকল সংহিতা যে বৌদ্ধাধিকারের পূৰ্ব্বে বর্তমান ছিল তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় না। বৌদ্ধ গ্রন্থাদিতে ইহার উল্লেখ নই; কিন্তু এই সকল গ্রন্থে বৌদ্ধাধিকারের উল্লেখ স্পষ্টতঃ বা আনুসঙ্গিকরূপে বৰ্ত্তমান রহিয়াছে। সুতরাং তাম্ৰশাসনাদি যে অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ের ব্যবহার-পদ্ধতি তদ্বিষয়ে সন্দেহ করিবার কারণ নাই।

মিতাক্ষরায় তাম্রপট্টের উল্লেখ আছে; কিরূপে উহা সম্পন্ন হইত তাহারও পরিচয় সংক্ষেপে প্রদত্ত হইয়াছে, যথা :

“দত্ত্বা ভূমিং নিবন্ধং বা কৃত্বা লেখ্য কারয়েৎ।
আগামিভদ্রনৃপতিঃ পরিজ্ঞানায় পার্থিবঃ।
পটে বা তাম্রপট্টে বা সমুদ্রোপরিচিহ্নিতম।”

ভূমিদান ব্যতিত অন্যান্য নিবন্ধও পটে অথবা তাম্রপটে লিখিবার প্রথা প্রচলিত থাকার কথা মিতাক্ষরায় দেখিতে পাওয়া যায়। এখন যেমন দলিলাদি কৃত্রিম হইয়া থাকে এবং তন্নিবারণাৰ্থ স্ট্যাম্প কাগজ, রেজেষ্টারী ও অঙ্গুষ্ঠের ছাপ ইত্যাদির প্রচলন হইয়াছে, পুরাকালেও তদ্রপ পট বা তাম্রপট্টের ব্যবস্থা ও রাজমুদ্রা মুদ্রিত করিবার নিয়ম প্রচলিত হইয়াছিল। সেকালের যে কৃত্রিম তাম্রশাসন লইয়া অর্থ প্রত্যর্থীর মধ্যে বাদানুবাদ হইত এবং কোনখানি প্রকৃত তাহার মীমাংসা করিবার জন্য বিচারকের মস্তিষ্ক চালনা করিতে হইত মিত্র মহাশয় তাহারও নির্দশন দেখাইয়াছেন।

সাধারণ কাগজে লিখিলে সহজেই তাহার অনুকরণ করা সম্ভব; তজ্জন্য বৰ্ত্তমান যুগে বিশেষ মুদ্রাদিযুক্ত রাজকীয় কাগজে দলিলাধি লিখিবার ও তাহা রেজেষ্টারী করাইবার নিয়ম হইয়াছে। সে কালেও যে এই উদ্দেশ্যে তাম্রপট্টের প্রচলন হয় নাই, তাহা কে বলিতে পারে? তাম্রপট্ট কৃত্রিম করা নিতান্ত সহজ নহে; ফলক প্রস্তুতের জন্য তাম্রকার, লিপি রচনার জন্য পণ্ডিত এবং উৎকীর্ণ করিবার জন্য শিল্পীর সহায়তা গ্রহণ না করিলে কেহ একাকী সহসা এতগুলি কাৰ্য্য সাধন করিতে পারিত না।

যে সকল তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহা বিশুদ্ধ তাম্রে নির্মিত কিম্বা কোনও নির্দিষ্ট পরিমাণের একাধিক ধাতুমিশ্রণে গঠিত তাহাও পরীক্ষা করিয়া দেখা আবশ্যক। অনেক ফলক তাম্র ও রৌপ্যের মিশ্রণে গঠিত বলিয়া জানা গিয়াছে এবং তাম্রফলকে যে রাজমুদ্রা সংযুক্ত থাকে তাহা যে বিশুদ্ধ তাম্ৰে নিৰ্মিত নহে, তাহাও বুঝিতে পারা যায়। কৃত্রিম তাম্রশাসন নিবারণ করিবার পক্ষে ইহা মন্দ কৌশল নহে।

পরবর্তীকালে এই নিয়ম সর্বত্র অনুসৃত হইয়াছিল বলিয়া বোধ হয় না। মোসলমানাধিকার প্রবর্তিত হইবার পরে যে সকল ধাতুপট্ট খোদিত হইয়াছিল তাহার কতক পূৰ্ব্ববৎ তাম্র ও রৌপ্য মিশ্রণে গঠিত, কতক বা কেবল তাম্র, অথবা কেবল পিত্তলময়।

খালশা সেনাধিনায়ক মহারাজ রণজিৎ সিংহ যে সকল খোদিত শাসনলিপি প্রধান করেন তাহাই সৰ্ব্বাপেক্ষা আধুনিক। সেগুলি এক্ষণে লাহোরের শিল্পপ্রদর্শনীতে সযত্নে রক্ষিত হইয়াছে। তাহা সমস্তই পিত্তলপট্টে পারস্য অক্ষরে খোদিত। রণজিৎ সিংহের শাসন-সময়ে তদ্রাজ্যে বিক্রমসম্বৎ প্রচলিত ছিল; ফলকগুলি তজ্জন্য সম্বৎ উল্লেখে উৎকীর্ণ; সৰ্ব্বশেষ ফলক ১৮৭৩ সম্বতে সম্পাদিত।

যে তাম্রশাসনে কৃত্রিম তাম্রশাসন প্রকাশিত হইবার কথা খোদিত আছে, তাহা স্থানেশ্বরাধিপতি হর্ষবর্দন নামা নরপতির প্রদত্ত পঞ্চবিংশতাব্দীর শাসনলিপি, উহা ৬৩১ খৃস্টাব্দের সমকালবর্তী বলিয়া পরিচিত।

এই সকল তাম্রশাসন সাধারণতঃ সংস্কৃত ভাষায় দেবনাগরাক্ষরে খোদিত হইত; কোনো কোনো ফলক প্রাদেশিক অক্ষরেও উৎকীর্ণ হইয়াছিল। তাম্র ফলকে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য লাভ করা গিয়াছে, অনেক প্রচলিত ভ্রম সংশোধনের উপায় হইয়াছে। ভারতবর্ষে মোসলমান শাসন প্রবর্তিত হইবার সময়ে জয়চন্দ্র কান্যকুজে রাজ্যশাসন করিতেন। তাঁহার সহিত পৃথ্বীরাজের গৃহকলহের ছিদ্রপথে মোসলমান-সেনা এ দেশে প্রবেশ লাভ করিয়া কালক্রমে জয়চন্দ্রকেও নিহত করিয়া তাঁহার রাজ্যে মোসলমান-শাসন প্রবর্তিত করিয়াছিল। জয়চন্দ্রের প্রদত্ত তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়া তাঁহার কালনির্ণয়ের সহায়তা করিয়াছে। কান্যকুজের জয়চন্দ্র ও বাঙ্গালার শেষ সেন নরপতি সমসাময়িক ব্যক্তি। সেননরপালগণের অনেকগুলি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, জয়চন্দ্র ও তাঁহার পিতামহ গোবিন্দচন্দ্রেরও কয়েকখানি তাম্রশাসন প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। সুতরাং সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তাম্রশাসন হইতে ঐতিহাসিক তথ্য সঙ্কলনের আশা ক্রমেই বর্ধিত হইতেছে।

ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিতমণ্ডলী তাম্রশাসন হইতে ভাষার পরিবর্তন লক্ষ করিয়া সাহিত্যের ইতিহাস সঙ্কলন করিতে পারেন। হস্তাক্ষর পাঠে যাঁহারা নৈপুণ লাভ করিয়াছেন, তাঁহার ইহা হইতেই দেখাইয়া দিতে পারেন–সেকালের বিশুদ্ধ দেবনাগরক্ষর কোন সময় হইতে মূর্তি পরিগ্রহ করিয়া কোন সময় হইতে ক্রমশঃ রূপান্তর লাভ করিতে করিতে বর্তমান কালের প্রাদেশিক অক্ষরমালার আকারগঠনের সহায়তা করিয়াছে। শিল্পী ইহা হইতে সেকালের খোদিত লিপি শিল্পকৌশল ও তৎসূত্রে সেকালের শিল্পেতিহাস সঙ্কলন করিতে পারেন। এ দেশে দানাদি ব্যাপারে কোন সময় হইতে লিখিত প্রমাণ প্রচলিত হইয়াছে, কোনসময় হইতে ছলপ্রতারণা কৃত্রিমতা প্রবেশ করিয়াছে, ব্যবহারশাস্ত্রবিদগণ তাহারও কিছু কিছু পরিচয় পাইতে পারেন। সুতরাং ইতিহাস পাঠকের নিকট এই সকল তাম্রফলকের সমাদর ক্রমেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবার কথা। মিত্র মহাশয় তাম্রশাসনের ইতিহাসের আলোচনা করিয়া প্রবন্ধ রচনা করায় ইহার প্রতি অনেকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইবে।

ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন সময়ে যতগুলি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, একটি মাত্র প্রবন্ধে তাহার আলোচনা শেষ করা অসম্ভব বলিয়া মিত্র মহাশয় কেবল সংক্ষেপে সকল কথা শেষ করিতে চাহিয়াছেন। বিশেষজ্ঞ পাঠক বা লেখক না হইলে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা সহজ নহে। মিত্র মহাশয় যখন এই ক্ষেত্রে এতদূর ক্লেশ স্বীকার করিয়া অগ্রসর হইয়াছেন, তখন তিনি আরও কিয়দ্র অগ্রসর হইয়া তাম্রশাসন সমালোচনায় হস্তক্ষেপ করিলে ভাল হইত। যে সকল তাম্রশাসন আবিষ্কৃত, পঠিত, ব্যাখ্যাত ও মুদ্রিত হইয়াছে তাহার সকল স্থল নির্ভুল নহে; কোনো কোনো স্থলে মূল বিষয়েও অনেক ভুল দেখিতে পাওয়া যায়, সেগুলি সংশোধিত হওয়া আবশ্যক। যে সকল তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াও লোকসমাজে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় নাই সেগুল প্রকাশিত করাও আবশ্যক। সমগ্র ভারতবর্ষের কথা ছাড়িয়া দিয়া কেবল বাঙ্গালা দেশের নানাস্থানে যে সকল তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে ও হইতেছে তাহা লইয়া বিচার করিতে বসিলেও অনেক নতুন তথ্য প্রকাশিত হইতে পারে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ দুই একখানি সৰ্ব্বজনপরিচিত তাম্রশাসনের সমালোচনা প্রদত্ত হইল।

ধর্মপালের তাম্রশাসন

বাঙ্গালা দেশে যে সকল তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে ধর্মপালের তাম্রশাসন তন্মধ্যে সৰ্ব্বাপেক্ষা পুরাতন বলিয়া বোধ হয়। এই ফলকলিপি গৌড়ের নিকটবর্তী খালিমপুর গ্রামের কোনও নিরক্ষর কৃষক হলকর্ষণোপলক্ষে প্রাপ্ত হয়। স্বর্গীয় উমেশ চন্দ্র বটব্যাল মহাশয় ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে ঐ তাম্রফলক হস্তগত করিয়া তাহার পাঠ ব্যাখ্যা ও প্রতিকৃতি প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন। তৎসূত্রে উহা ধর্মপালের তাম্রশাসন নামে পরিচিত হইয়াছে; বটব্যাল মহাশয় তাহাকে ভট্টনারায়ণের তাম্রশাসন বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন। তাহা যুক্তিযুক্ত বা মূলানুযায়ী বলিয়া বোধ হয় না।

পালনরপতিবর্গের অন্যান্য তাম্রশাসনে দেখা যায়, গোপালদেব তাঁহাদের বংশের আদিপুরুষ। এই গোপালের পুত্রই ধর্মপাল। তাম্রশাসনের পাঠ বটব্যাল মহাশয় যেরূপভাবে প্রকাশিত করিয়াছেন, তাহা অবিকল নিম্নে উদ্ধৃত হইল :

শ্রীমান্ধর্মপাল দেবঃ

Obverse

LI. স্বস্তি

সৰ্ব্বজ্ঞতাং শ্রিয়মিবস্থিরমাস্থিতস্য বজ্রাস

L.2. নস্য বহুমারকুলোপলম্ভাঃ।

দেব্যা মহাকরুণয়া পরিপা-লিতানি

L.3 রক্ষন্তু বো দশবলানি দিশোজয়ন্তি। [1]

শিয় ইব সুভগা

L. 4 যাঃ সম্ভবো বারিরাশি

শশশধর ইব ভাসো বিশ্বমাহূদয়ন্ত্যাঃ।

প্রকৃতিরবনিপানাং সন্ততেরুত্তমায়া

অ–

L. 5 জনি দয়িতবিষ্ণুঃ সৰ্ব্ববিদ্যাবদাতঃ। [2]

আসীদাসাগরাদুবর্বীং গুবর্বীভিঃ কীৰ্ত্তিভিঃ কৃতী।

মণ্ডয়ন

L. 6 খণ্ডিতারাতিঃ শ্লাঘ্যঃ বপ্যটস্ততঃ। [3]

মাৎস্যন্যায়মপোহিতুং প্রকৃতিভিলক্ষ্যাঃ করগ্রাহিতঃ

শ্রীগোপা–

L. 7.ল ইতি ক্ষিতীশশিরসাং চূড়ামণিস্তসুতঃ।

যস্যানুক্ৰিয়তে সনাতন যশোরাশিৰ্দিশামাশয়ে

শ্বেতিস্লা য–

L. ৪. দি পৌর্ণমাসরজনীজ্যোৎস্নাতিভারশিয়া। [4]

শীতাংশোরিব রোহিণী হুতভুজঃ স্বাহেব তেজোনিধেঃ

শৰ্ব্বাণী–

L. 9. ব শিবস্য গুহ্যকপতে ভদ্রেব ভদ্ৰাত্মজা।

পৌলমীব পুরন্দরস্য দয়িতা শ্রীদেদ্দদেবী ত্যভূৎ

দেবী তস্য বিনোৰ্ল ভূমুররিপো লক্ষ্মীরিবহ্মাপতেঃ। [5]

L. 10. তাভ্যাং শ্রীধৰ্ম্মপালঃ সমজনি সুজনপমানাবদানঃ

স্বামী ভূমী–

L. 11 পতীনামখিলবসুমতীমণ্ডলং শাসদেকঃ।

চত্তারস্তীর মজ্জকরিগণচরণান্যস্তমুদ্রাঃ সমুদ্রা

যাত্রাং য–

L. 12 স্য ক্ষমন্তে ন ভুবনপরিখাবিশ্বগাশাজিগীষোঃ। [6]

যস্মিনুদ্দামলীলাচলিতবলকরে দিগজয়ায় প্রবৃত্তে যান্ত্যা–

L. 13 দ্বিশ্বম্ভরায়াং চলিতগিরি তিরশ্চীনতাং তদ্বশেন।

ভারাভুগ্নাবমজ্জন্মনিবিধুরশিরশ্চক্ৰসাহায়কারং

শোষে–

L. 14 ণোদস্তদোষ্ণাত্বরিতরমধোধস্তমেবানুযাতং।[7]

যপ্রস্থানে প্রচলিতবলাস্ফালনাদুল্ললদ্ভি

র্ধূলীপূরৈঃ পিহি–

L.15 ত সকল ব্যোমভির্ভূতধাত্রাঃ।

সম্প্রপ্তায়াঃ পরমতনুতাং চক্রবালং ফণানাং।

মগ্নোন্মীলন মণিফণিপতে র্ল্লা–

L.16 ঘবাদুল্ললাস। [৪]

বিরুদ্ধবিষয়ক্ষোভাৎ যস্য কোপাগ্নিরৌর্ববৎ।

অনিবৃতি প্রজজ্বাল চতুরম্ভোধিবারিতঃ। [9]

L.17 যেহভুবনপৃথুরাম রাঘবনল প্রায়াধরিত্রীভুজ

স্তান্বেকত্র দিদ্দক্ষুণেব নিচিন সৰ্বান সম মৃধসা।

ধব–

L. 18 স্তাশেষনরেন্দ্রমানমহিমা শ্রীধৰ্ম্মপালঃ কলৌ

লোল শ্রীকরিণীনিবন্ধনমহাস্তম্ভঃ সমুত্তম্ভিতঃ ॥ [10]

L. 19 নাসীর ধূলীধবলদশদিশাং দ্রাগপশ্যন্নিয়ত্তাং

ধত্তে মান্ধাতৃসৈন্যব্যতিকরচকিতো ধ্যানতন্দ্ৰীষ্মহেন্দ্রঃ।

L. 20 তাসামদ্যাহবেচ্ছা পুলকিতবপুষাহিনীনাম্বিধাতুং

সাহায্যং যস্য বাহ্বোনিখিলরিপুকুলধবংসিনোনা

L. 21 বকাশঃ। [11] ।

ভোজৈর্মসৈঃ সমদ্রৈঃ কুরু যদবনাবন্তি গন্ধার কীরৈ

ভুবৈপৰ্যালোল-মৌলি-প্রণতি-পরিণতঃ সাধু সঙ্গীৰ্যমানঃ।

L. 22 সাধু সঙ্গীৰ্যমানঃ। হৃষ্যৎ পঞ্চালবৃদ্ধোদ্ধৃতকনময়স্বাভিষেকোদকুম্ভো দত্তঃ শ্রীকন্যকুজ সসললিত চ

L. 23 লিত জ্বলতালক্ষ্ম যেন।[12] গোপৈঃ সীম্নিবনেচরৈ বনভুবিগ্রামোপকণ্ঠেজকৈঃ ক্রীড়দ্ভিঃ প্রতিচত্বরং শিশুগণৈঃ প্রত্যাপনস্থানপৈঃ। L. 24 লীলাবেশ্মনিপঞ্জরোদর শুকৈরুদগীতমাত্মস্তুবং যস্যাকর্ণয়ত স্ত্রপাবিচলিতানং স

L. 25 দৈবাননং।[13] স খলু ভগীরথীপথপ্ৰবৰ্ত্তমান নানাবিধনৌবাটক সম্পাদিতসেতুবন্ধনিহিতশৈল শি

L. 26 খরশ্রেণীবিভ্ৰমাৎ নিরতিশয় ঘনঘনাঘনঘটাশ্যামায়মান বাসরলক্ষ্মী সমারসন্নতজলদ স

L. 27 ময় সন্দেহাৎ উদীচীনামেকনরপতিপ্রভৃতীকৃতাপ্রমেয় হয়বাহিনী-খরখুরোৎখাতধূলীধূসরিত দি

L. 28 গন্তরালাৎ পরমেশ্বরসেবাসমায়াতসমস্তজম্বুদ্বীপ ভূপালানন্তপাদাত ভরনমদবনেঃ পাটলীপূ

L. 29. সমাবাসিত শ্রীমঙ্খয়স্কন্ধাবারাৎ পরমসৌগতো মহারাজাধিরাজ শ্রীগোপালদেব পাদানুধ্যাতঃ প

L. 30. রমেশ্বরঃ পরমভট্টারকো মহারাজাধিরাজ শ্রীমান্ধর্মপাল দেবঃ কুশলী৷৷ শ্রীপুণ্ড্রবর্ধনভু

L. 31 ক্রন্তঃ পাতিব্যাঘ্রতটীমণ্ডলসম্বন্ধ মহন্তাপ্রকাশবিষয়ে

ক্রৌঞ্চশ্বভ্র নাম গ্রামোহস্য চ সীমা পশ্চি

L. 32 মেন গঙ্গিনিকা উত্তরেণ কাদম্বরীদেবকুলিকা খর্জুর বৃক্ষশ্চ। পুৰ্বোত্তরেণ রাজপুত্র দেবটকৃতালিঃ। বী

L. 33 জপূরকঙ্গত্বা প্রবিষ্টা পূৰ্বেণ বিটকালিঃ খাতক যানিকাং গত্বা প্রবিষ্টা জম্বুনিকামাক্রম্য জমূযাণকং

L. 34 গতা। ততো নিসৃত্য পুণ্যারোমবিল্বর্ধস্রোতিকা।

ততোপি নিসৃত্য ন

L. 35 ল চর্মটোত্তরাং গতা। নলচৰ্ম্মটাৎ দক্ষিণেন নামুণ্ডিকায়িকে

L. 36 …কায়াঃ খণ্ডমুণ্ডমুখং খণ্ডমুখাবেদসবিল্কিা বেদবিশ্বি কান্তো রোহিতবাদিঃ পিণ্ডারবিটি জোটিকা সীমা

L. 37 কারজোটস্য দক্ষিণান্তঃ গ্রামবিল্বস্য চ দক্ষিণান্তঃ দেবিকা সীমাবিটি। ধৰ্ম্মা যোজোটিকা। এবম্মাঠাশালীনা

L. 38 মগ্ৰামঃ অস্য চোত্তরেণ গঙ্গিনিকাসীমা ততঃ পূৰ্বেণার্ধ স্রোতিকয়া আম্রযানকোলৰ্দ্ধানিকঙ্গতঃ ত

L. 39 তোপি দক্ষিণেন কালিকাশ্বভ্রঃ। অতোপি নিসৃত্য শ্রীফলভিযুকং যাবৎ পশ্চিমেন ততোপি বিশ্বঙ্গোৰ্দ্ধ শ্রোতি

L. 40 কয়া গঙ্গিনিকা প্রবিষ্টা, পালিতকে সীমা দক্ষিণেন কাণাদ্বীপিকা। পূৰ্ব্বেণ কৌম্বিয়াস্রোতঃ উত্তরেণ।

L. 41 গঙ্গিনিকা। পশ্চিমেন জৈনন্যায়িকা। এতগ্রাম সম্পরীণ পরকৰ্ম্মতৃদ্বীপং। স্থালীৰ্কটবিষয় স

L. 42. স্বদ্ধাম্রষণ্ডিকামণ্ডলান্তপাতি গোপীপ্পল্লীগ্রামস্য সীমা পূৰ্বেণ উড্রগ্রামণ্ডল পশ্চিম সীমা। দক্ষি

L. 43 ণেন জোলকঃ পশ্চিমেন বৈশনিকাখ্যা খাঁটিকা। উত্তরেণোড্রগ্রামমণ্ডল সীমাব্যবস্থিতো গোমার্গঃ এষুচ

L. 44 তুরষু গ্রামে সমুপাগতান সৰ্ব্বানেব রাজরাজনকরাজপুত্র

রাজামাত্য সেনাপতি বিষয়পতি ভোগপতি ষষ্টাধি

L. 45 কৃতদণ্ডশক্তি দণ্ডপাশিক চৌরোদ্ধরণিক দোসসাধ সাধনিক দূতখোলগমাগমিকাভিত্বরমান হস্ত্যশ্বগোমহিষ্যজা

L. 46 বিকাধ্যক্ষ নাকাধ্যক্ষ বলাধ্যক্ষ তরিক শৌল্কিক গৌল্মিক তদাযুক্তক বিনিযুক্তকাদি রাজপাদোপজীবি নোহন্যাংস্টাকীৰ্ত্তি

L. 47 তান চাটভটজাতীয়ান যথাকালাধ্যাসিনো জ্যেষ্ঠকায়স্থ মহামহত্তর মহত্তর দাশগ্রামিকাদি বিষয়ব্যবহারিকঃ ।

L. 48 সকরণান প্রতিবাসিনঃ ক্ষেত্ৰকাংশ্চাব্রাহ্মণমাননাপূৰ্ব্বকং যথার্ফং মানয়তি বোধয়তি সমাজ্ঞাপয়তি চ। মতমস্তু

L. 49 ভবতাং মহাসামন্তাধিপতি শ্রীনারায়ণ বর্মণা দূতক যুবরাজ শ্ৰীত্রিভুবনপালমুখেন বয়মেবং বিজ্ঞাপিতাঃ যথাহম্মা

L. 50 ভিৰ্মাতাপিত্রোরাত্মনশ্চ পুণ্যাভিবৃদ্ধয়ে শুভস্থল্যাং দেবকুলং কারিতত্র প্রতিষ্ঠাপিত ভগবনুন্ন নারায়ণ ভটারকায় তপ্র

L. 51 তিপালকলাটদ্বিজদেবার্চকাদি পাদমূলসমেতায় পূজোপস্থানাদিকৰ্ম্মণে চতুরো গ্রামান অত্ৰত্য হটিকা। তল (পা) বাটক

L. 52 সমেতান দদাতু দেব ইতি। ইত্যাদি ইত্যাদি।

ইহা একখানি ভূমিদান পত্র। এতদ্বারা শ্ৰীমান ধর্মপাল দেব পাটলীপুত্রের জয়স্কন্ধাবার হইতে তদীয় “অভিবর্ধমান বিজয় রাজ্যে” দ্বাত্রিংশদ্বর্ষীয় দ্বাদশ মার্গদিনে তাম্রফলকোল্লিখিত গ্রামচতুষ্টয় দান করিয়াছিলেন। এই দানের হেতু, প্রয়োজন ও পাত্রাদি সম্বন্ধীয় কথা ৪৯ হইতে ৫৪ পংক্তি পর্যন্ত খোদিতাংশে বর্ণিত রহিয়াছে। বটব্যাল মহাশয় উত্তাংশের এইরূপ ইংরাজি অনুবাদ করিয়া গিয়াছেন; যথা :

Be it known unto you:

Our Mahasamantadhipati, Sree Narayana Varman, by the mouth of the Yuvaraja Sree Tribhuvana Pala, the messenger, addresses us as follows :

“We for increasing the merit of our father and mother, as well as of self have caused a House of God to be erected at Subhasthali. There have we established the Godguided Bhatta Narayana, who came to visit

the Brahmans of the Lata country, whom we appointed as the guardians and worshippers of the said House of God.

“For the performance of the offices of religion in the said House, may your Majesty be pleased to grant to the said Bhatta Narayana four villages, together with their markets, roads, and everything on the surface.”

Then we, in pursuance of his recommendation, have in the terms of his address, eatablished and granted these above written four villages with markets, roads, and everything on the surface as far as their respective boundries, as also with everything above them together with the ten apacaras, free of all tribute, and free from all coercive measures. May this grant last, like the pores of the Earth, as long as the Sun and the moon.

এই অনুবাদের ভাবার্থ এইরূপ; যথাঃ–”এতদ্বারা সকলে অবগত হও যে, আমাদিগের মহাসামস্তাধিপতি শ্রীনারায়ণ বর্মা যুবরাজ শ্ৰীত্রিভুবন পালের দ্বারা আমাদের নিকট এই মর্মে আবেদন করিয়াছিলেন যে;–পিতা মাতার ও নিজের পুণ্যাভিবৃদ্ধিকামনায় আমরা শুভস্থলীতে এক দেবালয় করিয়া তথায় ঈশ্বরচালিত ভটনারায়ণকে স্থাপিত করিয়াছি; তিনি লাটদেশীয় ব্রাহ্মণ দিগের সহিত সাক্ষাৎলাভাৰ্থ আসিয়াছিলেন, ঐ লাটদেশীয় ব্রাহ্মণগণকে আমরা উক্ত দেবালয়ের অভিভাবক ও দেবপুজকরূপে নিযুক্ত রাখিয়াছি। উক্ত দেবালয়ের ধৰ্মকৰ্ম্মাদি নির্বাহের জন্য মহারাজ প্রসন্ন হইয়া উক্ত ভট্টনারায়ণকে হাটঘাট ও তল বাটক সহ গ্রামচতুষ্টয় দান করুন। অতঃপর আমরা এরূপ অনুরোধ প্রাপ্ত হইয়া উক্ত প্রার্থনার মর্মানুসারে পূর্বোক্ত হাট ঘাটাদি সহ সসীমা গ্রামচতুষ্টয় ও তদুপরিস্থ তাবৎ পদার্থ দশোপকার সহ দান করিলাম। উহার কর গৃহীত হইবে না, বা কোনও পীড়ন থকিবে না। ভূমির ছিদ্রের ন্যায় এই দান চন্দ্রসূৰ্য্যবৎ স্থায়ী হউক।”

বটব্যাল মহাশয়ের উদ্ধৃত পাঠের সহিত তাঁহার প্রদত্ত তাম্রশাসনের প্রতিকৃতি পাঠ করিলে দুই চারিটি স্থলে যৎসামান্য পাঠবিপৰ্যয় ভিন্ন কোনো গুরুতর ভ্রম লক্ষ্য করা যায় না; কিন্তু তাঁহার অনুবাদ ও ব্যাখ্যার অনেক স্থলেই অনুমোদন করা যায় না।

বটব্যাল মহাশয় যে অনুবাদ প্রকাশিত করিয়াছেন তাহাতে দেখা যায় যে, লাটদেশীয় দ্বিজগণ শুভস্থলীর দেবালয়ের পুজকরূপে নিযুক্ত থাকিবার সময়ে তাঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ লাভার্থ ভট্টনারায়ণ নামক কোনও ব্রাহ্মণ শুভস্থলীতে আগত ও সংস্থাপিত হইয়াছিলেন। লাটদ্বিজগণের সহিত সাক্ষাৎ কামনায় আসিয়া থাকিলে ভট্টনারায়ণকে মানুষ বলিয়াই মানিয়া লইতে হয়। কিন্তু মূল তাম্রফলকে এতদনুরূপ কোনো কথা নাই। তাহাতে ভট্টনারায়ণ শব্দও নাই, নারায়ণ ভট্টারক শব্দ মাত্রই খোদিত আছে। বটব্যাল মহাশয় তাহাকে পূৰ্ব্বনিপাত করিয়া এবং ভট্ট, ভট্টার, ভট্টারক একার্থবোধক বলিয়া নারায়ণ ভট্টারককে ভট্টনারায়ণ করিয়াছেন, এবং উক্ত ভট্টনারায়ণ “লাটদেশীয় দ্বিজগণের সহিত সাক্ষাৎকামনায় শুভস্থলীতে সমাগত হইয়াছিলেন” (মূলে তাহা না থাকিলেও) এইরূপ অনুবাদ মুদ্রিত করিয়া গিয়াছেন, তদনুসারে ধর্মপালদের এই তাম্রশাসন প্রদান করিয়া ভট্টনারায়ণ নামক ব্রাহ্মণকে গ্রাম চতুষ্টয় দান করিয়াছিলেন বলিয়া সুদীর্ঘ ব্যাখ্যাও লিখিত ও প্রচারিত হইয়াছে।

ভট্টনারায়ণের নাম ভারতবর্ষের সর্বত্র সুপরিচিত; কারণ ভট্টনারায়ণ নামধেয় কবি বেণীসংহার নাটকের রচয়িতা বলিয়া প্রসিদ্ধ। বটব্যাল মহাশয় বলেন যে, এই তাম্রফলক সেই প্রসিদ্ধ নাটকরচয়িতাকেই প্রদত্ত হইয়াছিল।

ভট্টনারায়ণের নাম বঙ্গীয় ব্রাহ্মণ সমাজে সমাদৃত; কারণ, আদিশূরের আমন্ত্রণে কান্যকুজ হইতে যে পঞ্চগোত্রীয় পঞ্চ ব্রাহ্মণ গৌড়াগত হইয়াছিলেন বলিয়া জনশ্রুতি প্রচলিত আছে, অনেকের মতে ভট্টনারায়ণ তাঁহাদের একতম। বটব্যাল মহাশয় বলেন, সেই ভট্টনারায়ণ এবং বেণীসংহার-রচয়িতা ভট্টনারায়ণ তথা ধর্মপালের তাম্রশাসনোল্লিখিত ভট্টনারায়ণ এক এবং অভিন্ন ব্যক্তি।

বটব্যাল মহাশয় লিখিয়াছেন : ‘স্বর্গীয় রাজা রামমোহন রায়, স্বর্গীয় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহারাজ স্যার যতীন্দ্র মোহন ঠাকুর, কবিবর হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মান্যবর ডবলিউ, সি, বনাৰ্জী, বিচারপতি ডাক্তার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বাগ্মীবর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পণ্ডিতবর মহামহোপাধ্যায় মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন প্রভৃতি গণ্যমান্য বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ ভট্টনারায়ণের বংশধর।” শুনিয়াছি বটব্যাল মহাশয় নিজেও এই বিখ্যাত ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।

বংশসংস্থাপক শাণ্ডিল্য গোত্রীয় শাণ্ডিত্য অসিত দেবল প্রবর ভট্টনারায়ণ বেণীসংহার-রচয়িতা কিনা, তাহার কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ দেখিতে পাওয়া যায় না।

বেণীসংহার-রচয়িতা ভট্টনারায়ণ বঙ্গদেশে বংশবিস্তার করিয়াছিলেন কি না, তাহা নিঃসংশয় নির্ণয় করিতে না পারিলেও, বিশেষ কোনো ক্ষতি নাই। কিন্তু বটব্যাল মহাশয় যাহা লিখিয়াছেন তাহা সত্য হইলে, কুলজ্ঞগণের গ্রন্থ ও বঙ্গে পঞ্চ ব্রাহ্মণাগমনের জনশ্রুতি মিথ্যা হইয়া পড়ে। আদিশূরের আমন্ত্রণে ভট্টনারায়ণের বঙ্গদেশে পদার্পণ করা সত্য হইলে, ধর্মপালের রাজত্বের দ্বাত্রিংশদ্বর্যে তাঁহার তাম্রশাসন প্রাপ্তি ঘটিতে পারে না।

বটব্যাল মহাশয় মালদহের ম্যাজিস্ট্রেট হইয়া আসিবার পূর্বেই এই তাম্রশাসনখানি আবিষ্কৃত হয়। যে নিরক্ষর কৃষক ইহা প্রাপ্ত হইয়াছিল, সে ইহাকে হস্তচ্যুত করিতে চাহিত না। সুতরাং তাহার জীবনকালে ইহার সন্ধানলাভ করিলেও কেহ ইহা হস্তগত করিতে পারেন নাই। বটব্যাল মহাশয় মালদহে আসিয়া এই সংবাদ জ্ঞাত হন; কৃষক তখন পরলোকগত। সুতরাং তাহার বিধবার নিকট হইতে জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সহজেই উহা ক্রয় করিতে পারিয়াছিলেন।

এই তাম্রশাসনের পাঠোদ্ধারকার্য্যে মালদহনিবাসী পণ্ডিত রজনীকান্ত চক্রবর্তী মহাশয় প্রভূত ক্লেশ স্বীকার করিয়াছিলেন। বটব্যাল মহাশয় যে প্রবন্ধ রচনা করেন। তাহাতে ইহা উল্লিখিত হয় নাই। পাঠোদ্ধার সমাপ্ত হইলে ইহার ব্যাখ্যা লইয়া পণ্ডিত মহাশয়ের সহিত বিতর্ক উপস্থিত হইয়াছিল, বটব্যাল মহাশয় স্পষ্টতঃ তাহার উল্লেখ না করিলেও এই পৰ্য্যন্ত লিখিয়া গিয়াছেন যে, “এই তাম্রশাসন যে ভট্টনারায়ণের তাম্রশাসন তদ্বিষয়ে কেহ কেহ সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন।”৫

পণ্ডিত মহাশয় দরিদ্র ব্রাহ্মণ, কিন্তু ইতিহাস-পাঠকদিগর নিকট তাঁহার নাম অজ্ঞাত নহে। তাঁহার ন্যায় সুপণ্ডিত কিরূপে বটব্যাল মহাশয়ের ব্যাখ্যার অনুমোদন করিয়াছিলেন তাহা জানিবার জন্য পত্র লিখায় পণ্ডিত মহাশয় লিখিয়াছেন যে, বটব্যাল মহাশয় ভট্টনারায়ণ বংশীয়, তিনি কোনও আপত্তি না শুনিয়া ভগবান নারায়ণ ভট্টারকের তাম্রশাসনকে ভট্টনারাণের তাম্রশাসন বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন।

এইরূপ ব্যাখ্যা করিবার কারণ উল্লেখ করিতে গিয়া বটব্যাল মহাশয় লিখিয়াছেন, মন্বৰ্থমুক্তাবলী নামক মানবধর্মশাস্ত্রের টীকাকার “ভট্টদিবাকরাত্মজ শ্রীমৎ কুল্লুকভট্ট” বলিয়া আত্মপরিচয় দিয়াছেন। সুতরাং নামের পূৰ্ব্বে বা পরে ভট্ট শব্দ বক্তার ইচ্ছানুসারে ব্যবহৃত হইতে পারে। এই তর্ক ভট্টশব্দ সম্বন্ধে প্রযোজ্য; ইহাতে ভট্টারক শব্দকে যে ব্যাখ্যাতার ইচ্ছানুসারে ভট্ট শব্দে সঙ্কুচিত করিতে পারা যায় তাহার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তজ্জন্য বটব্যাল মহাশয় অন্যতর প্রমাণের উল্লেখ করিয়াছেন। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র শিবভট্টারকের তাম্রশাসনের ব্যাখ্যায় লিখিয়াছেন, “এই তাম্রশাসন শিবভট্টকে প্রদত্ত হইয়াছিল।”৬ বটব্যাল মহাশয় লিখিয়াছেন যে, “তিনি এই প্রমাণকে অন্ধবৎ অনুসরণ করেন নাই; “রাজা ভট্টারকো দেবঃ।” বলিয়া অমরকোষে এবং “তপোধন” বলিয়া মেদিনীতে ভট্টারকের অর্থ লিখিত শব্দে স্বার্থে ক প্রত্যয় করিয়া ভট্টারক করিয়া লইলে যেমন অর্থের পরিবর্তন হয় না, তদ্রপ ভট্টারক শব্দ হইতে ক পরিহার করিয়া ও ভট্টার শব্দকে কেবল ভট্ট শব্দে সঙ্কুচিত করিয়া লইলেও অর্থের তারতম্য ঘটে না।”

ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র যাহাকে শিবভট্টের তাম্রশাসন বলিয়াছেন তাহা যে শিবভট্টারক নামক মহাদেবের তাম্রশাসন নহে, সে কথা সংস্থাপন করিতে না পারিলে ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিয়া কোনো ফল নাই। ভট্ট, ভট্টার, ভট্টারক একাৰ্থবোধক কিনা সে আভিধানিক তর্কেও বিশেষ কিছু ফল নাই, এই শব্দত্রয় একার্থবোধকরূপে কোথায়ও ব্যবহৃত হইয়াছে কিনা তাহাই প্রদর্শন করা কর্তব্য। বটব্যাল মহাশয়ের ন্যায় প্রগাঢ় পণ্ডিতও তদ্রপ কোনো ব্যবহার দেখাইতে পারেন নাই।

তাম্রফলকে কেবল ভট্টারক শব্দ থাকিলে অর্থমীমাংসা করা সহজ হইত। নারায়ণ শব্দের পূৰ্ব্বে ভগবৎ ও পরে ভট্টারক এই দুই শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে। ঋষিদিগের নামের পূৰ্ব্বে ভগবৎ শব্দ প্রযুক্ত হইতে দেখা যায়। অন্য কোনও কবিরা তপস্বীর নামের পূৰ্ব্বে ভক্তিবাহুল্যে কেহ ভগবৎ শব্দ প্রয়োগ করিলেও বৌদ্ধধর্মানুরাগী ধর্মপালের পক্ষে সেরূপ ভক্তিবাহুল্য প্রদর্শনের সম্ভাবনা দেখা যায় না। সেনরাজগণ যে সকল তাম্রশাসন প্রদান করিতেন তাহার কোনো কোনো শাসনে লিখিত আছে “ভগবন্নারায়ণভট্টারকমুদ্দিশ্য”; বৌদ্ধ ভূপালগণ যে সকল তাম্রশাসন প্রদান করিতেন তাহার কোনো কোনো শাসনে লিখিত আছে “ভগবন্তং বুদ্ধভট্টারকমুদিশ্য’। ইহাতে স্পষ্টই দেখা যাইতেছে যে, দেবতার বা দেব্যবতারের নামোল্লেখ করিতে হইলে লিখিবার প্রথানুসারে গৌরব সম্ভ্রম ও ভক্তি বিজ্ঞাপনার্থে লোকে নামের পূৰ্ব্বে ভগবৎ ও পরে ভট্টারক শব্দের ব্যবহার করিত। কোনও মনুষ্যের নামের পূর্বে বা পরে এইরূপ বিশেষণ দেখা যায় না।

এ পর্যন্ত যতগুলি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহার অধিকাংশই মনুষ্যোদ্দেশ্যে দানপত্র। তত্তস্থলে আবিষ্কৃত গ্রহীতার বর্ণ (শৰ্ম্মন বা দেবশর্মন) গোত্র প্রবর, বেদ, বংশ (পিতা পিতামহ প্রপিতামহের নাম) লিখিত হইয়াছে। এরূপ লিখিবার প্রয়োজন আছে। উত্তরকালে একের তাম্রশাসন অপরে ব্যবহার করিতে না পারে তজ্জন্য গ্রহীতার পরিচয় স্পষ্টতঃ উল্লিখিত হওয়া আবশ্যক। অদ্যাপি এই রীতি প্রচলিত দেখিতে পাওয়া যায়।

সমালোচ্য তাম্রশাসন যদি কোনও ব্রাহ্মণকে প্রদত্ত হইয়া থাকে, তবে তাহার বংশ, গোত্র প্রবরাদি লিখিত হয় নাই কেন, বটব্যাল মহাশয়ের মনে এরূপ প্রশ্ন উদিত হইয়াছিল কিনা জানা যায় না; তাঁহার প্রবন্ধে ইহার কোনো উত্তর দেখিতে পাওয়া যায় না।

এপৰ্য্যন্ত যতগুলি ভূমিদানপত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে তন্মধ্যে এই তাম্রশাসনে ও ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র কর্তৃক ব্যাখ্যাত শিবভট্টারকের তাম্রশাসনেই গ্রহীতার বংশ গোত্র প্রবরাদির উল্লেখ নাই। এই দুই খানি দেবোদ্দেশে দানপত্র, অথচ দুইখানিই ব্রাহ্মণকে প্রদত্ত বলিয়া ব্যাখ্যাত ও পরিচিত হইয়াছে।

ধর্মপালদেব বৌদ্ধ হইয়া নারায়ণের পূজা সংস্থাপনার্থ ভূমিদান করিয়াছিলেন কেন? তাম্রফলকে তাহার আভাস দেখিতে পাওয়া যায় :

“মাৎস্যন্যায়মপোহিতুং প্রকৃতিভিলক্ষ্যাঃ করগ্রাহিতঃ”

এই বর্ণনায় ধর্মপালের রাজ্যলাভের কারণ বিবৃত রহিয়াছে। তাঁহার সিংহাসনারোহণের পূর্বে ‘মাৎস্য ন্যায়” প্রচলিত ছিল,–এক মৎস্য যেমন অপরকে উদরসাৎ করে–সবল সেইরূপ দুৰ্বলকে পীড়ন করিত, দেশ অরাজক হইয়াছিল। প্রকৃতিপুঞ্জ সেই “মাৎস্য ন্যায়” দূর করিয়া শান্তি সংস্থাপন কামনায় ধর্মপালকে সিংহাসনে সংস্থাপিত করিয়াছিল, সুতরাং ধর্মপাল হিন্দু ও বৌদ্ধ সকল শ্রেণির প্রকৃতিবর্গকেই তুল্যরূপে সমাদর করিতেন। তাঁহার মহাসামন্তাধিপতির নাম নারায়ণ বর্মা। উপাধি দ্বারা ক্ষত্রিয়ত্ব সূচিত হইতেছে। “অস্মাভি মাতাপিত্রোরাত্মনশ্চ পুণ্যাবিবৃদ্ধয়ে শুভস্থল্যাং দেবকূল, কারিতং” এই বর্ণনার “অস্মাভিঃ” পদ নারায়ণ বর্মাকেই সূচিত করিতেছে। তিনি শুভস্থলীতে দেবালয় করিয়া তথায় নারায়ণ বিগ্রহ সংস্থাপন করতঃ লাটদেশীয় দেবাéক আনাইয়া তাঁহাদের দ্বারা পূজাদি নিৰ্বাহিত করিতেন। এই নারায়ণ বিগ্রহের পরিচয় দিবার সময়ে তাহাকে “ভগবনুন্ন নারায়ণ ভট্টারক’’ বলিয়া নারায়ণ বৰ্ম্মা নিবেদন করিয়াছিলেন। নুদধাতু ক্ত প্রত্যয়ে নুন্ন পদ সিদ্ধ হয়। উহার অর্থ “প্রেরিত।” বৌদ্ধধর্মপ্লাবিত বঙ্গদেশে বহুকাল হিন্দুদেবদেবীর সমাদর অপসৃত হইয়াছিল। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সৌরাষ্ট্র ও মগধ বৌদ্ধধর্মের প্রবল প্রতাপে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। তত্তদ্দেশে গমন করিলেও ব্রাহ্মণের পাতিত্য ঘটিত বলিয়া প্রবাদ প্রচলিত হইয়াছিল।

“অঙ্গবঙ্গ কলিঙ্গেযু সৌরাষ্ট্রে মগধে তথা।
তীর্থযাত্ৰাং বিনা গচ্ছন পুনঃ সংস্কারমর্হতি।”

লোকে তীর্থদর্শন ব্যতীত এই সকল দেশে আসিলে পুনঃ সংস্কার গ্রহণ করিতে বাধ্য হইত। এই দেশে যখন বৌদ্ধপ্রতাপ মন্দীভূত হইতে আরম্ভ হয়, তখন হইতে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ব্রাহ্মণগণকে বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ বোধে এদেশে আমন্ত্রণ করা হইতেছিল ও দেবমূর্তিও তদ্দেশ হইতে আনীত হইতেছিল। “নুন্ন” শব্দে ও “লাটদ্বিজ” শব্দে ইহাই সূচিত হইতেছে বলিয়া বোধ হয়।

ধর্মপাল বৌদ্ধ হইয়াও হিন্দু বিগ্রহ স্থাপনের সহায়তা করিয়াছিলেন কেন, তাহার কারণ স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করিবার জন্যই মহাসামন্তাধিপতির আবেদন উদ্ধৃত করিয়াছেন। কিন্তু তাম্রফলকের কুত্রাপি “প্রদত্তমম্মাভিঃ” ইতি দানসূচক বাক্য বা ‘‘ভগবন্তং বুদ্ধ ভট্টারকমুদ্দিশ্য” ইতি ফলাকাঙ্ক্ষামূলক উক্তি খোদিত হয় নাই। বৌদ্ধ নরপালবর্গের অন্যান্য তাম্রশাসনে “বুদ্ধ ভট্টারকমুদ্দিশ্য” এই কথা খোদিত আছে, “প্রদত্ত মস্মাভি” এই দানসূচক উক্তিও দেখিতে পাওয়া যায়। এখানে কেবল নারায়ণ বর্মার আবেদনের অনুমোদন করা পৰ্যন্তই খোদিত রহিয়াছে।

বৌদ্ধধর্মের অভ্যুদয় অধঃপতনের ইতিহাসের সহিত বৌদ্ধ এবং হিন্দু উভয়েরই সংস্রব ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের উন্নতির দিনে হিন্দুগণ যেমন অনেক বৌদ্ধ আচার ব্যবহার অবলম্বন করিয়াছিল এবং অবশেষে বুদ্ধদেবকে অবতার বলিয়াও স্বীকার করিয়া লইয়াছিল, সেইরূপ বৌদ্ধ ধর্মের অধঃপতন কালে বৌদ্ধগণ অনেক হিন্দু আচার ব্যবহার করিয়াছিল এবং ধীরে ধীরে হিন্দু দেবদেবীর সেবাপূজা অবলম্বন করিয়া হিন্দুরূপে পরিগণিত হইয়াছিল। প্রজাসাধারণের মধ্যেই যে এইরূপ ঘটিয়াছিল তাহা নহে; বৌদ্ধ রাজারাও ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধাচারভ্রষ্ট ও হিন্দু মতে আনীত হইয়া হিন্দুদলে মিশিয়া গিয়াছিলেন। ধর্মপালের সময়ে ইহার কেবল আরম্ভ, পরবর্তী পালনরপতিগণের সময়ে ক্রমশঃ পরিণতি দেখিতে পাওয়া যায়।

এই তাম্রপটে যে রাজমুদ্রা সংযুক্ত আছে তাহাতে বৌদ্ধ ধর্মচক্র দেখিতে পাওয়া যায়। প্রথম শ্লোকেও দশবুদ্ধবলের উল্লেখ রহিয়াছে। পালবংশীয় অন্যান্য নরপতিবর্গের যে সকল তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহাতে গোপালদেব পুত্র বলিয়া কীৰ্তিত। পালনরপতিগণ কোন ধর্মাবলম্বী ছিলেন তাহা যেমন স্পষ্টতর সূচিত হইয়াছ, তাঁহারা কোন বর্ণের কোন বংশের তাহা সেরূপ সূচিত হয় নাই। বংশাবলী কীৰ্ত্তন করিবার সময়ে রাজকবি কল্পনার গতি রোধ করার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই; গৌরববর্ধনের জন্য ইচ্ছামত অনেক কথাই কবিতানিবদ্ধ করিয়াছেন।

পাটলীপুত্রের জয়স্কন্ধাবার হইতে এই তাম্রশাসন প্রদত্ত হইয়াছিল, তখন “অভিবর্ধমান বিজয়রাজ্যের দ্বাত্রিংশদ্বষ” অতীত প্রায়। যুবরাজ ত্রিভুবনপাল এই তাম্রশাসনের দূতক বলিয়া বোধ হয়। যুবরাজ ত্রিভুবনপাল কে, তাহার আর কোনও পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায় না। যদি যুবরাজ শব্দে ধৰ্ম্মপালের পুত্র বলিয়া ধরিয়া লইতে হয়, তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, এই পুত্র উত্তরকালে জীবিত ছিলেন না অথবা পিতৃসিংহাসন অধিকার করিতে পারেন নাই। কারণ অন্যান্য তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়, ধর্মপালের সিংহাসনে তদীয় ভ্রাতা বাক পালের পুত্র দেবপাল উপবেশন করিয়াছিলেন।

নারায়ণপালের তাম্রশাসন

বটব্যাল মহাশয় ডাক্তার রাজেন্দলাল মিত্ৰ কৰ্ত্তক ব্যাখ্যাত শিবভট্টারকের তাম্রশাসন বলিয়া যে তাম্রফলকের উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা ভাগলপুর হইতে স্মিত সাহেব কলিকাতার এসিয়াটিক সোসাইটিতে প্রেরণ করেন। উহাতে পালনরপতিগণের বংশাবলী এইরূপ কীৰ্ত্তিত রহিয়াছে :

  1. গোপাল
    1. ধর্মপাল
    1. বাকপাল
      1. দেবপাল
      1. জয়পাল
        1. বিগ্রহপাল
          1. নরপাল

ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র পাঠোদ্ধার করিয়া তাহার ইংরাজী অনুবাদ ও টীকা প্রকাশিত করিয়া লিখিয়াছেন যে, “সহস্রাক্ষ” নামক দেবতার চরুবলিপ্রদানর্থ, রুগ্নজনগণকে ঔষধ বিতরণার্থ এবং দুঃখিগণকে আহাৰ্য্য ও আশ্রয় দানার্থ একজন হিদুকে এই তাম্রশাসন প্রদত্ত হইয়াছিল।

ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের ন্যায় প্রসিদ্ধ প্রত্নতত্ত্ববিৎ যাহার ব্যাখ্যা করিয়াছেন, বটব্যাল মহাশয়ের ন্যায় সুপণ্ডিত যাহার অনুসরণ করিয়াছেন, তাহা যে আদৌ মূলানুযায়ী হয় নাই বা অসঙ্গত হইয়াছে একথা সহসা বিশ্বাস করিতে সাহস হয় না। তজ্জন্য ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের ব্যাখ্যাত তাম্রশাসনের কিয়দংশ নিম্নে অবিকল উদ্ধৃত হইল; যথা :

“কলশপোতে মহারাজাধিরাজ শ্রীনারায়ণপালদেবেন স্বয়ং কারিত সহস্রায়তনস্য তত্র প্রতিষ্ঠাপিতস্য ভগবতঃ শিবভট্টারস্য পাশুপত আচাৰ্য্য পরিষদশ্চ যথার্ফং পূজাবলিচরুসত্ৰনবকৰ্ম্মাদ্যর্থং শয়নাসনগ্লানপ্রত্যয়-ভৈষজ্যপরিস্কারাদ্যর্থং অন্যেষামপি স্কাভিমতানাং স্বপরিকল্পিতবিভাগেন অনবদ্য ভোগার্থঞ্চ যথোপরিলিখিত মকুতিকাগ্রামঃ স্বসীমা- তৃণপ্রতিগোচরপৰ্য্যন্তঃ সতল সোদ্দেশঃ সাম্রমধূকঃ সজলস্থলঃ সগর্তোষরঃ সোপরিকরঃ সদশোপচারঃ সচোরোদ্ধরণঃ পরিহৃতসৰ্ব্বপীড়ঃ অচাটভট্টপ্রবেশঃ অকিঞ্চিৎপ্রয়াস্ক (অকিঞ্চিৎ প্রগ্রাহ্য?) সমস্তভাগভোগকরহিরণ্যাদিপ্রত্যায়সমেতঃ ভূমিচ্ছিদ্ৰন্যায়েনাচার্কক্ষিতিসমকালং যাবৎ মাতাপিত্রোরাত্মনশ্চ পুণ্যযশোহভিবৃদ্ধয়ে ভগবন্তং শিবভট্টারকমুদ্দিশ্য শাসনীকৃত্য প্রদত্তঃ।”

ইহা একখানি ভূমিদানপত্র। এতদ্বারা শ্ৰীমান নারায়ণ পালদেব শ্রীমুদগগিরির (বর্তমান মুঙ্গের) জয়স্কন্ধাবার হইতে ভূমিদান করিয়াছিলেন। দানের প্রয়োজন ও পাত্রাদি সম্বন্ধীয় কথা ৩৮ হইতে ৪৪ পংক্তি পর্যন্ত খোদিতাংশে বর্ণিত রহিয়াছে। এই খোদিতাংশে বা কুত্রাপি এরূপ কোনো কথা লিখিত নাই যে “সহস্রাক্ষ” নামক দেবতার চরুবলি ইত্যাদির জন্য ইহা প্রদত্ত হইয়াছিল। দুঃস্থব্যক্তিগণেরও কোনো উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায় না। সমগ্র তাম্ৰশাসন খানি ধৈয্যাবলম্বনে পাঠ করিতে পারিলে সকলেই দেখিবেন ইহাতে ‘সহস্রাক্ষ” শব্দ পর্যন্তও ব্যবহৃত হয় নাই। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয় দানাংশের যেরূপ ইংরাজী অনুবাদ করিয়া গিয়াছেন তাহা নিম্নে উদ্ধৃত হইল; যথা :

Be it known unto you that in the village of Kalasapota, where Narayana Pala Deva himself has established thousands of temples, and where he has placed the honorable Siva Bhatta and Pasupati Acharya, I, Narayana Pala Deva, for purpose of due worship, for the offering of oblations (charu and yajnas) for the performance of new ceremonies, and for the dispensation of medicines, beddings and seats to diseased persons, and for the purpose of enabling them to enjoy without let or hindrance the village as defined, I have given the above named village & c.

এই অনুবাদে তাম্রশাসনোল্লিখিত ‘অন্যেষামপি স্বাভিমতানাং স্বপরিকল্পিতবিভাগেন” এই কয়েকটি কথা অনুবাদিত হয় নাই; এবং অনুবাদে যে শিবভট্ট ও পশুপতি আচাৰ্য্য শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে মূল ফলকে তাহা নাই, তস্থলে “ভগবতঃ শিবভট্টারকস্য পাশুপত আচাৰ্যপরিষদচ” রহিয়াছে। অনুবাদ কালে “শিবভট্টারক” শিবভট্ট হইয়াছেন, “পাশুপত আচাৰ্যপরিষ্কৎ” পশুপতি আচাৰ্য্য হইয়াছেন, “পরিষৎ” শব্দ একেবারে পরিত্যক্ত হইয়াছে। অনুবাদে যাহা পরিত্যক্ত হইয়াছে, তাহা পরিত্যক্ত না হইলে ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র কৃত ব্যাখ্যা আদৌ যুক্তিযুক্ত হয় না। কিয়দংশের পরিহার করিয়া কিয়দংশ ইচ্ছানুসারে পরিবর্তিত করিয়া মিত্র মহাশয় যে ব্যাখ্যা করিয়া গিয়াছেন বটব্যাল মহাশয় তাহাকেই প্রমাণস্থলে উপস্থিত করিয়াছেন। তাম্রশাসনে দানাংশ যেরূপে লিখিত রহিয়াছে তাহা আদ্যোপান্ত পাঠ করিলে এই ব্যাখ্যা যুক্তিসঙ্গত বা মূলানুগত বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। ৪৪ পংক্তিতে ‘‘ভগবন্তং শিবভট্টারকমুদ্দিশ্য শাসনীকৃত্য প্রদত্তঃ” এই কয়েকটি কথা খোদিত আছে; মিত্র মহাশয় তাহার অনুবাদেও CONTINGSI have given this edict engraved to you honourable Sival for এই স্থলে শিবভট্টারককে শিবভট্ট বলিয়া স্পষ্টতঃ অনুবাদিত করেন নাই। দানকালে কোনোরূপ কামনা করিয়া বা কাহাকেও উদ্দেশ করিয়া দান করিবার রীতি আছে, তজ্জন্য দাতার ইচ্ছানুসারে কেহ লিখিয়াছেন “ভগন্তং বুদ্ধভট্টারকমুদ্দিশ্য’, কেহ লিখিয়াছেন “ভগবন্নারায়ণ-ভট্টারকমুদ্দিশ্য” ইত্যাদি। সেই রীত্যনুসারে এই তাম্রপট্টে নারায়ণ পালদেব লিখিয়াছিলেন “ভগবন্তং শিবভট্টারকমুদ্দিশ্য’–ইহা শিববাদ্দেশে দান, শিবভট্টনামক মনুষ্যোদ্দেশে নহে। তাহা হইলে, শিবভট্টাচাৰ্য ও পশুপতি আচার্য্য নামক দুই ব্যক্তিকে দান করিয়া শেষাংশ আচাৰ্য মহাশয়কে বিস্মৃত হইয়া কেবল ভট্টাচাৰ্য মহাশয়কে উদ্দেশ করিয়া “শিবভট্টারকমুদ্দিশ্য” বলিয়া দানপত্র প্রদত্ত হইত না, এখানেও উভয়ের নামোল্লেখ থাকিত।

তাম্রফলকখানি সুপাঠ্য, তাহা মিত্র মহাশয় নিজেও লিখিয়া গিয়াছেন। তাঁহার উদ্ধৃত পাঠও তিনি জীবিত থাকিতে মুদ্রিত করিয়া গিয়াছেন। সুতরাং উদ্ধৃত পাঠে কোনোরূপ ভ্রম প্রমাদ থাকিবার কথা নহে। এই পাঠ শুদ্ধ হইলে ইহাতে যাহা লিখিত রহিয়াছে, তাহার অর্থবোধে কাহারও ইতস্ততঃ করিবার কথা নাই। দাতা শ্রীনারায়ণ পাল দেব, তাহা স্পষ্টই দেখা যাইতেছে। কিজন্য প্রদত্ত হইয়াছিল? “যথাহং পূজাবলিচরুসত্ৰনবকৰ্ম্মাদ্যর্থং” “শয়নাসনগ্লানপ্রত্যয়ভৈষজ্যপরিষ্কারাদ্যর্থং” ‘স্বপরিকল্পিতবিভাগেন অনবদ্য ভোগাৰ্থঞ্চ” এই কয়েকটি কারণজ্ঞাপক বাক্যে তাহা অভিব্যক্ত হইয়াছে। কাহার জন্য প্রদত্ত হইয়াছিল? “ভগবতঃ শিবভট্টারকস্য” “পাশুপত আচাৰ্য্যপরিষদশ্চ” “অন্যেষামপি স্বাভিমতানাং’–এই কয়েকটি বাক্যে তাহাও সূচিত হইয়াছে। চকার প্রয়োগে এবং অপি শব্দযোগে এই দান শিবভট্টারকস্য, তথা পাশুপত আচার্য্য পরিষদঃ, তথা অন্যেষাং স্বাভিমতানাং (জনানাং) সম্বন্ধীয় বলিয়া সূচিত হইতেছে। “পরিষদশ্চ” পদ পরিত্যাগ করিয়া “পাশুপত আচাৰ্য” মাত্র রাখিয়া তাহাকে পশুপতি আচাৰ্য্যরূপে পরিণত ও তদনুরূপ ব্যাখ্যা করা যায় কি না সুধীগণ তাহার বিচার করিবেন। এক্ষণে এই পদগুলির অর্থ কি তাহাই দেখা যাউক।

শিব শব্দের পূৰ্ব্বে ভগবৎ ও পরে ভট্টারক শব্দ রহিয়াছে, ভট্ট, ভট্টার ও ভট্টারক একাৰ্থবোধক বলিয়া ভট্ট স্থলে বক্তার ইচ্ছাক্রমে ভট্টারক শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে বলিলে অসঙ্গত হয়। এই তাম্রশাসনেও গ্রহীতার বংশগোত্রাদির উল্লেখ নাই; শিবভট্টকে প্রদত্ত হইলে তাহা থাকিত কি না সে কথাও ভাবিয়া দেখিতে হইবে। শিবভট্ট ও পশুপতি আচাৰ্য মহাশয় দুইব্যক্তি, কারণ মিত্র মহাশয় সেই ভাবেই তাঁহাদিগকে পরিচিত করিয়াছেন। কাহারও বংশেগোত্রাদির উল্লেখ নাই এবং উভয় ব্যক্তিকে একখানি মাত্র শাসন প্রদত্ত হইয়াছে, ইহা হইতে উত্তরকালে যে প্রভূত অনর্থ উৎপন্ন হইতে পারে নারায়ণ পাল দেবের সুবিখ্যাত মন্ত্রী সুপণ্ডিত ভট্টগুরব তাহা কি বুঝিত পারিতেন না?

শিবভট্টারকের “যথার্হং পূজাবলিচরুসত্ৰনবকৰ্ম্মাদ্যর্থং’, তথা পাশুপত আচার্য্য পরিষদের “শয়নাসনগ্লানপ্রত্যয়ভৈষজ্যপরিষ্কারাদ্যৰ্থম” এবঞ্চ স্বাভিমতাবলম্বী অন্যজনগণের ‘স্বপরিকল্পিতবিভাগেন অনবদ্য ভোগাৰ্থম” এই ভূমিদানপত্র প্রদত্ত হইয়াছিল বলিয়া স্পষ্টই দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবলপ্রতাপ মন্দীভূত হইলে ধীরে ধীরে দেবদেবীর পূজা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইতেছিল। তৎকালে বৌদ্ধ নরপালগণও প্রজারঞ্জনার্থ ক্রমে ক্রমে এই সকল কার্য্যের অনুমোদন করিতে বাধ্য হইতেছিলেন। ধর্মপালদেব মহাসামন্তাধিপতির অনুরোধে নারায়ণের সেবাপূজার জন্য ভূমিদান করিয়াছিলেন; তখনও পাল নরপতিগণ স্বয়ং কোনও হিন্দু দেবালয়ের প্রতিষ্ঠা করেন নাই। ধর্মপালের ভ্রাতৃপ্রপৌত্র নারায়ণ পালের সময়ে ইহার প্রথম পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। নারায়ণ পাল স্বয়ং সহস্রায়তন দেবালয় সংস্থাপিত করিয়া তথায় সর্বধর্মাবলম্বী প্রজাপুঞ্জের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। শঙ্করাচাৰ্য পাশুপত মতের প্রচার করায় তাঁহার ও তাঁহার অনুচরবর্গের চেষ্টায় ভারতবর্ষের বিবিধ প্রদেশ হইতে বৌদ্ধ মত তাড়িত ও পাশুপত মত সংস্থাপিত হয়। পাশুপত মতের আচাৰ্য্য শঙ্করস্বামীর পরিষৎ অদ্যাপি নানা স্থানে মঠধারী হইয়া বিরাজিত রহিয়াছেন। ইহারা বৌদ্ধমতের প্রতিবাদ করিয়া যে সকল নবকৰ্ম্ম অর্থাৎ অভিনব পূজাপদ্ধতি প্রচারিত করিয়াছিলেন তাহাতে জনসাধারণ ইহাদের অনুগত হইয়া পড়িয়াছিল। নারায়ণ পালদেব বোধ হয় সৰ্বশ্রেণির জনসাধারণের জন্য দেবালয় করিয়াছিলেন। তাহাতে যেমন শিবভট্টারকের পূজার ব্যবস্থা হইয়াছিল, সেইরূপ পাশুপত আচাৰ্যানুচরবর্গের ও স্বাভিমতালম্বী অর্থাৎ বৌদ্ধ মতাবলম্বী (অন্যেষ্যাং) অপর জনগণেরও শয়নাসনাদির ববস্থা হইয়াছিল। তাহারা পরস্পরের সহিত বিবদমান না হইয়া সকলেই যাহাতে রাজদত্ত প্রসাদ উপভোগ করিতে পারে তজ্জন্য ‘স্বপরিকল্পিতবিভাগেন” ভোগের ব্যবস্থা হইয়াছিল। বঙ্গদেশে কিরূপে কোন সময় হইতে ক্রমে ক্রমে হিন্দুধর্মের সহিত বৌদ্ধধর্মের সমন্বয় সংসাধিত হইয়াছিল এই তাম্রশাসনে তাহার পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে; অথচ ডাক্তার রাজেন্দ্র লাল মিত্রের ন্যায় সুপণ্ডিত ইহার কিয়দংশের পরিবর্জন ও কিয়দংশের পরিবর্তন করিয়া যে ব্যাখ্যা প্রদান করিয়া গিয়াছেন তাহাতে ঐতিহাসিক সমাজে ভ্রান্তমত প্রচলিত হইয়া পড়িয়াছে।

অধ্যাপক বেন্দল সাহেব নেপালভ্রমণে নিযুক্ত হইয়া হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একত্রাবস্থান লক্ষ্য করিয়া এসিয়াটিক সোসাইটির বিগত বার্ষিক অধিবেশনের বক্তৃতায় বলিয়াছেন, “হিন্দুধৰ্ম্ম ক্রমে বৌদ্ধধর্মকে আত্মসাৎ করিয়া লইয়াছিল। মোসলমানাধিকার প্রবর্তিত হইবার পূর্ব শতাব্দিতে হিন্দু ও বৌদ্ধের মধ্যে কিরূপ ভাব ছিল নেপালে তাহার কিছু কিছু পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়।” নেপাল পর্যন্ত পৰ্যটন না করিয়া বঙ্গদেশে প্রাপ্ত ধর্মপাল ও নারায়ণ পালের এই দুইখানি তাম্রশাসন দেখিলেও তাহার পরিচয় পাওয়া যাইত। কিন্তু এই দুইখানি তাম্রশাসনের ব্যাখ্যা-বিভ্রাটের জন্য এই ঐতিহাসিক তথ্য কাহারও দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই। পূৰ্বাবিষ্কৃত তাম্রশাসনগুলির এই সকল কারণে ভাল করিয়া সমালোচনা করা প্রয়োজন। শ্রীযুক্ত শরচ্চন্দ্র মিত্র মহাশয় তাহাতে হস্তক্ষেপ করিলে তাঁহার প্রবন্ধ আরও উপাদেয় হইত। কে কবে কাহাকে কোন গ্রামে কত খানি ভূমি দান করিয়াছিল তাহা অল্প কথা, না জানিলেও বিশেষ ক্ষতি নাই; কিন্তু এই সকল দানপত্রে কোন কোন ঐতিহাসিক তথ্য প্রাপ্ত হওয়া সম্ভব তাহাই প্রকৃত অনুসন্ধানের বিষয়–তৎপ্রতি আমাদের প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতবর্গের চেষ্টা ধাবিত

ঐতিহাসিক চিত্র, এপ্রিল, ১৮৯৯

তথ্যসূত্র

১ কেবল সাধারণতঃ এইমাত্র বলিয়াছেন :–That copper plate Sanads were not only granted by the kings of very early times, beginning from the 5th century A. D. up to the fourteenth and fifteenth centuries of the same era, but that they have also been granted even so lately as the last and present centuries.

২ It is probable also that an alloy of copper and silver was also occasionally employed, as is evident from the seal of Kumara Gupta II, now at Luknow. — Calcutta Review, January 1899

৩ এই তাম্রশাসনে লিখিত আছে :–The village had formerly been enjoyed on the strength of a forged Sasana by one Vamarathya, from whom it was taken after destroying the old plate.

8 J.A. S.B. Vol LXIII Part I. No. 1.

The preceding note was written on the assumption that the grantee, whose name appears in the copper-plate as Narayana Bhattarak, was the same person as Bhatta Narayana, the author of Veni Sonhara. As doubts have been expressed about the correctness of this identification, I proceed briefly to state the reasons on which it is based-J. A. S. B. Vol. LXIII. Part I, No 1.

৬ Indo Aryans, Vol.II. p. 274.

৭ The donee appears to have been a Hindu, and the gift was made with a view to assist him in offering charu and bali to divinity nameds. Sahasraksha, and also for the dispensation of medicincs to the sick, and food and shelter to the indigent. –Indo Aryans, Vol. II, p. 218.

নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসন ১

উপক্রমণিকা

পরিচয় : নদিয়া জেলার অন্তর্গত রাণাঘাটের নিকটবর্তী আনুলিয়া গ্রামের সীতানাথ ঘোষ বিগত ভাদ্রমাসে ভূমিখননোপলক্ষে এক খানি খোদিত তাম্রফলক প্রাপ্ত হয়। ফলকখানি নিতান্ত বিবর্ণ ও স্থানে স্থানে কালিমালিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। উহা কতকাল ভূগর্ভে নিহিত ছিল তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই। সীতানাথ ফলক লইয়া রাণাঘাটের সাবডিভিসন্যাল ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট গিয়াছিল, তিনি প্রত্যর্পণ করায় ও কেহ প্রকৃত পাঠোদ্দার করিতে না পারায় ফলকখানি বিক্রয়ার্থ মালদহে প্রেরিত হইয়াছিল। পণ্ডিতবর রজনীকান্ত চক্রবর্তী মহাশয় তাহার সন্ধান লাভ ও পাঠোদ্ধার করিয়া ফলকখানি ঐতিহাসিক চিত্রের জন্য ক্রয় করিয়া পাঠাইয়া দিয়াছেন। ইহার আয়তন ১৩ x ১২ ইঞ্চি। শিরোভাগে একটি দশভুজসমন্বিত দেবমূর্তি কীলকযোগে ফলকের সহিত দৃঢ়সংযুক্ত। প্রথম পৃষ্ঠে ৮ পংক্তি, দ্বিতীয় পৃষ্ঠে ২৮ পংক্তি পরিমিত সংস্কৃত ভাষায় রচিত পদ্যগদ্যময় ভূমিদান-পত্র খোদিত রহিয়াছে।

সংক্ষিপ্ত কথা : ওষধিনাথবংশে হেমন্ত নামক নরপতি জন্মগ্রহণ করেন। হেমন্তের পুত্রের নাম বিজয় সেন। বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন। বল্লাল সেনের পুত্র মহারাজাধিরাজ পরমেশ্বর পরমবৈষ্ণব পরমভট্টারক শ্রীমল্লক্ষ্মণ সেন দেব। তিনি বিক্রমপুরের জয়স্কন্ধাবার হইতে স্বকীয় রাজ্যাব্দের তৃতীয় বর্ষীয় নবম ভাদ্র দিনে যজুৰ্বেদান্তৰ্গত কাথশাখাধ্যায়ী কৌশিক গোত্রীয় বিশ্বামিত্র বন্ধুল কৌশিক প্রবরের রঘুদেব শৰ্মা নামক ব্রাহ্মণকে যে ভূমিদান করেন, ইহাতে তদ্বিবরণ খোদিত রহিয়াছে। সমগ্র খোদিত লিপির প্রতিকৃতি মুদ্রিত হইল।

রাজমুদ্রা : এই তাম্রপট্টে, কীলকযোগে যে রাজমুদ্রা সংযুক্ত আছে তাহা খোদিত নহে, ছাঁচে ঢালাইকরা বলিয়া বোধ হয়। তাহাতে সেকালের শিল্প কৌশলের কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায়। এইরূপ একটি রাজমুদ্রা দেখিয়া কোনও পাশ্চাত্য পণ্ডিত শিল্প-কৌশলের যথেষ্ট প্রশংসা করিয়াছিলেন; তাহা অতিশয়োক্তি বলিয়া বোধ হয় না। বর্তমান তাম্রশাসনের মুদ্রানিবদ্ধ দশভুজমূৰ্ত্তির অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, অস্ত্র শস্ত্র, বেশ ভুষা–এমন কি দেহবিলম্বী নাগোপবীত পৰ্য্যন্ত অদ্যাপি সুস্পষ্ট প্রতিভাত হইতেছে। ইহা শিল্পীর পক্ষে অল্প গৌরবের কথা নহে। এপর্যন্ত সেনরাজবংশের যতগুলি শাসনলিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহার প্রত্যেক লিপিতেই এই রাজমুদ্রা সংযুক্ত দেখা যায়। সুতরাং ইহাই যে সেনরাজবংশের প্রচলিত রাজমুদ্রা, তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই মুদ্রায় কাহারও নাম কি অন্য কোনো কথা খোদিত নাই; ইহার নাম কি, সে কথাও তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায় না। কেশবসেন ও বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে এইরূপ রাজমুদ্রা দেখা গিয়াছে। তাহাতে “শ্রীসদাশিবমুদ্ৰয়া মুদ্ৰয়িত্ব” ইত্যাদি বাক্যে রাজমুদ্রার পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে। তদনুসারে ইহাকেও সদাশিবমুদ্ৰা বলিয়াই নামকরণ করিতে হয়। মহানিৰ্ব্বাণতন্ত্রে সদাশিবের ধ্যান যেরূপ লিখিত আছে, তাহা এই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ অনুকূল যথা :

“ব্র্যাঘ্রচর্ম পরিধানং নাগযজ্ঞোপবীতিনং। বিভূতিলিপ্তসৰ্বাঙ্গং নাগালঙ্কারভূষিতং। ধূমপীতারুণশ্বেতবত্তৈ : পঞ্চভিরাননৈঃ। যুক্তং ত্রিনয়নং বিভ্রজ্জটাজুটধরং বিভুং৷৷ গঙ্গাধরং দশভুজং শশিশোভিত মস্তকং। কপালং পাবকং পাশং পীনাকং পরশুং করৈঃ৷৷ বামৈর্দধানং দক্ষৈশ্চ শূলং বজ্রাঙ্কুশং শরং। বরঞ্চ বিভ্রতং সর্বৈ দেবৈ মুনিবরৈঃ স্তুতং৷৷ পরমানন্দসন্দেহোল্লসৎ কুটিললোচনং। হিমকুন্দেসঙ্কাশং বৃষাসনবিরাজিতং৷৷ পরিতঃ সিদ্ধগন্ধর্বৈরপসরোভিরহর্নিশং। গীয়মানমুমাকান্তমেকান্তশরণং প্রিয়ম।”

এই রাজমুদ্রা শৈবমুদ্রা, অথচ তাম্রশাসনের প্রথমেই “ওঁ নমো নারায়ণায়” এবং লক্ষ্মণসেনের পরিচয় দিবার সময়ে তাঁহাকে “পরম বৈষ্ণব” বলিয়া লিখিত থাকায় অনেক বিতর্ক উপস্থিত হইতে পারে। যখন বৌদ্ধাধিকার প্রবল হইয়াছিল, তখনও ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্ম একেবারে বিলুপ্ত হয় নাই; চৈনিক পরিব্রাজক হিয়ঙ্গ থসাঙ্গ বঙ্গদেশে তখনও ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাব দর্শন করিয়াছিলেন। সে ধর্মে বিষ্ণুর আরাধনা প্রচলিত ছিল। কিন্তু বৌদ্ধনিরসনে বৈষ্ণব অপেক্ষা শৈবেরই সমধিক উৎসাহ জন্মিয়াছিল। শঙ্করাচাৰ্য্য ও তৎপরিষৎ প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিরূপে উদ্ভূত হইয়া নবোৎসাহে বৌদ্ধনিরসন ও প্রথমে বেদান্ত প্রতিপাদ্য ব্রহ্মজ্ঞান, পরে শৈববাপাসনার প্রচার করিয়াছিলেন। ধর্মবিপ্লবসময়ে শৈবমন্দির, শৈবোপবাসনা প্রভৃতি ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মানুরাগী ব্যক্তিমাত্রেরই আদরণীয় হইয়াছিল। যিনি যে মতের উপাসক হউন, ব্রাহ্মণ্য ধৰ্ম্মানুরাগী বলিয়া পরিচয় দিতে হইলে শৈব মতের সমাদর করিতে হইত। এই ধর্মবিপ্লবে যে সাহিত্য গঠিত হইয়া উঠিয়াছিল তাহার সর্বাঙ্গে শৈব চিহ্ন বৰ্ত্তমান। সুতরাং পরম বৈষ্ণব লক্ষ্মণ সেনের পক্ষে বা ব্রাহ্মণ্যধৰ্ম্মানুরাগী বৌদ্ধবিদ্বেষী সেনরাজকুলের পক্ষে সদাশিবমুদ্রার ব্যবহার করা কিছুমাত্র আশ্চর্যের কথা নহে। পরমবৈষ্ণব শব্দে ও নারায়ণের নমস্কারে লক্ষ্মণসেনের উপাসনাপদ্ধতিমাত্ৰ সূচিত হইয়াছে; সদাশিবমুদ্রা ও শাম্ভব কৰ্পদ্দাম্বুদের বর্ণনায় তাঁহার ব্রাহ্মণ্য ধর্মানুরাগ প্রচারিত হইয়াছে। উত্তরকালে শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণবের মধ্যে যে হিংসাদ্বেষ বিবর্ধিত হইয়া উঠিয়াছিল তাহা যে লক্ষ্মণসেনের সময়ে বর্তমান ছিল না এতদূরা তাহা প্রমাণীকৃত হইতেছে।

ধাতুশোধন-কৌশল : তাম্রনির্মিত সদাশিবমুদ্রা দীর্ঘ কাল অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে কেন, তাহা বুঝিতে হইলে রাসায়নিক পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যাঁহাদের হস্তে তাম্রফলকাদি পতিত হয়, তাঁহারা কেবল পাঠোদ্বারেই সমস্ত শক্তি নিহিত না করিলে, এ বিষয়ে এত দিন অনেক তথ্য সংগৃহীত হইত! একমাত্র কুমার গুপ্তের রাজমুদ্রার রাসায়নিক পরীক্ষা হইয়াছে, তাহা তাম্র ও রজতের সমবায়ে গঠিত বলিয়া জানিতে পারা গিয়াছে। বর্তমান তাম্রশাসনের রাজমুদ্রা রাসায়নিক পরীক্ষার বিশুদ্ধ তাম্ৰে গঠিত বলিয়া জানিতে পারা গিয়াছে;–ইহাতে কিছুমাত্র ধাতুমিশ্রণের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায় না। তাম্র খনিজ পদার্থ, কিন্তু বিশুদ্ধ তাম্র খনিজ নহে। খনিগর্ভে লৌহ, তাম্র ও গন্ধক পরস্পরের সহিত মিশ্রিত হইয়া বিরাজ করে। তাহাকে উত্তোলন করিয়া ধাতুশোধনকৌশলে বিশুদ্ধ তাম্র প্রস্তুত করিতে হয়, তাহা নিতান্ত সহজ ব্যাপার নহে। কিয়ৎপরিমাণে রাসায়নিক জ্ঞান না থাকিলে এই কাৰ্য্য সম্ভব হইতে পারে না। সুতরাং সেকালে আমাদের দেশে রাসায়নিক জ্ঞান কতদূর বিকশিত হইয়াছিল, এই সকল তাম্রপট্টে ও রাজমুদ্রায় তাহারও ইতিবৃত্ত প্রচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। মোসলমানাধিকার প্রবর্তিত হইবার বহুপূৰ্ব্বে বৌদ্ধ অমরসিংহ যে বিখ্যাত অভিধান রচনা করেন তাহাতে স্বর্ণ, রৌপ্য, লৌহ, তাম্র, পারদ, স্রোতোঞ্জন, গন্ধক, সীসক, রঙ্গ প্রভৃতি রাসায়নিক পদার্থের নাম দেখিতে পাওয়া যায়। এই সকল পদার্থ বিশুদ্ধাবস্থায় ভুগর্ভে প্রাপ্ত হওয়া যায় না; শোধনপ্রণালী অজ্ঞাত থাকিলে এই সকল পদার্থ কদাপি প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা নাই। সেকালের লোক কি কৌশলে ধাতুশোধন করিয়া তদ্বারা পাত্রাদি নিৰ্মাণ করিত তাহা জানিতে না পারিলেও, তাহারা যে ধাতুশোধন কৌশল অবগত ছিল তাহার পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। এই জ্ঞান অতি অল্পদিন হইল ইউরোপীয়গণের করায়ত্ত হইয়া বহুধা উন্নতিলাভ করিয়াছে। কিন্তু তাহার বহুপূৰ্ব্ব এই জ্ঞান যে একদিন বাঙ্গালীরও করায়ত্ত ছিল, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

মুদ্রাচিত্র : তাম্রফলকের যে প্রতিকৃতি প্রকাশিত হইল, তাহাতে মুদ্রাচিত্র সুস্পষ্ট প্রতিফলিত হয় নাই। ফলকখানি সম্মুখে রাখিয়া তুলিকাসম্পাতে চিত্ৰবিন্যাস করিতে না পারিলে মুদ্রাঙ্কিত সদাশিবমূৰ্ত্তির প্রতিকৃতি প্রকাশিত হইতে পারে না। এসিয়াটিক সোসাইটির বিখ্যাত পত্রিকার সপ্তম খণ্ডে এইরূপ একটি চিত্র মুদ্রিত আছে। কিন্তু তাহা সদাশিব মুদ্রার অবিকল চিত্র বলিয়া বোধ হয় না। তন্ত্রোক্ত সদাশিব “পঞ্চবত্ত “ সেনরাজবংশের তাম্রশাসননিহিত সদাশিবও যে পঞ্চবত্ত তাহার আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু সোসাইটির পত্রিকায় যে চিত্র মুদ্রিত আছে তাহাতে একটি মাত্র মুখ অঙ্কিত হইয়াছে। ঐ মুখের উভয় পার্শ্বে ও শীর্ষস্থানে আরও তিনটি মুখের কিয়দংশ বৰ্ত্তমান; বিদেশীয় লেখক তাহা কর্ণ ও শিরোভূষণ ভাবিয়া তদনুসারে চিত্রাঙ্কন করিয়াছিলেন।

তাম্রপট্ট : যে তাম্রপট্টে এই শাসনলিপি খোদিত রহিয়াছে তাহা সমচতুষ্কোণ নহে; তাম্রপৃষ্ঠও মসৃণ বলিয়া বোধ হয় না। কোনোরূপে ধাতুফলক প্রস্তুত করিয়া তাহাতে শাসনলিপি খোদিত হইয়াছিল। যে শিল্পী সদাশিবমুদ্রা প্রস্তুত করিয়াছিল, তাহার শিল্পসৌন্দর্য্যের প্রতি বিলক্ষণ দৃষ্টি ছিল, যে তাম্রপট্ট প্রস্তুত করিয়াছিল, তাহার তৎপ্রতি আদৌ দৃষ্টি ছিল বলিয়া বোধ হয় না। সুতরাং রাজমুদ্রা ও তাম্রপট্ট এক ব্যক্তির নির্মিত না হওয়াই সম্ভব। তাম্রপট্ট নির্মিত ও খোদিত হইলে মহাসান্ধিবিগ্রহিক মহাশয় তাহাতে কীলকযোগে রাজমুদ্রা সংযুক্ত করিয়া দিতেন। রাজশিল্পী রাজমুদ্রা-রচনায় সেই জন্য শিল্পকৌশলের পরিচয় দিতে বাধ্য হইত। তাম্রপট্ট ভিন্ন পিত্তলাদি ধাতুপটেও শাসনলিপি খোদিত হইবার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে,–কিন্তু তাহা নিতান্ত আধুনিক। পুরাকালে তাম্রপট্টই ব্যবহৃত হইত; সংহিতাদি ব্যবস্থাশাস্ত্রে তাহারই বিধান দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু অন্য কোনো ধাতুপট্ট ব্যবহৃত না হইয়া তাম্রপট্ট ব্যবহৃত হইত কেন? তা নিতান্ত সহজপ্রাপ্য ছিল না; তাম্রকুট্টক নামক শিল্পকারগণ এতদ্বারা দ্রব্যাদি প্রস্তুত করিত। তাহারা অবশ্যই তাম্রের রাসায়নিক জ্ঞান প্রাপ্ত হইয়াছিল। বর্তমান যুগের সমুন্নত রাসায়নিক শাস্ত্রে দেখিতে পাওয়া যায়–তাম্র এক সহস্র ডিগ্রীর উত্তাপ না পাইলে গলিত হয় না, ইহা সহজে মসৃণীকৃত হইতে পারে এবং ইহাতে কিছু খোদিত করিলে সহসা বিলুপ্ত হইবার সম্ভাবনা নাই। সেকালের শিল্পকার এই সকল তত্ত্ব অবগত হইয়াই কি তাম্রপট্টের ব্যবহার প্রচলিত করিয়াছিল? কোন সময় হইতে তাম্রপট্টের ব্যবহার প্রচলিত হইয়াছে তাহা নিঃসন্দেহে নির্ণয় করা যায় না। কিন্তু বৌদ্ধাধিকারের পূৰ্ব্বকালবর্তী তাম্ৰশাসনাদিও দেখিতে পাওয়া যায় না। তাম্রশাসন ভারতবর্ষের বিশেষ ব্যবস্থাপ্রসূত, অন্য কোনও দেশে তাম্রশাসন দেখিতে পাওয়া যায় না। সুতরাং ভারতবর্ষীয়গণ যে কাহারও নিকট তামপট্ট-নিৰ্মাণকৌশল শিখিয়া আসিয়াছিল তাহা বোধ হয় না। শিল্পরাজ্যে এই তথ্য ভারতবর্ষের লোকের রাসায়নিক ব্যাপারে মৌলিকত্ব সূচিত করিতেছে।

অক্ষর : পণ্ডিতবর স্বর্গীয় রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয় “বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব” নামক পুস্তকে লিখিয়া গিয়াছেন :–”দেবনাগর হইতেই যে বাঙ্গালা অক্ষর সৃষ্ট হইয়াছে, তদ্বিষয়ে সন্দেহ করিবার কোনো কারণ নাই।” তিনি লক্ষ্মণ সেনের একখানি তাম্রশাসন দেখিয়া এতৎ প্রসঙ্গে আরও লিখিয়া গিয়াছেন :–’’অতএব অনুমান হয়, উহা দেবনাগর হইতে বাঙ্গালা অক্ষর উৎপন্ন হইবার সন্ধিকালে লিখিত হইয়াছিল।” ন্যায়রত্ন মহাশয়ের মতে লক্ষ্মণ সেনের রাজ্যকালই সেই সন্ধিকাল। সেই সন্ধিকালে “বাঙ্গালা অক্ষর ও বাঙ্গালা ভাষা একদাই উৎপন্ন হইয়া থাকিবে” বলিয়া ন্যায়রত্ন মহাশয় মত প্রচার করিয়া গিয়াছেন। লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসনে ইহার কোনো প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না; এবং এরূপ মত আদৌ যুক্তিযুক্ত বলিয়াও বোধ হয় না। ভাষা বা অক্ষর সহসা কোনো নির্দিষ্ট দিনে, বৎসরে বা রাজ্যকালে গঠিত হয় না। তাহা ধীরে ধীরে দিনে দিনে যুগে যুগে নিতান্ত অজ্ঞাতসারে গঠিত হইয়া উঠে, কবে তাহা উদ্ভূত হইল কেহই তাহার দিন ক্ষণ নির্ণয় করিয়া দিতে পারেন না। সেকালের দেবনাগরাক্ষর কিরূপ ছিল এবং কিরূপে গঠিত হইয়াছিল তাহা জানিতে পারা যায় না। ভারতবর্ষের সৰ্ব্বাপেক্ষা পুরাতন খোদিত লিপি পালি অক্ষরে লিখিত। তাহা দেবনাগর অক্ষর হইতে প্রসূত, কি পালি অক্ষরের অস্পষ্ট ছায়াকে কায়াদান করিয়াই মাত্রানিবদ্ধ সুসংযত দেবনাগরাক্ষর গঠিত, তাহার মীমাংসা করাও সহজ নহে। বাঙ্গালা অক্ষরের সহিত দেবনাগরের সম্বন্ধ অত্যন্ত নিকট, তাহা দেবনাগর হইতে প্রসূত হইলেও হইতে পারে। কিন্তু কবে প্রসূত হইয়াছিল, কে বলিতে পারে? ন্যায়রত্ন মহাশয়ের পুস্তকের বিজ্ঞাপনে লিখিত আছে :–”বাঙ্গালা অক্ষরের সময় নিরূপণ প্রসঙ্গে রাজা লক্ষ্মণ সেন দেবের যে তাম্রশাসনের নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তদঙ্কিত সমগ্র বিষয়টি লিথোগ্রাফে মুদ্রিত করিয়া এক এক খণ্ড এই পুস্তক মধ্যে নিবেশিত করিতে আমাদের অতিশয় ইচ্ছা ছিল, কারণ তাহা হইলে, সেই সময়ে এ দেশে কিরূপ আকর প্রচলিত ছিল তাহা পাঠকগণ স্বচক্ষে দেখিতে পাইতেন। কিন্তু বড়োই দুঃখের বিষয় যে, আমরা বহু অনুসন্ধান করিয়াও সে তাম্ৰশাসন খানি আর একবার হস্তগত করিতে পারিলাম না।” শ্রীযুক্ত ওয়েস্টমেট সাহেব লক্ষ্মণ সেন দেবের আর একখানি তাম্রশাসন হস্তগত করিয়া এই কৌতূহল নিবারণ করিয়াছিলেন। আমরা সমগ্র তাম্রফলকের প্রতিলিপি মুদ্রিত করিয়াও অক্ষর পরিচয়ের সৌকর্যসাধনার্থ প্রথম শ্লোকের পৃথক প্রতিকৃতি নিম্নে মুদ্রিত করিলাম।

ইহা ঐতিহাসিক সমাজে ত্রিহুতী, মৈথিলী বা গৌড়ীয় অক্ষর বলিয়া সুপরিচিত। পঞ্চনদ হইতে বঙ্গভূমির শেষ সীমা পর্যন্ত যে সকল প্রাদেশিক অক্ষর ও ভাষা প্রচলিত আছে, তাহাদের মূল একস্থানে নিহিত বলিয়াই বোধ হয়। ডাক্তার হরনলি সাহেব এই সকল প্রাদেশিক ভাষাকে গৌড়ীয় ভাষা বলিয়া নামকরণ করিয়াছেন। যে অর্থে বাঙ্গালা ভাষাকে গৌড়ীয় ভাষা বলা হইয়াছে, সেই অর্থে বাঙ্গালা অক্ষরকেও গৌড়ীয় অক্ষর বলা যাইতে পারে। ইহার ‘প’ এবং ‘য’ যেরূপ ভাবে তাম্রশাসনে উত্তীর্ণ হইয়াছে, তাহাতে পরস্পরের মধ্যে কোনই পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায় না। কেবল অর্থ সঙ্গতির প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া পাঠোদ্ধার করিতে হয়। এই দুইটি অক্ষর দেবনাগর ‘য’ অক্ষরের অনুরূপ। চকার দেবনাগরের ছায়ায় অঙ্কিত। অন্যান্য অক্ষরের মধ্যে বাঙ্গালা অক্ষরের আকার সুস্পষ্ট অভিব্যক্ত। কেবল ‘ই’ না বাঙ্গালা, না দেবনাগর; বরং কিয়ৎপরিমাণে পালির অনুরূপ। লক্ষ্মণ সেন দেবের শাসন সময়েই যে এই অক্ষর গঠিত হইয়াছিল, তাহা বলিতে পারা যায় না। লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসনের অক্ষর ও তাঁহার পিতামহ বিজয় সেনের প্রস্তরলিপির অক্ষর একরূপ। সুতরাং লক্ষ্মণ সেনের পূর্ব হইতেই যে এইরূপ অক্ষর প্রচলিত ছিল তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। সংস্কৃত শ্লোকাবলি দেবনাগরাক্ষরেই লিখিত হইবার কথা; কলহণ পণ্ডিতের রাজতরঙ্গিণীর যে প্রতিকৃতি সম্প্রতি প্রকাশিত হইয়াছে তাহা নাগরাক্ষরে লিখিত, কিন্তু বাঙ্গালা দেশের পণ্ডিতসমাজে নাগরাক্ষরে লিখিত পুস্তক প্রচলিত ছিল না; হস্তলিখিত পুরাতন সংস্কৃত গ্রন্থাদি ত্রিহুতী বা বঙ্গাক্ষরেই লিখিত হইতেছিল। সংস্কৃতজ্ঞ লোকে সহসা দেবনাগরাক্ষর ছাড়িয়া বঙ্গাক্ষরের ব্যবহার করিয়াছিলেন বলিয়া বোধ হয় না। চিরাগত প্রথার পরিবর্তন ঘটিতে সমূহ কালবিলম্বের কথা। লক্ষ্মণ সেনের শাসনসময়ে বঙ্গাক্ষরে সংস্কৃত শ্লোকাদি তাম্রশাসনে উৎকীর্ণ হইতে দেখিয়া মনে হয় তাঁহার আবির্ভাবের বহুপূৰ্বেই দেবনাগরাক্ষর বিদায় গ্রহণ করিয়াছিল; অন্যথা তাঁহার মন্ত্রিগণ প্রাদেশিক অক্ষরে দেবভাষা লিখিতেন না। এই সকল কারণে ন্যায়রত্ন মহাশয়ের সিদ্ধান্তে আস্থা স্থাপন করা যায় না।

লিপিকৌশল : মাত্রানিবদ্ধ সুসংযত অক্ষর পংক্তি লিপিকৌশলের পরিচয় স্থল। বর্তমান তাম্রশাসনে তাহা দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। পুরাকালে লিপিকৌশল সহসা সমুন্নত হয় নাই। প্রথমে কোনোরূপ অক্ষরবিন্যাস করিতে পারিলেই লিপিকর সন্তুষ্ট হইত। কালক্রমে কাৰ্য্য-সাধনোপযোগী কৌশলের সঙ্গে শিল্পসৌন্দৰ্য্য বিকশিত হইয়াছে। পালি অক্ষরে কাৰ্য্য সাধনোপযোগী কৌশল মাত্রই পরিস্ফুট হইয়াছিল; দেবনাগর বা বাঙ্গালা অক্ষরে শিল্পসৌন্দর্য্যেরও পরিচয় নিহিত রহিয়াছে। ইহা একদা সহসা উদ্ভূত হইতে পারে না। বর্তমান তাম্রশাসনের লিপিকৌশল দেখিয়া বোধ হয় তৎকালে এদেশে লিপি-সৌন্দৰ্য্য সমাদর লাভ করিয়াছিল। যাহা দেশপ্রচলিত ও সাধারণের বোধগম্য লক্ষ্মণ সেন দেব সেই অক্ষরেই শাসনলিপি উৎকীর্ণ করাইয়াছিলেন; তিনি যে অক্ষরসৃষ্টির সমকালবৰ্ত্তী তাহা সম্ভব বলিয়া বোধ হয় না। অক্ষরগুলি যদিও অবিরল ঘনসন্নিবিষ্ট, তথাপি পদচ্ছেদচিহ্নে সুবিভক্ত ও সৰ্ব্বত্র সুপাঠ্য। পংক্তিনিচয় সরল, সমান্তরাল, সমশীর্ষে খোদিত,–যেন মুক্তাফলের ন্যায় সূত্রনিবদ্ধ। এইরূপে লিপিসৌন্দর্য রক্ষা করিয়া ধাতুফলকে সুদীর্ঘ শাসনলিপি খোদিত করা অল্প প্রশংসার কথা নহে। একালে হইলেও ইহার জন্য শিল্পকার প্রশংসা লাভ করিতেন।

ভাষা। বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা অক্ষর যুগপৎ গঠিত হইয়াছে কিনা তাহা নির্ণয় করিবার উপায় নাই। বহুপুরাতন বাঙ্গালা সাহিত্য বা হস্তলিখিত বর্ণমালা প্রাপ্ত হওয়া যায় না। সাধারণতঃ অক্ষরবিকাশের পূর্বেই ভাষা বিকশিত হইয়া থাকে। বাঙ্গালাদেশে আৰ্য্যাভিযানের পূর্বেও ভাষা প্রচলিত ছিল। বাঙ্গালা ভাষায় অনেক অনাৰ্য্য শব্দ এখনও তাহার পরিচয় প্রদান করিতেছে। সংস্কৃতের সহিত আদান প্রদানে এই সকল প্রাদেশিক ভাষা গঠিত ও পরিপুষ্ট হইয়াছিল। বাঙ্গালা শব্দ ও পদবিন্যাসকৌশলের মধ্যে তাহার কিছু কিছু পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ বা ইতিহাস অদ্যাপি যথাযোগ্য দক্ষতার সহিত লিখিত হয় নাই; ইংরাজ বা বাঙ্গালী এ সম্বন্ধে যিনি যাহা কিছু লিখিয়াছেন সমস্তই অসম্পূর্ণ। সুতরাং কবে কি সূত্রে বাঙ্গালা ভাষার উৎপত্তি হইয়াছিল এখনও তাহার সমগ্র তথ্য সঙ্কলিত হয় নাই। বাঙ্গালার পূর্বে এদেশে কোন ভাষা প্রচলিত ছিল? সে ভাষার কোনও লিখন-প্রণালী বৰ্ত্তমান ছিল কিনা? তাহাই বা কে বলিতে পারে? বৰ্ত্তমান বাঙ্গালা অক্ষর দেখিয়া বোধ হয় ইহার অনেক অক্ষর দেবনাগর-সদ্ভূত হইলেও কোন কোন অক্ষর দেবনাগর-সদ্ভূত কি না তাহা কিছুতেই নির্ণয় করা যায় না। একমাত্র দেবনাগর হইতে প্রাদেশিক সর্বপ্রকার গৌড়ীয় অক্ষর সৃষ্ট হইয়াও সকলগুলি একরূপ হয় নাই কেন? একমাত্র সংস্কৃত ভাষা হইতে সৰ্ব্বপ্রকার প্রাদেশিক গৌড়ীয় ভাষা উদ্ভূত হইলেও প্রাদেশিক বিশেষত্ব বশতঃ তাহারা যেমন স্বতন্ত্র ও পৃথক হইয়া পড়িয়াছে, সেইরূপ ভাবে অপরগুলিও পৃথক হইয়া দাঁড়াইতে পারে। এই পৃথককরণব্যাপারে পূৰ্ব্বপ্রচলিত প্রাদেশিক লিখনপদ্ধতি যে কিছুমাত্র সহায়তা করে নাই, তাহাই বা কে বলিবে? বাঙ্গালা অক্ষর ও বাঙ্গালা ভাষা যে সময়েই উদ্ভূত হইয়া থাকুক, বাঙ্গালা ভাষা অপেক্ষা বাঙ্গালা অক্ষরই সর্বপ্রথম রাজসম্মান প্রাপ্ত হইয়াছিল। লক্ষ্মণ সেনের সমকালবর্তী বাঙ্গালা ভাষা কিরূপ ছিল তাহা রাজকীয় বাঙ্গালা অক্ষরে খোদিত! বাঙ্গালাভাষা হিন্দু-শাসন সময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল; কিন্তু মোসলমান রাজ্যেই তাহা প্রথমে রাজসম্মান লাভ করে। সংস্কৃতাভিমানী হিন্দুগণ বাঙ্গালা ভাষায় অনাস্থা প্রদর্শন করিতেন, ব্রাহ্মণপণ্ডিতমণ্ডলী এখনও তৎপ্রতি নাসিকাকুঞ্চনে বিরত হন নাই! মোসলমানগণ হিসাবনিকাশের কাগজে বাঙ্গালাকে স্থান দিতে বাধ্য হইলে তৎসূত্রে বাঙ্গালা ভাষা যাবনিক পরিচ্ছদে বিভূষিত হইয়া সেকালের কাবাচাপকানধারী বাঙ্গালীর মতো নবাবদরবারে সসঙ্কোচে উপনীত হইয়াছিল। এখন তাহা বিমুক্তক্ষেত্রের আলোক ও বায়ুপ্রবাহে বহির্গত হইয়া দিন দিন সমুন্নত ও সম্মান প্রাপ্ত হইতেছে। বাঙ্গালা যখন বৌদ্ধ বা হিন্দুর করায়ত্ত ছিল, তখন বাঙ্গালা ভাষা এই গৌরব লাভ করিতে পারে নাই! তখন যে সংস্কৃত ভাষা প্রচলিত ছিল, তাহা প্রাচীন সংস্কৃতের সরলতা পরিহার করিয়া বাহ্যাড়ম্বরে ভারাক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। অত্যুক্তি ব্যতীত যথাযথ ভাবে কেহ কোনো কথা লিখিতেন বলিয়া বোধ হয় না। তাম্রশাসনের ভাষাবিন্যাস-কৌশল প্রশংসনীয় হইলেও এই কারণে দোষাবহ হইয়াছে। গোষ্পদকে মহাসমুদ্র বলিয়া বর্ণনা করিলে শ্রুতিসুমধুর হইতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য নির্ণয়ের পক্ষে সমধিক বিপত্তি সংঘটন করে। বাঙ্গালার রাজাকে সসাগরা ধরিত্রীর অধিপতি বলিয়া বর্ণনা করিলে তাঁহার অধিকৃত রাজ্যের প্রকৃত সীমা নির্দেশ করা অসম্ভব হইয়া পড়ে।

লক্ষ্মণ-শাসন : এ পর্যন্ত চারিখানি লক্ষ্মণ-শাসনের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। তন্মধ্যে দুইখানি পূৰ্বাবিষ্কৃত, দুইখানি বর্তমান বর্ষে নবাবিষ্কৃত। পাবনার অন্তর্গত মাধাইনগরে যে লক্ষ্মণশাসন প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে, আমরা অদ্যাপি তাহার বিশেষ বিবরণ প্রাপ্ত হই নাই। পূৰ্বাবিষ্কৃত তাম্রশাসনদ্বয়ের মধ্যে একখানির সম্বন্ধে ন্যায়রত্ন মহাশয় লিখিয়া গিয়াছেন :

ত্রিবেণীর হলধর চূড়ামণি মহাশয় বিস্তর পরিশ্রম করিয়া ঐ সনন্দের লিপি পাঠ করিয়াছিলেন। তিনিও সমুদয় অক্ষর বুঝিতে পারেন নাই–অবুদ্ধ স্থলে স্বয়ং যোজনা করিয়া দিয়াছেন। সন তারিখের স্থল অস্পষ্টই রহিয়াছে। এইরূপে উহার রচনা অনেক বিকৃত হওয়ায় স্থানে স্থানে স্পষ্টরূপে অর্থ বুঝিতে পারা যায় না, এজন্যই আমরা উহার বাঙ্গালা অনুবাদ করিলাম না।

ওয়েষ্টমেট সাহেব যে লক্ষ্মণ-শাসন প্রাপ্ত হন, তাহার পাঠ প্রতিকৃতি ও অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে; কিন্তু তাহাও ভ্রমশূন্য হয় নাই। এই দুইখানি পূৰ্বাবিষ্কৃত তাম্রশাসনের অক্ষর ও প্রথম সাত শ্লোক বৰ্ত্তমান তাম্রশাসনের অনুরূপ; সুতরাং এতৎসাহায্যে পূৰ্বাবিষ্কৃত লক্ষ্মণ শাসনের পাঠোদ্ধার ও মৰ্ম্মোদঘাটনের সবিশেষ সহায়তা সাধিত হইবে। পণ্ডিতবর রজনীকান্ত চক্রবর্তী মহাশয় সৰ্ব্বপ্রথমে এই লক্ষ্মণ-শাসনের পাঠোদ্ধার করেন; সুতরাং তাঁহার উদ্ধৃত পাঠই মুদ্রিত হইল।

মূল

(১) ওঁ নমো নারায়ণায়। বিদ্যুত্যত্র মণিদ্যুতিঃ ফণিপতের্বালেন্দুরিায়ুধং বারি স্বর্গতরঙ্গিণী সিতশিরোমালাবলাকাবলিঃ। ধ্যানাভ্যাসসমীরণোপনিহিতঃ শ্ৰেয়োহঙ্কুরোদ্ভূতয়ে ভুয়াদ্বঃ স ভবাৰ্তিতাপভিদুরঃ শম্ভোঃ কৰ্পৰ্দাষুদঃ।১। আনন্দোষুনিধৌ চকোরনিকরে দুঃখচ্ছিদাত্যন্তিকী করে হতমোহতা রতিপতাবে কোহমেবেতিধীঃ। যস্যামী অমৃতাত্মনঃ সমুদয়ন্ত্যাশুপ্রকাশাজ্জগ ত্যত্রেধানপরম্পরাপরিণতং জ্যোতিস্তদাস্তাম্বুদে।২। সেবাবনম্র নৃপকোটিকিরীটরোচিরম্বুল্লসৎপদনখ দ্যুতিবল্লরীভিঃ। তেজোবিষজ্বরমুঘষা দ্বিষতামভূবন ভূমিভুজঃ ফুটমথৌষধি-নাথবংশে৷৷৩৷৷ আকৌমারবিকস্বরৈদিশিদিশি প্রস্যন্দিভিৰ্দোৰ্যশঃ প্রালেয়ৈরিপুরাজবত্ত নলিনম্লানীঃ সমুন্মীলয়ন। হেমন্তঃ স্ফুটমেব সেনজননক্ষেত্রৌঘপুণ্যাবলী শালি শ্লাঘ্য বিপাকপীবরগুণ স্তেষামভূদ্বংশজঃ।৪৷৷ যদীয়ৈরদ্যাপি প্রচিতভুজতেজঃ সহচরৈ যশোভিঃ শোভন্তে পরিধিপরিণদ্ধা ইব দিশঃ। ততঃ কাঞ্চলীলাচতুরচতুরম্ভোধিলহরী পরীতোববীভত্তাহজনি বিজয়সেনঃ স বিজয়ী৷৷৫৷৷ প্রত্যুহঃ কলিসম্পদামনলসো বেদায়নৈকাধবগঃ সংগ্রামঃ শ্রিতজঙ্গমাকৃতিরভূদ্বল্লালসেনস্ততঃ। যশ্চেততাময়মেব শেীৰ্যবিজয়ী দত্তৌষধং তৎক্ষণা দক্ষীণারচয়াঞ্চকার বশগাঃ স্বস্মিন পরেষাং শিয়ঃ। ৬। সম্ভক্তান্যদিগঙ্গনাগণগুণাভোগপ্রলোভাৰ্দিশা মীশৈরংশসমর্পণেন ঘটিতস্তত্তৎ প্রভাবস্কুটেঃ২। দোরুষ্মক্ষপিতারিসঙ্গররসো রাজন্যধর্মাশ্রয়ঃ শ্রীমল্লক্ষণ সেন ভূপতিরতঃ সৌজন্যসীমাজনি৷৷৭৷৷ আম্লায়ঃ প্রণিনায় যানি মুনয়ে যান্যস্মরন সংস্তুতা ন্যাচারেষু চ যানি তানি দদিরে দানানি দৈন্যহা। হ্রীনবে তথাপ্যনেন নিয়মং কালেসংখ্যাততা দেয়েম্বক্ষিজমন্তরেণ।৩ ফলাশংসাং বিধৌ শৃথতা।৮৷৷ সময়মপি সমুদ্ধতং নুমস্তং তদপি মহৌষধমুদ্বভুব যত্র। ভবতি পরপুরপ্রবেশসিদ্ধিঃ করবিধৃতি সকৃদেব যস্য মূলে।৯। যান … জগত্ৰয়ীবিতরণে মিত্রৈবলির্বারিতে যৈঃ সঙ্গম্য ন গঙ্গয়া ক্ষণমপি স্বর্গোপি সংস্মৰ্যতে। তানুচ্চৈ রতিশায়িশালিবসুধানরামরম্যান্তরান বিপ্রেভ্যোয়মদত্ত পত্তনগণান ভূমীপতিভূয়সঃ।১০৷৷

স খলু শ্রীবিক্রমপুরসমাবাসিত শ্ৰীমজ্জয়স্কন্ধাবারাৎ মহারাজাধিরাজ শ্রীবল্লাল সেনদেব পাদানুধ্যাত পরমেশ্বর পরমবৈষ্ণব পরমভট্টায়ক মহারাজাধিরাজ শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনদেবঃ পরমেশ্বর পরমবৈষ্ণব পরমভট্টায়ক মহারাজাধিরাজ শ্রীমল্লক্ষ্মণদেবঃ কুশলী। সমুপগশেষ-রাজরাজন্যকরাজ্ঞী-রাণকরাজপুত্ররাজামাত্য পুরোহিত মহাধর্মাধ্যক্ষ মহাসান্ধিবিগ্রহিক মহাসেনাপতি মহামুদ্ৰাধিকৃত অন্তরঙ্গবৃহদুপরিক মহাক্ষপটলিক মহাপ্রতীহার মহাভোগিক মহাপীলুপতি মহাগণস্ক দৌসসাধিক চৌরোদ্ধরণিক নৌবলহস্ত্যশ্বগোমহিষাজাবিকাদিব্যাপৃতক গৌল্মিক দণ্ডপাশিক দণ্ডনায়ক বিষয়পত্যাদীনন্যাংশ্চসকলরাজপাদোপজীবিনোহধ্যক্ষ প্রচারোক্তানিহাকীৰ্তিতান চট্টভট্টজাতীয়ান জনপদান ক্ষেত্ৰকরাংশ্চ ব্রাহ্মণান ব্রাহ্মণোত্তরান যথার্হং মানয়তি বোধয়তি সমাদিশতি চ মতমস্তু ভবতাং যথা– শ্রীপৌণ্ড্রবর্ধনভুক্ত্যন্তঃপাতি ব্যাঘ্রতট্যাং পূৰ্ব্বে অশ্বথবৃক্ষঃ সীমা। দক্ষিণে জলপিল্লা সীমা। পশ্চিমে শান্তিগোপীশাসনং সীমা। উত্তরে মালামঞ্চবাপী সীমা। ইথং চতুঃসীমাবচ্ছিন্নং বৃষভশঙ্কর নলিনসকাকিনীক-সপ্তত্রিংশদুন্মানাধিকাঢ়াবাপান্বিত নবদ্রোণোত্তর ভূপায়কৈকাত্মকং সংবৎসরেণ কপর্দকপুরাণশতিকোৎপত্তিকং মাথরণ্ডিয়াখশুক্ষেত্ৰং সসাটবিটপং সজলস্থলং সগর্তোষরং সগুবাকনারিকেলং সহ্যদশাপরাধং পরিহৃতসৰ্ব্বপীড়ং অচট্টভট্টপ্রবেশং অকিঞ্চিৎপ্রগ্রাহ্যং তৃণযুতি গোচরপৰ্য্যন্তং বিপ্রদাস-দেবশর্মণঃ প্রপৌত্রায় শঙ্করদেবশর্মণঃ পৌত্রায় দেবদাসদেবশর্মণঃ পুত্ৰায় কৌশিক সগোত্রায় বিশ্বামিত্রবন্ধুল কৌশিক প্রবরায় যজুৰ্বেদকাথ শাখাধ্যায়িনে পণ্ডিত শ্রীরঘুদেবশর্মণে পুণ্যেহহনি বিধিবদুদক পূৰ্ব্বকং ভগবন্তং শ্ৰীমন্নারায়ণভট্টারকমুদ্দিশ্য মাতাপিত্রোরাত্মনশ্চ পুণ্যযশোহভিবৃদ্ধয়ে উৎসৃজ্য আচার্কং ক্ষিতিসমকালং যাবৎ ভূমিচ্ছিদ্ৰন্যায়েন তাম্ৰশাসনীকৃত্য প্রদত্তমম্মাভিঃ। তদ্ভবত্তিঃ সব্বৈরেবানুমন্তব্যং ভাবিভিরপি নৃপতিভিরপহরণে নরকপাতভয়াৎ পালনে ধর্মগৌরবাৎ পালনীয়ং। ভবন্তি চাত্র ধর্মানুশংসিনঃ শ্লোকাঃ। ভূমিং যঃ প্রতিগৃহ্নাতি যশ্চ ভূমিং প্রযচ্ছতি। উভৌ তৌ পুণ্যকর্মাণৌ নিয়তং স্বর্গগামিনে। স্বদত্তাম্পরদত্তাম্বা যো হরেত বসুন্ধরাম। স বিষ্ঠায়াং কৃমির্ভূত্বা পিতৃভিঃ সহ পচ্যতে৷৷ আস্ফোটয়ন্তি পিতরো বন্ধুয়ন্তি পিতামহাঃ। ভূমিদাতা কূলে জাতসস ন স্ত্রাতা ভবিষ্যতি৷৷ ইতি কমদলাম্বু-বন্দুলেলাং শিয়মনুচিন্ত্য মনুষ্যজীবিতঞ্চ। সকলমিদ মুদাহৃদঞ্চ বুদ্ধা নহি পুরুষৈঃ পরকীৰ্ত্তয়ো বিলোপ্যাঃ। শ্রীমল্লক্ষণসেনদেবো নারায়ণদত্তসান্ধিবিগ্রহিকম রঘুদেবশাসনেহকৃতদূতং মণ্ডলী বলভিৎ৷৷ সং ৩ ভাদ্রদিনে ৯ মহা সাং নি। শ্রী নি।।

(শ্রীরজনীকান্ত চক্রবর্তী)

ঐতিহাসিক তথ্য

বাঙ্গালার সেন রাজবংশের যে সকল খোদিতলিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তদবলম্বনে শ্রীযুক্ত জেমস প্রিন্সেপ, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, স্যার আলেকজান্ডার কনিংহাম, ডাক্তার হরণলি, ডাক্তার কিলহর্ণ, হেনরী বিভারিজ প্রভৃতি প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতবর্গ বহুপ্রবন্ধ প্রকটিত করিয়াছেন; শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় এখনও তৎসম্বন্ধে প্রবন্ধ প্রকাশিত করিতেছেন। ইহাদের চেষ্টায় অনেক ঐতিহাসিক তথ্য সংকলিত, হইয়াছে; অনেক তর্ক বিতর্কেরও সূত্রপাত হইয়াছে। সুতরাং সেনরাজবংশের কোনও নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসনের আলোচনা করিতে হইলে, পূৰ্বাবিষ্কৃত শাসনাদির উল্লেখ করা প্রয়োজন। তদর্থে সেই সকল খোদিতলিপির সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদত্ত হইল :

১ কেশব সেন : কেশব সেনদেব তদীয় রাজ্যাব্দের তৃতীয় বর্ষে ঈশ্বর দেব শর্মাকে যে তাম্রশাসন প্রদান করেন তাহা ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাবু কানাইলাল ঠাকুরের জমিদারী বাখরগঞ্জের অন্তর্গত ইদিলপুর গবেষণায় আবিষ্কৃত হয়। পণ্ডিত গোবিন্দরাম তাহার পাঠোদ্ধার করেন, বাযু সারদাপ্রসাদ চক্রবর্তী ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া দিলে, প্রিন্সেপ সাহেব এসিয়াটিক সোসাইটির বিখ্যাত পত্রে প্রবন্ধ প্রকাশিত করেন। ইহাতে বংশাবলী এইরূপ খোদিত আছে :–বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষ্মণ সেন। লক্ষ্মণ সেনের পুত্র কেশব সেন।৫

২ লক্ষ্মণ সেন : লক্ষ্মণ সেনদেব তদীয় রাজ্যাব্দের দ্বিতীয় বর্ষে দশম মাঘদিনে শ্রীকৃষ্ণধর দেবশর্মাকে যে তাম্রশাসন প্রদান করেন, তাহা মজিলপুর নিবাসী বাবু হরিদাস দত্তের জমীদারীর অন্তর্গত ডায়মন্ড হারবারের নিকটবর্তী সুন্দরবনাঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়। ত্রিবেণীর হলধর চূড়ামণি মহাশয় তাহার যে অসম্পূর্ণ পাঠ লিপিবদ্ধ করেন পণ্ডিতবর রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয় “বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব” নামক পুস্তকে তাহাই প্রকাশিত করায় ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র তৎপ্রতি আস্থা স্থাপন করেন নাই। এই তাম্রশাসনে বংশাবলী এইরূপ লিখিত আছে : হেমন্তের পুত্র বিজয়। বিজয়ের পুত্র বল্লাল। বল্লালের পুত্র লক্ষ্মণ সেন।

৩ লক্ষ্মণ সেন : লক্ষ্মণ সেনদেব তদীয় রাজ্যাব্দের সপ্তমবর্ষে তৃতীয় ভাদ্রদিনে ঈশ্বর দেবশর্মাকে যে তাম্রশাসন প্রদান করেন তাহা দিনাজপুরের অন্তর্গত তর্পণদীঘি নামক পুষ্করিণীর নিকটে আবিষ্কৃত, বাবু মহেশচন্দ্র চক্ৰবৰ্ত্তিকর্তৃক অনুবাদিত ও শ্রীযুক্ত ওয়েস্টমেকট সাহেব কর্তৃক সোসাইটির পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছে। ইহাতে বংশাবলী এইরূপ লিখিত আছে : হেমন্তের পুত্র বিজয়। বিজয়ের পুত্র বল্লাল। বল্লালের পুত্র লক্ষ্মণ।

৪ বিজয় সেন : বিজয় সেনদেব প্রদ্যুম্নেশ্বর নামক শিব-স্থাপন করিয়া মন্দিরফলকে যে শিলালিপি খোদিত করাইয়াছিলেন, তাহা রাজসাহীর অন্তর্গত দেপাড়া গ্রামে আবিষ্কৃত ও শ্রীযুক্ত মেটকাফ সাহেবের যত্নে প্রকাশিত হইয়াছে। তাহাতে বংশাবলী এইরূপ খোদিত আছে :-বীরসেনের পুত্র সামন্ত সেন। সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন। হেমন্তের পুত্র বিজয়।

৫ বিশ্বরূপ সেন : বিশ্বরূপ সেন তদীয় রাজ্যাব্দের চতুর্দশ বর্ষে প্রথম আশ্বিন দিনে বিশ্বরূপ দেবশর্মাকে যে তাম্রশাসন প্রদান করেন, তাহা ফরিদপুরের অন্তর্গত কোটালিপাড়া পরগণার মদনপাড় গ্রামে আবিষ্কৃত ও শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়ের যত্নে সোসাইটির পত্রে প্রকশিত হইয়াছে। তাহাতে বংশাবলী এইরূপ লিখিত আছে : বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষ্মণ সেন। লক্ষ্মণের পুত্র বিশ্বরূপ।

অন্যান্য প্রমাণ : এই সকল খোদিত লিপি ব্যতীত কোন কোন পুরাতন গ্রন্থেও সেনরাজ বংশের প্রসঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়। তন্মধ্যে বল্লাল বিরচিত “দানসাগর”, হলায়ুধকৃত “ব্রাহ্মণ-সৰ্ব্বস্ব”, ঘটক ও কুলজ্ঞ-সঙ্কলিত কুলপঞ্জী ও মোসলমান লিখিত ইতিহাস উল্লেখযোগ্য। দানসাগর প্রাচীন ও প্রামাণ্য গ্রন্থ; ‘সময় প্রকাশে” ও “শুদ্ধিতত্ত্বে” ইহার বচন উদ্ধৃত রহিয়াছে। এই গ্রন্থে বল্লালসেন ৭০ অধ্যায়ে ১৩৭৫ প্রকার দানপদ্ধতি লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন। ইহার রচনাকাল ১০৯১ শক। লক্ষ্মণ সেনের ধর্মাধ্যক্ষ হলায়ুধ “ব্রাহ্মণ-সৰ্বস্ব” রচনা করেন। তিনি লক্ষ্মণসেনের কৃপায় বাল্যে সভাপণ্ডিত, যৌবনে মহাপাত্র বার্ধক্যে ধর্মাধিকারের উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত থাকার পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন।১০ কুলজ্ঞ মহাশয়দিগের হস্তলিখিত গ্রন্থ বংশানুক্রমে সঙ্কলিত; অদ্যাপি যাহা বর্তমান আছে তাহাও নিতান্ত আধুনিক নহে। মোসলমান-লিখিত ইতিহাসের মধ্যে ‘তবকাৎ-ই-নাসেরী” বখতিয়ারের বঙ্গাগমনের ৫৭ বৎসর পরে লিখিত; “আইন আকবরী” তাহার তুলনায় অপেক্ষাকৃত আধুনিক।

ব্রাহ্মণ-সৰ্ব্বস্বের শ্লোকানুসারে লক্ষ্মণসেন দীর্ঘকাল রাজ্যভোগ করার প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং আইন আকবরী গ্রন্থে এতদ্বিপরীত যাহা লিখিত আছে, তৎপ্রতি আস্থা স্থাপন করা সুসঙ্গত নহে। ঐ গ্রন্থে সুখসেন, বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন, মাধব সেন, কেশব সেন, সদা সেন, নুজ ও লাক্ষ্মণেয় নাম লিখিত আছে। তাম্ৰশাসনাদিতে যে বংশমালা প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাহার সহিত আইন আকবরীধৃত বংশমালার সামঞ্জস্য না থাকায় আবুল ফজলের গ্রন্থে অতিরিক্ত আস্থা স্থাপন করা নিরাপদ নহে।

সেনবংশ : বাঙ্গালার সেনরাজবংশের অভ্যুদয় ও অধঃপতনের ইতিহাস বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। তাহারা কে কোন সময়ে কতদূর পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করিয়াছিলেন, তাহাও নিঃসন্দেহে নির্ণয় করিবার উপায় নাই। এরূপ অবস্থায় কল্পনাকে ঐতিহাসিক বিষয়ের পথ প্রদর্শক না করিলে ভাল হইত; কিন্তু অনেকেই অনুমান মাত্র অবলম্বন করিয়া প্রবন্ধ প্রকটিত করিয়া গিয়াছেন। সেনরাজবংশের আদিপুরুষ কে এবং কাহার শাসন-সময়ে বখতিয়ার খিলিজী বঙ্গবিজয় করেন, তৎ সম্বন্ধেই কল্পনার আধিক্য দেখিতে পাওয়া যায়।

ঘটকদিগের গ্রন্থে ও জনশ্রুতিমুখে শুনিতে পাওয়া যায়, আদিশূর নামক কোনও হিন্দু রাজা কান্যকুজ হইতে পঞ্চগোত্রের পঞ্চ ব্রাহ্মণকে বঙ্গদেশে আমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছিলেন। এই আদিশূর কে, তাহা কোন খোদিত লিপিতে অদ্যাপি দেখিতে পাওয়া যায় নাই। কিন্তু ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁহার পরিচয় দিবার সময়ে তাঁহাকে বীরসেন বলিয়া ধরিয়া লইয়াছেন। “শূর ও বীর একার্থবোধক, সুতরাং যিনি আদিশূর তিনিই বরসেন, তিনিই সেনরাজবংশের আদিপুরুষ।” তাঁহার মতে “আদিশূর ও তৎপুত্র সামন্ত এবং পৌত্র হেমন্ত সেন পূর্ববঙ্গে রাজত্ব করিতেন। হেমন্তের পুত্র বিজয় (অথবা সুখসেন) সমগ্র বঙ্গদেশ পদানত করিলে, তৎপুত্র বল্লাল, তস্য পুত্র লক্ষ্মণ ও লক্ষ্মণের পুত্র মাধব ও কেশব এবং পৌত্র লাক্ষ্মণেয় বা অশোক সেন সমগ্র বঙ্গরাজ্য শাসন করিয়াছিলেন।” এইরূপ অনুমান বলে ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র সামন্ত সেনকে বীরসেনের পুত্র বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। অধিকাংশ খোদিত-লিপিতে রাজার পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহের নাম পৰ্য্যন্তই দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু সম্প্রতি পাবনার অন্তর্গত মাধাইনগরে যে তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, শ্রীযুক্ত বাবু প্রসন্ন নারায়ণ চৌধুরী মহাশয় লিখিয়াছেন যে, তাহাতে বীরসেন হইতে নামাবলী প্রদত্ত হইয়াছে। এই তাম্রফলকের প্রথমাংশের কয়েকটি শ্লোকমাত্রই আমাদের নিকট প্রেরিত হইয়াছে, তদনুসারে সামন্ত সেন বীরসেনের পুত্র বলিয়া বোধ হয় না,–তাঁহার বংশধর মাত্র। যাহা হউক, বীরসেনকে আদিশূর বলিয়া কল্পনা করিলে, ঘটক ও কুলজ্ঞগণের গ্রন্থ নিতান্ত অবিচারে প্রত্যাখ্যান করিতে হয়। অনুমানবলে পুরুষানুক্রমে লিখিত ও সযত্নে রক্ষিত পুরাতন বংশমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করা সঙ্গত বোধ হয় না। সুবিখ্যাত ডাক্তার হরণলি বলেন, “বিজয়সেনই আদিশূর।” বল্লালের পিতা বিজয়সেন আদিশূর হইলে, কুলপঞ্জীগুলির অগ্নিসৎকার করা আবশ্যক হইয়া উঠে

সেন রাজবংশের শেষ নরপতি কে, তাহাও সমূহ বিতর্কের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। মোসলমানের মতে তাঁহার নাম লাক্ষ্মণেয়, ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মতে তাঁহার নাম অশোক সেন, শ্রীযুক্ত বিভারিজ সাহেবের মতে তাঁহার নাম লক্ষ্মণ সেন, শ্রীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় যে ঘটকের গ্রন্থ হইতে বচন উদ্ধৃত করিয়াছেন, তদনুসারে তাঁহার নাম কেশব সেন বলিয়াই বোধ হয়। এই প্রমাণ সত্য হইলে লক্ষ্মণ সেনের অভাবের পর বখতিয়ার খিলিজির বঙ্গাগমনের কাল নির্ণয় করিতে হইবে। কুলশাস্ত্রে বা তাম্রফলকে লাক্ষণের নাম দেখিতে পাওয়া যায় নাই; অশোক সেনই যে লক্ষণের তাহারও প্রমাণাভাব।

মোসলমান ইতিহাসলেখক মিনহাজ উদ্দীন শেষ স্বাধীন সেন নরপতির জন্মবিষয়ক যে এক আখ্যায়িকা প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন, তাহা অনেকেই তাঁহার স্বকপোলকল্পিত বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন। মিনহাজ অনেক কথা লোকমুখে অবগত হইয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন; এবং অনেক কথা বখতিয়ারের অতিবৃদ্ধ পার্শ্বচরদিগের নিকটেও অবগত হইয়াছিলেন। তাঁহারা বঙ্গবিজয়ের গৌরববর্ধনার্থ কোন কোন কথা অতিরঞ্জিত করা বিচিত্র নহে। কিন্তু মিনহাজ যে স্বয়ং কিছু অতিরঞ্জিত করিয়া লিখিয়াছিলেন, তাহা নিঃসন্দেহে সিদ্ধান্ত করা যায় না। রায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাহাদুর বঙ্গদর্শনে লিখিয়াছিলেন–’আত্ম-জাতিগৌরবান্ধ মিথ্যাবাদী হিন্দুদ্বেষী মুসলমানের কথা যে বিচার না করিয়া ইতিহাস বলিয়া গ্রহণ করে, সে বাঙ্গালী নয়।” সুতরাং মিনহাজের কোন কথাই লোকে মানিয়া লইতে চাহে না। কিন্তু শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় যে ঘটকের গ্রন্থ হইতে প্রমাণ উদ্ধৃত করিয়াছেন, তাহাতেও লক্ষ্মণ সেনের জন্মবিষয়ক জনশ্রুতির উল্লেখ আছে। বাঙ্গালার সেন-রাজবংশের যে ভূপতির জন্ম সংক্রান্ত জনশ্রুতি ছিল, ঘটকের মতে তাঁহার নাম লক্ষ্মণ সেন; মিনহাজের মতে তাঁহার নাম রায় লখমণিয়া; এই লখমণিয়া লক্ষ্মণ সেনের নামের বিকৃত উচ্চারণ হওয়া বিচিত্র নহে।

বংশ : সেন নরপতিবর্গ কোন রাজবংশ অলংকৃত করিয়াছিলেন, তৎসম্বন্ধেও নানারূপ তর্ক বিতর্ক প্রচলিত হইয়াছে। রাজসাহী প্রদেশে বিজয় সেনের যে শিলালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছিল, তাহাতে বিজয় সেন তাঁহার পিতামহ সামন্ত সেনকে “ক্ষত্রিয়ানাং কুলশিরোদাম” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। লক্ষ্মণ সেনের সমস্ত পূৰ্বাবিষ্কৃত তাম্রশাসনে ও বর্তমান তাম্রশাসনে “ওষধিনাথ বংশের” উল্লেখ আছে। কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেনের তাম্রশাসনে “সেন-কুল-কমল-বিকাশ-ভাস্কর সোমবংশ-প্রদীপ” বলিয়া পরিচয় প্রদত্ত হইয়াছে। মাধাইনগরে প্রাপ্ত তাম্রশাসনের পাঠ শ্রীযুক্ত প্রসন্ননারায়ণ চৌধুরী মহাশয় যেভাবে উদ্ধৃত করিয়া পাঠাইয়াছেন তাহাতে স্পষ্টাক্ষরে “বংশে কর্নাটক্ষত্রিয়ানাং” খোদিত আছে। সুতরাং সেন রাজবংশের নরপতিগণ যে সোমবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন, তদ্বিষয়ে বাদানুবাদ করা নিষ্প্রয়োজন।

জাতি : এ পর্যন্ত কোনও সোমবংশীয় ক্ষত্রিয় লেখক সেন রাজবংশের তাম্রশাসনের সমালোচনা করেন নাই। বাঙ্গালীর মধ্যে যাঁহারা এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, তাঁহারা কেহ বৈদ্য কেহ বা কায়স্থ। তাঁহারা কেহ সেনরাজগণকে বৈদ্য কেহ বা কায়স্থ বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে চাহিয়াছেন। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র ক্ষত্রিয়-মতেরই সমর্থন করিয়া গিয়াছেন; তথাপি লোকে তাঁহাকে কায়স্থ মতের পক্ষপাতী বলিয়া নিন্দা করিত। তিনি তাহারও প্রতিবাদ করিয়া গিয়াছেন। শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় এখনও কায়স্থ-মত সংস্থাপনের জন্য চেষ্টা করিতেছেন। তিনি ফরিদপুরের কোনও ঘটকমহাশয়ের পুস্তকে “চন্দ্রদ্বীপস্যভূপালো সেনবংশসমুদ্ভব” দেখিয়া চন্দ্রদ্বীপের রাজবংশের বংশমালা মুদ্রিত করিয়া দেখাইয়াছেন যে, উক্ত রাজবংশের আদিপুরুষ দনৌজামাধব বসু ও মিত্র মহাশয়দিগের নিকট কুটুম্ব। কিন্তু এই দনৌজামাধব যে কাহার পুত্র তাহা এখনও নির্ণীত হয় নাই। তিনি সেনবংশোদ্ভূত বা কোনও বিখ্যাত রাজবংশজাত হইলে তাঁহার সযত্ন প্রতিপালিত ঘটকমহাশয়গণ তাঁহার পিতাপিতামহের নাম ছাড়িয়া দিয়া বংশমালা রচনা করিয়াছিলেন কেন, তাহারও কোনো কারণ বুঝিতে পারা যায় না। বসুজ মহাশয় বলেন, এই দনৌজামাধব বল্লালের প্রপৌত্র ছিলেন; এবং প্রমাণস্থলে হরি মিশ্রের কারিকা হইতে উদ্ধৃত করিয়াছেন :

“প্রাদুরভবৎ ধর্মাত্মা সেনবংশাদনন্তরং। দনৌজামাধবঃ সৰ্ব্বভূপৈঃ সেব্যপদাম্বুজঃ।’’

এতদনুসারে দনৌজামাধব সেনবংশের অধঃপতনের পর প্রাদুর্ভূত হওয়া বুঝিতে পারা যায়; কিন্তু তিনি যে সেনবংশেই জন্মগ্রহণ করেন, তাহা নিঃসন্দেহে বলিতে পারা যায় না। সুতরাং এ সম্বন্ধে আরও আলোচনা হওয়া আবশ্যক।

রাজ্যসীমা : বাঙ্গালার সেনরাজবংশের অধিকার কাহার সময়ে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল তদ্বিষয়ে অনেকে অনেকরূপ অনুমান করিয়া গিয়াছেন। ডাক্তার হরনলি বলেন, বিজয় সেনই গৌড়ের পালনরপালগণকে পরাজিত করিয়া বঙ্গদেশের সৰ্ব্বপ্রথম সেনভূপতি বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। তাঁহার পূৰ্ব্বে হেমন্ত ও সামন্ত সেন পৌণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত কোনও ভূভাগে রাজত্ব করিতেন; তখন (১০০৬-১০২৬ খৃষ্টাব্দে) নারায়ণ পাল গৌড়েশ্বর ছিলেন।”১৩ বিজয় সেন যে গৌড়াধিকার করিয়াছিলেন তাহা তাঁহার শিলালিপিতেও দেখিতে পাওয়া গিয়াছে। বিজয় সেনের প্রপৌত্র বিশ্বরূপ সেনের তাম্রশাসনে সেননরপতিবর্গের উপাধি এই রূপ খোদিত আছে :

অরিরাজবৃষভশঙ্করগৌড়েশ্বর শ্রীমদ্বিজয় সেন দেব অরিরাজনিঃশঙ্কশঙ্করগৌড়েশ্বর শ্রীমদ্বল্লাল সেন দেব অরিরাজমদনশঙ্করগৌড়েশ্বর শ্রীমল্লক্ষণ সেন দেব। অরিরাজবৃষভাঙ্কশঙ্করগৌড়েশ্বর শ্রীমদ্বিশ্বরূপ সেন দেব।

শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ বসু মহাশয় এই সকল উপাধির প্রতি পণ্ডিতসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলিয়াছেন, এতৎপ্রতি ইতিপূৰ্ব্বে কাহারও দৃষ্টি পতিত হয় নাই। কিন্তু ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কেশব সেন দেবের তাম্রশাসনের উপাধির প্রতি শ্ৰীযুক্ত প্রিন্সেপ সাহেবের দৃষ্টি আকৃষ্ট হইয়াছিল বলিয়া বোধ হয়। কেশব সেন পিতা, পিতামহ ও প্রহিতামহ সকলকেই একটি মাত্র উপাধিতে ভূষিত করিয়া গিয়াছেন, যথা : “অরিরাজ-সূদনশঙ্কর-গৌড়েশ্বর।” যাহা হউক লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসনে বা বল্লাল সেনের দানসাগরে বা হলায়ুধের ব্রাহ্মণ সৰ্ব্বস্তে এই সকল উপাধি ব্যবহৃত হয় নাই। ইহা প্রচলিত উপাধি হইলে লক্ষ্মণ সেনের দুই পুত্র দুইরূপ লিখিতেন না; এবং আর কোনও পুস্তকে না হউক, হলায়ুধের পুস্তকে ইহার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যাইত। ইহা কি যথার্থই কোনো ঐতিহাসিক বৃত্তান্তজ্ঞাপক, অথবা কেবল কবিজনসুলভ গৌরববিজ্ঞাপক বচনবিন্যাস, তাহাও নির্ণয় করা সুকঠিন। সেনরাজবংশের তাম্রশাসনগুলি শ্রীবিক্রমপুরসমাবাসিত জয়স্কন্ধাবার হইতে প্রদত্ত; গৌড় হইতে প্রদত্ত নহে। বিজয় সেন গৌড়াধিকার করিয়া থাকিলেও বল্লাল ও লক্ষ্মণ সেন যে গৌড়াধিপতি ছিলেন তাহা লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায় না। তবে গৌড়ের ধবংসাবশেষের মধ্যে লোকে এখনও বল্লালগড় দেখাইয়া দেয় এবং মোসলমানেরা এদেশে পদার্পণ করিয়া লক্ষ্মণ সেনের নামানুসারে গৌড়কে লক্ষ্মণাবতী বলিতেন। গৌড়জনপদে কখন পাল কখনও বা সেননরপতি শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করিতেন; কিন্তু নিঃসংশয়ে তাহার কাল নির্ণয় করা সুকঠিন। সেননরপতিগণ সৌভাগ্যের দিনে দূরদেশেও যুদ্ধযাত্রা করিতেন, বিজয় সেন কামরূপ ও কলিঙ্গ দেশেও যুদ্ধযাত্রা করিয়াছিলেন।

শাসনপ্রণালী : যথাযোগ্য ইতিহাসের অভাবে যাহা জনশ্রুতিমাত্রে পর্যবসিত হয়, তাহা কালে বহুধা রূপান্তরিত হইয়া থাকে। সুতরাং সেন নরপতিবর্গের শাসনকাহিনী সঙ্কলিত করা অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছে। যতটুকু জানিতে পারা যায়, তাহাতে তাঁহাদের সহিত বঙ্গদেশের অনেক দিনের সংস্রব ছিল; বাঙ্গালীর সুখ দুঃখ বা উন্নতি অবনতি বহুকাল সেনরাজবংশের শাসনকৌশলে নিয়মিত হইত। সে দিন কেমন ছিল? তাম্রশাসনোল্লিখিত রাজকর্মচারিগণের সংখ্যা ও পদবিজ্ঞাপক। উপাধি দেখিয়া বোধ হয়, রাজ্য সুরক্ষিত ও সুশাসিত করিতে হইলে যাহা যাহা প্রয়োজন তাহার কিছুরই অভাব ছিল না। কিন্তু এই সকল পুরাতন রাজপদবিজ্ঞাপক কথার অর্থ লইয়া অনেকে অনেক অসঙ্গত টীকা লিখিয়া ঐতিহাসিক তথ্য নির্ণয়ের অসুবিধা করিয়া গিয়াছেন। ক্ষত্রিয়-শাসন প্রণালীর প্রথম ও প্রধান নিয়ম সামন্তপ্রথা; এক সময়ে বঙ্গদেশেও এই প্রথা প্রচলিত ছিল বলিয়া বোধ হয়। পালননরপতিবর্গের রাজসভায় মহাসামন্তাধিপতি নামক রাজপাত্রের উল্লেখ আছে; সেননরপতিবর্গের রাজসভায় মহাসামন্তাধিপতি নামক কেহ না থাকিলেও “অশেষ রাজরাজণ্যকের’ কথা দেখিতে পাওয়া যায়। রাজাকে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হইতে হইত, মহাসান্ধিবিগ্রহিক তদ্বিভাগের কার্য নির্বাহ করিতেন। সামরিক ও রাজনৈতিক প্রত্যেক বিভাগের রাজকর্মচারীর নামোল্লেখ দেখিয়া বোধ হয় সেনরাজগণও পুরাতন হিন্দুপদ্ধতিক্রমে রাজ্যশাসন করিতেন। সে পদ্ধতিতে রাজা-প্রজার মধ্যে একটি সুখের ও সম্মানের সম্বন্ধ সংস্থাপিত ছিল। রাজা আদেশ প্রচারের সময়েও যথাযোগ্য সম্মান সহকারে শাসন প্রবর্তন করিতেন এবং তৎপালনে সৰ্বসাধারণের মতি হউক বলিয়া সকলের সহায়তা ও অনুমোদন লাভাশায় লিখিতেন–”মতমস্তু ভবতাম।”

লক্ষ্মণ সেনের তাম্রশাসনে যে সকল রাজপাদোপজীবীর নাম লিখিত আছে, তন্মধ্যে বৃহদুপরিক, মহাক্ষপটলিক, মহাভোগিক, মহাপীলুপতি ও মহাগণস্কের ব্যাখ্যা করিতে গিয়া শ্রীযুক্ত ওয়েষ্টমেকট সাহেব ও অন্যান্য ইউরোপীয় পণ্ডিত অনেক গোলযোগ করিয়াছেন।

আধ্যাপক ল্যাসেন বলেন, “ফৌজদারী-বিভাগের কাৰ্য্য পরিদর্শকের নাম বৃহদুপরিক,” ওয়েষ্টমেকট বলেন, “বৃহদুপরিক কোন রাজপদের নাম ছিল তাহা নির্ণয় করা অসম্ভব।” ইহারা বৃহদুপরিক ও তৎপূৰ্ব্ববর্তী অন্তরঙ্গ শব্দ পৃথক করিয়া লইয়াছেন; কিন্তু অন্তরঙ্গ বৃহদুপরিক (অন্তরঙ্গানাংবৃহদুপরিকঃ) একটি পদের নাম। যাঁহারা রাজন্তঃপুরে প্রবেশলাভের অধিকারী সেই সকল ভৃত্যবর্গের অধিনায়কের নাম অন্তরঙ্গবৃহদুপরিকঃ। ডাক্তার রাজেনদ্রলাল মিত্র ধর্মাধ্যক্ষ বলিয়া মহাক্ষপটলিক শব্দের ব্যাখ্যা করেন; কিন্তু ওয়েষ্টমেকট তাহা গ্রহণ করেন নাই। বাস্তবিক মহাক্ষপটলিক, অক্ষপাটক, অক্ষদর্শক প্রভৃতি কথা একার্থ-বোধক,– প্রধান বিচারপতি এই নামে অভিহিত হইতেন। ওয়েষ্টমেকট ভোগ শব্দ হইতে মহাভোগিক উৎপন্ন হইতে পারে বলিয়া করসংগ্রাহক কর্মচারীকে মহাভোগিক ও বনবিভাগের কর্মচারীকে মহাপীলুপতি বলিয়াছেন। ভোগিক অশ্বরক্ষকের নাম, পীলুপতি হস্তিরক্ষকের নাম। সংস্কৃত পীলু পারস্যে গিয়া পিল, আরবে গিয়া ফিল হইয়াছে, অথচ এদেশে পীলু শব্দ অপ্রচলিত হইয়া পড়িয়াছে! মহাগণস্কের ব্যাখ্যায় ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ নানারূপ কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু কেহই কোনো সিদ্ধান্ত করিতে পারেন নাই। এক রথ, এক গজ, তিন অশ্ব পঞ্চপদাতিক লইয়া একটি সোনামণ্ডলী গঠিত হইত, তাহার নাম পত্তি। তিনটি পত্তি একত্র হইলে তাহাকে সেনামুখ বলিত; তিনটি সেনামুখ মিলিয়া এক গুল্ম গঠিত হইত; তিন গুল্ম এক “গণ” বলিয়া কথিত হইত; সেই গণের অধিপতির নাম মহাগণস্ক। ২৭ রথ ২৭ গজ ৮১ অশ্ব ও ১৩৫ পদাতিকে এক “গণ” গণিত হইত।১৪ পালনরপালবর্গের তাম্রশাসনে যে সকল রাজকর্মচারীর নাম উল্লিখিত হইয়াছে, তাহার সহিত এই সকল নামের তুলনা করিলে অনেক ঐতিহাসিক রহস্য প্রকাশিত হইতে পারে।

ঐতিহাসিক চিত্র, এপ্রিল, ১৮৯৯

তথ্যসূত্র

১ The Seal which is an elaborately executed figure of Siva cast in copper, of great delicacy and taste, is uninjured by time even in the minutest limbs and weapons which protrude undefended from the trunk.

–J. A. S. B. Vol, VII, Part I, 40.

২ পণ্ডিত মহাশয় “ফুটেঃ” পাঠ উদ্ধৃত করিয়াছিলেন।

৩ তাম্রপট্টে ‘অক্ষিজমন্তরেণ” কথা দেখিতে পাওয়া যায় না; এই স্থলের প্রকৃত পাঠ অস্পষ্ট রহিয়াছে।

৪ অপঠিত শব্দটি “সম্বন্ধ্য” বলিয়া পাঠ করা যায়।

৫ (J.A.S.B. Vol. VII, Part I.

৬ বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব।

৭ J.A.S.B. Vol. XLIV, Part I.

৮ J.A.S.B Vol. LXV, Part I.

৯ নিখিলচক্ৰতিলক শ্ৰীমদ্বল্লালসেনেন পূর্ণে। শশিনব দশমিতে শকবর্ষে দানসাগরো রচিতঃ।

১০ বাল্যে খ্যাপিত রাজপণ্ডিতপদঃ শ্বেতাংশুবিশ্বোজ্জ্বল চ্ছান্ত্রোৎসিক্ত মহামহন্তনুপদং দত্ত্বা নবে যৌবনে। যস্মৈ যৌবনশেষযোগ্য মখিলক্ষ্মাপাল নারায়ণঃ শ্রীমান লক্ষ্মণসেনদেবনৃপতি ধর্মাধিকারংদদৌ।

১১ প্রায়শ্চিত্তং ততঃ কুত্বা ব্রাহ্মণেভাঃ প্রতিগ্রহান। তৎপুত্রঃ কেশবো রাজা গৌড় রাজাং বিহায় চ৷৷ মতিং চাপা করোদ্বন্দ্বে যবনস্য ভয়াত্ততঃ। ন শত্রু বজ্জন্তে, বিপ্রান্ত স্থাতুং হদ পুনঃ।

My critics all labour under the mistake that I wanted to make the Sena Kings members of the Kayastha caste, in order to glorify that caste and eajoy the advantage of a ray of that glory, being myself a Kayastha; but as I have nowhere said anything of the kind, I cannot but leave this part of their criticisms unnoticed;– Indo Aryans Vol. II. 264.

১২ I have not been able to ascertain from the geneologies of ancient families whose son Danouja Madhava was. — J.A.S.B. vol. LXV. Part I.

১৩ Centenary Review of the Researches of the Asiatic Seciety, 1784-1883.

১৪ একৈভৈরথা শ্বঃ পত্তিঃ পঞ্চপদাতিকা। পত্তঙ্গৈ স্ত্রিগুণৈঃ সর্বৈঃ ক্রমাদাখ্যা ধথ্যেত্তরম। সেনামুখং গুল্মগণৌ বাহিনী পুতনা চমুঃ৷৷ ইত্যাদি।–অমরকোষঃ।

নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসন ২

অদ্যাপি সেনরাজবংশের সমগ্র বিবরণ সঙ্কলিত হইতে পারে নাই। তজ্জন্য সেনরাজগণের বিবিধ শাসন-লিপির আলোচনা করিতে গিয়া, অনেকে অনেক কষ্টকল্পনার অবতারণা করিয়া আসিতেছেন। বাঙ্গালার শেষ হিন্দু-রাজবংশের ইতিহাস যে এখনও তমসাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে, তাহা বাঙ্গালীর পক্ষে নিয়তিশয় ক্ষোভের বিষয়।

সম্প্রতি কাটোয়ার নিকটবর্তী ভাগীরথীতীরে সেনরাজবংশের দ্বিতীয় রাজা বল্লালসেনদেবের একখানি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে। “প্রবাসী’র সম্পাদক মহাশয় সর্বাগ্রে তাহার একটি পাঠ মুদ্রিত করিয়া, কৌতূহল চরিতার্থ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে “প্রবাসী’তে মুদ্রিত পাঠটি মূলানুগত বলিয়া মৰ্য্যাদা লাভ করিতে না পারায়, তাহাতে কৌতূহল সম্পূর্ণরূপে চরিতার্থ হইতে পারে নাই। এক্ষণে সাহিত্য-পরিষৎ বহুব্যয়ে একটি প্রতিকৃতি প্রস্তুত করাইয়া, পাঠ, অনুবাদ ও টীকা প্রকাশিত করিয়াছেন; সুতরাং নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসনের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইবার প্রকৃত অবসর উপস্থিত হইয়াছে। পরিষৎ-সম্পাদক সুহৃদ্ধর শ্ৰীযুত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাশয় অনুগ্রহ-প্রকাশে একখণ্ড পত্রিকা উপহার প্রদান করায়, মুদ্রিত প্রতিকৃতি অবলম্বন করিয়া, একটি মূলানুগত পাঠ উদ্ধৃত করিবার চেষ্টা করিয়াছি। পরিষৎ-পত্রিকায় প্রকাশিত পাঠের সহিত সকল স্থলে তাহার সামঞ্জস্য রক্ষিত হইতে পারে নাই।

পরিষৎ-পত্রিকায় প্রকাশিত পাঠে অনেকগুলি লিপিপ্রমাদ দেখিতে পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া, প্রথম পৃষ্ঠার ২৮ পংক্তির [১৪ শ্লোকের] “তদয়মদিতো বাসুবিদুষে” পাঠটি মূলানুগত হইলেও, প্রকৃত পাঠ কি না, তাহাতে সংশয় উপস্থিত হইয়াছে। প্রবন্ধলেখক শ্ৰীযুত তারকচন্দ্র রায় মহাশয় এই পাঠের ব্যাকরণদোষের প্রতি লক্ষ্য করিয়া, ব্যাখ্যা করিবার সময়ে, “অদিৎ ইতি বৈদিকপ্রয়োগঃ” বলিয়া একটি কল্পনার অবতারণা করিতে বাধ্য হইয়াছেন। কিন্তু তাহাতেও ব্যাকরণদোষ সংশোধিত হইতে পারে নাই। ‘তৎ + অয়ং + অদিৎ + ওবাসুবিদুষে” এইরূপ পদচ্ছেদ কল্পনা করিয়াই, রায় মহাশয় “বৈদিক-প্রয়োগের শরণাগত হইবার চেষ্টা করিয়া থাকিবেন। কিন্তু ইহাতে “তদয়মদিদোবাসুবিদুষে” হইত;–’তদয়মদি তোবাসুবিদুষে” হইত না। তাম্রশাসনে শিল্পীর ত্রুটীতে কখনও কখনও লিপিপ্রমাদ সংঘটিত হইয়া থাকে। ইহাও সেইরূপ বলিয়া বোধ হয়। “তদয়মদিতৌবাসুবিদুষে” উত্তীর্ণ করিতে গিয়া, শিল্পী ঔকারের পরিবর্তে ওকারমাত্ৰ উৎকীর্ণ করিয়াই নিরস্ত হইয়া থাকিবেন। এরূপ অনুমানের আশ্রয় গ্রহণ করিলে, “বৈদিক-প্রয়োগে”র শরণাপন্ন হইতে হয় না।

পরিষৎ-পত্রিকায় প্রকাশিত পাঠের প্রথম পৃষ্ঠার ৩১ পংক্তির “সমুপাগত’– শব্দটি মূলানুগত হয় নাই; তজ্জন্য ইহার ব্যাখ্যাও মুলানুগত হইতে পারে নাই। তাম্রপটে “সমুপগত” শব্দই উৎকীর্ণ রহিয়াছে; তাহাতে আকার নাই। এই শব্দটি সকল তাম্রশাসনেই দেখিতে পাওয়া যায়। খালিমপুরে আবিষ্কৃত ধর্মপালদেবের তাম্রশাসনের পাঠ উদ্ধৃত করিবার সময়ে পরলোকগত উমেশচন্দ্র বটব্যাল মহাশয় “সমুপাগত” পাঠ উদ্ধৃত করিয়াছিলেন। অধ্যাপক কিলহৰ্ণ প্রকৃত পাঠ [সমুপগত] উদ্ধৃত করিয়াও, তাহাকে সমুপাগত-শব্দের তুল্যার্থবোধক মনে করিয়া, assembled বলিয়া অনুবাদ করিয়া গিয়াছেন। উপগত-শব্দ অমরকোষে [৩।২।১০৮-১০৯] যে ভাবে ব্যাখ্যাত আছে, তদনুসারে rocognised বলিয়া অনুবাদ করিলেই অর্থসঙ্গতি রক্ষিত হইতে পারিত। রাজপাদোপজীবী বলিয়া স্বীকৃত ও সুবিদিত–এইরূপ অর্থ ব্যক্ত করিবার জন্যই “সমুপগত” শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠার ২ পংক্তির “গোমহিষাজীবিকাদি” পরিষৎ-পত্রিকায় অনূদিত বা ব্যাখ্যাত হয় নাই। ইহাও লিপিকরের প্রমাদে যথাযথ ভাবে উদ্ধৃত হইতে পারে নাই। তাম্রপট্টে প্রকৃত পাঠই উৎকীর্ণ রহিয়াছে, তাহা-গোমহিষাজাবিকাদি। তাম্রপট্টে জা আছে, জী নাই। গো + মহিষ + অজ + অবিক [মেষ] = গোমহিষাজাবিক। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ৪ পংক্তির “জনপদান”–শব্দ “জানপদান”; এবং ২৭ পংক্তির “বর্ণয়ন্তি”–শব্দ “বল্পয়ন্তি”, হইবে বলিয়াই বুঝিতে পারা যায়। দ্বাদশ শ্লোকের “দৃষ্টাঃ” “দৃপ্তাঃ” হইবে। গদ্যাংশের “সসাটবিটপ” ‘সঝাটবিটপ” হইবে। অন্যান্য লিপি-প্রমাদ উল্লেখযোগ নহে।

প্রথম পৃষ্ঠার ৩য় পংক্তির “হর্ষোচ্ছাল” শব্দের ব্যাখ্যাটি কৌতুকপূর্ণ। “যিনি অভূদিত হইলে উল্লসিত জলনিধি (?) বারিবিপ্লব উচ্চতায় শালবৃক্ষ অতিক্রম করে,”–এরূপ ব্যাখ্যার মূল কি, তাহা বোধগম্য হয় না। পংক্তির “স্থূললক্ষ্য” শব্দটি ব্যাখ্যাত হয় নাই। “স্থূললক্ষ্য” এবং “স্কুললক্ষ” একার্থবোধক “পারিভাষিক” শব্দরূপে সুপরিচিত। যাজ্ঞবল্ক্য-সংহিতায় [রাজধৰ্ম্মপকরণে] রাজা

“মহোৎসাহঃ স্থূললক্ষঃ কৃতজ্ঞো বৃদ্ধসেবকঃ” বলিয়া উল্লিখিত। মিতাক্ষরা-টীকায় “বহুদেয়াদর্শী” বলিয়া “স্কুললক্ষের” অর্থ উল্লিখিত আছে। ইহাই যে সুপরিচিত অর্থ, মনুসংহিতায়, মহাভারতে এবং অন্যান্য স্থলেও তাহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। কবি একটি নিগূঢ় ভাব দ্যোতিত করিবার জন্যই এই “পারিভাষিক” শব্দের ব্যবহার করিয়া থাকিবেন।

প্রথম পৃষ্ঠার ১১ পংক্তির “বৈরিসরঃ-প্রলয়-হেমন্তঃ” প্রয়োগটি ব্যাখ্যাত হয় নাই। পাদটীকায় উল্লিখিত হইয়াছে,–”হেমন্তকালে তড়াগ প্রভৃতি শুষ্ক হইয়া যায়।” এরূপ কবি-প্রসিদ্ধি অপরিচিত। হেমন্তের হিমানীপাতে তড়াগের পদ্মবন বিধবস্ত হইবারই প্রসিদ্ধি প্রচলিত আছে। কিন্তু এ সকল কথা, তাম্রশাসনের এই ব্যাখ্যার পক্ষে অল্প কথা।

সেনরাজগণ চন্দ্রবংশীয়, ব্রহ্মক্ষত্রিয়, কর্নাট-ক্ষত্রিয়বংশোৎপন্ন, ইত্যাদি পরিচয় ক্রমে ক্রমে আবিষ্কৃত হইলেও, তাঁহারা কি সূত্রে, কোন সময়ে, এ দেশে উপনীত হইয়াছিলেন, তাহা এখনও তমসাচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে।

সেনরাজবংশের প্রথম রাজা বিজয়সেনদেবের দেওপাড়া-প্রস্তরলিপির একটি শ্লোকে জানিতে পারা যায়, বিজয়সেনদেবের পিতামহ সামন্ত সেন শেষজীবনে গঙ্গতীরের পুণ্যাশ্রমে উপনীত হইয়াছিলেন। যথা :

উদগন্ধীন্যাজ্যধূমৈ মৃগশিশু-রসিখিন্ন-বৈখানসন্ত্রী স্তন্যক্ষীরাণি কীরপ্রকর-পরিচিত ব্রহ্ম পারায়ণানি। যেনাসেব্যন্ত শেষে বয়সি ভবভয়াস্কন্ধিভি মস্করীঃৈ পুর্ণোৎসঙ্গানি গঙ্গাপুলিন-পরিসরারণ্যপুণ্যাশ্রমাণি।

বল্লালসেনের পুত্র লক্ষ্মণসেনের সভাকবি ধোয়ী কবিরাজের “পবন-দূত” কাব্যে দেখিতে পাওয়া যায়, রাঢ় দেশে সেন-রাজগণের মুরারি-বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যথা :

গঙ্গাবীচি-প্লুত পরিসরঃ সৌধমালাবতংসো ধ্যায্যত্যুচ্চৈয়ি রসময়ো বিস্ময়ঃ সুহ্মদেশঃ। শ্রোত্রক্রীড়াভরণপদবীং ভূমিদেবাঙ্গনানাং তালীপত্ৰং নবশশিকলাকোমলং যত্র ভাতি। তস্মিন সেনান্বয়-নৃপতিনা দেবরাজ্যাভিষিক্তো দেবঃ সুহ্মে বসতি কমলা-কেলিকারো মুরারিঃ। পাণৌ লীলাকমলমসকৃৎ যৎসমীপে বহন্ত্যো লক্ষ্মীশঙ্কাং প্রকৃতিসুভগাঃ কুৰ্ব্বতে বাররামাঃ৷৷

বল্লালসেন দেবের নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসনের তৃতীয় শ্লোকে দেখিতে পাওয়া যায়, –বিজয় সেনের পিতামহ সামন্তসেনের পূর্বপুরুষগণের সময়েই রাঢ় দেশের সহিত সেনরাজবংশের সম্পর্ক সংস্থাপিত হইয়াছিল। তাঁহারা কোন সময়ে, কি সূত্রে, সেই সম্পর্ক-সংস্থাপনে কৃতকার্য হইয়াছিলেন, তাহা একটি ঐতিহাসিক সমস্যা।

বিজয়সেনের পিতামহের পূৰ্ব্বেও যে সেনবংশের সহিত রাঢ়দেশের সম্পর্ক সংস্থাপিত হইয়াছিল, তাহাই নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসনের নবাবিষ্কৃত ঐতিহাসিক তথ্য। এক সময়ে শ্ৰীযুত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এম.এ. অনুমানমূলে লিখিয়াছিলেন, রাজেন্দ্র চোড়ের বঙ্গাক্রমণ করিবার সময়ে, যাঁহারা তাঁহার সেনাদলের সঙ্গে এ দেশে উপনীত হইয়াছিলেন, সেনরাজবংশের পূৰ্ব্বপুরুষগণ তাঁহাদিগের এক শাখা বলিয়া বোধ হয়। তাহা সত্য হইলে, তাঁহারা পাল-সাম্রাজ্যেই বাস করিতেন। কারণ রাজেন্দ্রের অভিযান একটি লুণ্ঠন-ব্যাপারেই পর্যবসিত হইয়াছিল; তিনি এ দেশে রাজ্যস্থাপনে কৃতকাৰ্য্য হইতে পরেন নাই। তাঁহার অভিযানে পূৰ্ব্বে এবং পরে, রাঢ় দেশ পাল-সাম্রাজ্যেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেনরাজগণের পূৰ্বপুরুষগণ সেই সাম্রাজ্যে প্রজারূপে বসতি করিতে করিতে, কোন সময়ে, কিরূপ ঘটনাচক্রে, রাজসিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন, তাহা একটি ঐতিহাসিক সমস্যা। “সেখ শুভোদয়া”র হস্তলিখিত পুঁথিতে একটি জনশ্রুতির উল্লেখ আছে। তাহাতে লিখিত আছে, রামপালদেব তনুত্যাগ করিলে, মন্ত্রিগণ বিজয়সেন নামক এক শিবোপাসক কাঠুরিয়াকে রাজা নিৰ্বাচিত করিয়াছিলেন! এ পর্যন্ত ইহার কোনোরূপ প্রমাণ আবিষ্কৃত হয় নাই। সুধীগণ এই ঐতিহাসিক সমস্যার মীমাংসা করিতে যত্নশীল হউন,–এই ভরসায় নবাবিষ্কৃত তাম্রশাসনের একটি মূলানুগত পাঠ মুদ্রিত হইল।

ওঁ নমঃ শিবায়

সন্ধ্যা-তাণ্ডব-সন্বিধান-বিলসন্নান্দী-নিনাদোৰ্ম্মিভি নিমর্যাদ-রসার্মবো দিশতু বঃ শেয়োর্ধ-নারীশ্বরঃ। যস্যার্ধে ললিতাঙ্গহারবলনৈরর্পে চ ভীমোদ্ভটৈ র্নাট্যারম্ভ-রয়ৈ র্জয়ত্যভিনয়-দ্বৈনুরোধ শ্রমঃ।৪ হর্ষোচ্ছাল-পরিপ্লবো নিধিরপাং ত্রৈলোক্যবীরঃ স্মরো নিস্তন্দ্রাঃ কুমুদাকরা মৃগদৃশো বিশ্রান্তম্যানাধয়। যস্মিন্নভদিতে চকোরনগরাভোগে সুভিক্ষোৎসবঃ স শ্ৰীকণ্ঠ-শিরোমণি ৰ্বিজয়তে দেব স্তমীবল্লভঃ।৫ বংশে তস্যাভদয়িনি সদাচারচর্যা-নিরূঢ়ি প্রৌঢ়াং রাড়ামকলিতচরৈভুবয়ন্তোহনুভাবৈঃ। শম্বদ্বিশ্বাভয়বিতরণস্কুললক্ষ্যা বলক্ষৈঃ কীর্ত্তল্লোলৈঃ পিতবিয়তো জঞ্জিরে রাজপুত্রাঃ।৬ তেষাম্বংশে মহৌজাঃ প্রতিভট-পৃতম্ভোধিকলল্পান্তসুরঃ কীৰ্ত্তি-র্জ্যোৎস্নাজ্জ্বলশ্রী প্রিয়-কুমুদবনোল্লাস-লীলামৃগাঙ্কঃ। আসীদাজন্মরক্ত-প্রণয়িগণ-মনোরাজ্য-সিদ্ধি-প্রতিষ্ঠা শ্রীশৈল-সত্যশীলো নিরুপধি-করুণাধাম সামন্তসেনঃ। তস্মাদজনি বৃষধবজ-চরণাম্বুজ-বটপদো গুণাভরণঃ। হেমন্তসেনদেবো বৈরিসরঃ প্রলয় হেমন্তঃ।৮ লক্ষ্মী-স্নেহাৰ্ত্ত-দুগ্ধাম্বুধি-বলনরয়-শ্রদ্ধয়া মাধবেন প্রত্যাবৃত্ত-প্রবাহোচ্ছসিতসুরধুনী শঙ্কয়া শঙ্করেণ। হংসশ্রেণী-বিলাসোজ্জ্বলিত-নিজপদাহংযুনা বিশ্বধাত্রা সুত্রামা-রামসীমা-বিহরণ-ললিতাঃ কীৰ্ত্তয়ো যস্য দৃষ্টাঃ। তস্মাদভুদখিল-পার্থিব-চক্রবর্তী নিৰ্যাজ-বিক্রম-তিরস্কৃত-সাহসাঙ্কঃ। দিকপালচক্র-পুটভেদন-গীতকীৰ্ত্তিঃ পৃথ্বীপতি ৰ্ব্বিজয়সেন-পদপ্রকাশঃ।১০ ভ্রাম্যম্ভীনাম্বনান্তে যদরি-মৃগদৃশং হারমুক্তাফলানি ছিন্নাকীর্ণানি ভূমৌ নয়নজল-মিলৎ-কজ্জলৈ লাঞ্ছিতানি। যত্নাচ্চিন্বস্তি দক্ষতচরণতলাসৃথিলিপ্তানি গুঞ্জা স্ৰগ ভুষারম্য-রামা-স্তনকলশ-ঘনাশ্লেষলোলাঃ পুলিন্দাঃ। প্রত্যাদিশবিনয়ং প্রতিবেশ্ম রাজা বভ্রাম কামুকধরঃ কিল কার্তবীর্যঃ। অস্যাভিবেক-বিধি-মন্ত্রপদৈগ্নিরীতি রারোপিতো বিনয়বঅঁনি জীবলোকঃ।১২ পদ্মালয়েব দয়িতা পুরুষোত্তমস্য গৌরীব বাল-রজনীকর-শেখরস্য। অস্য প্রধান মহিষী জগদীশ্বরস্য শুদ্ধান্ত-মৌলিমণি রাস বিলাসদেবী।৩ এষা সুতং সুতপসাং সুকৃতৈরসুত। বল্লালসেনমতুলং গুণগৌরবেন। অধ্যাস্ত যঃ পিতুরনন্তরমেকবীরঃ সিংহাসনাদ্রি শিখরং নরদেব সিংহঃ।১৪ যস্যারি-রাজ-শিশবঃ শবরালয়ে বালৈরলীক-নরনাথ-পদেহভিষিক্তাঃ। দৃপ্তাঃ প্রমোদ-তরলেক্ষণয়া জনন্যা। নিশ্বস্য বৎসলতয়া সভয়ং নিবিদ্ধাঃ।১৫ ক্রীতাঃ প্রাণতৃণ-ব্যয়েন রভসাদালিঙ্গ্য বিদ্যাধরী রাকল্পং বিহরন্তি নন্দনবনাভোগেযু সংসপ্তকাঃ। ইত্যালোচ্য নৃপৈঃ স্মর-প্রয়িতাভীকৈঃ শ্রিতঃ স্বরবধূ নেত্রেীবর-তোরণাবলিমগো বস্যাসি-ধারাপথঃ।১৬ দদানা সৌবপ্নং তুরগমুপরাগেম্বরমণে যদস্যোদাক্ষী দহনি জননী শাসনপদং। নৃপ স্তম্রোক্কীর্ণং তদয়মদিতো [তৌ] বাসুবিদুবে, সতাং দৈন্যোত্তাপ-প্রশমন-ফলা-কাল-জলদঃ।১৭ স খলু শ্রীবিক্রমপুর-সমাবাসিত শ্রীমজ্জয়স্কন্ধাবারাৎ মহারাজাধিরাজ শ্রীবিজয়সেনদেব-পাদানুধ্যাত–১৮ পরমেশ্বর-পরমমাহেশ্বর-পরম-ভট্টারক মহারাজাধিরাজ-শ্রীমদ্বল্লালসেনদেবঃ কুশলী। সমুপগশেষ–১৯ রাজরাজন্যক রাজপুত্র রাজামাত্য পুরোহিত মহাধর্মাধ্যক্ষ মহাসান্ধিবিগ্রহিক-মহাসেনাপতি-মহামুদ্ৰাধিকৃত-অন্তরঙ্গ-বৃহদুপরিক মহাক্ষপটলিক মহাপ্রতীহার মহা ভোগিক-মহাপীলুপতি-মহাগণস্থ-দৌসসাধিক-চৌরোদ্ধরণিক

নৌবলহস্ত্যগোমহিষাজাবিকাদিব্যাপৃতক২০ গৌল্মিক-দণ্ড-পাশিক-দণ্ডনায়ক বিষয়পত্যাদীন অন্যাংশ্চ সকলরাজপাদোপজীবিনোহধ্যক্ষ প্রচারোক্তন ইহাকীৰ্তিতান চট্টভট্টজাতীয়ান জানপদান ২১ ক্ষেত্ৰকরাংশ্চ ব্রাহ্মণান ব্রাহ্মণোত্ততি যথাহং মানয়তি বোধয়তি সমাদিশকিত চ।২২ মতমস্তু ভবতাং। যথা শ্রীবর্ধমানভুক্ত্যন্তঃপাতিচ্যুত্তররাড়ামণ্ডলে স্বল্পদক্ষিণবীথাং খাণ্ডোয়িল্লা-শাসনোত্তরস্থিত-সিঙ্গটিয়া-নদ্যুত্তরতঃ নাড়ীচা-শাসনোত্তরস্থ সিঙ্গটিয়া নদী পশ্চিমোত্তরতঃ অম্বয়িল্লা-শাসন-পশ্চিমস্থিত-সিঙ্গটিয়া-পশ্চিমতঃ পশ্চিম গড্ডিসীমালি-দক্ষিণতঃ। আউহা-গড্ডিয়া-দক্ষিণ গোপথ-দক্ষিণতঃ। তথা আউহা গড্ডিয়োত্তর-গোপথনিঃসৃত-পশ্চিমগতি-সুরকোণা গড্ডিআকীয়োত্তরালিপৰ্য্যন্তগত সীমালি-দক্ষিণতঃ-নাচ্ছিনা শাসন-পূৰ্ব্ব-সীমালিপূৰ্ব্বতঃ জলশোথী-শাসন সীমাপূৰ্ব্বস্থ-গোপথাৰ্দ্ধ-পূৰ্ব্বতঃ মোলাড়ন্দী-শাসনপূৰ্ব্বস্থিত-সিঙ্গটিআ-পৰ্যন্ত গোপমাৰ্ধপূৰ্ব্বতঃ।

এবং চতুঃসীমাবচ্ছিন্নঃ বাল্লহিট্টাগ্রামঃ শ্রীবৃষভ-শঙ্কর-নলিন-সবাস্তু-নালখিলাদিভিঃ কাকত্রয়াধিকচত্বারিংশদুন্মানসমেত-আকনবদ্রোণোত্তর-সপ্তভুপাটকাত্মকঃ প্রত্যব্দং কৰ্পৰ্দকপুরাণপঞ্চশতোৎপত্তিকঃ সঝাটবিটপঃ সগর্তোষরঃ সজলস্থলঃ সগুবাকনারিকেরঃঋ সহৃদশাপরাধঃ পরিহৃতসৰ্ব্বপীড়ঃ তৃণযুতি৫ গোচরপৰ্য্যন্তঃ অচট্টভট্টপ্রবেশঃ অকিঞ্চিৎ-প্রগ্রাহ্যঃ সমস্তরাজ-ভোগ্য-কর-হিরণ্য-প্রত্যায়-সমেতঃ।

বরাহদেবশর্মণঃ প্রপৌত্রায় ভদ্রেশ্বর দেবশর্মণঃ প্রৌত্রায়লক্ষ্মীধর দেবশর্মণঃ পুত্রায় ভরদ্বাজসগোত্রায় ভরদ্বাজাঙ্গিরস-বাৰ্হস্পত্য-প্রবরায় সামবেদ-কৌথুমশাখা চরণানুষ্ঠায়িনে২৩ আচাৰ্য্যশ্রী ওবাসুদেবশর্মণে অস্মতৃ-শ্রীবিলাসদেবীভিঃ সুরসরিতি সুৰ্যোপরাগে দত্তহেমাশ্ব-মহাদানস্য দক্ষিণত্বেননাৎসৃষ্টঃ মাতাপিত্রোরাত্মনশ্চ পুণ্যযশোহভিবৃদ্ধয়ে আচার্কং ক্ষিতিসমকালং যাবৎ ভূমিচ্ছিদ্ৰন্যায়েন তাম্ৰশাসনীকৃত্য প্রদত্তোহপ্যাভিঃ।

অতো ভবদ্ভিঃ সর্বৈরেবানুমন্তব্যং ভাবিভিরপি ভূপতিভিরপহরণে নরকপাতভয়াৎ পালনে ধৰ্ম্মগৌরবাৎ পালনীয়ং। ভবন্তি চাত্র ধর্মানুশংসিনঃ শ্লোকাঃ।

বহুভির্বসুধা দত্তা রাজভিস সগরাদিভিঃ।২৪ যস্য যস্য যদা ভূমি স্তস্য তস্য তদা ফলং। ভূমিং যঃ প্রতিগৃহ্নাতি যশ্চ ভূমিং প্রযচ্ছতি। উভৌ তৌ পুণ্যকর্মাণৌ নিয়তং স্বর্গগামিনৌ।.

আস্ফোটয়ন্তি পিতরো বল্লয়ন্তি২৫ পিতামহাঃ। ভূমিদাতা কুলে জাতঃ স ন স্ত্রাতা ভবিষ্যতি৷৷ যষ্টিং বর্ষসহস্রাণি স্বর্গে তিষ্ঠতি ভূমিদঃ। আক্ষেপ্তা চানুমন্তা চ তানেব নরকং ব্রজেৎ৷৷ স্বদত্তাং পরদত্তাম্বা যা হরেত বসুন্ধরাং। স বিষ্ঠায়াং কৃমি ভূর্বা পিতৃভিঃ সহ পচ্যতে। ইতি কমলদলাম্বুবিন্দুলেলাং শিয় মনুচিন্ত্য মনুষ্যজীবিতঞ্চ। সকলমিদ মুদাহৃতঞ্চ বুদ্ধা নহি পুরুষেঃ পরকীৰ্তয়ো বিলোপ্যাঃ। জিতনিখিলক্ষিতিপালঃ শ্রীমদ্বল্লালসেনভূপালঃ।

ওবাসু শাসনে কৃতদূতং হরিঘোষ-সান্ধিবিগ্রহিকম। সং ১১ বৈশাখাদিনে ১৬ শ্ৰী–নি৷৷ মহাসাং করণ নি।২৬

সাহিত্য, কার্তিক, ১৩১৮

তথ্যসূত্র

১ J.A.S.B. Vol. LXII, p. 57.

২ Epigraphia Indica, Vol, IV, p. 249.

৩ They were most probably a relic of the invasion of Bengal by Rajendra Chola and owed their territorial possessions to that monarch.

– J.A.S.B. New Series Vol. V, P. 496.

৪-৫ শার্দুল-বিক্ৰীড়িত।

৬ মন্দাক্রান্তা।

৭ সগ্ধরা।

৮ আৰ্য্যা।

৯ সুন্ধরা

১০ বসন্ততিলক।

১১ স্নগ্ধরা। এই শ্লোকের পাঠোদ্ধারে পরিষৎ-পত্রিকায় “লোলাঃ” শব্দের বিসর্গ পরিত্যক্ত হইয়াছে।

১২-১৫ বসন্ততিলক। নবম কবিতার “কার্তবীর্যঃ” পরিষৎ-পত্রিকায় “কাৰ্ত্তবীৰ্য্যঃ” রূপে মুদ্রিত হইয়াছে।

১৬ শার্দুল-বিক্ৰীড়িত।

১৭ শিখরিণী।

১৮ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় মুদ্রাকর প্রমাদে “পাদানুধ্যাৎ” মুদ্রিত হইয়াছে।

১৯ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় “সমুপগত” শব্দ “সমুপাগত” রূপে উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যাত হইয়াছে। তাম্রফলকে “সমুপাগত” শব্দ উৎকীর্ণ নাই।

২০ “গোমহিষাজাবিকাদি” হইবে। তাম্রফলকেও তাহাই আছে।

২১ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় ‘জনপদান” পাঠ উদ্ধৃত হইয়াছে। তাম্রপট্টে প্রথমে তাহাই উত্তীর্ণ হইয়া পরে সংশোধিত হইয়াছিল বলিয়া আকারের একটি ক্ষীণরেখা প্রতিভাত হইতেছে।

২২ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় “তৃণপুতি” মুদ্রিত হইয়াছে।

২৩ “পুত্র” শব্দ “পুত্ৰ” রূপে উৎকীর্ণ আছে। পাণিনি-মতে ‘আক্রোশে” ভিন্ন আর কোনও অর্থে পুত্র শব্দের তকারের দ্বিত্ব হয় না। তাম্রশাসনে পুত্র শব্দের যেরূপ বর্ণবিন্যাস উৎকীর্ণ আছে, তাহাতে বুঝিতে পারা যায়, তৎকালে (পুৎ + ত্রৈ + ড) ব্যুৎপত্তিটি প্রবল হইয়া, প্রকৃত ব্যুৎপত্তি বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছিল।

২৪ সাহিত্যপরিষৎ-পত্রিকায় লিপিকরপ্রমাদে “সুসগরাদিভিঃ” মুদ্রিত হইয়াছে।

২৫ সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় “বম্নয়ন্তি” মুদ্রিত হইয়াছে।

২৬ দলিলখানি বুঝিবার সুবিধার জন্য, পংক্তি অনুসারে উদ্ধৃত না করিয়া বিষয়ানুসারে পৃথক ‘প্যারায়’ পাঠ উদ্ধৃত হইল।

মহামালিক ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসন

বাঙ্গালীর ইতিহাসের সহিত সম্পর্ক সংযুক্ত যে সকল প্রাচীন লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহাতে সাময়িক বিবরণ উল্লিখিত থাকায়, অনেক অজ্ঞাতপূৰ্ব্ব ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশিত হইয়াছে। কিংবদন্তী অপেক্ষা এই সকল প্রমাণ যে অধিক নির্ভরযোগ্য, তাহাতে সংশয় নাই। এই শ্রেণির প্রমাণে জানিতে পারা গিয়াছে,–বাঙ্গালা দেশ যখন পাল নরপালগণের শাসন-কৌশলে পরিচালিত হইত, তখন বাঙ্গালা দেশের চতুঃসীমার বাহিরেও অনেক দূর পর্যন্ত তাঁহাদের শাসন-ক্ষমতার প্রবল প্রভাব অনুভূত হইত। তৎকালে পরাক্রমশালী সামন্তগণ আপন আপন সামন্ত-চক্রে স্বাধীন নরপালের ন্যায় শাসন-ক্ষমতা বিস্তৃত করিয়া, সাৰ্বভৌম নরপালের সহচররূপে মৰ্য্যাদা লাভ করিতেন। সামন্ত সংখ্যা নিতান্ত অল্প ছিল না। ধর্মপালদেবের [খালিমপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে “মহাসামন্তাধিপতি” উপাধিধারী রাজপুরুষের উল্লেখ আছে; সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত” কাব্যে [৪১৮] ‘মণ্ডলাধিপতি”উপাধিধারী এক রাজ-সুহৃদের উল্লেখ আছে; এবং “রামচরিতে”র টীকায় [২। ৮] “মহামাণ্ডলিক” উপাধিধারী কাহ্রদেব নামক রামপালদেবের মাতুল-পুত্রের উল্লেখ আছে। কিন্তু “মহামাগুলিকে”র প্রকৃত পদমর্যাদা ও শাসন-ক্ষমতা কিরূপ ছিল, এ পর্যন্ত সে কৌতূহল চরিতার্থ করিবার উপায় ছিল না।

সৌভাগ্যক্রমে সে কালের এক জন “মহামাগুলিকে’র একখানি তাম্রশাসন বরেন্দ্র-অনুসন্ধান-সমিতির হস্তগত হইয়াছে। তাহা ‘মহামাণ্ডলিক” ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসন। এই শাসনখানি বরেন্দ্রমণ্ডলের অন্তর্গত [দিনাজপুর জেলার] মালদোয়ার নামে সুপরিচিত রাজষ্টেটের দপ্তরখানায় বহুকাল হইতে সযত্নে রক্ষিত হইতেছে; ইহার সহিত মালদোয়ার ষ্টেটের ভূসম্পত্তির সম্পর্ক থাকিবার জনশ্রুতিও প্রচলিত আছে। মালদোয়ার ষ্টেট ১৮৩৩ খৃষ্টাব্দে প্রথম বার কোর্ট-অব-ওয়ার্ডসের অধীন হইবার সময়ে, এই তাম্রশাসনখানিও তালিকাভুক্ত হইয়াছিল। মালদোয়ার ষ্টেটের বর্তমান অধিকারী কুমার শ্রীযুক্ত ছত্রনাথ ও কুমার শ্রীযুক্ত টঙ্কনাথ চৌধুরী বি. এ. এই পুরাতন লিপির প্রতিকৃতি ও পাঠ পণ্ডিত সমাজে প্রকাশিত করিবার অনুমতি দান করিয়া, ইতিহাসানুরাগের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন; এবং বহু রহস্যপূর্ণ বিবিধ ঐতিহাসিক তথ্যের উদ্ধার সাধনের সহায়তা করিয়া, বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতিকে চিরকৃতজ্ঞ করিয়াছেন।

তাম্রশাসনখানির সকল অংশ এক্ষণে বর্তমান নাই; উদ্ধভাগের দক্ষিণাংশের কিয়দংশ এবং নিম্নভাগের দক্ষিণাংশের অল্পাংশ খসিয়া পড়িয়া গিয়াছে। তাহাতে যাহা ক্ষোদিত ছিল, তাহা আর দেখিবার উপায় নাই। কিন্তু বহুপূৰ্ব্বে তৈরভুক্ত পণ্ডিত বাচ্চা ঝা এই তাম্রশাসনের যেরূপ পাঠ মৈথিল-অক্ষরে লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহা এখনও মালদোয়ার রাজষ্টেটের দপ্তরখানায় রক্ষিত হইতেছে। তাহার সকল শব্দ সকল স্থানে মূলানুগত না হইলেও, অধিকাংশ পাঠই শুদ্ধরূপে উদ্ধৃত। যে অংশের অক্ষর এক্ষণে আর দেখিতে পাইবার উপায় নাই, সেই অংশের পাদ-পূরণ-কামনায় পূৰ্ব্বোদ্ধৃত পাঠই বন্ধনীমধ্যে সন্নিবিষ্ট হইবে।

তাম্রপট্টের আয়তন ৯৮ ইঞ্চ। সম্মুখ পৃষ্ঠে ২২ পংক্তি, এবং অপর পৃষ্ঠে ২৫ পংক্তি সংস্কৃত-ভাষা-নিবদ্ধ গদ্যপদ্যাত্মক লিপি উৎকীর্ণ হইয়াছিল। তাহা “৩৫ সম্বতের ১ মার্গদিনে’র লিপি। মালদোয়ারে ইহা ৩৫ বিক্রম-সম্বতের লিপি বলিয়া পরিচিত। বলা বাহুল্য, এই লিপি সেরূপ পুরাতন হইতে পারে না। প্রতিকৃতির প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেই তাহা সুব্যক্ত হইবে।

মহামাগুলিক ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসনের শীর্ষদেশে “শ্রীপরাক্রমমূলস্য” এবং তন্নিম্নে “নি” এই কয়েকটি অক্ষর উৎকীর্ণ আছে, এবং একটি ছত্রের চিহ্নও ক্ষোদিত আছে। ইহাই “মুদ্রা’ ছিল বলিয়া প্রতিভাত হয়। “শ্রীপরাক্রমমূলস্য” শব্দ কাহাকে সূচিত করিতেছে, লিপিমধ্যে তাহা উল্লিখিত নাই। এই শব্দের দক্ষিণ পার্শ্বে ই ছত্র চিহ্ন ক্ষোদিত আছে। তাহা [মহামাগুলিকের পরাক্রমের মূল] সার্বভৌম রাজাধিরাজকে সূচিত করিতেছে কি না, সুধীগণ তাহার বিচার করিবেন।

ঈশ্বর ঘোষের জাতি কি ছিল, তাহার উল্লেখ নাই। তিনি ক্ষত্রিয় ছিলেন বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে, এরূপ আভাসও প্রাপ্ত হওয়া যায় না। তিনি যে কুল অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন, দ্বিতীয় শ্লোকে [চতুর্থ পংক্তিতে] তাহা “ঘোষকুল” বলিয়া উল্লিখিত আছে। তকালে তাহা “পৃথিবীতে প্রথিত” ছিল বলিয়া, জাতির উল্লেখ করিবার প্রয়োজন হয় নাই। পাল-নরপালগণও তাঁহাদিগকে শাসন-লিপিতে জাতির উল্লেখ করেন নাই। কিন্তু তাঁহারা প্রথম শ্লোকে তাঁহাদিগের বৌদ্ধমতানুরক্তির পরিচয় প্রদান করিতেন। ঈশ্বর ঘোষ [তাঁহার তাম্রশাসনের ৩২ পংক্তিতে] ভগবান শঙ্করকে উদ্দেশ করিয়া দান করিবার উল্লেখ করিয়া, শৈব-মতানুরাগের পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন।

এই তাম্রশাসন সম্পাদিত করাইয়া, মহামাণ্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ নিবেবাক শৰ্মা নামক ব্রাহ্মণকে [২৯ পংক্তি] একখানি গ্রাম দান করিয়াছিলেন। মালদোয়ারে জনশ্রুতি আছে,–নিবেবাক শৰ্মা ঈশ্বর ঘোষের গুরুদেব ছিলেন। তিনি দান গ্রহণ করিয়া, তাম্রশাসন সহ গ্রামখানি তাঁহার গুরুদেবের চরণে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। সেই গুরুবংশই মালদোয়ারের রাজবংশ। এই জনশ্রুতি মালদোয়ার-রাজবংশে পুরুষানুক্রমে প্রচলিত আছে। ইহা সত্য কি না, তদ্বিষয়ে কোনও লিখিত প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় নাই।

কোন সময়ে এই তাম্রশাসন সম্পাদিত হইয়াছিল, লিপি-বিচার করিয়াই তাহার মীমাংসা করিতে হইবে;–অন্য উপায় দেখিতে পাওয়া যায় না। যাঁহারা এই শ্রেণির লিপির পুনঃ পুনঃ পরিদর্শন ও পরীক্ষা করিয়াছেন, তাঁহারা ইহার মীমাংসা করিতে পারিবেন। সকল স্থানে অবগ্রহ-চিহ্ন ব্যবহৃত হয় নাই; বর্ণবিন্যাসের ভ্রম প্রমাদ বিরল; সংস্কৃত-রচনাও ব্যাকরণদুষ্ট নহে;-রেফের চিহ্ন মাত্রার উপর দক্ষিণ দিকে অঙ্কিত; ত-কারের আকার প্রণিধানযোগ্য, এবং রেফ-সংযোগে বর্ণের দ্বিত্ব যে ভাবে সাধিত হইয়াছে, তাহাও বিচারযোগ্য এই সকল কারণে, ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসনকে পাল-সাম্রাজের অভ্যুদয়যুগের [খৃষ্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দীর] লিপি বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে। তৎকালে প্রাচ্যভারত পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। সুতরাং ঈশ্বর ঘোষ যে পাল-সাম্রাজ্যের “মহামাগুলিক” ছিলেন, তাহাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া প্রতিভাত হয়।

গৌড়েশ্বরগণের তাম্রশাসন যে ‘জয়স্কন্ধাবার” হইতে প্রদত্ত হইত, তাম্রপট্টে তাহার নাম উৎকীর্ণ থাকিত। ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসনে “জয়স্কন্ধাবার” শব্দের উল্লেখ নাই; কিন্তু যে স্থান হইতে ইহা প্রদত্ত হইয়াছিল, [১০ পংক্তিতে] তাহার নাম উৎকীর্ণ আছে। সেই স্থানের নাম “ঢেক্করী’। পাল-নরপালগণের শাসনসময়ে “ঢেক্করী” একটি “সামন্ত-চক্র” বলিয়া পরিচিত ছিল। “রামচরিতের’র টীকায় [২। ৫] প্রতাপসিংহ নামক এক “ঢেক্করীয়” রাজের উল্লেখ আছে। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এম. এ. “রামচরিতে’র ভূমিকায় ইংরাজীতে “ঢেরীয়” বলিয়া উল্লেখ করিলেও, মূল গ্রন্থের “ঢেক্করীয়” শব্দটি মুদ্রাকর প্রমাদে] গ্রন্থমধ্যে “ডেক্করীয়” রূপে নাগরাক্ষরে মুদ্রিত হইয়াছে। শাস্ত্রী মহাশয় লিখিয়াছেন, কাটোয়ার নিকটবর্তী অজয়নদের অপর তীরে যে ‘ঢাকুরা” নামক স্থান আছে, তাহাই পুরাকালের “ঢেক্করীয়”। “রামচরিতে”র টীকায় কযঙ্গলের রাজা “কযঙ্গলীয়রাজ” রূপে লিখিত থাকায়, ঢেকুরীয়-রাজকেও ঢেরীয় রাজা বলিয়া গ্রহণ করা কর্তব্য। সুতরাং স্থানের নাম “ঢেক্করীয়” না বলিয়া, “ঢেক্করী’’ বলাই সঙ্গত। “ঢেক্করী” ঢেকুরা হইবার পক্ষে যে শব্দ-সাদৃশ্য বর্তমান আছে, কেবল তাহার উপর নির্ভর করিয়া, উভয় স্থানকে এক বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায় না। কিন্তু ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসনের প্রথম শ্লোক হয়ত কিয়ৎপরিমাণে শাস্ত্রী মহাশয়ের সিদ্ধান্তের সমর্থন করিতে পারিবে। এই শ্লোকে ঈশ্বর ঘোষের বৃদ্ধ প্রপিতামহের উল্লেখ আছে; কিন্তু তাঁহার নাম উল্লিখিত নাই। তিনি একজন ‘‘অধিপ” ছিলেন। অক্ষর এখন কিছু অস্পষ্ট হইলেও, [বাচ্চা ঝা মহাশয়ের উদ্ধৃত পাঠের সাহায্যে] বুঝিতে পারা যায়, তিনি “রাঢ়াধিপ” ছিলেন। তাঁহাকে “রাঢ়াধিপ” বলিয়া, তাঁহার পুত্রকে “নৃপবংশকেতু” এবং পৌত্র হইতে অধস্তন। পুরুষগণকে “ঘোষকুল’-সম্ভুত, ও ঈশ্বর ঘোষকে “মহামাণ্ডলিক” বলায়, হয়ত প্রসঙ্গক্রমে এইরূপ ঐতিহাসিক তথ্যের ইঙ্গিত প্রকাশিত হইয়াছে যে–ঈশ্বর ঘোষের উধ্বতন চতুর্থ পুরুষের ব্যক্তি ‘রাঢ়াধিপ” ও স্বাধীন নরপতি ছিলেন; তাঁহার পর হইতে তদীয় বংশধরগণ ‘‘মহামাণ্ডলিক” হইয়াছিলেন; এবং রাঢ়ারাজ্য কালক্রমে পাল-সাম্রাজ্যের একটি “সামন্ত-চক্রে” পৰ্য্যবসিত হইয়াছিল। ইহা অনুমানমাত্র। কিন্তু এই তাম্রশাসনখানি অনেক নিঃসন্দিগ্ধ ঐতিহাসিক তথ্যেরও আধার। ইহার প্রধান কথাই “ঘোষকুলে”র কথা,–সেই কুলের লোক এক সময়ে “রাঢ়াধিপ”, এবং উত্তরকালে “মহামাণ্ডলিক” ছিলেন। এখন তাহার কিংবদন্তীও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। “রাঢ়াধিপ” থাকিবার সময়ে পদমর্যাদা কিরূপ ছিল, তাহা জানিবার উপায় নাই। কিন্তু “মহামাণ্ডলিক” ঈশ্বর ঘোষের পদমর্যাদা বড়ো অল্প ছিল না। তাঁহার আজ্ঞা অশেষ রাজরাজন্যকগণকে পালন করিতে হইত। তাঁহারও সামন্ত সহচর ছিল; তাঁহার অধীনেও “বিষয়পতি” ও “ভুক্তিপতি” ছিল; তাঁহারও কোট্ট [দুর্গ] ছিল; সেনাপতি-কোট্টপতি ছিল;–এক জন রাজাধিরাজের প্রবলপ্রতাপ-বিজ্ঞাপক যে সকল “রাজপাদোপজীবী” থাকিত, মহামাগুলিক ঈশ্বর ঘোষেরও সেই সকল “রাজপাদোপজীবী” ছিল। ঈশ্বর ঘোষকে কায়স্থ বলা যায় কি না, এবং আদিশূরের আমন্ত্রণে পঞ্চব্রাহ্মণের সঙ্গে যাঁহারা কান্যকুজ হইতে আসিয়াছিলেন বলিয়া জনশ্রুতি প্রচলিত আছে, ঈশ্বর ঘোষকে তাঁহাদিগের বংশধর বলা যায় কি না? বলিতে পারিলে, আদিশূরকে কোন শতাব্দীতে স্থান দিতে হইবে? এই সকল কথার বিচার করিবার প্রয়োজন উপস্থিত হইবে। কুলশাস্ত্র-লেখকগণ বাঙ্গালার কায়স্থগণকে ‘শূদ্রবংশজ” বলিয়া যে ‘ত্রিবর্ণসেবক” মৰ্য্যাদা দান করিয়া গিয়াছেন, প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালার পূর্ধ্বতন কায়স্থগণের তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আভিজাত্য-মৰ্য্যাদা বৰ্তমান ছিল কি না, তাহার রহস্যভেদে সমর্থ হইলে, ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসন বাঙ্গালীর ইতিহাসকে এক নূতন আলোকে উদ্ভাসিত করিবে। যাঁহারা সে বিচারে প্রবৃত্ত হইবেন, এবং প্রবৃত্ত হইবার যোগ্য পাত্র, তাঁহাদিগের অবগতির জন্য “মহামাণ্ডলিক” ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসনের প্রতিকৃতি-সংযুক্ত পাঠ ও সঠিক বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হইতেছে।

মণ্ডল’ শব্দ হইতে ‘মহামাগুলিক’ শব্দ [পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। “বিশ্বে” মণ্ডল-শব্দের বিবিধার্থ-বিজ্ঞাপনার্থ যাহা উল্লিখিত হইয়াছে, তাহাতে সে কালের ‘মণ্ডল’ নামক বিভাগের কিঞ্চিৎ পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাহা দ্বাদশ রাজক’ নামে কথিত হইত। যথা :

সান্মগুলে দ্বাদশরাজকে চ।
দেশে চ বিম্বে চ কদম্বকে চ৷৷

ভরত অমর-টীকায় ইহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। মেদিনী-কোষেও মণ্ডল ‘দ্বাদশরাজক” বলিয়া উল্লিখিত আছে। মণ্ডলের শাসন-কৰ্ত্তা “মণ্ডলেশ”, ‘‘মণ্ডলাধিপতি”, “মণ্ডলেশ্বর” প্রভৃতি নামে কথিত হইতেন; অভিধানে তাহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। কামন্দকীয় নীতিসারে [৮১ দেখিতে পাওয়া যায়, মণ্ডলাধিপেরও কোষ-দণ্ড-অমাত্য-মন্ত্রি-দুর্গাদি সহায় ছিল। যথা :

উপেতঃ কোষদণ্ডাভ্যাং সামাতঃ সহ মন্ত্রিভিঃ। দুর্গস্থ শ্চিন্তয়েৎ সাধু মণ্ডলং মণ্ডলাধিপঃ৷৷

ইহাতে মণ্ডলাধিপতি “দুর্গস্থ” থাকিয়া, মণ্ডল শাসন করিতেন বলিয়া পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের শ্রীকৃষ্ণ-জন্ম খণ্ডে [৮৬ অধ্যায়ে] দেখিতে পাওয়া যায়,–”মণ্ডলেশ্বরে”র পদমর্যাদা নৃপ-শব্দ-বাচক সাধারণ রাজ রাজন্যকের পদমর্যাদা অপেক্ষা অনেক অধিক ছিল। যথা :

চতুর্যোজনপৰ্য্যন্ত মধিকারং নৃপস্য চ।
যো রাজা তচ্ছতগুণঃ স এব মণ্ডলেশ্বরঃ।

এই বচনের প্রমাণে, মণ্ডলেশ্বরও “রাজ” পদবাচ্য ছিলেন বলিয়াই বুঝিতে পারা যায়; কিন্তু তাঁহার অধিকার সাধারণ “রাজ”-পদবাচ্য ব্যক্তির অধিকার অপেক্ষা শতগুণ অধিক ছিল। ‘মণ্ডলাধিপতিগণ” পরমেশ্বর-পরমভট্টারক রাজাধিরাজের ‘সামন্ত’-মধ্যে পরিগণিত ছিলেন। সে কালের শাসনব্যবস্থায় রাজাধিরাজ “পরম ভট্টারক” ছিলেন; তাঁহার পরেই মণ্ডলাধিপতির স্থান নির্দিষ্ট ছিল।

মাণ্ডলিক-শব্দ এই মণ্ডলাধিপতি শব্দেরই রূপান্তরমাত্র। মধ্যযুগের গৌড়ীয় সাম্রাজ্যে “মালিক” ও “মহামাগুলিক” শব্দ যে সত্য সত্যই প্রচলিত ছিল, “রামচরিত” কাব্যের যে অংশের টীকা প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে, তাহাতে তাহার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। “কয়ঙ্গলীয় মঙ্গলাধিপতি” প্রভৃতি রাজপুরুষগণ [টীকায়] ‘সামন্তাঃ” বলিয়া স্পষ্ট উল্লিখিত থাকায়, বুঝিতে পারা যায়, তৎকালে ‘মগুলাধিপতিগণ” বা “মালিকগণ” রাজাধিরাজের “সামন্ত” মধ্যেই পরিগণিত হইতেন। ‘‘মহামাণ্ডলিক” ঈশ্বর ঘোষও এইরূপ এক জন “সামন্ত” ছিলেন; কাহার “সামন্ত” ছিলেন, তাম্রশাসনে তাহার উল্লেখ নাই। সামন্তগণের স্বাধিকারে, [স্বামিধৰ্ম্মের প্রচলিত নিয়মানুসারে] রাজাধিরাজের “রাজ্যসম্বৎ” প্রচলিত ছিল; কিংবা সামন্তগণের নিজের “রাজ্যসম্বৎ” প্রচলিত ছিল, তাহার মীমাংসা করিবার উপায় নাই।

খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে মাৎস্যনায়” প্রচলিত হইয়াছিল। তারানাথ লিখিয়া গিয়াছেন,–সমগ্র দেশের একচ্ছত্র অধিপতি না থাকায়, সকলেই স্ব-স্ব-প্রধান হইয়া, অরাজকতার প্রশ্রয় দান করিতেছিল। ইহাতে বাহুবলই প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল, সবলের কবলে দুৰ্ব্বল-দল নিপীড়িত হইতেছিল। ধর্মপালের [খালিমপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে এবং তারানাথের গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায়, সেই “মাৎস্যন্যায়” দূর করিবার উদ্দেশ্যে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালদেবকে রাজা নিৰ্বাচিত করিয়াছিল। এইরূপে পালরাজগণের গৌড়ীয় সাম্রাজ্য সংস্থাপিত হইয়াছিল। এই সকল ঐতিহাসিক বিবরণ স্মরণ করিলে মনে হয়, যিনি “মাৎস্যন্যায়ের বিপ্লবযুগে “রাঢ়াধিপ” ছিলেন, তিনি বা তাঁহার “নৃপবংশকেতু’ পুত্র, গোপালদেবের নিৰ্বাচন সময়ে, [দেশের কল্যাণকামনায়] স্বাতন্ত্র পরিত্যাগ করিয়া, “মহামাগুলিক” হইয়া, “সামন্ত-শ্রেণিভুক্ত হইয়াছিলেন। এরূপ অনুমানের অনুকূল স্পষ্ট প্রমাণ প্রাপ্ত না হইলেও, নিঃসংশয়ে বলিতে পারা যায়, এই তাম্রশাসনে ঘোষ-কুলের সহিত বাঙ্গালার ইতিহাসের যেরূপ সম্পর্ক বৰ্ত্তমান থাকা প্রকাশিত হইতেছে, তাহা উল্লেখযোগ্য গৌরবের সম্পর্ক;–একালের ঘোষকুল এ পর্যন্ত যত গৌরব লাভ করিতে পারিয়াছেন, তাহার তুলনায়, অধিক বলিয়াই কথিত হইবার যোগ্য। গৌড়ীয় সাম্রাজ্য দীর্ঘকাল প্রাচ্য ভারতে প্রাধান্য রক্ষা করিয়াছিল। তৎকালে গৌড়জন সাহিত্যে, শিল্পে, বাণিজ্যে ও রাজ্যশাসনে, সৰ্ব্বত্র মৰ্য্যাদা লাভ করিয়াছিল। কেবল এক বর্ণের উন্নতিতে সমগ্র দেশের এরূপ উন্নতি সাধিত হইতে পারিত না। ইতিহাসের অভাবে সে কথা জনশ্রুতি হইতেও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। তজ্জন্য জ্ঞানোজ্জ্বল বিংশ শতাব্দীর অভ্যুদয়েও, সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণ সময়ে সময়ে কিরূপ সিদ্ধান্ত প্রচারিত করিতেছেন, তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত করিলে, ইতিহাসের অভাব সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রধান অভাব বলিয়া অনুভূত হয়। অশেষ শ্রদ্ধাভাজন শ্ৰীযুক্ত শিবনাথ শাস্ত্রী এম. এ. মহোদয় [“ইষ্ট এবং ওয়েস্ট” পত্রিকার প্রথম ভাগের ৪৬৮ পৃষ্টায়] লিখিয়াছেন :

We are already turning for inspiration and guidance not to the hereditary priests of the people or their descendants, but to our Pauls and Sarkars, our Dasses and Ghoses, our Boses and Mitras, men sprung from the lower castes, whose ancestors did not occupy an enviable position in ancient Hindu Society.

সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্য ও ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসন, আধুনিক শিক্ষিত সমাজের এইরূপ ধারণা কিয়ৎপরিমাণে দূর করিতে পারিলে, বাঙ্গালীর পুরাতত্ত্ব বাঙ্গালীর শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতে পারিবে। ইংরেজী শিক্ষার স্পর্শমণি-সংস্পর্শে আমাদের পাল-সরকার-দাস-ঘোষ-বসু-মিত্র মহোদয়গণ হঠাৎ সুবর্ণত্ব লাভ করিয়াছেন বলিয়া বর্ণনা করিলে, রচনালালিত্য উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতে পারে, কিন্তু বাঙ্গালীর পুরাতত্ত্ব ক্ষুণ্ণ হইয়া পড়ে। গুণগ্রাহী প্রাচীন সমাজ গৌড়কবি সন্ধ্যাকর নন্দীকে ‘কলিকাল বাল্মীকি” উপাধি প্রদান করিয়াছিল; সন্ধ্যাকরের পিতা প্রজাপতি নন্দীকে ‘সান্ধিবিগ্রহিকে”র উচ্চপদ প্রদান করিয়াছিল, এবং ঘোষকুলোদ্ভব “মহামাণ্ডলিক” ঈশ্বর ঘোষকে রাজাধিরাজের দক্ষিণ বাহুর ন্যায় রাজ্যশাসনের ক্ষমতা প্রদান করিয়াছিল; বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ‘‘ভার্গব সগোত্র-যমদগ্নি-ঔৰ্ব্ব-চ্যবন-আপ্নবান” প্রবর যজুৰ্ব্বেদাধ্যায়ী ভট্টশ্রীনিবেবাক শৰ্মা ঈশ্বর ঘোষের মাতাপিতার ও নিজের পুণ্যযশোভিবৃদ্ধি কামনায় উৎসর্গীকৃত ভূমিদান গ্রহণ করিয়া, সমসাময়িক হিন্দুসমাজের সম্মুখে “ঘোষকুলে”র সামাজিক আভিজাত্যের সাক্ষ্যদান। করিয়াছিলেন। এ সকল বিবরণ সেকালের সামাজিক পদমর্যাদা-সম্ভোগের সংশয়শূন্য ঐতিহাসিক প্রমাণ। তাহার তুলনায় একালের পদগৌরব আধুনিক শিক্ষাসত অজ্ঞাতপূর্ব অভিনব গৌরব বলিয়া কথিত হইতে পারে কি না, পাল সরকার-দাস-ঘোষ-বসু-মিত্র-মহোদয়গণ তাহা ব্যক্ত করিতে পারিবেন। তাঁহাদিগের পূর্ধ্বতন অবস্থা সম্বন্ধে আধুনিক রচনায় যে সকল কথা অবলীলাক্রমে উল্লিখিত হইয়া থাকে, তাহা বাঙ্গালীর ইতিহাসের প্রচ্ছন্ন অপবাদ, সমগ্র হিন্দুসমাজের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অভিযোগ। ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসন তাহার কথঞ্চিৎ প্রত্যুত্তর প্রদান করিতে পারিবে; এবং গৌড়-গৌরবযুগের যে সকল লিপি-প্রমাণ আবিষ্কৃত হইয়াছে, তন্মধ্যে স্থান লাভ করিতে পারিবে। রামগঞ্জে প্রাপ্ত বলিয়া ইহা “রামগঞ্জ লিপি’ নামে অভিহিত হইল।

সাহিত্য, বৈশাখ, ১৩২০

তথ্যসূত্র

১ Pratapa Sinha, the king of Dhekhariya or Dhekura on the other side of the river Ajaya near Katwa.–Ramacharita, Introduction. p. 14.

২ মহামাণ্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ (৩১ পংক্তি) ‘‘জটোদায়াং স্নাত্বা” এই তাম্ৰশাসনোক্ত ভূমি দান করিয়াছিলেন। “জটোদা” শব্দটিতে লিপিকরপ্রমাদ না থকিলে, তাহাই ঢেক্করী নামক স্থানের নিকটবর্তিনী নদী ছিল বলিয়া প্রতিভাত হইবে, এবং তাহার সাহায্যে ঢেক্করীর প্রকৃত ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণীত হইতে পারিবে। পক্ষান্তরে, ‘জটোদা” অজয়ের পুরাতন নাম হইলে, অথবা “জটোদায়াং,” লিপিকরপ্রমাদে “জটোয়ায়াং” সূচিত করিতে পারিলে, তাহাকে গঙ্গার নামান্তর বলিয়া গ্রহণ করিয়া, ঢেক্করীকে অজয়তীরবর্তী ঢাকুরা বলা চলিতে পারে। ঢেক্করী কোথায় ছিল, তাহা নিঃসংশয়ে নির্ণীত হইতে না পারিলেও, তাহার সহিত রাঢ়া-মণ্ডলের সম্পর্ক ছিল বলিয়াই আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়।

৩ গৌড়রাজমালা।

৪ গৌড়লেখমালা।

ঈশ্বর ঘোষের তাম্রশাসন

[প্রশস্তি-পাঠ]

১ ওঁ * নি স্বস্তি বভূব রাঢ়াধিপলব্ধজন্মা তি [গ্নাংশু-চণ্ডো নৃপবংশ]

২ কেতুঃ। শ্রীধূর্ভোঘোষো নিশিতাসিধারা– নিৰ্ব্বা [পিরিব্রজ-গৰ্ব্ব-]

৩ লেশঃ। আসীত্ততোপি সমর ব্যবসায়সার বি [সূৰ্জিতাসি–কুলি–]

৪ শ-ক্ষত-বৈরিবগর্গঃ। শ্রীবালঘোষ ইতি ঘোষ-কু [লাজজাতমাৰ্ত্ত-]

৫ গু-মণ্ডলমিব প্রথিতঃ পৃথিব্যাং।২ তস্যাভবদ্ধবলঘোষ [ইতি প্রচ-]

৬ দণ্ডঃ সুতো জগতি গীত-মহাপ্রতাপঃ।
যেহেন যোধ-তি [মিরৈক-]।

৭ দিবাকরেণ বজ্রায়িতং প্রবল-বৈরি কুলাচলেষু। ভবানীবাপরা মূৰ্ত্তা সীতে [ব চ পতি-]

৮ ব্রতা।
সদ্ভাবা নাম তস্যাভুদ ভাৰ্য্যা পদ্মেব শার্জিণঃ।
তস্যা ঈশ্বর ঘোষ এষ তনয়ঃ [সপ্তাংশু-]

৯ ধামা জয় ত্যেকো দুর্ধর-সাহসঃ কিমপরং কাত্যা জিতেন্দ্রদ্যুতিঃ। যস্য প্রোর্জিত-শৌর্যনিজ্জিত-রিপোঃ [প্রৌ-]

১০ ঢ়-প্রতাপশ্রুতে রাস্য স্বাষ্পজল-প্রণালমলিনং শত্ৰুস্ত্রিয়ো বিভ্রতি।৫ স খলু ঢেকুরীতঃ। মহামাণ্ডলিকঃ

১১ শ্ৰীমদীশ্বরঘোষঃ কুশলী পিপিেল্ল-মণ্ডলান্তঃপাতি-৭ গাল্লিটিপ্যক-বিষয়-সম্ভোগ-দিগ ঘা সোদি

১২ কা-গ্রামে সমুতগশেষ-রাজ। রাজন্যক। রাজ্ঞী। রাণক। রাজপুত্র-কুমারামাত্য। মহাসান্ধিবিগ্র

১৩ হিক মহাপ্রতীহার-মহাকরণাধ্যক্ষ-মহামুদ্ৰাধিকৃত মহা আক্ষপটলিক-৮ মহাসৰ্বাধিকৃত

১৪ মহাসেনাপতি-মহাপাদমূলিক-মহাভোগপতি মহাতন্ত্ৰাধিকৃত-মহাব্যুহপতি-মহাদণ্ডনায়

১৫ ক মহাকায়স্থ-মহাবলাকোষ্ঠিক ৯-মহাবলাধিকরণিক মহাসামন্ত-মহাকটকঠকুর-১০–অঙ্গিকর

১৬ ণিক-দাপাণিক-১১- কোট্রপতি-হট্টপতি ভুক্তিপতি-বিষয়পতি-ঐন্ধিতাসনিক-১২-অন্তঃ প্রতীহার-দ [৩]

১৭ পাল-খণ্ডপাল দুঃসাধ্যসাধনিক-চৌরোদ্ধরণিক উপরিক-তদানিযুক্তক-আভ্যন্তরিক-বাসাগা-১৩

১৮ রিক-খড়গগ্রাহ-শিরোরক্ষিক-বৃদ্ধধানুষ্ক-একসরক খোলদূত-গমাগমিক-লেখ ০০০০০০^১৪

১৯ ষণিক-পানীয়াগারিক-সান্তকিকর্মকর-গৌল্কিক-শৌল্কিক হস্ত্যশ্বোষ্ট্রনৌবলব্যাপৃতক-গো

২০ মহিষ্যজাবিকবড়বাধ্যক্ষাদি-সকলরাজপাদোপজীবি
নোইন্যাংশ্চ চাটভটজাতীয়ান স [কর-]

২১ ণ-ব্রাহ্মণমাননাপূৰ্ব্বকং১৫ মানয়তি বোধয়তি সমাদিশতি চ বিদিতমতমস্তু ভবতাং গ্রামো

২২ য়ং চতুঃসীমাপৰ্য্যন্তঃ স্বসম্ভোগসমেতঃ সজলস্থলঃ সোদ্দেশঃ সগর্তোষরঃ সাম্র [মধু-]

২৩ কঃ সগোকুলঃ স [শাদ্ব] ল

২৪ বিটপলতান্বিতঃ সহট্র-প

২৫ ট্র সতরু জকল্যভাব্য

২৬ দ্বারিকাদি সমস্তক্ষিতি

২৭ পরিহৃতসৰ্ব্বপীড়ঃ আচটভটপ্রবেশঃ
অকিঞ্চিৎকরপ্রগ্রা

২৮ [হ্য আচার্কতারক্ষিতি-সমকালং যাবৎ। বিন (নি) গর্তায়

২৯ ভট্ট। শ্রীবাসুদেবপুত্ৰায় ভট্টশ্রীনিবেবাকশৰ্ম্মণে ভার্গবসগোত্রায়

৩০ য-] মদগ্নি-ঔৰ্ব্ব-আপ্নবান-প্রবরায় আপ্নবান ঔৰ্ব্ব-যামদগ্ন-চ্যবন-ভা…

৩১ যজুৰ্ব্বেদা আধ্যায়িনে১৬মার্গসংক্রান্তেী জটোদায়াং (জটোয়ায়াং?) স্নাত্বা তিলদৰ্ভপবিত্র ৩২ পূৰ্ব্বকং ভগবন্তং শঙ্করভট্টারকমুদ্দিশ্য মাতাপিত্রোরাত্মনশ্চ পুণ্যযশোভিবৃদ্ধয়ে

৩৩ [তাম্র-] শাসনীকৃত্য প্রদত্তোহপ্যাভিঃ। অতঃ প্রতিপালনে মহাফলদর্শনাৎ অপহরণে ম

৩৪ [হা-নর] কপতন-ভয়াৎ সর্বৈরেব দানমিদনুমন্তব্যং প্রতিবাসিভিঃ ক্ষেত্ৰকরৈশ্চাজ্ঞাশ্রবণবিধে

৩৫ [য়ী] ভূয় যথাদীয়মান-করাদি-সমস্ত-প্রত্যাহোপনয়ঃ কাৰ্য ইতি। ভবান্ত চাত্র ধর্মানুসং (শং) সি

৩৬ নং শ্লোকাঃ।
বহুভিৰ্ব্বসুধা দত্তা রাজভিঃ সগরাদিভিঃ। যস্য যস্য যদা ভূমি স্তস্য তস্য তদা

৩৭ ফলং [] ভূমিং যঃ প্রতিগৃহ্নাতি যশ্চ ভূমিং প্রযচ্ছতি। উভৌ তৌ পুণ্যকর্মাণৌ নিয়তং স্বগর্গগামিনে।

৩৮ সৰ্ব্বেষামেব দানানাং একজনুগং ফলং [1]
হাটক-ক্ষিতি-গৌরীণাং সপ্তজন্মানুগং ফলং৷৷
বষ্টিং১৭।

৩৯ বর্ষসহস্রাণি স্বগের্গ মোদতি ভূমিদঃ [1] আক্ষেপ্তা চানুমন্তাচ তান্যে নরকং বসেৎ [] গা

৪০ মেকাঃ সুবর্মমেকং ভূমেরপ্যেকমঙ্গলং [1] হরন্নরক মায়াতি যাবদাহুতি সংপ্লবং []১৮ অন্যদত্তাং

৪১ দ্বিজাতিভ্যো যত্নদ্ৰক্ষ যুধিষ্ঠির। মহীং মহীভুজাং শ্রেষ্ঠ দানচ্ছুেয়োনুপালনং। স্বদত্তাং প

৪২ রদত্তাং বা যো হরে দ্বসুন্ধরাং ১৯। স বিষ্ঠায়াং কৃমি ভূত্বা পিতৃভিঃ সহ পচ্যতে। বাপীকৃপ-স।

৪৩ হস্রেণ অশ্বমেধ-শতেন চ। গবাং-কোটিপ্রদানেন ভূমিহর্তা ন শুধ্যতি৷৷ সৰ্ব্বানে

৪৪ তান ভাবিনঃ পার্থিবেন্দ্র (ন্দ্রা) ন। ভূয়োভূয়ঃ প্রার্থয়ত্যেষ রামঃ [। ] সামান্যোয়ং ধর্মসেতু—

৪৫ পানাং কালে কালে পালনীয়ঃ ক্ৰমেণ। ইতি কমলদলাম্বু বিন্দুলেলাং
শিয় মনুচি

৪৬ [ম] নুষ্য-জীবিতঞ্চ। সকলমিদ মুদাহৃতঞ্চ বুদ্ধা ন হি পুরুষেঃ পরকীৰ্তয়ো বিলোপ্যা। ই–

৪৭ [তি] সম্বৎ ৩৫ মার্গ দিনে [১]

[বঙ্গানুবাদ]

রাঢ়াদেশের অধিপতির পুত্র নৃপবংশকেতু ধূৰ্ত্ত ঘোষ [তিস্মাংশুচণ্ডঃ]। সূর্যের ন্যায় প্রচণ্ড প্রতাপশালী ছিলেন; তাঁহার শাণিত অসিধারায় অরিকুলের গৰ্ব্বলেশ নিৰ্বাপিত হইয়া গিয়াছিল।

তাঁহা হইতে শ্রীবাল ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার সমরব্যবসায়-সার বিস্ফুজ্জিত তরবারিরূপ বজ্রের আঘাতে বৈরিবর্গ ক্ষতবিক্ষত হইত। তিনি ঘোষ কুল-কমল-সমূহের পক্ষে [আনন্দদায়ক] মার্তণ্ডমণ্ডল বলিয়া পৃথিবীতে প্রথিত হইয়াছিলেন।

তাঁহার ধবল ঘোষ নামে পুত্র জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রচণ্ডদণ্ড ছিলেন বলিয়া তাঁহার প্রতাপ পৃথিবীতে গীত হইয়াছিল। তিনি [শ] সেনা-তিমির-বিনাশী দিবাকরতুল্য ছিলেন; বৈরিকুল পৰ্ব্বতের পক্ষে বজ্রের ন্যায় প্রতিভাত হইতেন।

ভবানীর অপরা মূর্তির ন্যায়, সীতার ন্যায় পতিব্রতা, এবং (শাঙ্গীর) বিষুদায়িতা লক্ষ্মীর ন্যায় তাঁহার সদ্ভাবা নাম্নী ভাৰ্য্যা ছিলেন।

সেই ভাৰ্য্যার গর্ভে এই পুত্র ঈশ্বর ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সুর্যের ন্যায় বীৰ্য্যসম্পন্ন ছিলেন। তাঁহার অত্যন্ত সাহস ছিল, অধিক কি বলিব, কান্তিপ্রভায় তিনি ইন্দ্রের কান্তিদ্যুতিকে পরাভূত করিয়াছিলেন। সেই শৌৰ্যনিজ্জিতরিপু সুবিখ্যাত প্রতাপশালী বীরবরের প্রতাপে শত্রুরমণীগণ বাম্পজলমলিন বদনমণ্ডল ধারণ করিতেন।

[গদ্যাংশ সরল বলিয়া অনূদিত হইল না।]

সাহিত্য, জ্যৈষ্ঠ, ১৩২০

তথ্যসূত্র

১-২ ওঁকার বিজ্ঞাপক চিহ্নমাত্রই উত্তীর্ণ আছে। ১-২ ইন্দ্ৰবজ্রা। দ্বিতীয় শ্লোকের শেষে “পৃথিব্যাম” স্থলে “পৃথিব্যাং” উৎকীর্ণ আছে। “জাত” শব্দটি সমূহার্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।

৩ বসন্ততিলক। বাচ্চা ঝা “দণ্ড’কে “চণ্ড” বলিয়া এবং “যোধ’কে “যৌধ” বলিয়া পাঠ করিয়া গিয়াছেন।

৪ অনুষ্ঠুভ।

৫ শার্দুল-বিক্ৰীড়িত।

৬ ২১ পংক্তিতে [মানয়তি বোধয়তি সমাদিশতি] ক্রিয়াপদ উল্লিখিত আছে।

৭ মণ্ডলের নাম বাচ্চা ঝা কর্তৃক উদ্ধৃত হইবার সময়ে পকার যকার রূপে, এবং “সোদিকা” শব্দ “সাঢ়িকা” রূপে পঠিত হইয়াছিল।

৮ ‘মহাক্ষপটলিক’ পাঠ করিতে হইবে।

৯ এরূপ রাজপাদোপজীবীবর নাম পালরাজগণের তাম্রশাসনে অপরিচিত।

১০ বাচ্চা ঝা ঠকার পাঠ করিতে পারেন নাই।

১১ “দাপাশিক’ শব্দের স্থলে “দাপাণিক” আছে।

১২ বাচ্চা ঝা “ঔন্ধিতাসনিক” পাঠ উদ্ধৃত করিয়া গিয়াছেন। ৩০ পংক্তিতে দুইবার ঔকার যে ভাবে উৎকীর্ণ আছে, তাহার সহিত এই শব্দের ঔকারের আকৃতিগত পার্থক্য আছে।

১৩ “বাসাগারিক শব্দ” পালরাজগণের তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায় না।

১৪ এই স্থানের কয়েকটি অক্ষর অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে।

১৫ বাচ্চা ঝা “সচরণ-ব্রাহ্মণমাননাপূৰ্ব্বকং” পাঠ উদ্ধৃত করিয়া গিয়াছেন। ২০. পংক্তিতে স অক্ষরের পর ক-অক্ষরের কিয়দংশমাত্র বর্তমান আছে; ২১. পংক্তির প্রথমেই মুণ্য ণকার; ব্রাহ্মণ-শব্দের সহিত সমাস-নিবদ্ধ এই শব্দটি ‘সকরণ’ বলিয়াই প্রতিভাত হয়। ধর্মপালের [খালিমপুরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে “ব্রাহ্মণমাননাপূৰ্ব্বক” আছে; পরবর্তী পাল নরপালগণের শাসনে তাহা নাই। “সকরণব্রাহ্মণমাননাপূৰ্ব্বকং” পাঠ যুক্তিযুক্ত হইলে, ঈশ্বর ঘোষ জাতিতে “করণ’ ছিলেন বলিয়াই প্রতিভাত হয়।

১৬ “যজুৰ্ব্বেদাধ্যায়নে’ পাঠ করিতে হইবে।

১৭ এই একটিমাত্র স্থলে অনুস্বার-চিহ্ন প্রচলিত বাঙ্গালা চিহ্নের ন্যায় উত্তীর্ণ রহিয়াছে; অন্যন্য স্থলে মাত্রার উপরে বিন্দু ক্ষোদিত আছে।

১৮ এই শ্লোক-ধৰ্ম্মপালের এবং দেবপালের তাম্রশাসনে উদ্ধৃত হয় নাই। প্রথম মহীপালদেবের [বাণগড়ে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনে ইহা দেখিতে পাওয়া যায় : তাহাতে “স্বর্ণমেকঞ্চ” এবং “ভূমেরপ্যৰ্দ্ধমঙ্গুলং” পাঠ উদ্ধৃত আছে।

১৯ “যো হরেত বসুন্ধরা” এই পাঠ পরিত্যক্ত হওয়ায় ছন্দোভঙ্গ ঘটিয়াছে। ইহা লিপিকর-প্রমাদ বলিয়াই বোধ হয়।

মন্তব্য করুন

Don`t copy text!