গল্প রচনা

দ্রবময়ীর কাশীবাস

0

দ্রবময়ীর কাশীবাস

দু-দিন থেকে জিনিসপত্র গুছোনো চলল। পাড়ার মধ্যে আছে মাত্র তিনঘর প্রতিবেশী—কারো সঙ্গে কারো কথাবার্তা নেই। পাড়ার চারিধারে বনজঙ্গল, পিটুলিগাছ, তেঁতুলগাছ, বাঁশঝাড়, বহু পুরোনো আম-কাঁঠালের বাগান। দ্রব ঠাকরুনের বাড়ির চারিধার বনে বনে নিবিড়, সূর্যের আলো কস্মিনকালে ঢোকে না, তার ওপর বাড়ির সামনে একটা ডোবা, বর্ষার জলে টইটম্বুর, দিনরাত ‘ষাঁকো’ ‘ষাঁওকো’ ব্যাঙের একঘেয়ে ডাক, দিনেরাতে মশার বিনবিনুনি।

দ্রব ঠাকরুনের নাতি বললে—ঠাকুমা, সাবু আছে ঘরে, না বাজার থেকে আনব?

দ্রব ঠাকরুনের কণ্ঠস্বর অতি ক্ষীণ শোনাল, কারণ আজ দু-মাসকাল তিনি ম্যালেরিয়ায় ভুগছেন—পালাজ্বর, ঘড়ির কাঁটার নিয়মে তা আসবে একদিন অন্তর অন্তর ঠিক বিকেল বেলাটিতে। দ্রব ঠাকরুন পুরোনো কাঁথা-লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়বেন, উঃ-আ : করবেন—জ্বরের ধমকে ভুল বকবেন।

ও বাড়ির নঠাকরুন এসে জিজ্ঞেস করবেন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে—বলি ও দিদি, অমন করচ কেন? জ্বর এল নাকি?

—আর ন-বউ! মলেই বাঁচি! নিত্যি জ্বর, নিত্যি জ্বর—ওরে, হাত-পা কী কামড়ানটা কামড়াচ্চে!…একটু উঠে হেঁটে বেড়াতে দেবে না—এ কী কাণ্ড, হ্যাঁ গা?

পরে মিনতির সুরে বলবেন—ও ন-বউ, নক্ষী দিদি, শীত তো আজ ভাঙল না, কাঁথা গায়ে দিইচি, নেপ গায়ে দিইচি—তুমি ওই বাঁশের আলনার পুরোনো তোশকটা পেড়ে আমার গায়ে যদি দিয়ে দ্যাও–

—চেপে ধরব, হ্যাঁ দিদি?

—ধ—রো–ন-বউ—চেপে ধ-রো—আমার হয়ে গেল!

–ভয় কী, অমন ক’রো না, ছিঃ। টেবু আসবে চিঠি পেলেই, কানু আসবে, বিন্দে আসবে—তোমার নাতিরা বেঁচে থাক, অমন সোনার চাঁদ নাতি সব, ভাবনা কী তোমার দিদি?

—কে-উ-আ-মা-কে—দেখে–না—ন-বউ—

—কেন দেখবে না দিদি—সবাই দেখবে। তুমি বেশি বোকো না, চুপটি করে শুয়ে থাকো–

—আমার গো-রু! গো-রু উ-ও-র-মা-ঠে—

—কোথায় গোরু দিয়ে এসেছিলে?

—জ-টে গ-য়-লা-র অ-ডু-ল খে-তে-র পাশে–

—আচ্ছা আমি এনে দেব এখন গোরু। আমারও গোরু রয়েচে জটে গোয়ালার জমির কাছেই। তুমি শুয়ে থাকো।

আরও ঘণ্টাখানেক পরে বৃদ্ধা ন-ঠাকরুন আবার এসে জানালায় দাঁড়িয়ে বললেন—কম্প থেমেছে দিদি?

ক্ষীণস্বরে লেপ-কাঁথার ছেড়া ভ্রুপের মধ্যে থেকে জবাব এল—গোরু! আমার গোরু তো—

—কোনো ভয় নেই। সে আমি এনেচি। কম্প থেমেচে?

—হুঁ।

 

সারা বর্ষা দ্রবময়ী এমনি ম্যালেরিয়ায় ভোগেন। তাঁর বড়ো নাতি শ্রীশচন্দ্র ওরফে টেবু কাজ করে ইছাপুরে বন্দুকের কারখানায়, মেজো নাতি পাকশীতে ই. বি. আর.-এ–ছোটো নাতিও ওদিকে যেন কোথায় থাকে। বড়ো নাতি ছাড়া অন্য দুটি অবিবাহিত, বড়ো নাতির আবার একটি ছেলে হয়েছে। আজ বছর পাঁচ-ছয় আগে নাতি ছেলে-বউ নিয়ে বাড়ি এসে দিনসাতেক ছিল। নাতবউ মনোরমা হুগলি জেলার মেয়ে, সে এখানে এসে নাকসিঁটকে থাকে, ‘বাড়ি তো ভারি, মোটে একখানা চালাঘর, হেঁচার বেড়া, এমনিধারা জঙ্গল যে দিনমানেই বুনো শূয়োর লুকিয়ে থাকে—মশার তো ঝাঁক! মাগো, কী কাদা ঘাটের পথে! এখেনে কী মানুষ থাকে নাকি?’ মনোরমার খাঁড়ার মতো নাক আরও উঁচু ও তীক্ষ হয়ে ওঠে। সাতদিন পরে দ্রবময়ীকে নাতির ছেলে খোকনমণির মায়া কাটাতে হয়। তাঁর চোখের জলে বুক ভেসে যায়।

ন-ঠাকরুনকে বলেন—সুদের সুদ, ও যে কি মিষ্টি তা তোমাকে কী বোঝাব ন বউ—

দ্রবময়ীর আকুল ক্রন্দনের মধ্যে যে কতকালের পিপাসিত প্রতীক্ষা সুদূর ভবিষ্যতের দিকে নিষ্পলকে চেয়ে আছে, স্বামীহীনা বন্ধ্যা বিধবা ন-ঠাকরুন তা বুঝতে না-পেরে কেমন অবাক হয়ে যান, হয়তো বা-ভাবেন—দিদির সবই বড়াবাড়ি!

ন-ঠাকরুন আপনার জন কেউ নয়—পাড়ার পাশের বাড়ির প্রতিবেশিনীমাত্র। বছরের মধ্যে গড়ে তিন-চার মাস দুই বৃদ্ধার মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়, মুখ দেখাদেখি থাকে না—তবুও ঝগড়া কেটে গেলে পাড়ার মধ্যে একমাত্র ন ঠাকরুনই দ্রবময়ীকে দেখাশোনা করেন সবচেয়ে বেশি, জ্বরে শয্যাশায়ী হয়ে থাকলে তাঁর গোরুটাও নিজের গোরু দুটোর সঙ্গে মাঠে বেঁধে দিয়ে আসেন, একটু সাবু হয়তো করে নিয়ে আসেন, অন্তত জানালায় উঁকি মেরে দু-একটা কথাও বলেন।

কিন্তু এবার দ্রবময়ী যেন ভুগচেন একটু বেশি।

আষাঢ় মাসের প্রথম থেকে জ্বর শুরু হয়েছে, মাঝে মাঝে প্রায়ই ভোগেন।

শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে—ঘোর অরুচি তার ওপর। পালাজ্বরে ধরেচে আজ মাসখানেক।

সন্ধ্যার দিকে দ্রবময়ী লেপ-তোশক ফেলে ঝেড়ে উঠলেন। পালাজ্বরের কম্প থেমে গিয়েছে। জ্বর যদিও এখন যায়নি—মুখ তেতো, মাথা ভার, শরীর ঝিমঝিম করচে।

ডাক দিলেন—ও ন-বউ, গোরু এনেচ দিদি?

দু-তিনবার ডাকের পর ন-ঠাকরুন উত্তর দিলেন—কে ডাকে, দিদি? ঠেলে উঠেচ?

—বলি আমার গোরুডো কী এনেচ মাঠ থেকে?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ। গোরু গোরু করেই ম’লে শেষকালডা! জ্বর ছেড়েছে?

—ছেড়েচে—ছেড়েচে। বলি গোরু কোথায় বেঁধে রাখলে?

—গোয়ালে গো গোয়ালে—ক্ষেপলে যে গোরু গোরু করে—

কেরোসিন তেল একটা টেমিতে একটুখানি ছিল, দ্রব ঠাকরুন টেমিটা জালালেন। আমড়া গাছে একটা তেড়ো পাখি আর একটা তেড়ো পাখির সঙ্গে কথাবার্তা কইচে, দ্রব ঠাকরুনের জ্বরতপ্ত মস্তিষ্কে মনে হল পাখি দুটো বলচে :–

প্রথম। কুৎলি, কুৎলি—
দ্বিতীয়। ক্যাঁ-ক্যাঁ-ক্যাঁ—
প্রথম। কুৎলি, কুৎলি—
দ্বিতীয়। ক্যাঁ-ক্যাঁ-ক্যাঁ—
প্রথম। কুৎলি, কুৎলি—

দ্রব ঠাকরুন বিরক্ত হয়ে উঠলেন। কী একঘেয়ে আওয়াজ রে বাপু! চালাচ্চে তো চালাচ্চেই, আধঘণ্টা হয়ে গেল—একে মাথা ধরে আছে, ভালো লাগে? থাম না বাপু! মানুষে জানোয়ারে সবাই মিলে পেছনে লাগলে কী করে বাঁচি—

গোয়ালে গিয়ে দ্রব ঠাকরুন মুংলি গোরুকে দেখে প্রাণ ঠান্ডা করলেন। মুংলি–খেলে তাঁর খাওয়া হয় না, এই বনজঙ্গলে ঘেরা নির্জন স্বামীর ভিটে আঁকড়ে পড়ে আছেন, সবাই ছেড়ে গিয়েছে তাঁকে, কতক স্বর্গে কতক বা বিদেশে। তাঁর দুই ছেলে, দুই মেয়ে, নাতি, নাতনি—একঘর, বড়ো গেরস্ত, যদি সবাই থাকত আজ বজায়।

কেউ নেই আজ। মুংলিকে নিয়ে তিনি একা পড়ে আছেন গোপীনাথপুরের ভিটেতে। তাই গোরুটাকে অত ভালোবাসেন, মাঠে বেঁধে দিয়ে বার বার করে দেখে আসেন, নদীতে জল খাওয়াতে নিয়ে যান।

সকালে উঠে দ্রব ঠাকরুনের মনে হল খিদের চোটে তিনি দাঁড়াতে পারছেন না। বাড়ির পেছনে জঙ্গলের মধ্যে একটা ডুমুর গাছ থেকে ডুমুর পেড়ে আনলেন, দুটো সজনে শাক পাড়লেন উঠোনের গাছ থেকে। ঘাটের পথে মুখুজ্জে গিন্নির সঙ্গে দেখা। মুখুজ্জে গিন্নির ছেলে ক-টি লেখাপড়া শেখেনি, গাঁজা খেয়ে বেড়ায়—দ্রব ঠাকরুনের ক-টি নাতি চাকুরে, এজন্যে দ্রব ঠাকরুনের প্রতি তাঁর অন্তরে অন্তরে হিংসে বেশ।

জিজ্ঞেস করলেন—জ্বর হয়েছিল নাকি শুনলাম খুড়িমার?

—হ্যাঁ মা, আজ দুটো ভাত রাঁধব। তাই সকাল সকাল ঘাটে যাচ্চি–

—আর মা, তোমার থাকতেও নেই—অমন সব নাতি-নাতনি থাকতেও তোমার এই দুর্দশা—সবই কপাল!

অর্থাৎ দুই চাকুরে নাতি আছে বলে তোমার গুমর করবার কিছু নেই। তুমি যে তিমিরে সেই তিমিরে।

নদীর ঘাটে যাবার পথে দু-ধারে শুধু বন আর বাগান। কোনো বাগানে বেড়া দেওয়া নেই, ঘন আশশ্যাওড়া ও বনচালতে গাছের ডালপালা স্নানার্থীদের গায়ে লাগে বলে দু-একজন শুচিবাইস্তা বিধবা পথের পাশের ডালগুলো হাত দিয়ে ভেঙে রেখেছেন। দ্রব ঠাকরুন বনের মধ্যে ঢুকে উঁকি মেরে কী দেখছেন, এমন সময় মুখুজ্জেদের সেজো বউ পেছন থেকে বললে—কী দেখছেন, ও খুড়িমা?

—এই খয়েরখাগী কাঁঠালগাছটাতে কাঁঠাল আছে কিনা এক-আধটা মা—একটা গাছ কাঁঠাল, সব্বনেশেদের জন্যে যদি মা তার কিছু ঘরে উঠল—নিজে থাকি অসুখে পড়ে–

—কে কাঁঠাল নিলে খুড়িমা?

—কে নিয়েছে আমি কি চৌকি দিতে গিয়েচি বসে বসে? এই পাড়ার মধ্যেই চোরের ঝাড়–দ্যাখ তোর, না-দ্যাখ মোর! সব্বনেশে কলিকালে কী ধম্মেজ্ঞান আছে মা?

—চলুন খুড়িমা, ঘাটে যাই—

দ্রব ঠাকরুন বকতে বকতে ঘাটের দিকে চলেন। স্নান সেরে এসে দুটো আলোচাল ফুটিয়ে ডুমুরের চচ্চড়ি করে ভাত বেড়ে নিয়ে খেতে বসেছেন, এমন সময় শুনতে পেলেন বাড়ির পেছনে কাগজি লেবুগাছটার তলায় কী খস খস শব্দ হচ্চে।

দ্রব ঠাকরুণ হাঁক দিলেন—কে রে লেবুতলায়?

ক্ষীণ বালিকাকণ্ঠে উত্তর এল—এই আমি কনক, ঠাকুমা—

—কেন, ওখানে কি শুনি? কী হচ্চে ওখানে? বের হয়ে আয় ইদিকে, সামনে আয়!

একটি ম্যালেরিয়াশীর্ণ দশ-এগারো বছরের বালিকামূর্তি অকুণ্ঠ পদবিক্ষেপে লেবু-ঝোপের আড়াল থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে উঠোনে এসে দ্রব ঠাকরুনের ত্রু দ্ধ দৃষ্টির সম্মুখে দাঁড়াল।

—এই আমার মা-র মুখে অরুচি—কিছু খেতে পারে না, তাই গিয়ে বললে— যা তোর ঠাকুরমার লেবুগাছ থেকে একটা লেবু–

দ্রব ঠাকরুন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন—হ্যাঁ গা—তোর বাবা লেবু গাছ পুঁতে রেখে গিয়েছে, যা তুলে নিয়ে আয় গিয়ে! যত সব চোরছ্যাঁচড় নিয়ে হয়েচে—তোর মার অরুচি, তা হাটে লেবু কিনতে পারিসনে? এখানে কী? তোর বাবার গাছ আছে এখানে?

বালিকা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

দ্রব ঠাকরুন আপনমনে বকে যেতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পরে বালিকা ভয়ে ভয়ে বল্লেও ঠাকুরমা–

—কী রে? কী?

—আমি চলে যাব?

—কেন, তোকে কী বেঁধে রেখেচি নাকি? যা—

—লেবু দেবেন না?

দ্রব ঠকরুন চুপ করে আপনমনে বড়ো বড়ো কয়েকটি ভাতের গ্রাস মুখে পুরে দিলেন, বাঁ-হাতে ঘটি নিয়ে ঢক ঢক করে খানিকটা জল খেয়ে অপেক্ষাকৃত নরমসুরে জিজ্ঞেস করলেন— তোর পরনের কাপড় কাচা? ওই কলসিটা থেকে আমায় একটু খাবার জল গড়িয়ে দে দেখি—

মেয়েটি তাই করলে। দ্রব ঠাকরুন বললেন—অরুচি কেন? তোর মার কী ছেলেপিলে হবে নাকি?

—তা তো জানিনে ঠাকমা।

—যা, নিয়ে যা—তবে একটার বেশি নিবিনে— বুঝলি?

দ্রব ঠাকরুন খেয়ে উঠে মাদুর পেতে একটু শুয়েচেন, এমন সময় মুখুজ্জে বাড়ির বড়ো ছেলে অতুল এসে বললে—ও ঠাকমা, শুয়েচেন নাকি?

—হ্যাঁ, কে? অতুল? কী ভাই?

—আপনার পিটুলিগাছ আছে? কলকাতা থেকে দেশলাইয়ের কারাখানার লোক এসেচে গাঁয়ের পিটুলি আর শিমুলগাছ কিনতে। আপনার যদি থাকে—বেশ দর দিচ্ছে—

—না বাপু, আমার নেই।

—কেন, আপনার বাড়ির পেছনে হরি রায়ের দারুণ জঙ্গলে তো বেশ বড়ো বড়ো পিটুলি গাছ আছে—

-না, আমি বেচব না।

আসলে দ্রব ঠাকরুনের গাছপালার ওপর বড়ো মায়া, স্বামীর আমলের যা কিছু যৎসামান্য জমিজমা, তা প্রায়ই জঙ্গলাবৃত এবং বড়ো বড়ো বাজে গাছে ভর্তি। জ্বালানি কাঠ হিসেবে বিক্রি করলেও এ কয়লার দুর্মূল্যতার দিনে দু-পয়সা পাওয়া যায়, কিন্তু গাছের একটা ডাল কাটতেও তাঁর মায়া। না-খেয়ে কষ্ট পাবেন, তবুও গাছ বিক্রির কথা তুলতেও দেবেন না। একজনের শুয়োপোকা লাগাতে সে। ডুমুরপাতা পাড়তে এসেছিল, কারণ ডুমুরপাতা দিয়ে শুয়ো-লাগা জায়গাটা ঘষলে শুয়ো ঝরে যায়, কিন্তু দ্রব ঠাকরুন তাকে ডুমুরপাতা পাড়তে দেননি। হয়তো এটা অতিরঞ্জিত গল্পমাত্র, তবে এর দ্বারা তাঁর মনের অবস্থা অনেকটা বোঝা যাবে।

বৈকালের দিকে দ্রব ঠাকরুন বেশ ভালোই বোধ করলেন। পাড়ার এক প্রান্তেজঙ্গলে ঘেরা বাড়ি, বড়ো কেউ এদিকে বেড়াতে আসে না, এক ন-ঠাকরুন ছাড়া কেউ উঁকি মেরে বড়ো একটা দেখে না, দ্রব ঠাকরুন কিন্তু লোকজন, আড্ডা, মজলিশ প্রভৃতি ভালোইবাসেন। কেউ এসে গল্প করে, এটা তাঁর খুবই ইচ্ছে— কিন্তু ও-বেলার সেই বালিকাটি ছাড়া বিকেলে আর কেউ এল না। সেও এসেছে নিজের স্বার্থে।

ঠাকুরমা, একটা লেবু দেবেন?

—কেন রে, কেন? ওবেলা তো—

—ওবেলার লেবু ওবেলা ফুরিয়েচে, এবেলা একটা দরকার—মা বললে—

—আচ্ছা, আয় উঠে, বোস একটু—

বালিকাটি অনিচ্ছাসত্বেও এসে বসে। নয়তো লেবু পাওয়া যায় না। বুড়ির কাছে বসতে তার ইচ্ছে হয় না, তার সমবয়সি বালিকারা রায়পাড়ার পুকুরধারে এতক্ষণ ফুল তোলাতুলি খেলা আরম্ভ করে দিয়েছে—তার প্রাণ রয়েছে সেখানে পড়ে। কিন্তু দ্রব ঠাকরুনের নিঃসঙ্গ মন যাকে আঁকড়ে ধরতে চায় এই নির্জন বৈকাল বেলাটিতে—তবুও দুটো কথা বলবার লোক তো বটে।

দ্রব ঠাকরুন আপনমনেই বকে চলেছেন, নাতবউ-এর মন্দ ব্যবহারের কথা, নাতির ছেলে খোকনের অলৌকিক গুণাবলি, ছোটো নাতি পরেশ তাঁকে কীরকম ভালোবাসে…এই ধরনের নানাকথা শুনতে শুনতে ক্ষুদ্র শ্রোতাটির হাই ওঠে, সে করুণস্বরে বলে—ঠাকুমা, মা সাবু চড়িয়ে আমায় বললে, লেবু নিয়ে আয়, বেলা গেল—

—হ্যাঁ হচ্চে হচ্চেতারপর শোন না…

–মা বকবে—লেবু নইলে সাবু খেতে পারবে না—

—আচ্ছা, শোন—তারপর খোকনমণি সেই পেয়ারা তো খাবেই, কিছুতেই ছাড়ে না—ওর মাও দেবে না—বড্ড হেজলদাগড়া মেয়ে ওর মা, আমি বলি, বউ, চাচ্চে খেতে, এক টুকরো ওকে দ্যাও—তা আমায় বললে—আপনি চুপ করে থাকুন, আপনি কী বোঝেন ছেলে-মেয়ে মানুষ করার—একালের মাও অন্যরকম, আপনাদের সেকাল গিয়েচে।…আমি জানিনে ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে—তবে তুই তোর বর পেলি কোথা থেকেরে আবাগের বেটি?

—আমি এবার যাই ঠাকমা—লেবু একটা

-আচ্ছা তা যা নিয়ে একটা লেবু—শুনলি তো সব কাণ্ডখানা! দিদিশাশুড়ি বড়ো মন্দ—

এমন সময়ে বাড়ির বাইরে একখানা গোরুরগাড়ির শব্দ শোনা গেল। খুকি কৌতূহলে চোখ বড়ো বড়ো করে বললেও ঠাকমা, কে যেন এল গাড়ি করে —তোমার ওই তুত-তলায় গাড়ি দাঁড়াল—

বলতে বলতে দ্রব ঠাকরুনের মেজো নাতি নীরদচন্দ্র দুটি ভারি মোট দু-হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ঢুকে ডাক দিলে–ও ঠাকমা—

দ্রব ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বল্লেন-কানু? আয়, আয় ভাই ভালো আছিস?

কানু এসে মোট নামিয়ে পিতামহীকে প্রণাম করলে, বলিকাটির দিকে চেয়ে বললে— এ হরিকাকার মেয়ে কনক না? ওঃ কত বড়ো হয়ে গিয়েছে—ভালো আছিস কনকী? নে দাঁড়া—একখানা গজা নিয়ে যা—

পুঁটলি খুলে মেয়েটির হাতে একখানা বড়ো গজা দিতে সে নিঃশব্দে হাসিমুখে হাত পেতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, বড়ো মোটটার মধ্যে আরও কী কী জিনিস আছে দেখবার আগ্রহে। তাদের বাড়িতে এমন কেউ নেই যে বিদেশে চাকুরি করে— নিতান্তই অল্পবিত্ত গৃহস্থের সংসার চাকুরে বাবুরা বাড়ি আসবার সময় কী কী অপূর্ব জিনিস না-জানি নিয়ে আসে!

দ্রব ঠাকরুন জিজ্ঞেস করলেন— তারপর, কী মনে করে? হঠাৎ যে! বুড়িকে মনে পড়েছে তাহলে? বাবাঃ, সারা আষাঢ় মাস অসুখে ভুগে ভুগে—তাই এখনও কী সেরেচি! এমন একটা লক নেই যে, এক ঘটি জল এগিয়ে দেয়—ওই ন-বউ ছিল তাই—এত চিঠি দিলাম, না-এল টেবু, না-এল বিন্দে, না-এলে তুমি

সন্ধ্যার পর ন-ঠাকরুন খবর পেয়ে ছুটে এলেন। গ্রামের ছেলে, জন্মাতে দেখেছেন, অনেক দিন পরে দেখে খুব খুশি। কুশলপ্রশ্নাদি জিজ্ঞেস করার পর বললেন—হ্যাঁ কানু, তা তোমরা সোনারচাঁদ সব নাতি থাকতে বুড়ি এখানে বেঘোরে মারা যাবে! পালাজ্বরে ধরেচে—এই আজ ভালো আছে, কাল এমন সময় লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে পড়বে! কে দেখে, কে শোনে—তার ওপর আবার গোরু—একটা বিহিত করে যাও যা হয়—নইলে—

কানু বললে—সেসবের জন্যেই তো আসা। চিঠি পেয়েছি অনেক দিন, সায়েব ছুটি দিতে চায় না—পরের চাকরি—তাই দেরি হল।

দ্রব ঠাকরুন বললেন—ভালো কথা, ও ন-বউ, দু-খানা গজা নিয়ে যাও, জল খেয়ো কানু এনেচে আমার জন্যে—তা ও যেমন পাগল, আমার কী দাঁত আছে। যে গজা খাব? নিয়ে যাও ন-বউ।

—তা দ্যাও দু-খানা, নিয়ে যাই। ভালোটা-মন্দটা এ পাড়াগাঁয়ে তো চক্ষেই দেখতে পাইনে দিদি-বেঁচে থাক তোমার সোনারচাঁদ নাতিরা, তোমার ভাবনাটা কীসের? বিশেষ করে কানুর মতো ছেলে নেই এ গাঁয়ে—আমি যা বলব তা মুখের ওপরেই বলব বাপু

বলে ন-বউ দু-খানার জায়গায় চারখানা গজা হাতে খুশি মনে বাড়ির দিকে চললেন আর কিছুক্ষণ পরে।

নাতি-ঠাকুরমার পরামর্শ হল রাত্রে। কানু এক মতলব ফেঁদে এসেচে। ঠাকুরমাকে সে কাশী নিয়ে গিয়ে রেখে আসবে। তার একজন কে বন্ধুর মা কাশীতে থাকেন, সেই একই বাড়িতে ঠাকুরমাকে রাখবে। পরদিন সকালে ন-বউ শুনে খুব খুশি, অমন সব নাতি থাকতে ভাবনা কী? তীর্থধর্ম করার সময়ই তো এই। তাঁর যদি আজ ছেলেটাও বেঁচে থাকত।

আজ প্রায় পঁয়তাল্লিশ বৎসর পূর্বে সাত মাস বয়সে ন-ঠাকরুনের ছেলে মারা গিয়েছে সে-ই প্রথম, সেই শেষ। তাঁর আর ছেলেপুলে হয়নি।

যাবার দিন দ্রব ঠাকরুন প্রিয় মুংলি গোরুটার ভার দিয়ে গেলেন ন-বউকে। বার বার মাথার দিব্যি দিলেন, মুংলিকে যেন যত্ন করা হয়। বললেন—ও গোরু তোমারই হয়ে গেল ন-বউ, আমায় আশীর্বাদ করো যেন কাশীতে হাড় ক-খানা রাখতে পারি—নাতিদের ঘাড়ের বোঝা যেন নেমে যাই—আমার বড়ো নাতির ভাবনা কী, তার সচ্ছল অবস্থা, লুচি-পরোটা জলখাবার, তেল ঘিয়ে কলকলে করে পাঁচ ব্যাঞ্জন রান্না—আমি বুড়ি হয়েছি, ওদের সংসারে সেকেলে মতের লোকের জায়গা আর হয় না এখন–

ঘরের অড়ায় শুকনো নারকোল পাতার আঁটি, পাকাটির বোঝা জোগাড় করা ছিল, বর্ষায় উনুন ধরানোর কষ্ট বলে সুগৃহিণী দ্রব ঠাকরুন ‘যে-সময়ের-যা’ সঞ্চয় করে রাখতেন। কাশীবাস করতে যাচ্ছেন, পেছনটান থাকলে তীর্থবাস হয় না— সে-সব দান করে গেলেন কতক ন-ঠাকরুনকে, কতক একে-ওকে।

কনক একটা পাকা শসা হাতে এসে বললে—শসা খাবে ঠাকমা?

—তুই এক বোঝা পাকাটি নিয়ে যা কনকী—ঠাকমাকে মনে রাখবি তো, হ্যাঁ রে?

কনক অনেকখানি ঘাড় নেড়ে বললে—হু-উ-উ—

ন-ঠাকরুন চোখের জল ফেললেন যাবার সময়ে।

 

দ্রব ঠাকরুন ট্রেনে কোনোরকমে শুচিতা বজায় রেখে কাশী এসে পৌঁছালেন। একটা গলির মধ্যে দোতলা একটা বাড়ির নীচের তলার ঘরে কানুর সেই বন্ধুর মা কাশীবাস করছেন। পাশেই আর একখানা ছোটো ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে দ্রব ঠাকরুনের জন্যে। অপর বৃদ্ধাটির কাছে চাবি ছিল ঘরের, তিনি চাবি খুলে দিলেন। দ্রব ঠাকরুন নিজের জিনিসপত্র নিয়ে সেই ঘরে অধিষ্ঠান হলেন।

দ্রব ঠাকরুন ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সভয়ে আবিষ্কার করলেন, তাঁর প্রতিবেশিনী নদে’ জেলার লোক। কথাবার্তার ধরন ও সুর শহুরে ও সম্পূর্ণ মার্জিত। যশোর জেলার মানুষ দ্রব ঠাকরুনের ভয় পাবারই কথা বটে। তিনি এসে দ্রব ঠাকরুনের ঘরে ঢুকে বললেন—আপনার রান্নাবান্নার ব্যবস্থা কাল থেকে করলেই হবে— আজ আমার ঘরে দুধ আর মিষ্টি আছে, আপনার জন্যে রাখলুম কিনা।

দ্রব ঠাকরুন ভয়ে ভয়ে বললেন—ও!

প্রতিবেশিনী নিজের ঘর থেকে খাবার এনে বললেন—আপনার লোমবস্ত্র বার করুণ—

দ্রব ঠাকরুন ভালো বুঝতে না-পেরে বললেন—কী বললেন?

দ্রব ঠাকরুন ‘বললেন’ এই কথায় ‘ব’-এর উচ্চরণ যশোর জেলার উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী প্রসারিত উচ্চারণ, প্রতিবেশিনী বৃদ্ধার উচ্চারণে এইসব স্থানের উচ্চারণ যতদূর সম্ভব আকুঞ্চিত। ‘বললেন’-এর উচ্চারণ ‘বোললেন’—’ও’-এর উচ্চারণও যতদূর সম্ভব ঘোরালো।

–বলচি, লোমবস্ত্র বের করে পরুন, একটু কিছু মুখে দিতে হবে তো?

লোমবস্ত্র কি জিনিস, পাড়াগাঁয়ের মানুষ দ্রব ঠাকরুন কখনো শোনেননি—তবে জিনিসটা যে বস্ত্রজাতীয় দ্রব্য তা বুঝতে পারলেন, বললেন—সে তো আমার নেই!

—লোমবস্ত্র নেই? আপনি জপ করেন কী পরে?

—এই সাদা থান পরেই জপ করি, আর কোথায় কী পাব?

বাড়িখানা গলির মুখে হলেও প্রায় সদর রাস্তার ওপরে। অনেক রাত পর্যন্ত গাড়িঘোড়া রাস্তার গোলমাল থামে না। নিরিবিলি বনজঙ্গলের মধ্যে বাড়িতে একা থাকা দ্রব ঠাকরুনের চিরদিনের অভ্যাস, এত গোলমালে বড়োই অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন তিনি। উঃ, কী মুশকিলেই পড়া গেল! নাঃ কাশীর লোক ঘুমোয় কখন?

কানু তার পরদিন বন্ধুর হাতে পল্লিবাসিনী পিতামহীকে সমর্পণ করে কর্মস্থানে চলে গেল, তার ছুটি ফুরিয়েছে। বন্ধুর মা-র নাম নীরজাবাসিনী, দ্রব ঠাকরুনের চেয়ে তাঁর বয়স দু-পাঁচ বছর কম হবে, মাথার সব চুল এখনও পাকেনি—তবে সেটা স্বাস্থ্যের গুণেও হতে পারে।

দ্রব ঠাকরুন এঁর সঙ্গে দশাশ্বমেধ ঘাটে বিকেলে বেড়াতে গেলেন—খুব লোকজনের ভিড়, গান, বক্তৃতা, কথকতা। এক গেরুয়া কাপড়পরা সন্নিসির চারিপাশে খুব ভিড়, নীরজা সেখানে জুটলেন গিয়ে। কর্মবাদ, সেবাধর্ম ইত্যাদি নিয়ে সন্নিসি কীসব কথা বলে যাচ্ছেন, দ্রব ঠাকরুন অতশত বুঝতে পারলেন না। ফিরবার পথে দ্রব ঠাকরুন জিজ্ঞেস করলেন—উনি কেডা?

—উনি রামকৃষ্ণ মঠের একজন বড়ো ইয়ে—স্বামী সেবানন্দ।

—কী মঠ?

—কেন, রামকৃষ্ণ মঠের কথা শোনেননি? ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের—মস্ত বড়ো কাণ্ড ওঁদের

—রাম আর কৃষ্ণ দুই ঠাকুরের নাম বুঝি?

নীরজা বিস্ময়ে দ্রব ঠাকরুনের দিকে চেয়ে বললেন—আপনি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের নাম শোনেননি?

—না। কে তিনি—কই না—এখানে আছেন?

নীরজা আর কোনো কথা বললেন না। এমন বর্বরের সঙ্গেও তিনি বেড়াতে বেরিয়েছেন যে রামকৃষ্ণদেবের নাম পর্যন্ত জানে না! দ্রব ঠাকরুনের কোনো দোষ নেই, তিনি অজ্ঞ সেকেলে লোক, অজ পল্লিগ্রাম ছেড়ে জীবনে কখনো কোথাও যাননি। গোপীনাথপুরের জঙ্গলে ও-নাম কখনো কারো মুখে শোনেনওনি। তিনি জানেন, রাম, কৃষ্ণ, রাধা, দুর্গা, লোচনপুরের জাগ্রত কালী, কালীঘাটের কালী ইত্যাদি। অতবড়ো নামের কোনো ঠাকুরের কথা—কই কেউ তো তাঁকে বলেনি।

 

দ্রব ঠাকরুন ভয়ে ভয়ে থাকেন। তাঁর সঙ্গিনী তাঁকে নিতান্ত নাস্তিক, অজ্ঞ, মূখ বলে না। ঠাওরান।

দিনকয়েক যেতে-না-যেতেই দ্রব ঠাকরুন বুঝে নিলেন সঙ্গিনীটি ধর্মবাতিকগ্রস্তা। সাধুসন্নিসির ভক্ত। যদি কোথাও কোনোধরনের সাধু মন্দিরে কী ঘাটে বসে আছে, তবে আর নিস্তার নেই। সেখানে বসে অমনি গরুড়ের মতো হাত জোড় করে বকবক বকুনি জুড়ে দেবে। আর কীসব কথা জিজ্ঞেস করবে, কর্মফল কী, পুনর্জন্ম কী, হেনো তেনো। রাস্তাঘাটে বেরুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, বাসায় ফেরবার নামটি নেই। এত বিরক্ত ধরে দ্রব ঠাকরুনের—কিন্তু তিনি কী করবেন? কাশীর রাস্তা চেনেন না—একাও বাসায় ফিরতে পারেন না সঙ্গিনী না-ফিরলে।

একদিন বিশ্বনাথের মন্দিরে সন্ধ্যার আরতি দেখতে গেলেন দুজনেই।

সেখানে এক সন্ন্যাসিনী নাটমন্দিরে বসে আছেন, গেরুয়া কাপড় পরনে, মাথায় জটা, অনেক মেয়েছেলের ভিড় হয়েছে সেখানে। নীরজা তো সাধু-সন্ন্যাসী দেখলে সর্বদা একপায়ে খাড়া, চারিপাশের ভক্তের দলে গেল মিশে তাঁকে নিয়ে। দ্রব ঠাকরুন শুনতে লাগলেন কেউ জিজ্ঞেস করচে, মাইজি, ঠাকুরের দেখা পাওয়া যায়?

কেউ বলছে—মাইজি, আমার মেয়ের মাদুলি দেবেন তো আজ?

—আজ আমার হাতখানা দয়া করে দেখবেন কী?

নীরজা জিজ্ঞেস করলেন—মাইজি, আমার ভক্তি হচ্ছে না কেন?

দ্রব ঠাকরুন শুনে মনে মনে হেসে আর বাঁচেন না। সর্বদা সাধুসন্নিসি নিয়েই আছো, এখানে প্রণাম, ওখানে ধন্না, দু-ঘণ্টা ধরে নাক টেপা—এতেও যদি তোমার ভক্তি না-হয়ে থাকে, গঙ্গার জলে ডুবে মরো গিয়ে—ঢং দেখে আর বাঁচিনে! মরণ আর কী!

তারপরই সবাই চলে গেল—নীরজা সেই যে সেখানে চোখ বুজে ধ্যান না কী যোগে বসল, আর ওঠে না! দ্রব ঠাকরুনও কিছু বলতে সাহস পান না। এদিকে তাঁর মনে পড়ল সুজি একদম নেই, সে-কথা এতক্ষণ মনে ছিল না, এত রাত হয়ে গেল, কোথায়-বা সুজি কেনা হবে! রাত্রে একটু মোহনভোগ খাওয়া, তাও আজ ধর্মের ভিড়ে বুঝি বা হয় না।

বসে বসে দ্রব ঠাকরুন বিরক্ত হয়ে উঠলেন। মন্দির থেকে মেয়েরা প্রায় সব চলে গিয়েছে, এদেশি লোক যারা হিন্দিমিন্দি বলে, তাদের দলই যাচ্চে-আসছে। কী জানি ওদের কথা তিনি কিছুই বুঝতেও পারেন না, বলতেও পারেন না।

আজ মাসতিনেক গ্রাম থেকে এসেছেন। বেশ শীত পড়ে গিয়েচে কাশীতে। মংলি গোরুটার কথা এত করেও আজকাল মনে পড়ছে। শীতের রাত্রে পাছে কষ্ট হয় বলে তিনি গোয়ালে আগুন করে রাখতেন। তাঁর গাছটাতে খুব ডুমুর হয়েছে নিশ্চয়, কে জানে একটা গাছ ডুমুর কারা খাচ্চে? কম ডুমুর হয় গাছটাতে! আহা, ন-বউ কী মুংলিকে অত যত্ন করছে?—তাঁর মতো? তিনি যে পেটের মেয়ের মতো ওকে…না, তাঁর চোখে জল এসে পড়ে।

আজই এতকাল পরে ন-বউ-এর পত্র এসেচে দেশ থেকে…তাই বেশি করে মনে পড়ছে দেশের কথা। ন-বউ লিখেচে মুংলি ভালো আছে, শিগগির বাছুর হবে। তাঁর বাড়ির দাওয়ার খুঁটি না-বদলালে নয়। কানু বা বিন্দেকে যেন চিঠি লেখা হয় সেজন্যে।

নীরজা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ধ্যান ভঙ্গ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—দিদি চলো যাই…সত্যি কী পবিত্র স্থান, না? ইচ্ছে হয় না যে আবার সংসারে ফিরে যাই, রাঁধি খাই!

দ্রব ঠাকরুন মনে মনে বললেন—মরো না এখানে শুকিয়ে হত্যে দিয়ে—কে মাথার দিব্যি দিয়েছে রাঁধতে খেতে!

নীরজা বললেন—করন্যাসটা অভ্যেস করছি কিনা, প্রায় হয়ে এল—

দ্রবময়ী নীরব। মাগিটা পাগল নাকি? কীসব বলে বোঝাও যায় না! রাত দুপুর বাজল, বাবা, এখন বাসায় চল দিকি!

বাসায় এসেও কি তাই নিস্তার আছে?

নীরজা ডাকবেন তাঁর ঘর থেকে—ও দিদি, একটু গীতাপাঠ করি শোনো— নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে তাঁকে যেতে হয়। গীতা-টিতা ওসব তিনি বোঝেন না। সুবচনীর ব্রতকথা, সত্যনারায়ণের পাঁচালি, শিবরাত্রির ব্রতকথা এসব শোনা তাঁর অভ্যেস আছে, বেশ দিব্যি বুঝতেও পারেন—এসব শক্ত শক্ত কথার কী কাণ্ডমাণ্ড, এক বর্ণও যদি তিনি বোঝেন! আর মাগির চোখ উলটে, কান্না কান্না মুখের ভাব করে পড়বার ভঙ্গিই বা কী! দ্রব ঠাকরুন না-পারেন হাসতে, না পারেন হাসি চাপতে! এমন বিপদেও মানুষ পড়ে গা!

নীরজা পড়তে পড়তে বলবেন—আহা-হা! কী চমৎকার!

দ্রব ঠাকরুন বসে ঢুলতে ঢুলতে ভাববেন—থামলে যে বাঁচি–

সকালে উঠে নীরজা বললেন—আজ আমার গুরুদেব আসবেন, দিদি দু-খানা লুচি ভেজে দিও তো আমার ঘরে বসে।

বেলা দু-টোর সময় এক সন্নিসি এসে হাজির। বেশ মোটা ভুড়িওয়ালা, এই লম্বা দাড়ি। নীরজা সাষ্টাঙ্গ হয়ে প্রণাম করে দু-বার মাথা ঠুকলেন গুরুদেবের পাদপদ্মে। আহারাদির জোগাড় করতেই কাটল সারাদিন—তিনসের দুধ মেয়ে একসের হল, ঘরে রাবড়ি মালাই তৈরি হল। লুচি ভাজা হল। সন্ধ্যার সময় নীরজা বসলেন গুরুর কাছে কীসব ক্রিয়া শিখতে। আসন না মাথামুণ্ডু তাই শিখতে। যত-বা এ বকে, তত-বা ও বকে। মনে হল বুঝি কানের পোকা সব বেরিয়ে যায়!

গুরুদেব বাঙালি। রাত নটার পরে দ্রব ঠাকরুনকে ডাক দিলেন। বললেন—তোমার বাড়ি কোথায়?

—গোপীনাথপুর, যশোর জেলা—

—কে আছে বাড়িতে?

-নাতিরা আছে, তাদের ছেলে-বউ আছে।

—তুমি কাশীবাস করতে এসেছ?

—হ্যাঁ।

—নাম কী?

–দ্রবময়ী দেব্যা—

—দীক্ষা হয়েছে?

–না।

নীরজা চোখ কপালে তুলে বললেন—কী সর্বনাশ! দীক্ষা হয়নি এতদিন? তা তো জানতাম না?

গুরুদেব বললেন—দীক্ষা নিতে হবে মা তোমাকে।

—আমার পয়সা নেই, দীক্ষা নিতে গেলে খরচ আছে। নাতিরা এগারো টাকা করে মাসে পাঠায়—তার মধ্যে ঘরভাড়া, তার মধ্যে খাওয়া। পয়সা পাই কোথায়?

—দীক্ষা না-নিলে কাশীবাসে ফল কী মা?

—ফলের জন্যে তো আসিনি, শরীরডা সারাতি এসেছিলাম।

নীরজা রাগের সুরে বললেন—শরীর আগে না-পরকাল আগে?

দ্রব ঠাকরুন চুপ করে রইলেন।

গুরুদেব বললেন—নীরজা-মার কথার উত্তর দাও—চুপ করে থাকলে হবে না।

নীরজা বললেন—গীতার ভক্তিযোগ সেদিন পড়ছিলাম, শুনলে তো দিদি? কর্মের চেয়েও ভক্তি বড়ো, স্বয়ং ভগবান বলছেন—

আ:, কী বিপদ! মাগির সবসময়েই কী আবোল-তাবোল বকুনি?

মুখে বললেন—আমি তো কিছু বুঝিনে, আপনারা যা বলেন। তবে এবার কিছু হবে না। নাতি সাতটাকা পাঠিয়েছিল, তা ঘরভাড়াতেই গিয়েছে। হাতে টাকা না থাকলি—

তবুও দুজনই নাছোড়বান্দা। দীক্ষা নিতেই হবে।

গুরুদেব বললেন—কাশীবাস করেচ মা, তোমার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। গুরুদীক্ষা না-নিলে যে সবই মাটি। আজ আছ, কাল নেই! পৃথিবী কিছুই না— ইহকাল কিছুই না—

নীরজা বললেন—গুরুর মুখেই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। ইহকালেও তিনি, পরকালেও তিনি–

দ্রব ঠাকরুন মনে মনে বললেন—আ মরণ মাগির! তবে সোয়ামি কোথায় যাবে মেয়েদের! ঢং দ্যাখো না! যাই হোক, বহু তর্ক করেও ঠাকরুনকে দ্রব করা গেল না। নাম দ্রবময়ী হলে কী হবে, ভেতরে বেজায় শক্ত। নীরজা অবিশ্যি তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি মতে একজন সত্তর বছরের মৃত্যুপথযাত্রিণীর ভালো করবারই যথেষ্ট চেষ্টা করছিলেন, সে রাজি না-হলে তিনি আর কী করবেন?

নীরজার ভক্তি—হ্যাঁ, সে দেখবার মতো একটা জিনিস বটে। গুরুর পাদোদক পান না করে তিনি দাঁতে তৃণ কাটবেন না। গুরুর বাক্য বেদবাক্যের চেয়েও মূল্যবান তাঁর কাছে। পুরোনো একছড়া সোনার হার ছিল, সেটা বিক্রি করে এসে টাকা তুলে দিলেন গুরুদেবের হাতে।

কথাটা শুনে দ্রব ঠাকরুন জিজ্ঞেস করলেন—অতগুলো টাকা দিয়ে দিলে গুরুদেবকে?

—টাকা সার্থক হল, দিদি—

—তোমার নিজের হার?

-–ও আমার বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে দিয়েছিল—তিনি হাতে করে দিয়েছিলেন—

—সেই হার তুমি দিয়ে দিলে বেচে?

—দিদি, সংসার অনিত্য, সবই অনিত্য। কে কার স্বামী, কে কার স্ত্রী? সবই ভগবানের মায়া। মায়ায় সব ভুলে থাকা—গুরুই কেবল নিত্য বস্তু—

—তা তো বটে।

এ মাগির মুখে সবসময় বড়ো বড়ো কথা! দিগে যা তোর সব কিছু গুরুর পাদপদ্মে বিলিয়ে,—তাঁর কী? বিয়ের পরে স্বামী নিজের হাতে যে হারছড়া দিয়েছিল, তা কোনো মেয়েমানুষ এভাবে ঘুচিয়ে দিতে পারে? গভীর রাত পর্যন্ত শুধু এই কথাটিই বার বার তাঁর মনে পড়ে। সে-সব দিন ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, মনের আকাশ বিস্মৃতির মেঘে ঢাকা। ওই গোপীনাথপুরের ভিটে অমন ছিল কী তখন? ফুলশয্যার রাত—

হঠাৎ মনে পড়ে যায়, গত আষাঢ় মাসের প্রথমে উত্তর দিকের ভাঙা পাঁচিলের গায়ে এতটুকু একটা শসাগাছ নতুন বর্ষার জল পেয়ে গজিয়েছে দেখে তিনি শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে একটা মাচা বেঁধে দিয়েছিলেন—এতদিনে গাছ বড়ো হয়েচে, কত শসার জালি পড়েছে গাছটাতে! কে খাচ্চে সে বনের মধ্যে? হয়তো কনকী আসে লেবু তুলতে—এক গাছ লেবু রেখে এসেছিলেন, সে-ই হয়তো শসা পেড়ে নিয়ে যায়—কে জানে?

হঠাৎ কী একটা কুস্বরে দ্রব ঠাকরুন চমকে ওঠেন। নীরজার ঘর থেকে শব্দটা আসচে। মাগি এত রাত্রে করে কী? হুস হুস করে অত জোরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলচে কেন? ঘুমের ঘোরে মুখ-চাপা লাগল নাকি?

দ্রব ঠাকরুন ডাকলেন—শুনচ—ওগো—কী হয়েছে? ওগো—

নীরজা বললেন—ডাকচেন কেন দিদি?

—বলি ও শব্দ কীসের?

—কুম্ভকের রেচক-পূরক অভ্যেস করচি—অনেক রাত ভিন্ন হয় না কিনা, ঠাকুর তাই বলে গেলেন।

সে আবার কীরে বাবা! মাগি তো ঘুমুতেও দেয় না রাত্তিরে!

দ্রব ঠাকরুন বললেন—যাকগে—ঘুমের ঘোরে মুখ-চাপা হয় নিতো?

—না দিদি—ঘুমোইনি এখনও। ঘুমোলে যোগের ক্রিয়া হয় না। জীবনটা যদি ঘুমিয়েই কাটাব, তবে পরকালের কাজ করব কখন?

—তা বেশ, বেশ। —দিদি-ঘুমোলেন? —না, কেন?

—নির্বিকল্প সমাধি না-হওয়া পর্যন্ত আমার মনে শান্তি পাচ্চিনে, পাবও না। দেহ কী-জন্যে দিদি? ঘুমোবার জন্যে নয়, আরামের নয়—শুধু নিজের কাজ করে যাওয়ার জন্যে। দিন কিনে নাও, শুধু দিন কিনে নাও

দ্রব ঠাকরুনের পিত্তি জ্বলে গেল। কিনগে যা দিন মাগি, যদি তোর পয়সা থাকে। রাত্তিরে একটু ঘুমোতে দে অন্তত।

 

শীতকাল এসে গেল। কানু বড়োদিনের ছুটিতে একবার কাশী এসে পিতামহীর সঙ্গে দেখা করে গেল।

দ্রব ঠাকরুন তাকে বললেন—কানু ভাই, অন্য একটা বাসা পাওয়া যায় না? কানু বিস্মিত হয়ে বললে—কেন, এখানে কী হল? সত্যর মা রয়েছেন, এই তো সবচেয়ে ভালো—

—ও মাগি পাগল।

—পাগল! সে কী!

—না বাবু বেজায় ধর্মিষ্টি। অত ধর্মিষ্টি আমার পোষাবে না। আমাকে তুই সরিয়ে নিয়ে যা—

কানু কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলে। ঠাকুরমার যেমন কাণ্ড! বললে—আচ্ছা ঠাকুমা, শেষবয়সে কাশীবাস করতে এলে—না-হয় তুমিও হও একটু ধর্মিষ্টি! হ্যাঁ, উনি ওইরকমই বটে। সত্য বলছিল, মা কিছুতেই দেশে থাকতে চান না। এই গত বোশেখ মাসে সত্যর ছোটো ভাইয়ের বিয়ে গেল, ওঁর ছোটো ছেলের—ওঁকে কত চিঠিপত্তর, কত অনুরোধ—কিছুতেই গেলেন না! বললেন, যে মায়া একবার কাটিয়েছেন, তাতে আর জড়িয়ে পড়তে চান না। ছোটো ছেলে টেলিগ্রাম পর্যন্ত করলে, কোনো ফল হল না।

দ্রব ঠাকরুন অবাক হয়ে বললেন—বলিস কীরে কানু, সত্যি?

—মিথ্যে বলছি তোমার কাছে ঠাকুমা?

—আমায় এখান থেকে তুই সরিয়ে দে ভাই!

—ছিঃ—আচ্ছা, তুমি অত নাস্তিক কেন ঠাকুমা? ওঁর সঙ্গে থেকে একটু ধর্ম শেখো না, চিরকালই বিষয় আর সংসার নিয়েই তো কাটালে!

—হাঁফ লেগে মরে যাব যে এখানে থাকলে—

—আবার ওইসব নাস্তিকের মতো কথাবার্তা—ঠাকমা তুমি কী!

 

শীত কেটে গ্রীষ্ম এল, চলেও গেল। আবার আষাঢ় মাসের প্রথম। দেশের খবর নেই অনেকদিন। ন-ঠাকরুনের চিঠি আগে আগে আসত—গত তিন-চার মাস তাও বন্ধ। কথায় কথায় একদিন নীরজাকে কথাটা বলেই ফেললেন।

—দেশে কে আছে আপনার? শুনেছি সেখানে থাকে না কেউ?

—বাড়িটা, গাছটা পালাটা—

—দিদি, এখনও ওইসবের মায়া? বিশ্বনাথের পাদপদ্মে মন সমর্পণ করুন, সব বন্ধন ঘুচে যাবে। কেউ কিছু নয়, কিছু নয়—একমাত্র তিনিই সত্যি। বলে নীরজা চোখ কপালে তুলে ওপরের দিকে চেয়ে রইলেন।

দ্রব ঠাকরুন তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন—ওই যাঃ, দাঁড়াও, কড়ার দুধটুকু বুঝি বেড়ালে খেয়ে গেল! নাঃ বেড়ালের জ্বালায়—যত-বা বেড়াল, তত-বা বাঁদর! অমন গামছাখানা সেদিন—

—দিদি, আজ আমার সঙ্গে চলুন, কেদারঘাটে কাশীখণ্ডের ব্যাখ্যা করবেন উপীন কথক। শোনবার জিনিস। কাশীতে এসে কাশীখণ্ড শুনতে হয়—

—আমার শরীর ভালো না, আজ থাক, তুমি যাও—

নীরজা নাছোড়বান্দা, অবশেষে নিয়ে গেলেন দ্রব ঠাকরুণকে। কেদারঘাটে এর আগেও দু-তিন বার দ্রব গিয়েচেন সত্যর মা-র সঙ্গেই। ওপরের রানার চওড়া চাতালের একপাশে ফর্সা রোগামতো কথক ঠাকুর কথকতা শুরু করেছেন—তাঁকে ঘিরে বাঙালি মেয়ে-পুরুষের ভিড়। পুরুষের চেয়ে মেয়ে অনেক বেশি। সত্যর মা জিজ্ঞেস করলেন—দিদি, প্রণামী কিছু এনেছেন তো?

—তা তো বললে না—আনিনি—

—আট আনার কম দেওয়া যায় না। আচ্ছা, আপনারটা আমি দিয়ে দেব এখন

—আমার আট আনা না-দিয়ে চার আনা বরং দেও। নাতিরা ক-টাকা বা পাঠায়?

—এখানে যা দেবেন দিদি, পরকালের জন্য তোলা রইল—

বর্ষার গঙ্গায় ঢল নেমেছে। কেদারঘাটের সামনের নদীতে কাদের বড়ো একটা বজরা ভেসে চলেচে, দু-তিনখানা পানসিতে সুসজ্জিত নরনারী নদীভ্রমণে বার হয়েচে। রামনগরের দিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে—উঁচু বাড়ির ছাদের কার্নিশে তরল সোনার মতো ঝিলমিল করচে রাঙা রোদ। কথক ঠাকুর সুকণ্ঠে গান ধরেচেন, কাশী সকল তীর্থর সার, মৃত্যুর সময় মনিকর্ণিকার ঘাটে স্বয়ং বিশ্বনাথ কানে মন্ত্র দেন— মানুষের শিবলোকপ্রাপ্তি ঘটে—এই হল গানের অর্থ।

দ্রব ঠাকরুনের মন অজ্ঞানে অনেকদূরে চলে গেল। তাঁর খয়েরখাগী গাছে কত কাঁঠাল হয়েছে এই আষাঢ় মাসে, বড্ড কাঁঠাল ধরে গাছটাতে, শেকড়ে পর্যন্ত কাঁঠাল। তিনটে আমগাছে আমও নিশ্চয়ই খুব ধরেছিল—নাতিরা কি গিয়েচে আম খেতে? তাদের সেদিকে দৃষ্টি নেই! বারোভূতে লুটে খাচ্ছে!

রাত্রি নামল। নীরজা বল্লে—চলুন দিদি—

দ্রব ঠাকরুন লক্ষ করেচেন সমস্ত সময় নীরজা মাগি ফোঁস ফোঁস করে কেঁদেছে। আর কেবল বলেছে—আহা-হা-হা!

যদি এ মাগির সঙ্গ ছাড়তে পারতেন!—কিন্তু তা হবার নয়, কানু শুনবে না।

বাসায় এসে নীরজা দেখলেন তাঁর সঙ্গিনীর মন বড়ো খারাপ—অন্যমনস্ক ভাব, বিশেষ কোনো কথা বলে না।

কাশীখণ্ড শুনে আজ তাহলে খুব ভালো লেগেচে বোধ হয়! পাষাণ বুঝি গলেছে!

নীরজা বললেন—কী ভাবছেন দিদি?

—একটা গাছ কাঁঠাল দেশে। খয়েরখাগীর কাঁঠাল, সে তুমি কখনো খাওনি— খেলে বুঝতে।

—দিদি, এখনও আপনার মায়ার বন্ধন গেল না? আপনার তো দুটো-একটা গাছ, আমার তিনটে বড়ো বাগান–কলমের বোম্বাই, মালদার ফজলি—মায় ল্যাংড়া পর্যন্ত। আমি তো ফিরেও চাইনি ওসব দিকে। ছেলেরা কাঁদে, বলে, এখন কী কাশীবাস করবার সময় হয়েছে তোমার? আমি বলি, না, সংসারের মায়ায় আর। গানে বলে—কেবা কার পর, কে কার আপন? (এই মরেচে, মাগি আবার শুরু করেচে!) কালশয্যা পরে মোহতা ঘোরে, দেখে পরস্পরে অসার আশার স্বপন।

—তা আমি বলি—এতকাল তো সংসারের বন্ধনে ঘুরে আশার স্বপন অনেক দেখলুম। এইবার পরকালের কথা ভাবি। আর আমার এই যে গুরুদেব, উনি দেহধারী মুক্তপুরুষ—ওঁর কৃপায়—(নীরজা উদ্দেশে প্রণাম করলেন।)

দ্রব ঠাকরুন মুখে বললেন—তা তো বটেই—

—চলুন দিদি, কাল বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরে সেই মাইজির কাছে আপনাকে নিয়ে যাই—আপনার বয়স আমার চেয়ে বেশি, আপনার এখন উচিত গুরুমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সব বন্ধন-মুক্ত হয়ে একমনে কাশীবাস করা। আমাদের আর ক-দিন দিদি! শমন তো দোরে দাঁড়িয়ে—সবরকম তো দেখলুম শুনলুম—

দ্রব ঠাকরুন মনে মনে বললেন—তোমার মুণ্ডু করলুম, মাগির কথার আবার ধরন শোনো না, ভাটপাড়ার ভটচাজ্জি এসেছেন! মুখে বল্লেন—মুংলি বলে একটা গাই গোরু ছিল আমার—বড় ন্যাওটা। যেখানে যাব, সেখানে যাবে। আমার হাতে না-খেলে তার পেট ভরত না। এই বেশ কচি কচি বাঁশপাতা এনে মুখে দেতাম তুলি—আর—

—আ:, আবার ওইসব কথা আপনার মুখে! জড়ভরতের কথা জানেন তো? অত বড়ো জ্ঞানী—পূর্বজন্মের এক হরিণের মায়ায় তাঁর সব গেল। ভগবানের চিন্তা করুন—ভগবানের চিন্তা করুন—সব মিথ্যে, সব মিথ্যে।

দ্রব ঠাকরুন কোনো কথা বললেন না। তাঁর ওর কথা একেবারেই ভালো লাগে। মাগি যেন কী! কী বলে, কী করে! মাগি এমন পাষাণ যে, ছোটো ছেলের বিয়েতে বাড়ি গেল না! মুখ দেখতে আছে ওর? ছিঃ

সারারাত্রি স্বপ্নের ঘোরে দেখলেন তাঁর গোপীনাথপুরের ভিটেতে চালাঘরের ছাঁচতলায় ম্লানমুখে ছলছলে চোখে তাঁর মুংলি দাঁড়িয়ে রয়েচেন-বউ তাকে যত্ন করচে না, বুড়ি হয়েচে মুংলি, তেমন দুধ তো আর দিতে পারে না—মুংলিকে তিনি তার মায়ের পেট থেকে টেনে বার করে এতকাল নিজের মেয়ের মতো পুষেছিলেন—তিনি নেই, কে ওকে দেখে! কাঁঠাল হয়েছে বটে খয়েরখাগী গাছটাতে! এত কাঁঠাল তিন-চার বছরের মধ্যে হয়নি। তিনি নাইতে যাচ্ছেন নদীতে, মুখুজ্জে-গিন্নি বলচে-হ্যাঁ খুড়িমা, এবার তোমার গাছে কী কাঁঠাল ধরেছেঃ! তা আমায় একটা দিও, তোমার নাতিদের খেতে দেব—

খড় উড়ে উড়ে পড়ছে বাড়ির চাল থেকে! কানু বা বিন্দু দেশে যায়নি, ঘরও সারায়নি! এবার বর্ষায় কী টিকবে চালে খুঁটি না-দিলে?

কনক বলচে—অ ঠাকুমা, একটা লেবু দেবা? আমার মার অরুচি হয়েছে, কিছু খেতি পারে না—

 

সকালে উঠে নীরজা নিজেই গঙ্গাস্নান করে এসে স্বপাক হবিষ্যান্ন চড়িয়েছেন এবং প্রতিদিনের অভ্যাসমতো ইষ্টমন্ত্র জপ শেষ করে গানবাদ্যসহকারে শিবপূজা করচেন। দ্রব ঠাকরুনের একটু বেলা হয়েছে আজ উঠতে। মনও খুব ভার। তাঁর আপনার জন পড়ে রইল—তাঁর মুংলি, তাঁর খয়েরখাগী গাছটা, তাঁর ডুমুরগাছ— আর তিনি কোথায়! আরও ওই মাগির জ্বালায়…

নীরজার গান-বাদ্য থামল। দ্রব ঠাকুরুনকে বললেন—আজ বড়ো সুখবর পেলুম দিদি–গঙ্গাস্নানে গিয়ে গুপ্তিপাড়ার সইয়ের সঙ্গে দেখা—সেও আমার মতো কাশীবাস করচে বাঙালিটোলায় থাকে, বললে, গুরুদেব আসচেন সামনের সোমবারে। হরিদ্বার থেকে ফেরবার পথে আমার এখানে পায়ের ধুলো দিয়ে তবে যাবেন। সইও একই গুরুর কাছে মন্ত্র নিয়েছে কিনা। আজ বড়ো শুভদিন আমার। গুরুর পাদপদ্ম আশ্রয় করেই বেঁচে আছি, এবার এলে আপনাকে দীক্ষা নিতেই হবে দিদি, আমি ছাড়ব না। গুরুদীক্ষা না-হলে দেহ পবিত্র হয় না, ভবসাগর পার হতে হলে গুরুর চরণরূপ-ভেলা চাই আগে—নইলে হাবুডুবু খেয়ে মরতে হবে যে দিদি!

দ্রব ঠাকরুন বললেন—তা তো ঠিক, তা ঠিক—

গুরুদেবের আগমনের পূর্বেই শনিবার সকালের গাড়িতে কানু এসে হাজির হল। দ্রব ঠাকরুন নাতির কাছে কেঁদে পড়লেন—তুই আমায় গুপীনাথপুরে নিয়ে চল ভাই, আমার আর কাশীবাসে কাজ নেই—বাবা বিশ্বনাথ মাথায় থাকুন, ও মাগির কাছে আর দু-মাস থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব।

ফলে সোমবার কাশীতে গুরুদেবের শুভাগমনের দিন দুপুরের ট্রেনে দ্রব ঠাকরুন দেশের ইস্টিশানে তাঁর বোঁচকা-তোরঙ্গ নিয়ে নাতির সঙ্গে এসে নামলেন।

ন-ঠাকরুন শুনে ছুটে এলেন—ও দিদি—দিদি–

—হ্যাঁ ন-বউ—আমার মুংলি ভালো আছে?

—ভালো নেই দিদি। ওঠে না, খায় না—তোমার যাওয়ার পর থেকেই, গোয়ালে শুয়েই থাকে।

—সে আমার মন বলেচে ভাই, তুমি কী বলবে! তাকে রাত্তিরে স্বপ্ন দেখেই তো আর টিকতে পারলাম না, চলে এলাম। কানুকে বললাম, নিয়ে চল ভাই গুপীনাথপুর, মাথায় থাকুন বাবা বিশ্বনাথ-মুংলি কোথায়? ওকে কচি বাঁশপাতা খাওয়াব নিজের হাতে, স্বপ্ন দেখিচি।

একটু পরে ন-ঠাকরুন দড়া ধরে মুংলিকে নিয়ে এলেন। সত্যিই তার সে চেহারা নেই! সব কাজ ফেলে দ্রব ছুটে গিয়ে তার গায়ে-মুখে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন। মুংলির চোখে জল পড়ে, তাঁরও চোখে জল পড়ে।

ন-ঠাকরুন বললেন–আর-জন্মে ও তোমার মেয়ে ছিল দিদি–আর-জন্মের মায়ার বাঁধন–

–রক্ষে কর ন-বউ—তুমিও বড়ো বড়ো কথা বলতে শুরু করলে নাকি সেই মাগির মতো! মুংলি এ জন্মেই আমার মেয়ে—আর-জন্ম-টন্ম ছেড়ে দাও।

—কে মাগি, কার কথা বলচ—

—সে বলব এখন সব। হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি দেশে এসে—বাবাঃ—

কানু হেসে বললে—নাঃ, ঠাকুমাকে নিয়ে আর পারা গেল না—এমন নাস্তিক —কাশীপ্রাপ্তি অদৃষ্টে থাকলে তো?

—তুই ভাই বল, ন-বউ বলো—আমার এই ভিটেতেই যেন তোদের কোলে শুয়ে সকলের কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে যেতে পারি। কাশি পেরাপ্তিতে দরকার নেই —এই ভিটেই আমার গয়া-কাশী। তিনি এই উঠোনের মৃত্তিকেতে শুয়েছিলেন ওই তুলসিতলায়—আমাকেও তোরা ওখানে—

আঁচলের খুঁট দিয়ে দ্রব ঠাকরুন চোখের জল মুছলেন।

বেলা যায়-যায়—আষাঢ়ান্ত সুদীর্ঘ দিনমানের শেষে সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিকের নিবিড় বাঁশবনের অড়ালে। ঘেঁটকোল ফুল কোথাও জঙ্গলে ফুটেচে, বাতাসে তার কটু উগ্র গন্ধ। দ্রব ঠাকরুনের মন শান্তিতে, আনন্দে, উৎসাহে পূর্ণ হয়ে গেল। এগারো বছরের নববধূ, এই বাড়ির উঠোনে পা দিয়েছিলেন, এখন তাঁর বয়েস তিন-কুড়ি ছয়। কনক হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়ে বললে—ঠাকুমা, ভালো আছেন? এয়েচেন শুনে ছুটে দেখতি এলাম—আমাদের কথা মনে ছিল?

 

গল্প: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

নব-বৃন্দাবন
দুর্মতি

Reactions

0
0
0
0
0
0
ইতিমধ্যে এই পোস্টের জন্য প্রতিক্রিয়া করা হয়েছে।

Nobody liked ?

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

GIF