ইতিহাস রাজনীতি

বৌদ্ধধর্ম

0

বৌদ্ধধর্ম

কপিলাবস্তু

বৌদ্ধধর্মের তিরোভাবের সঙ্গে ভারতবর্ষ হইতে কপিলাবস্তুর নাম পৰ্য্যন্তও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। এখন আর কপিলাবস্তু নামে কোনো রাজ্য বা রাজধানী আর কপিলবস্তু নামে কোন রাজ্য বা রাজধানী দেখিতে পাওয়া যায় না। অতি পুরাতন দেশ বলিয়া, ভারতবর্ষের গ্রাম নগর ধবংসপ্রাপ্ত হইয়াছে, অন্য কোন দেশে তত ধবংসলীলার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায় না। যদুপতির মথুরাপুরী, রঘুপতির উত্তর কৌশলা, কোথায় বুদ্বুদবৎ বিলীন হইয়া গিয়াছে;–সে কথা ক্রমে প্রবাদমাত্রে পরিণত হইয়াছে। যদুপতি বা রঘুপতি দৃষ্টান্ত মাত্র; কত নরপতির কত সমুন্নত সৌধশিখর ধূলিপরিণত হইয়াছে, তাহার তথ্যনির্ণয় করা অসম্ভব।

অগণ্য পুরাকীৰ্ত্তির সন্ধান প্রাপ্ত হইয়া পুরাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতমণ্ডলী কখন একদেশ মাত্ৰ পৰ্যালোচনা করিয়া, কখন বা কল্পনা জল্পনার সহায়তা গ্রহণ করিয়া ঐতিহাসিক ভ্রমপ্রমাদে পতিত হইয়া থাকেন। কপিলবস্তুর স্থাননির্দেশে এরূপ অনেক ভ্রমপ্রমাদ প্রচলিত হইয়াছিল। ভূগর্ভের নিভৃত নিকেতনে কতবার কপিলবস্তুর কীৰ্তিচিহ্ন আবিষ্কৃত হইল; কতবার তাহার ভ্রমপ্রমা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপাদিত হইয়া গেল! তথাপি ঐতিহাসিক আবিষ্কারের অদম্য অধ্যবসায় পরিশ্রান্ত না হইয়া, আবার অনুসন্ধান কার্যে ব্যাপৃত হইয়াছিল। তাহার ফলে আমরা আবার একখানি বিচিত্র গ্রন্থ প্রাপ্ত হইয়াছি।১

কপিলবস্তু কোথায় ছিল, তাহা নানা দেশের নানা জাতির লোকেই জিজ্ঞাসা করিয়া থাকে। শাক্য নরপতি শুদ্ধোদন ও তদীয় পট্টমহিষী মায়াদেবীর পুত্র সিদ্ধার্থ শাক্যসিংহ কপিলবস্তুর সমুচ্চ প্রাসাদ প্রাচীর অতিক্রম করিয়া দীর্ঘতপস্যায় যে নিৰ্ব্বাণপথের সন্ধান প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাহা অদ্যাপি ভূমণ্ডলের বহুসংখ্যক নরনারীর হৃদয় মন আকর্ষণ করিয়া রাখিয়াছে। তাহাদের নিকট কপিলবস্তু সৰ্বশ্রেষ্ট পুণ্যতীর্থ। যাঁহারা এসিয়া মহাদেশের জলে স্থলে ভারতীয় শিক্ষা ও সভ্যতার প্রভাব দর্শন করিয়া তাহার রহস্যোদ্ধারে বদ্ধপরিকর, তাঁহাদের নিকটেও কপিলবস্তু বহুবিস্ময়ের লীলাভূমি। সুতরাং কপিলবস্তু কোথায় ছিল, সে কথা অনেকেই জিজ্ঞাসা করিয়া থাকেন। পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্যজাতি এই প্রশ্নের মীমাংসা করিবার জন্য মৃত্তিকাখনন করিয়া পুরাকীৰ্ত্তির অনুসন্ধান করিয়া আসিতেছেন। এত কাল পরে এক জন বঙ্গবাসীর হস্তে সেই কীৰ্তিচিহ্ন আবিষ্কৃত হইয়াছে।

স্বনামখ্যাত শ্ৰীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় মহাশয় অল্প সময়ে, অল্প ব্যয়ে, হিমালয়ের পদতললগ্ন তরাই অঞ্চলে নেপালরাজ্যের শালবনসমাচ্ছন্ন নতোন্নত ভূমিভাগে ভূগর্ভ প্রোথিত যে সকল কীৰ্তিচিহ্ন খনন করাইয়া লোকলোচনের বিস্ময়োৎপাদন করিয়াছেন, তদ্বারা কপিলবস্তুর রাজদুর্গের পরিখা, প্রাচীর, প্রাসাদ, তোরণ সমস্তই পুনরায় দৃষ্টিগোচর হইবার সম্ভাবনা হইয়াছে। প্রথম চিত্রে এই ঐতিহাসিক পুণ্যভূমির আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়; ইহা পূৰ্ব্ব দ্বারের চিত্রপট। সমস্তই ভূগর্ভে প্রোথিত হইয়া পড়িয়াছিল, তাহার উপর অরণ্যানী সমুদ্ভুত হইয়া তথ্যানুসন্ধানের সকল চেষ্টা বিফল করিয়া রাখিয়াছিল। বিদেশের বিদ্বন্মগুলী এই নবাবিষ্কারের পথপ্রদর্শক হইলেও, তাহার সহিত এক জন বাঙ্গালীর নামও যে চিরসংযুক্ত হইয়া রহিল, তাহা অল্প আহ্লাদের কথা বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। আমাদের পুরাকীর্তি জনশ্রুতিমাত্ৰে পৰ্য্যবসিত হইয়া সত্যের সঙ্গে কবিকল্পনা সংযুক্ত করিয়া তথ্যানুসন্ধানের পথ কিয়ৎ পরিমাণে কঠিন করিয়া তুলিয়াছে। কোন কোন পাশ্চাত্য পণ্ডিত সেই জন্য অনুমান করেন, আমরা সত্যানুসন্ধান কার্যে হস্তক্ষেপ করিবার মত বিচারবুদ্ধি লাভ করিতে অক্ষম; সংস্কারবশতঃ স্বদেশের প্রচলিত জনশ্রুতিতে আস্থা স্থাপন করিয়া অসত্যকেও সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়া থাকি। এই সকল সিদ্ধান্ত যে কিরূপ একদেশদর্শী, মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের অভিনব আবিস্ক্রিয়া তাহা প্রমাণ করিয়া দিয়াছে। তজ্জন্য তিনি আমাদের ললাটপট হইতে একটি কলঙ্করেখা অপনয়ন করিয়া বাঙ্গালীর মুখ উজ্জ্বল করিয়া দিয়াছেন।

শাক্যসিংহের ইতিহাসই কপিলবস্তুর ইতিহাসের একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয়। তাহা কল্পাপ্রসুত অতিপ্রাকৃত কাহিনী পরম্পরায় পরিব্যপ্ত হইলেও, সুধীর ইতিহাসপাঠক তন্মধ্যে নানা ঐতিহাসিক তথ্যের সন্ধান লাভ করিতে পারেন। কপিলবস্তু নামের ব্যুৎপত্তিনির্দেশের জন্য বৌদ্ধসাহিত্যে নানা আখ্যায়িকা সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। একটি আখ্যায়িকা এইরূপ। “সেকালে ইক্ষাকুবংশোদ্ভব কোশলাধিপতির চারি পুত্র ও পাঁচ কন্যা বিমাতার কুটিল কৌশলে নির্বাসিত হইয়া, মহর্ষি কপিলদেবের আমাভোগে আশ্রয়গ্রহণ করিয়া, মহর্ষির কৃপায় অরণ্যানী মধ্যে এক বিচিত্র রাজধানী সংস্থাপিত করিয়াছিলেন। তাহার “বস্তু” অর্থাৎ ভূমি কপিলপ্রদত্ত বলিয়া, সেই রাজ্য ও রাজধানী কপিল-বস্তু নামে পরিচিত হয়। সে কত দিনের কথা, ইতিহাস তাহার তথ্যনির্ণয়ে অক্ষম। তাহার নিকটে এবং সমসময়ে কোলী নামক আরও একটী ক্ষত্রিয় জনপদ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। এই উভয় ক্ষত্রিয় রাজ্যের অধিবাসিবর্গের মধ্য বৈবাহিক সম্বন্ধ সংস্থাপিত হইয়া, হিমালয়-পাদমূলে শাক্যশাখার ক্ষত্রিয়বংশের শৌর্য বীৰ্য্য সৰ্ব্বত্র জয়যুক্ত হইয়াছিল। কপিলবস্তুর জয়সেনের পুত্র সিংহনুর সহিত কোলীরাজ ঔককের কন্যা কাঞ্চনার, এবং ঔককপুত্ৰ অঞ্জনের সহিত জয়সেনদুহিতা যশোধরার উদ্বাহ কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হয়। অঞ্জন খৃষ্টাবির্ভাবের ৬৯১ বৎসর পূর্বে যে অব্দগণনা প্রবর্তিত করেন, তাহা “অঞ্জনা” নামে পরিচিত। দশম অঞ্জনাব্দে অঞ্জনের ভাগিনেয় কাঞ্চনার পুত্র শুদ্ধোদনের জন্ম হয়। দ্বাদশ অঞ্জনাব্দে অঞ্জনের কন্যা মায়াদেবী জন্মগ্রহণ করেন। শুদ্ধোদনের ঔরসে মায়াদেবীর গর্ভে, ৬৮ অঞ্জনাব্দের বৈশাখী পূর্ণিমায় মঙ্গলবাসরে ভগবান শাক্যসিংহ জন্মগ্রহণ করেন।

শাক্যসিংহের আবির্ভাবকাল অদ্যাপি বহুবিতর্কে আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। মুখোপাধ্যায় মহাশয় ৬৮ অঞ্জনাব্দ গ্রহণ করিয়া, খৃষ্টাবির্ভাবের পূর্ববর্তী ৬২৩ অব্দে শাক্যসিংহের আবির্ভাব কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। এবিষয়ে নানা মতভেদ থাকিলেও, তাহাতে কপিলবস্তুর স্থাননির্দেশে গোলযোগ ঘটিবার সম্ভাবনা নাই। শাক্যজীবনের নানা কাহিনী নানাভাষায় নানারূপে লিপিবদ্ধ হইলেও তাঁহার জীবনী সকল গ্রন্থেই কয়েকটি বিশেষ ভাগে বিভক্ত হইয়াছে। তাঁহার জন্ম, শিক্ষা, গৃহত্যাগ, সাধন ও ধর্মপ্রচারের প্রথম ও শেষ উদ্যমের কাহিনী সকল গ্রন্থেই প্রায় একরূপ। সকলেই বলেন, তিনি কপিলবস্তুর অদূরবর্তী লুম্বিনীবনে ভূমিষ্ঠ হইয়া কুশী নগরের শালবনে নিৰ্ব্বাণলাভ করেন। এই উভয় স্থলেই রাজাধিরাজ অশোক স্তম্ভস্থাপন করিয়া স্থাননির্দেশ করিয়াছিলেন। সে স্তম্ভ ও স্তম্ভলিপি বহু পরিব্রাজকের ভ্রমণ-কাহিনীতে উল্লিখিত। এ পর্যন্ত যত স্থান জন্মস্থান বলিয়া বিঘোষিত হইয়াছিল, তথায় অশোকস্তম্ভ দেখিতে পাওয়া যায় নাই। মুখোপাধ্যায় মহাশয় যাহাকে জন্মস্থান বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, তথায় এই পুরাতন অশোকস্তম্ভ আবিষ্কৃত হইয়াছে।

রাজপুত্র হইলেও শাক্যসিংহের জন্ম বা মৃত্যু রাজপ্রাসাদে সংঘটিত হয় নাই;–উভয় ঘটনাই বনান্তরালে সংঘটিত হইয়াছিল। আসন্নপ্রসবা মায়াদেবী পতিগৃহ হইতে পিতৃগৃহে গমন করিবার সময়ে পথিমধ্যে শালবনে (মতান্তরে অশোকাননে) শাক্যসিংহ ভূমিষ্ঠ হইবার কথা সকল গ্রন্থেই দেখিতে পাওয়া যায়। এবিষয়ে কোন মতভেদ নাই। এই স্থান বৌদ্ধগ্রন্থে “লুম্বিনীবন” নামে পরিচিত। অশোক স্তম্ভের ন্যায় তথায় মায়াদেবীর মন্দির নামে একটি মন্দিরও নির্মিত হইয়াছিল। তাহা বহুকাল বৌদ্ধতীর্থরূপে পরিগণিত হইয়া পুনঃপুনঃ সুসংস্কৃত হইয়া বহুদিন তীর্থযাত্রিগণের আনন্দবর্ধন করিয়া অবশেষে ভূগর্ভে প্রোথিত হইয়া পড়িয়াছিল। মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের চেষ্টায় তাহার ভিত্তিমূল আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহাতে খৃষ্টাবির্ভাবের ও গ্রীক অভিযানের পূৰ্ব্ববর্তী সময়ের ভারতীয় ইষ্টকালয় নির্মাণের অপূৰ্ব্ব কৌশল দেদীপ্যমান। যাঁহারা আমাদের স্থপতিবিদ্যা গ্রীকঅনুকরণে সমুদ্ভূত বলিয়া ইতিহাস রচনা করিয়া থাকেন, তাঁহারা ইহাতে অনেক নূতন তথ্য লাভ করিতে পারিবেন। মানুষের গৃহনির্মাণ প্রয়াস অতীব পুরাতন বলিয়াই স্বীকার করিতে হইবে। তাহা দীর্ঘকালে ধীরে ধীরে নানা কৌশলের উদ্ভাবন করিয়া শিল্পসৌন্দর্য্যের অবতারণা করিয়াছিল। মায়াদেবীর মন্দিরের ভিত্তিমূলে এখনও যে রচনাকৌশল ও শিল্পসৌন্দর্য্যের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহা অতি পুরাকালে প্রচলিত না হইলে, সহসা কপিলবস্তুর সান্নিধ্যে প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারিত না। কালপ্রভাবে এই সকল কীৰ্তিচিহ্ন বিলুপ্ত হইয়াছে বলিয়া অনেকে নানা ঐতিহাসিক পাণ্ডিত্য প্রকাশের অবসরলাভ করিয়া আমাদের মৌলিকতার সন্দেহ উৎপাদন করিতেছেন। এরূপ ঐতিহাসিক গবেষণা অপেক্ষা মায়াদেবীর মন্দিরের একখানি পুরাতন ইষ্টক অধিক বিশ্বাসযোগ্য। মুখোপাধ্যায় মহাশয় সেই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের আবিষ্কার করিয়া গ্রীক-অনুকরণবাদী ইতিহাসলেখকগণের তর্কবিতর্কের অসারতা প্রদর্শন করিয়া দিয়াছেন।

শুদ্ধোদনের রাজপ্রাসাদ “ধাৰ্তরাষ্ট্র” নামে পরিচিত ছিল। তাহা নদীতীরে প্রাচীর ও পরিখাবেষ্টিত দুর্গমধ্যে অবস্থিত ছিল। সেকালের দুর্গনিৰ্মাণকৌশল কিরূপ ছিল, সংস্কৃত সাহিত্যে তাহার কিছু কিছু নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায়। আধুনিক সময় পৰ্য্যন্তও ভারতীয় দুর্গরচনার সেই পুরাতন পদ্ধতি অবলম্বিত হইত; তাহা পৌরাণিক বর্ণনার সহিত দুর্গাদির চিত্র দর্শন করিলেই বুঝিতে পারা যায়। প্রাচীর এবং পরিখা দুর্গের সাধারণ বাহ্যদেশ। প্রাচীরে দ্বার থাকিত; দ্বারে যন্ত্রারূঢ় কপাট থাকিত; তাহা রক্ষা করিবার জন্য অস্ত্রশস্ত্র সুবিন্যস্ত হইত। যুধিষ্ঠির শরশয্যাশায়ী ভীষ্মদেবের নিকট তত্ত্বজিজ্ঞাসু হইলে, তিনি যে সকল উপদেশ দান করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে দুর্গরচনারও উপদেশ প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাহা মহাভারতীয় শান্তিপৰ্ব্বের অন্তর্গত। শুদ্ধোদনের রাজদুর্গের যে বর্ণনা ললিতবিস্তরে প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাও এই শ্রেণীর। এই দুর্গান্তর্গত রাজপ্রাসাদ শাক্যসিংহের শৈশবলীলার তীর্থরূপে বৌদ্ধগ্রন্থে সমাদর প্রাপ্ত হইয়াছিল।

শাক্যসিংহ ভূমিষ্ঠ হইবার এক সপ্তাহ মধ্যে মায়াদেবী স্বর্গারোহণ করায়, তদীয়া কনিষ্ঠা ভগিনী মহাপ্রজাবতী নাম্নী শুদ্ধোদনের দ্বিতীয়া মহিষী সন্তান পালনের ভার গ্রহণ করেন। শাক্যগণ দেবপূজক ছিলেন; শৈব ছিলেন বলিয়াই প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। শাক্যসিংহকে লুম্বিনীবন হইতে প্রাসাদে আনয়ন করিবার সময়ে কুলপ্রথা অনুসারে এক দেবমন্দিরে তাঁহার জাতকৰ্ম্ম সম্পন্ন হইয়াছিল। এই মন্দির বৌদ্ধসাহিত্যে নানা নামে অভিহিত; কাহারও মতে ইহার নাম যক্ষমন্দির; কাহারও মতে–ঈশ্বরমন্দির। এই মন্দিরে শিব, স্কন্দ, নারায়ণ, বৈশ্রবণ, শত্রু, কুবের, চন্দ্র, সূৰ্য্য, ব্রহ্মাদির দেবমূৰ্ত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইহাও কালে বৌদ্ধ তীর্থযাত্রিবর্গের দর্শনীয় স্থান বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিল।

জাতকৰ্ম্মের পর নামকরণ সময়ে নবকুমার সিদ্ধার্থ বা সৰ্বসিদ্ধার্থ নামে অভিহিত হইয়া পৌরজনের আনন্দবর্ধন করিবার সময়ে, তাঁহার কোষ্ঠীফল প্রচারিত হইয়া শুদ্ধোদনকে নিরতিশয় বিষণ্ণ করিয়া তুলিয়াছিল। সকলেই গণনা করিয়া বলিয়াছিলেন, রাজকুমার সংসারে থাকিলে রাজচক্রবর্তী হইবেন; সন্ন্যাস গ্রহণ করিলে বুদ্ধত্ব লাভ করিবেন। শুদ্ধোদন পুত্রকে মহারাজচক্রবর্তী করিবার জন্যই লালায়িত হইয়াছিলেন এবং তদনুরূপ শৌর্যবীৰ্য্য বিবর্ধক ব্যায়ামাদির শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করিয়া পুত্রের জন্য রম্য, সুরম্য ও শুভ নামক তিনটি অট্টালিকা নির্মাণ করাইয়াছিলেন। রাজকুমার সিদ্ধার্থ ভগবান কৌশিকের নিকট শাস্ত্র, এবং শাকদেবের নিকট শস্ত্রশিক্ষা করিয়া, ২৯ বৎসর বয়সে রাজ্য, রাজসিংহাসন, শিশুপুত্র রাহুল ও ধর্মপত্নী যশোধরাকে (মতান্তরে গোপা) পরিত্যাগ করিয়া পূর্ণিমা রজনীর প্রশান্ত জ্যোৎস্নালোকে ‘মঙ্গলদ্বার” নামক নগরভোরণ অতিক্রম করিয়া গোপনে কপিলবস্তু হইতে পলায়ন করিয়াছিলেন। ইহারই নাম– মহাভিনিষ্ক্রমণ।

প্রভাতে কপিলবস্তু হাহাকারে পরিপূর্ণ হইয়া গেল; সিদ্ধার্থের কোষ্ঠীফল তাঁহাকে মহারাজচক্রবর্তী না সাজাইয়া সন্ন্যাসী সাজাইয়া সংসার হইতে বিদায় করিয়া দিল। ছয় বৎসরের মধ্যে সিদ্ধার্থ আর সে শোকসন্তপ্ত রাজপুরীতে পদার্পণ করেন নাই। তিনি তখন মগধান্তৰ্গত উরুবিন্দ্বের বোধিদ্রুমমূলে দীর্ঘতপস্যার ধ্যানমগ্ন। তাহার পর সিদ্ধার্থ সিদ্ধকাম হইয়া যখন শৈশবের লীলাভূমি কপিলবস্তুর নগরোপকণ্ঠে সশিষ্যে উপনীত হইলেন, তখন সে নবীন সন্ন্যাসীর অলৌকিক পুণ্যপ্রতাপে কপিলবস্তু অভিভূত হইয়া পড়িল; রাজা, রাজপুত্র, রাজামাতা, কত লোকে নবধর্মে দীক্ষিত হইয়া সম্ভোগের সিংহাসনে সংযমকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য মহামন্ত্র গ্রহণ করিতে লাগিল।

সে দিন কপিলবস্তুর শাক্য রাজধানী শাক্যসিংহের পুণ্যাশ্রমে পরিণত হইয়াছিল। সংসর্গগুণে লোকচিত্ত সংসারাসক্তি বিচ্ছিন্ন করিয়া সদগতিকামনায় ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিল। সিদ্ধার্থের সন্ন্যাসগ্রহণে রাজা শুদ্ধোধন দ্বিতীয় পুত্র নন্দকে সিংহাসনদানের সংকল্প করিয়াছিল। বৃদ্ধ শুদ্ধোদন অভিষেকের আয়োজন করিয়া আনন্দোৎসবের সূচনা করিয়াছেন; নন্দ তাহা উপভোগ করিবার পূর্বেই জ্যেষ্ঠের চরণতলে পতিত হইয়া সিংহাসন ও ছত্রদণ্ডের পরিবর্তে সন্ন্যাসীর চীবরখণ্ড ও ভিক্ষাপাত্র গ্রহণ করিলেন। সিদ্ধার্থের শিশুপুত্র রাহুল, আনন্দ, অনিরুদ্ধ প্রভৃতি শাক্যরাজকুমারগণ দলে দলে সন্ন্যাসগ্রহণ করিতে আরম্ভ করিলেন; অন্তঃপুরকামিনীগণও মন্ত্র গ্রহণের জন্য লালায়িত হইয়া উঠিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা অল্পই সংঘটিত হইয়াছে।

ইহার পর রাজকুমার সিদ্ধার্থ আরও কয়েকবার কপিলবস্ত প্রদেশে উপনীত হইয়াছিলেন। তিনি বৈশালীতে অবস্থান করিবার সময়ে শাক্য ও কোলী রাজবংশের মধ্যে তুমুল কলহ উপস্থিত হয়। উভয় পক্ষের সৈন্যসামন্ত অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া রোহিণীতটে সমবেত হইয়াছে, এই সংবাদ পাইয়া সিদ্ধার্থ আসিয়া শান্তির প্রতিমূর্তিরূপে বিবদমান সেনাতরঙ্গের মধ্যে অচল গিরিশৃঙ্গবৎ দণ্ডায়মান হইলেন। হিংসা নিরস্ত হইয়া গেল; সাম্য ও মৈত্রীর মহামন্ত্র ধবনিত হইয়া উঠিল; শোণিতলোলুপ সেনাদলের বহু ব্যক্তি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করিয়া শস্ত্রের পরিবর্তে শাস্ত্রশাসন স্বীকার করিয়া ধৰ্ম্ম, সংঘ ও বুদ্ধের জয়ধবনি বিঘোষিত করিল।

ইহার পর বুদ্ধ শুদ্ধোধনের দিন ক্রমে ফুরাইয়া আসিতে লাগিল। তখন সিদ্ধার্থ আসিয়া রুগ্নশয্যাপার্শ্বে উপবেশন করায়, শুদ্ধোধন সহাস্যবদনে আনন্দলোকে মহাপ্রস্থান করিলেন। সিদ্ধার্থ পুনরায় বনগমনে সমুদ্যত হইলে, পঞ্চশত শাক্যরমণী তাঁহার অনুগমনে সমুদ্যত হইলেন। তখনও রমণীগণ সন্ন্যাসের অধিকারে বঞ্চিত ছিলেন। আনন্দের নিরতিশয় কাতরোক্তিতে দয়ার্দ্র হইয়া সিদ্ধার্থ এই সময়ে প্রথম ভিক্ষুণীদল গঠিত করিলেন। এইরূপে শাক্যবংশের অধিকাংশ নরনারী বৌদ্ধধর্ম অবলম্বন করায়, কপিলবস্তুর পুণ্যভূমি শাক্যসিংহের জীবিতকালেই তীর্থরূপে সমাদর লাভ করিল।

শাক্যসিংহের জন্মভূমি পুণ্যতীর্থ মধ্যে পরিগণিত হইয়া বৌদ্ধ তীর্থযাত্রিবর্গের নিরতিশয় যত্ন ও অর্থব্যয়ে নিয়ত সুসংস্কৃত অবস্থায় দীর্ঘকাল লোকসমাজে সুপরিচিত থাকিতে পারিত। কিন্তু শাক্যসিংহের পরিনির্বাণ লাভের পূর্বেই বিরুদ্ধক নামক কোশলাধিপতির ক্রোধবহ্নি কপিলবস্তু ভস্মীভূত করিয়া তাহাকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করিয়াছিল। শাক্যসিংহ সে শ্মশানে পদার্পণ করিয়া হতাবশিষ্ট শাক্যগণকে আশ্রয়দান করায়, কপিলবস্তুর অনতিদূরে শাক্যগণ নতুন বাসস্থান নিৰ্মাণ করিয়া পুরাতন রাজধানী পরিত্যাগ করে। কপিলবস্তুর পুরাতন রাজপথপার্শ্বে যে সকল চৈত্য, বিহার, আরাম প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল, তাহা ক্রমে ধবংসমুখে পতিত হইয়া স্থাননির্দেশের চেষ্টা বিফল করিবার উপক্রম করে। তখন দেবানাং প্রিয় প্রিয়দশী (অশোক) তদীয় রাজ্যাব্দের একবিংশতি বর্ষে বৌদ্ধসন্ন্যাসী উপগুপ্তের সঙ্গে এই পুণ্যতীর্থে উপনীত হইয়া স্তম্ভ স্থাপন করিয়া ও স্তম্ভলিপি খোদিত করাইয়া স্থান নির্দেশের সহায়তা করিয়াছিলেন। কালক্রমে তাহাও বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

কপিলবস্তু ও তন্নিকটবর্তী যে সকল স্থান তীর্থরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল, তন্মধ্যে রাজপ্রাসাদ, মঙ্গলদ্বার, লিপিশালা, জন্মস্থান, যক্ষমন্দির, মায়াদেবীর মন্দির প্রভৃতি বিশেষরূপে উল্লেখযোগ্য। অশোকের পর খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রারম্ভে ফাহিয়ান এই সকল তীর্থ দর্শনে উপনীত হইয়া, পূৰ্ব্বচিহ্নাদি বিলুপ্ত হইবার কথা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তখন এখানে রাজা ছিল না, প্রজা ছিল না, ছিল কেবল অরণ্যের পর অরণ্য এবং অরণ্যবিহারী অল্পসংখ্যক সন্ন্যাসী। তাহার পর খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে হিয়াঙ্গ থসাঙ্গ আসিয়া দেখিয়াছিলেন–সীমাচিহ্নাদি সমস্তই বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে! তখনও যাহা সম্পূর্ণরূপে ভুগর্ভে প্রোথিত হইয়া পড়ে নাই, কালে তাহাও অদৃশ্য হইয়া পড়িয়াছিল।

কপিলবস্তু কোথায় ছিল, তাহার সাধারণ জ্ঞান লাভ করিলেও, ঠিক কোন স্থান কপিলবস্তু, তাহা নির্ণয় করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছিল। সে অঞ্চলের নতোন্নত ভূমিভাগ সৰ্ব্বত্র একরূপ,–সৰ্ব্বত্রই ভগ্নস্তূপ, সৰ্ব্বত্রই অরণ্যের পর অরণ্য! মুখোপাধ্যায় মহাশয় এই অরণ্যসমাচ্ছন্ন তরাই অঞ্চলে উপনীত হইয়া, তৌলিভা নামক নেপালী তহশিল কাছারি হইতে অনুসন্ধানকাৰ্য্য আরম্ভ করেন। তথায় অদ্যাপি এক পুরাতন শৈব মন্দির দেখিতে পাওয়া যায়। তাহাতে অদ্যাপি সেবাপূজা নিৰ্বাহ হইয়া থাকে। এই স্থানে নানা পুরাকীর্তির চিহ্ন দর্শন করিয়া, মুখোপাধ্যায় মহাশয় ইহাকেই বৌদ্ধসাহিত্যবর্ণিত যক্ষমন্দির কল্পনা করিয়া অনুসন্ধান কাৰ্যে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। ইহার এক ক্রোশ উত্তরে তিলৌরা। তাহা এখনও পাহাড়ীদিগের নিকট তিলৌরাকাট নামে পরিচিত। কোট শব্দের অর্থ দুর্গ। মৃত্তিকাখনন করাইয়া মুখোপাধ্যায় মহাশয় সে দুর্গের ভিত্তিমূলাদি আবিষ্কৃত করিয়াছেন। নানা প্রমাণে তাহাই কপিলবস্তুর রাজদুর্গ বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে।

ভগবানপুর তহশিল-কাছারীর এক ক্রোশ উত্তরে “রুম্মিন দেয়ী” নামে একটি পুরাতন স্থান দেখিতে পাওয়া যায়। তাহাই “লুম্বিনীবন” নামক বৌদ্ধতীর্থ; শাক্যসিংহের জন্মস্থান। লুম্বিনীবনে মায়াদেবীর মন্দির, মায়াদেবীর প্রস্তরমূৰ্ত্তি এবং অশোকস্তম্ভ আবিষ্কৃত হইয়া সকল সন্দেহ নিরস্ত করিয়া দিয়াছে! লুম্বিনীবন এইরূপে নিঃসন্দেহে নির্ণীত হইয়া, কপিলবস্তুর স্থাননির্দেশে যথেষ্ট সহায়তা করিয়াছে। এখন অতীতের স্বপ্ন-সমুদ্র সন্তরণ করিয়া সকলেই সেই ইতিহাসবিখ্যাত পুণ্যভূমি প্রত্যক্ষবৎ দর্শন করিয়া কৌতূহল চরিতার্থ করিতে পারিবেন। একজন বঙ্গবাসীর চেষ্টায় যে এই লুপ্তোদ্ধার সাধিত হইয়াছে, তাহা চিরদিন ইতিহাসপাঠকের স্মৃতিপথে আরূঢ় হইয়া বাঙ্গালীর মুখ উজ্জ্বল করিবে।

কি ছিল, কি হইয়াছে, তাহা চিন্তা করিলে, ভারতবর্ষের ইতিহাসের অভাব আরও বিশেষ ভাবে অনুভূত হয়! কিন্তু আধুনিক অনুসন্ধানপরায়ণ পণ্ডিতবর্গের অধ্যবসায়ে যে সকল কীৰ্তিচিহ্ন ক্রমশঃ আবিষ্কৃত হইতেছে, তদ্বারা পুরাকালের নানা ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশিত হইবার সম্ভাবনা হইতেছে। এ সময়ে যাঁহাদের সময় আছে, শক্তি আছে, স্বদেশের লুপ্তকীৰ্ত্তির উদ্ধার সাধনের পুণ্যপিপাসা আছে, তাঁহারা অধ্যবসায়ের সঙ্গে তথ্যসংকলনে অগ্রসর হইলে ভাল হয়। কোথায় কোন নূতন তথ্য আবিষ্কৃত হইতেছে, তাহার সংবাদ বহনের জন্য মাসিকপত্র অগ্রসর হইলে ঘরে বসিয়া পাঠকগণ নানা তথ্য সংকলন করিতে পারেন। প্রবাসী-সম্পাদক মহাশয় তজ্জন্য বহুযত্নে চিত্রাদি সংগ্রহ করিয়া, কপিলবস্তু ও পাটলিপুত্রের নবাবিষ্কৃত কীৰ্তিচিহ্নাদির বিবরণী আমার নিকট প্রেরণা করিয়া ধন্যবাদাহঁ হইয়াছেন।

প্রবাসী, ভাদ্র, ১৩০৯

তথ্যসূত্র

১ Report on a Tour of Exploration of the Antiquities in the Terrai, Nepal-By Babu Purna Chandra Mukerjea.

২ ‘‘দেয়ী” ‘‘দেবীর” অপভ্রংশ

শাক্যবুদ্ধ–বোধিদ্রুম

সেদিন একটি স্মরণীয় দিন। কেবল আমাদের দেশের সমসময়োজনের স্মরণীয় দিন নয়, পৃথিবীর সকল দেশের আগত ও অনাগত সকল নরনারীর চিরস্মরণীয় দিন। তাহা সার্ধ দ্বিসহস্র বৎসর পূৰ্ব্ববর্তী দিন। অদ্যাপি তাহার স্মৃতি বিমলিন হয় নাই।

সেদিন শাক্যরাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম ছয় বৎসরের দীর্ঘ তপঃক্লেশে কঙ্কালাবসার দেহভার বহন করিয়া স্খলৎ-চরণে বোধিদ্রুমের সন্ধানে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন।

নতোন্নত বালুকান্তরনিহিত অন্তঃসলিলা ফন্তুপ্রবাহে কয়েকটি দৃশ্যমান ক্ষীণ জলধারার সহিত যেখানে সমান অবস্থাপন্ন নৈরঞ্জনার সলিলধারা মিলিত হইয়াছে, তাহার অনতিদূরে নৈরঞ্জনা-তীরে উরুবিন্দ গ্রামোপকণ্ঠে এক বালুকা-প্রান্ত বহু মহামহীরূহ সমাচ্ছাদিত নিবিড় অরণ্যরূপে বৰ্তমান ছিল। তাহার মধ্যে আত্মহারা রাজকুমার মূল হইতে কাণ্ডে, কাণ্ড হইতে প্রকাণ্ডে, প্রকাণ্ড হইতে শাখায়, শাখা হইতে পত্ৰ-কিশলয়ে সতৃষ্ণ নয়নে দৃষ্টি সঞ্চারণ করিয়া এক বৃক্ষ হইতে বৃক্ষান্তরে গমন করিতেছিলেন। দিনদেবতা ক্রমে অস্তাচল-গমনোন্মুখ হইয়া শেষ কিরণ সম্পাতে বৃক্ষশির অনুরঞ্জিত করিতেছিলেন–বৃক্ষতলে সায়াহ্নের ছায়াধূসর অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হইতে গাঢ়তর হইয়া আসিতেছিল। দিনের অনুসন্ধানে যাহা মিলিল না, রজনীতে তাহা কেমন করিয়া মিলিবে–এইরূপ চিন্তাতে রাজকুমার সিদ্ধার্থ অধিক ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। তৎকালে তাঁহার অজ্ঞাতসারে আর একজন তাঁহার গতিবিধি লক্ষ্য করিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মণিময় বসনভূষণ অঙ্গলাবণ্য উদ্ভাসিত করিয়া রাখিয়াছে, মস্তকে নাগফণাচিহ্নিত মুকুট শোভা বদনমণ্ডলকে তাহা সমুজ্জ্বল করিয়া দীপ্তি দান করিতেছে। হস্তে বারিপূর্ণ তাঁহার মণিমাণিক্যখচিত সেচনঘট বহন করিয়া তিনি নিঃশব্দ পদসঞ্চারে, ধীরে– অতি ধীরে অনুগমন করিতেছিলেন।

ঘটনাক্রমে চারি চক্ষু সম্মিলিত হইবামাত্র উভয়েরই বিস্ময়ের অবধি রহিল না। এই সেই তাপস যে পরিচয় পাইবামাত্র অভিবাদন জানাইয়া সেচন-ঘট-বাহক কহিলেন, আমি নাগরাজ কুলিক,–সিদ্ধার্থ উপনীত না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার বোধিবৃক্ষ-মূলে জল-সেচন করিতে এবং তাহাকে আততায়ীর হস্ত হইতে রক্ষা করিতে দেবদেশে নিযুক্ত থাকিয়া দিন গণনা করিতেছিলাম। আপনার শুভাগমনে আমার বনবাসের অবসান হইল। এই সেই বোধিদ্রুম। সিদ্ধার্থ দ্রুমের দিকে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র রোমাঞ্চিত-কলেবরে চাহিয়া দেখিলেন নাগরাজ অন্তর্হিত তাঁহার স্থলে এক ক্ষুৎপিপাসাতুর বৃদ্ধ গৃহস্থ সঞ্চিত তৃণরাশি স্কন্ধে ধারণ করিয়া অবনতশিরে দণ্ডায়মান। সে কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ়। রজনীর অন্ধকার অল্পক্ষণ মধ্যেই পথের চিহ্ন বিলুপ্ত করিয়া দিবে; তথাপি সে সঞ্চিত তৃণভার বহন করিবার চেষ্টা করিলে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিবার পূর্বে শ্বাপদাক্রান্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করিতে বাধ্য হইবে। সিদ্ধার্থ তাহার নিকট কিঞ্চিৎ তৃণ ভিক্ষা করিলে, সে সমগ্র তৃণভার বৃক্ষমূলে নিক্ষেপ করিয়া গৃহাভিমুখে প্রস্থান করিল। তৃণগুলি সুবিস্তীর্ণ করিয়া আসন রচনা শেষ হইলে, ‘মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পাতন’ দৃঢ়সঙ্কল্প লইয়া তরুমূলে তৃণাসনে উপবিষ্ট রাজকুমার সম্বোধিলাভার্থ ধ্যানস্থ হইতে গিয়া শ্রুতিমধুর সঙ্গীতের এবং তাহার সঙ্গে নূপুরশিঞ্জন শ্রবণ করিয়া বিস্মিতনেত্রে চাহিয়া দেখিলেন, হাস্যে লাস্যে বনভূমি লীলায়িত করিয়া তরুণীগণ তাঁহাকে প্রলুব্ধ করিতে আসিতেছে। তাহারা নানা ভাবে বহুবার বিফলমনোরথ হইয়াও তাঁহাকে আবার উপদ্রুত করিতে আসিতেছে। তাহাদের মনস্কামনা আবার ব্যর্থ হইবামাত্র বনভূমি বিকল্পিত করিয়া বিকট অট্টাহাস্য ধবনিত হইয়া উঠিল। উৎকট অবয়বধারী মার সৈন্যগণ উৰ্দ্ধ হইতে লোষ্ট্র নিক্ষেপে আক্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। আকাশ ঘনান্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া আসিল। ক্কচিৎ কোন বৃক্ষান্তরাল হইতে চন্দ্ররশ্মি আসিতে পারিত; কিন্তু চন্দ্রমণ্ডল সৰ্ব্বগ্রাস-গ্রহণে রাহু-কবলিত হইয়া অন্ধকারে বিলীন হইয়া গেল। আসিল মেঘ, আসিল দিগন্তপ্রসারিত বিদ্যুদ্দামের ক্ষণস্থায়ী আবির্ভাব। তাহার সঙ্গে মেঘমালা, বজ্রনির্ঘোষ, কলকাঁপাত, অশনিপাত, অবিরল বারিপাত, ভীম প্রভঞ্জন এবং ঘনঘোর ভূকম্পন। সিদ্ধার্থ দক্ষিণ হস্তের তর্জনী সম্প্রসারিত করিয়া তাহার অগ্রভাগ দ্বারা ভূমি স্পর্শ করিলেন, এবং সাক্ষী হইবার জন্য মাতা বসুন্ধরাকে সাগ্রহে আহ্বান করিলেন। বসুন্ধরা উঠিতে না উঠিতে সকল উপদ্রব শান্ত হইয়া গেল। মার পরাভব স্বীকার করিয়া দলবল লইয়া চিরদিনের মত অন্তর্হিত হইল। সুমার্জিত সুনীল আকাশে আবার চন্দ্রকিরণ সমুদ্ভাসিত হইয়া বারি-বিধৌত পত্রাবলির উপর শোভা বিস্তার করিল।

রজনী অবসানপ্রায়, এমন সময় ধ্যানভঙ্গে নেত্র উন্মীলিত করিয়া সিদ্ধার্থ নিকটস্থ একটি মহামে দৃষ্টিপাত করিবামাত্র এক বিমল আলোকমালা দর্শন করিলেন; বুঝিলেন সিদ্ধার্থ সিদ্ধার্থ হইয়াছেন। মহাবোধি-মূলে সম্বোধি লাভ করিয়াছেন। তিনি আর শাক্যসিংহ নহেন–তিনি এখন বুদ্ধ।

সেই দিন হইতে সেই তরুমূল মহাতীর্থে পরিণত হইল। শাক্যবুদ্ধ সারনাথে গিয়া ধর্মচক্র প্রবর্তন আরম্ভ করিবার পর প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল নানা স্থানে পরিভ্রমণ ও ধর্মোপদেশ দান করিয়া কুশি নগরে দেহরক্ষা করিয়াছিলেন। নানা দেশের শিষ্য-শিষ্যাগণ বোধিদ্রুম-দর্শন-লালসায় সমবেত হইতেন। ভারত-সম্রাট অশোক আচাৰ্য্য উপগুপ্তের সঙ্গে বোধিদ্রুম-মূলে উপনীত হইলে, উপগুপ্ত কথাপ্রসঙ্গে কুলিক নাগরাজের কাহিনী বিবৃত করিয়াছিলেন। তাহা পালি ভাষায় লিখিত দিব্যাবদান-গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায়। রাজাধিরাজ অশোকের আদেশে বোধিম, এবং বজ্ৰাসন নামে খ্যাত শাক্যবুদ্ধের সিদ্ধাসন সুরক্ষিত করিবার জন্য এক প্রস্তর-বেষ্টনী নির্মিত হইয়াছিল। এখন তাহা দেখিতে পাওয়া যায় না; কিন্তু এক সময়ে তাহার চিত্র ভারতবর্ষের বিবিধ বৌদ্ধ স্থাপত্যের শোভা বর্ধন করিয়াছিল। ভারতের কারুকার্যখচিত প্রস্তরে তাহার যে প্রতিকৃতি খোদিত হইয়াছিল, তাহার নিম্নে অশোকের সময়ের প্রাচীন অক্ষরে লিখিত আছে :

ভগবতে শাকমুনিনো বোধি—

খৃষ্টাবির্ভাবের পূর্ববর্তী কালে এবং পরবর্তী প্রথম কালেও যে এই অশোক কীৰ্ত্তি বৰ্তমান ছিল, তাহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। তাহার পর রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পতিত হইয়া বহু বৌদ্ধ কীর্তি ধবস্ত বিধবস্ত অথবা সমূলে উৎপাটিত হইয়াছিল। গৌড়েশ্বর শশাঙ্ক মহাবোধি আক্রমণ করিয়া পবিত্র বোধিদ্রুম উৎখাত করিয়া তাহার মূল, কাণ্ড, প্রকাণ্ড, শাখা, প্রশাখা অগ্নিসংযোগে দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছিলেন। চৈনিক তীর্থযাত্রী এইরূপ এক আখ্যায়িকা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। ভারত-প্রত্নতত্ত্ব-বিভাগের স্বনামখ্যাত অক্লিষ্টকৰ্ম্মা কর্মচারী বেগলার সাহেব ভূগর্ভ খননে অনেক অঙ্গার বাহির করিয়া আখ্যায়িকার সত্যতার নিদর্শন দেখাইয়া দিয়াছিলেন। ভূগর্ভে লুক্কায়িত অগ্নি চাপ হইতে রক্ষিত কোন এক পরিত্যক্ত উপমূল হইতে কালে আবার আকস্মিক ভাবে বোধিদ্রুম উদ্ভূত হইবার কথা প্রচলিত হইয়াছে। তাহা সত্য হউক অথবা নূতন বৃক্ষ সংরক্ষিত হইয়া থাকুক স্থান সম্বন্ধে সংশয় নাই। এখন সেখানে বোধিমণ্ড নামক এক সুদৃঢ় বেদিকা, তাহার উপর বোধিবৃক্ষ এবং তাহার তল-সংস্পৃষ্ট বজ্ৰাসন এবং তাহারি সম্মুখে মহাবোধি মন্দিরের পশ্চাৎভাগের সুদৃঢ় ভিত্তি সম্মুখের দৃশ্য আবৃত করিয়া রাখিয়াছে। বোধিমঞ্চের ভিত্তিগাত্রে একখণ্ড প্রস্তরে কুলিক নাগরাজের খোদিত মূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। তথাকার স্থাপত্যের এবং ভাস্কর্যের বহু নিদর্শন বহুবার বহু ভাষায় সচিত্র গ্রন্থে ও প্রবন্ধে ব্যাখ্যাত হইয়াছে এবং পুনঃপুনঃ হইতেছে। কিন্তু কুলিক নাগরাজের চিত্রখানির কথা বা প্রতিকৃতি প্রকাশিত হয় নাই। উহা কবে নির্মিত ও বোধিমঞ্চে সংযুক্ত হইয়াছিল, তাহাও জানিতে পারা যায় নাই। কিন্তু বহু দিনের বহু তীর্থযাত্রী ঘৃত-চন্দনে সংবর্ধনা করিতে গিয়া নাগরাজের মূৰ্ত্তি এমন ভাবে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন যে, তাহা দেখিলেও সহসা চিনিবার উপায় ছিল না।

আমরা যখন মহাবোধিতে প্রত্নতত্ত্বের অনুসন্ধানে ব্যাপৃত, তৎকালে শ্রীমতী ষ্টেলা ক্ৰামরিসও আমাদের সঙ্গে অকাতরে অনুসন্ধান ক্লেশ বহন করিয়াছিলেন। তাঁহাকে কুলিক নাগরাজের কাহিনী পড়িয়া শুনাইবামাত্র, তিনি বহু যত্নে স্বহস্তে মূর্তিখানি সুপরিষ্কৃত করেন। তাহার একখানি আলোকচিত্র গৃহীত হয়। একখানি মাত্র ছবি ছাপিবার পর কাঁচফলক নষ্ট হইয়া গিয়াছে। পুরাকীৰ্ত্তির বহুসংখ্যক অপ্রকাশিত নিদর্শনের ন্যায় এই চিত্রখানিও আমার দপ্তরে পড়িয়া ছিল। আর মহাবোধি দর্শনের সম্ভাবনা নাই। জরাজীর্ণ কলেবরে এখন ভ্রমণ-ক্লেশ স্বীকারে অসমর্থ হইয়া পড়িয়াছি। কুলিক নাগরাজের চিত্রখানি প্রকাশিত করিবার জন্য অনুরুদ্ধ হইয়া মুখে বলিয়া দিয়া অন্যের সাহায্যে এ প্রবন্ধ লিখাইয়া দিলাম। এখন আর আলোকচিত্রের সাহায্যে ইহার ব্যাখ্যা করিবার শক্তি নাই। ইহার শিল্প-সুষমার যথাযোগ্য আলোচনা করিবারও শক্তি নাই। ইহার প্রতি সর্বসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ইহা মুদ্রিত করাইলাম। ইহার সহিত বুদ্ধ-ভাস্কর্যের ইতিহাসের সম্পর্ক আছে। বুঝি বা তাহা কাহার না কাহার আলোচনা প্রভাবে একদিন না একদিন গৌড় শিল্পকলার বিজয় ঘোষণা করিবে।

ভারতবর্ষ, কার্তিক, ১৩৩৫

ফা-হিয়ান

উপক্রমণিকা

অজ্ঞানকে জ্ঞানদান করা, অসভ্যকে সভ্যতা-সোপানে উত্তোলন করা, আত্মসুখ তুচ্ছ করিয়া পরসেবায় জীবন উৎসর্গ করা,–ইহাতে এমন এক উগ্র উত্তেজনা নিহিত আছে যে, আধুনিক খৃষ্টিয়ানগণ তদ্বারা উত্তেজিত হইয়া কত দেশে কত বেশে মানবসমাজের কল্যাণ কামনায় ধাবিত হইয়াছেন। এক সময়ে আমাদের দেশের বৌদ্ধসন্ন্যাসিগণও এইরূপে উত্তেজিত হইয়া পবিত্র প্রচারব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন;-তাহার ইতিহাস অতীতের স্বপ্নসমুদ্রে বিলীন হইয়া গিয়াছে। খৃষ্টধর্ম প্রবর্তিত হইবার বহুপূৰ্ব্বে ভারতীয় বৌদ্ধমত এসিয়া খণ্ডের জলে স্থলে পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তৎকালে অন্যান্য দেশের ন্যায় মহাচীন সাম্রাজ্যেও বৌদ্ধশিক্ষা প্রচলিত হয়। তাহার সহিত সাম্রাজ্যলাভের লোভের গন্ধ মিশ্রিত না থাকায়, তদুপলক্ষে যুদ্ধবিগ্রহের সূচনা হয় নাই; নিতান্ত শনৈঃ শনৈঃ ‘সূত্র বিনয় ও অভিধৰ্ম্মের’ শিক্ষা প্রচারিত হইয়াছিল। তাহার ফল অদ্যাপি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয় নাই। ভারতবর্ষ হইতে বৌদ্ধমত তিরোহিত হইলেও, অদ্যাপি তিববতে, চীনে, শ্যামে, জাপানে, ব্রহ্মে সিংহলে শাক্য সিংহের শিক্ষা সমাদরলাভ করিতেছে।

শাক্য মতাবলম্বিতাগণ আপনাদিগকে “শাক্য পুত্র” বলিয়া পরিচিত করিয়াছিলেন। তাঁহাদের অটল বিশ্বাস, অবিচলিত শ্রদ্ধা ও অদম্য অধ্যবসায় ধর্মজগতের ইতিহাসে চিরদিন সমাদর লাভ করিবে। এই বিশ্বাস শ্রদ্ধা ও অধ্যবসায় অবলম্বন করিয়া বহুসংখ্যক চৈনিক শাক্যপুত্র জ্ঞান ধর্ম ও পুণ্যসঞ্চয় কামনায় ভারতবর্ষাভিমুখে তীর্থযাত্রা করিয়াছিলেন। তাঁহাদের গ্রন্থে বৌদ্ধশিক্ষার বিস্তৃত বিবরণের সঙ্গে ভারতবর্ষের পুরাকাহিনী সংযুক্ত হইয়া রহিয়াছে।

পাশ্চাত্য পণ্ডিতবর্গের কৃপায় এই সকল তীর্থযাত্রাকাহিনী ক্রমশঃ সভ্যসমাজে প্রকাশিত হইতেছে। যাঁহারা তীর্থযাত্রী নামে কথিত, তন্মধ্যে ফা হিয়ান ও হিয়াঙ্গ থসাঙ্গের নামমাত্রই বঙ্গসাহিত্যে সুপরিচিত; কিন্তু তাঁহাদের কথাও নিতান্ত সংক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হইয়াছে। তাহাতে কৌতূহল পরিতৃপ্ত হয় না।

বঙ্গসাহিত্য ক্রমশঃ যেরূপ বিপুলতা লাভ করিতেছে, তাহার উন্নতি করে ধনাঢ্য-সম্প্রদায় ক্রমশঃ যেরূপ উৎসাহদান করিতেছেন এবং তাহাকে জ্ঞান গৌরবে সমুন্নত করিবার জন্য সুশিক্ষিত সেবকদল যেরূপ আগ্রহে অগ্রসর হইতেছেন, তাহাতে আশা হয়, শীঘ্র হউক বা বিলম্বে হউক, বঙ্গসাহিত্যে স্বদেশের পুণ্যকাহিনী সমস্তই সংকলিত হইবে। এই সংকলন কাৰ্যে এখন পর্যন্ত পাশ্চাত্য পণ্ডিতবর্গের গ্রন্থমাত্রই আমাদের প্রধান সম্বল; তদবলম্বনে ফা হিয়ানের জীবনকাহিনী সংকলিত হইল।

যে সকল চৈনিক বৌদ্ধাচাৰ্য ভারতবর্ষে তীর্থযাত্রা করেন, তন্মধ্যে ফা হিয়ানকেই ইতিহাসপাঠকগণের পথ প্রদর্শক বলিতে হইবে। তাঁহার ভ্রমণকাহিনী ভারতবর্ষের বিলুপ্ত ইতিহাসের বহু জ্ঞাতব্য তথ্য প্রকাশিত করিয়াছে। তিনি খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রারম্ভে ভারতভ্রমণে বহির্গত হন, তৎকালে ভারতবর্ষের অবস্থা কিরূপ ছিল, তাহা জানিতে কাহার না কৌতূহল হয়?

ফা হিয়ান জন্মগ্রহণ করিবার বহুপূৰ্ব্বে চীন দেশে বৌদ্ধমত প্রচারিত হয়। মহাচীন সাম্রাজ্য ভারতবর্ষের নিতান্ত নিকটবর্তী হইলেও, একালের ন্যায় সেকালেও সহজে চীন সাম্রাজ্যে উপনীত হইবার উপায় ছিল না। চীনের পশ্চিমাঞ্চলে মরুভূমি, পূৰ্বাঞ্চল সমুদ্রবেষ্টিত, সমুদ্রপথে গমনাগমন করা ভিন্ন স্থলপথে সেদেশে ধর্ম প্রচারে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব ছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষের সমুদ্রতীরবর্তী জনপদনিবাসী শ্ৰেষ্ঠী ও নাবিকগণ সমুদ্রযাত্রায় পারদর্শী বলিয়া সৰ্ব্বত্র খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন। এখন হিন্দু সমুদ্রযাত্রার নিদর্শন বিলুপ্ত হইয়াছে বলিয়া অনেকে এ কথায় আস্থা স্থাপন করিতে ইতস্ততঃ করিয়া থাকেন। কিন্তু ভারত ও প্রশান্ত সমুদ্রবেষ্টিত সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপপুঞ্জের পুরাতন ইতিহাসে, ধাতু ও প্রস্তরখোদিত প্রাচীর লিপিতে, দেব মন্দির ও দেবমূৰ্ত্তির গঠনকৌশলে, ভাষা সাহিত্য ও লোকাঁচারে তাহার যথেষ্ট প্রমাণ অদ্যাপি বৰ্তমান আছে। বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হইবার পূৰ্বেই যে ভারতীয় নাবিকগণ নানা দিগদেশে সমুদ্রযাত্রা করিতেন, তাহাও বিশ্বাস করিবার উপযুক্ত প্রমাণের অভাব নাই। এই সমুদ্রযাত্রার কাহিনীর সহিত, বঙ্গোপসাগর-তীরস্থ পুরাতন তাম্রলিপির ইতিহাস চিরসংযুক্ত হইয়া রইয়াছে। তাম্রলিপ্তি হইতে তিনটি বিভিন্ন জলপথে ভারতীয় অর্ণবযান ধাবিত হইত;-পূৰ্ব্বপথে আরাকান বন্দরের নিকট দিয়া, পশ্চিম পথে কলিঙ্গোকূলের নিকট দিয়া সিংহল স্পর্শ করিয়া, ও দক্ষিণপথে মহাসমুদ্রের মধ্য দিয়া কামলঙ্কা অতিক্রম করিয়া বহুসংখ্যক অর্ণবপোত সুমাত্রার সুবিস্তৃত বন্দরে সমবেত হইত। এই বন্দর তত্ত্বালে “শ্রীভোজ” নামে পরিচিত ছিল, তথায় অদ্যাপি অনেক পুরাকাহিনীর নিদর্শন প্রাপ্ত হওয়া যায়। শ্ৰীভোজ হইতে পোত সকল উত্তরাস্যে অগ্রসর হইয়া আনামের উপকূল অতিক্রম করিয়া চীন সাম্রাজ্যের ক্যান্টন নগরে উপনীত হইত, এবং পূৰ্ব্বাস্যে অগ্রসর হইয়া দ্বীপপুঞ্জ পরিভ্রমণ করিত। এই পুরাতন বাণিজ্যপথেই দ্বীপে দ্বীপে বৌদ্ধমত প্রচারিত হয়, এবং চৈনিক বাণিজ্যের সঙ্গে চীনদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রবেশলাভ করে। তৎকালে ভারতবর্ষের পশ্চিমোপকূলেও সমুদ্রযাত্রার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। সিন্ধু ও গুর্জর হইতে অর্ণবপোত পারস্যে আরবে ও মিশরে ধাবিত হইত, মালাবার উপকূল হইতে সিংহলে এবং সিংহল হইতে আরবে বাণিজ্য ভাণ্ডার বহন করিত। স্থলপথে গান্ধার ইরাণ তুরাণ অতিক্রম করিয়া ভূমধ্যসাগরতীর পর্যন্ত বাণিজ্যভাণ্ডার ধাবিত হইত। এই পুরাতন বাণিজ্যপথের নিকটবর্তী সমস্ত দেশে ও সমস্ত দ্বীপেই বৌদ্ধধর্ম প্রচলিত হইয়াছিল। সুতরাং পূৰ্ব্ববর্তী বাণিজ্যবিস্তারের সুপরিচিত পথ অবলম্বন করিয়াই যে বৌদ্ধ প্রচারকবর্গ নানা দিগ্নেশে ধাবিত হইয়াছিলেন, তাহাই সঙ্গত বলিয়া বোধ হয়।

খৃষ্টধর্ম প্রচারের বর্তমান প্রণালী হইতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের পুরাতন প্রণালীর বহুবিষয়ে পার্থক্য ছিল। যোগযুক্ত মুক্তপ্রাণ সংসারাশক্তিশূন্য শাক্যপুরগণ কেবলমাত্র মানবহিতার্থেই প্রচারব্রত গ্রহণ করিতেন, তাহার সহিত ভারতীয় রাজন্যবর্গের বাণিজ্য বা রাজ্যবিস্তারের গুপ্ত সংকল্প সংযুক্ত রহিত না! বৌদ্ধসন্ন্যাসীর ভক্তি বিশ্বাস ও অধ্যবসায়, তাঁহার প্রশান্ত বনজ্যোতিঃ ও জ্ঞানোজ্জল স্নিগ্ধ দৃষ্টি, এবং সৰ্ব্বহিংসা-বিরহিত সাম্য মৈত্রীর শান্ত সৌম্য বেশ সহজেই তাঁহার প্রতি লোকচিত্ত আকর্ষণ করিতে সক্ষম হইত। জীবনগত পবিত্রাচার এবং চরিত্রগত সাধু ব্যবহারেই বৌদ্ধধর্ম সৰ্ব্বত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বৌদ্ধমতের সঙ্গে বৌদ্ধশাস্ত্রও সৰ্ব্বত্র অধীত হইতে আরম্ভ করে। তদুপলক্ষে যাহাদের ভাষা ও সাহিত্য ছিল না, তাহারা ভাষা ও সাহিত্য পাইয়াছে, যাহাদের ভাষা ও সাহিত্য ছিল তাহারা ভারতীয় সাহিত্যের অনুবাদে স্বদেশের সাহিত্যের উন্নতিসাধনে সক্ষম হইয়াছে। এই পুরাতন বাণিজ্যপথের কোন কোন স্থলে ভাষা ও সাহিত্য ছিল না এবং কোন কোন স্থলে ভাষা ও সাহিত্য ভারতীয় সাহিত্য সংশ্রবে সমুন্নত হইয়াছিল, অদ্যাপি তাহা সুস্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জে ভাষা ও সাহিত্য ছিল না–কেবল কথোপকথনের রীতিই প্রচলিত ছিল; তথায় ক খ গ ঘ প্রচলিত হইয়া সংস্কৃতের আদর্শে লিখিত সাহিত্য সমুদ্ভূত হইয়াছে। চীন সাম্রাজ্যে ভাষা ও সাহিত্য বৰ্তমান ছিল, তথায় চৈনিক ভাষায় ভারতীয় বহুগ্রন্থ অনুবাদিত হইয়াছে।

ফা হিয়ান জন্মগ্রহণ করিবার পূর্বেই এইরূপে মহাচীনে সংস্কৃত ও পালি ভাষার চৰ্চ্চা প্রচলিত হইয়াছিল, এবং বৌদ্ধশাস্ত্রাদি অনুবাদিত হইয়া লোক সমাজে প্রচারিত হইয়াছিল। তাহাতে জনসাধারণের জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারিত হইলেও, পণ্ডিতসমাজের কৌতূহল সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হইত না। ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ভারতীয় বিপুল সাহিত্য অধ্যয়ন করা ও তদুপলক্ষে পুণ্যতীর্থ পরিভ্রমণ করিবার আশা বহুসংখ্যক চৈনিক শাক্যপুত্রের হৃদয়ে প্রবল উত্তেজনা উপস্থিত করিয়াছিল। ফা হিয়ান তরুণ জীবনে এই উত্তেজনা লাভ করিয়া ভারতভ্রমণে বহির্গত হইবার সময়ে সন্ধান পাইয়া আরও কতিপয় চৈনিক যুবক তাঁহার সহযাত্রী হইয়াছিলেন। ইহারা সকলেই স্বদেশে বৌদ্ধশিক্ষায় সুশিক্ষিত ও সুপণ্ডিত বলিয়া পরিচিত ছিলেন।

তৎকালে ভারতীয় বৌদ্ধমত মহাযান ও হীনযান নামক দুইটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে এবং সমগ্র বৌদ্ধাচার অষ্টাদশ বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। হিন্দু ও বৌদ্ধের বাদ প্রতিবাদে যেরূপ কলহ বিবাদের সৃষ্টি হইত,মহাযানীর সহিত হীনযানীর বাদ প্রতিবাদও সেইরূপ গৃহবিবাদের সূচনা করিয়াছিল। মহাচীনের শাক্যপুত্রগণ ইহা অবগত ছিলেন। তৎকালে তাঁহাদের নিকট সাগরমধ্যস্থ দ্বীপপুঞ্জ অপেক্ষা মধ্য এসিয়ার সুসভ্য জনপদ বৌদ্ধশিক্ষার সমুন্নত ক্ষেত্র বলিয়া সুপরিচিত ছিল। তাঁহারা তজ্জন্যে সমুদ্র পথ পরিত্যাগ করিয়া মরুগিরি অতিক্রম পূৰ্ব্বক মধ্য এসিয়ার পথেই ভারতবর্ষে অগ্রসর হইতে কৃতসংকল্প হন।

সে দিনের কথা স্মরণ করিতেও বিস্ময়ে রোমাঞ্চ হয়! মরুস্থলে পথ নাই, লোকালয় নাই, জলস্পর্শের আশা নাই–কেবল অনন্তবিস্তৃত বালুকাস্তরের পর বালুকাস্তর! সে বালুকা সমুদ্র উপনীত হইলে মনে হয় বুঝি জীবনব্যাপী দীর্ঘযাত্রাতেও সে পথের অবসান হইবে না। তাহার উপর দিয়া যখন প্রবল বেগে প্রভঞ্জন প্রবাহিত হয়, তখন ধূলিপটলে গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিয়া কঙ্করকণা তীরবেগে সৰ্ব্বগাত্রে বিদ্ধ হইতে থাকে;–সে প্রচণ্ড পীড়নে যে সকল পূৰ্ব্বাত্রী মরুমধ্যে জীবন বিসৰ্জন করিয়াছে, তাহাদের ইতস্ততঃবিক্ষিপ্ত ধূলিবিলুণ্ঠিত জীর্ণকঙ্কালরাশি সে পথের ও একালের সুমাজ্জিত রাজপথের পার্থক্য বুঝাইয়া দিতে পারে। কোনরূপে মরুস্থল অতিক্রম করিলেও সম্মুখে পৰ্ব্বতের পর পৰ্ব্বত আসিয়া পথরোধ করিয়া দণ্ডায়মান হয়। তাহার সর্বত্র ঘন বন,–শ্বাপদসঙ্কুল মহারণ্য, সেখানে বৃক্ষলতার অস্তিত্ব নাই, সেখানে কেবল তুষার ভ্রুপের উপর তুষার স্কুপ। কোথায়ও দুরারোগ্য শৈলশৃঙ্গ, কোথায়ও দুরতিক্রমনীয় গিরিনদী, কখন কটুকষায় বন্যফল কখন বা নিরম্বু উপবাস,–এইরূপে কেবল জ্ঞান প্রেম ও পুন্যসঞ্চয়ার্থ যাঁহারা সেকালের কঠোর সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিয়া ভারতভ্রমণে বহির্গত হইয়াছিলেন, তাঁহাদের তুলনায় একালের সুসজ্জিত পোতবিহারী উত্তরকেন্দ্রান্বেষী যশস্বিবর্গের যশঃ মলিন বলিয়াই প্রতিভাত হয়। ইহা কেবল আমাদেরই ধারণা নহে; পাশ্চাত্য পণ্ডিতবর্গও এ কথার আলোচনা করিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিয়া থাকেন।

বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে পালিভাষায় লিখিত সুবিস্তৃত বৌদ্ধসাহিত্য বর্ধিত হইয়া উঠিয়াছিল;–টীকা টিপ্পনী সংযুক্ত হইয়া সে সাহিত্য ক্রমশঃ বিপুলতা লাভ করিয়াছিল। সে সকল অধ্যয়ন করিতে হইলে সবিশেষ ক্লেশ স্বীকার করিয়া সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষা অভ্যাস করিতে হইবে। বৌদ্ধগণ তজ্জন্য সকল দেশেই বৌদ্ধবিহারের সঙ্গে বিদ্যালয় ও পুস্তকালয় সংযুক্ত করিয়া ছিলেন। এই সকল বিদ্যালয়ে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ছাত্র অধ্যয়ন করিত। তাহাদের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য প্রত্যেক বিদ্যালয়ে যথেষ্ট ভূসম্পত্তি প্রদত্ত হইয়াছিল।

এক সময়ে বৌদ্ধবিদ্যালয়ের সংখ্যা নির্ণয় করা অসম্ভব হইয়া উঠিয়াছিল। তন্মধ্যে যথা এসিয়া, গান্ধার প্রভৃতি প্রতীচ্য বিদ্যালয় যথেষ্ট খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। কিন্তু পৃথিবীর বিদ্যাশিক্ষার ইতিহাসে যে বিদ্যালয় সর্বাপেক্ষা সুবৃহৎ বলিয়া অদ্যাপি পরিচিত রহিয়াছে, তাহা মগধের অন্তর্গত “নালন্দে” সংস্থাপিত হইয়াছিল। মগধান্তৰ্গত নৈরঞ্জনানদীতীরস্থ বুদ্ধগয়ার বোধিদ্রুমচ্ছায়ায় শাক্যসিংহ বুদ্ধত্বলাভ করেন; তন্নিকটস্থ গৃধ্রুকুটি পৰ্ব্বত, বোধিদ্রুম ও মগধের রাজধানী রাজগৃহ ও পাটলিপুত্র, শাক্যসিংহের জন্মভূমি কপিলাবস্তু, প্রচারক্ষেত্রে বারাণসী, বৈশালী, মহানিৰ্ব্বাণক্ষেত্রে কুশিনগরের শালবন বৌদ্ধতীর্থের মধ্যে সুপরিচিত,–নালন্দের বৌদ্ধ বিদ্যালয়ও এই শ্রেণীর মহাতীর্থের মধ্যে পরিগণিত ছিল। তথায় সহস্র অধ্যাপকের পাদমূলে বসিয়া দশ সহস্র শিষ্য নিয়ত বিদ্যাভ্যাস করিত; বিদ্যালয়ের সুগঠিত হৰ্ম্মরাজি ও অভ্রভেদী উচ্চচূড়া নালন্দকে ভারতবর্ষের মধ্যে সৰ্ব্বাপেক্ষা শোভাময় স্থান বলিয়া পরিচিত করিয়াছিল। কত বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বর্ণের বিভিন্ন জাতির বৌদ্ধছাত্র যে এই প্রসিদ্ধ বৌদ্ধবিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিত, তাহার সংখ্যা নির্ণয় করা সহজ নহে। এই বিদ্যালয়ের নাম ও খ্যাতি অন্যান্য দেশের ন্যায় মহাচীন সাম্রাজ্যেও বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিল। তথায় অধ্যয়ন করিবার জন্য আগ্রহ হওয়া স্বাভাবিক; কাহারও এরূপ আগ্রহ হইলে অন্য লোকে। তাহাকে তীর্থযাত্রার সহায়তা করিত। এরূপ অযাচিত সহায়তালাভ না করিলে তকালে দূরদেশগমন করা সহজ হইত না। ফা হিয়ান এইরূপ সহায়তার ভরসায় অধ্যবসায় ও উচ্চলক্ষ্য সম্বল করিয়া সঙ্গীদিগের সহিত তীর্থযাত্রার বহির্গত হন। তাহার বিস্তৃত বিবরণ “ফু-কু-কি” নামক চৈনিক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হইয়াছিল, প্রায় শতবর্ষ হইল ইউরোপীয়গণ এই গ্রন্থের সন্ধান লাভ করেন; এক্ষণে ইহা ইউরোপের সকল ভাষার অনুবাদিত হইয়াছে।

জীবন-কাহিনী

চীনদেশের শানসী প্রদেশে ফা হিয়ানের জন্ম হয়। তিনি শৈশবে কুঙ্গ নামে পরিচিত ছিলেন। তৎকালে বৌদ্ধমত প্রচারিত হইয়া সন্যাস গ্রহণের প্রথা সকল দেশেই সমাদর লাভ করিয়াছিল। যাঁহারা সাংসারিক প্রতিবন্ধকের জন্য বা কোন অনিবার্য কারণে স্বয়ং সন্ন্যাস গ্রহণ করিতে পারিতেন না, তাঁহারা পুত্রগণকে সন্ন্যাসী করিয়া পুণ্যসঞ্চয় কামনায় শৈশবেই তাহাদিগকে বৌদ্ধমঠে প্রেরণ করিতেন। তথায় দীক্ষার পর পুৰ্ব্ব নামোপাধি পরিত্যক্ত হইয়া নূতন নামোপাধি প্রদত্ত হইত, নবীন সন্ন্যাসী অতঃপর সেই নামে পৃথিবীতে বিচরণ করিতেন।

কুঙ্গের বয়ক্রম যখন তিন বৎসর, তিনি সেই সময়ে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত হইয়া বৌদ্ধমঠে বাস করিতে আরম্ভ করেন; তদুপলক্ষে তাঁহার নাম পরিবর্তিত হইয়া ফা হিয়ান নাম ও শাক্য পুত্ৰ উপাধি প্রদত্ত হয়। চীন ভাষায় শাক্যপুত্র শব্দ সংকুচিত হইয়া সী শব্দে পরিণত হইয়াছিল। ফাহিয়ানের বৌদ্ধাশ্রমের পূর্ণ নাম– সী ফা হিয়ান।

ফা হিয়ান একরূপ আজন্ম সন্ন্যাসী। বৌদ্ধমঠে লালিত পালিত ও শিক্ষিত হইয়া, নিয়ত বৌদ্ধধর্মের মতবিশ্বাস ও ক্রিয়া কলাপের সংশ্রবে পরিবর্ধিত ও সন্ন্যাসাশ্রমের অবশ্য প্রতিপাল্য নিয়ম পালনে অভ্যস্ত হইয়া ফা হিয়ান বাল্যজীবনেই অধ্যাপকবর্গের আশীৰ্বাদ লাভ করিয়াছিলেন। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফা হিয়ানের জ্ঞানানুরাগ প্রবল হইতে লাগিল। তৎকালে বিনয়পিটকের যে সকল গ্রন্থ চীন দেশে প্রচলিত ছিল, তাহাতে ফা হিয়ানের হৃদয় পরিতৃপ্ত হইল না। তিনি ভারতভ্রমণ করিয়া বিনয়পিটকের সমগ্র সাহিত্য সংগ্রহ করিবার জন্য বদ্ধ পরিকর হইলেন।

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ধৰ্ম্মজীবন কেবল আত্মোন্নতি সাধনের জন্যই ক্ষয় প্রাপ্ত হইত না। তাঁহারা লোকালয়ের অভ্যন্তরে বাস করিয়া জনসাধারণের জ্ঞান ধর্ম শিক্ষা ও সদাচারের উন্নতি সাধনের জন্য যথা সাধ্য যত্ন করিতেন এবং সময়ে সময়ে প্রকাশ্য স্থানে সমবেত জনসাধারণকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়া তাহাদের ধর্মসাধনের সহায়তা করিতেন। ফা হিয়ান স্বয়ং বিনয়পিটক অধ্যয়নের জন্য যেরূপ ব্যাকুল হইয়াছিলেন স্বদেশে তাহার সমগ্র গ্রন্থ ও টীকা আনয়ন করিবার জন্যও সেইরূপ কৃতসংকল্প হন। এখন কোন দূরদেশে গমন করিয়া তদ্দেশের প্রচলিত সাহিত্য স্বদেশে আনয়ন করা নিতান্ত সহজ কথা,–তাহাতে তদ্দেশের ভাষা শিক্ষা করিতে হয় না, সময় নষ্ট করিতে হয় না; কেবল অর্থব্যয় করিয়া মুদ্রিত পুস্তকরাশি ক্রয় করিয়া আনিলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। সেকালে এ সকল সুবিধা ছিল না,–পুস্তক সংগ্রহের জন্য স্বয়ং ভাষাশিক্ষা করিয়া পুস্তক স্বহস্তে লিখিয়া লইতে হইত। কেবল মরুগিরি উত্তীর্ণ হইয়া ভারতবর্ষে উপনীত হওয়াই কত আয়াস সাধ্য ব্যাপার; তাহার উপর ভাষাশিক্ষা গ্রন্থধ্যয়ন ও গ্রন্থ সংকলনের গুরুতর শ্রমের কথা স্মরণ করিলে,–ফা হিয়ানের সংকল্পে সকলকেই বিস্মিত হইতে হইবে। সেকালে ইহাতে বিস্ময়ের বিষয় ছিল না; বৌদ্ধ শ্ৰমণগণ সর্বদা সকল দেশেই এইরূপ অধ্যবসায় ও জনহিতাকাঙ্ক্ষার পরিচয় প্রদান করিতেন। পরিমিতাহার, পরিমিতাচার ও পরিমিত বিশ্রামের পর যাহা কিছু সময় সমস্তই ধৰ্ম সাধনে নিযুক্ত হইত। পরসেবা, ধর্মপ্রচার ও জ্ঞানবিস্তার ধর্মসাধনের প্রধান অঙ্গ বলিয়া পরিচিত ছিল–সুতরাং ফা হিয়ানের সাধু সংকল্প বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রকৃতির অনুরূপ হইয়াছিল।

ফা হিয়ানের সাধু সংকল্পে হুইকিং, টাচিং, হুইইং, হুইউ প্রভৃতি কতিপয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভারত যাত্রার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। প্রায় তিনশত বৎসর হইতে এইরূপ তীর্থ যাত্রা প্রচলিত হইয়াছিল। বুদ্ধগয়ার বোধিদ্রুমের নিকট সম্প্রতি যে দুইখানি প্রস্তরলিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহাতে চীনভাষায় পুরাতন তীর্থযাত্রীর নাম ঘোষিত আছে। চৈনিক তীর্থযাত্রীর সংখ্যা ক্রমশঃ বর্ধিত হইলে বুদ্ধগয়ায় একটি চৈনিক মন্দিরও নির্মিত হইয়াছিল। প্রথমাবস্থায় পুন্যভূমি দর্শনের অনুরাগই প্রবল ছিল, সুতরাং সে সকল পুরাতন তীর্থযাত্রীর কোন তীর্থভ্রমণ কাহিনী প্রাপ্ত হওয়া যায় না। উত্তর কালে পুণ্যসঞ্চয় কামনার সহিত জ্ঞানানুরাগ মিশ্রিত হইয়াছিল। তজ্জন্য ফা হিয়ানের সমসাময়িক বহু সংখ্যক চৈনিক সন্ন্যাসী ভারতভ্রমণের জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছিলেন। কিন্তু তৎকালে মধ্য এসিয়ার পথে অগ্রসর হওয়া সহজ নহে বলিয়াই অনেকে নিরস্ত হইতেন; ফা হিয়ানের উৎসাহে উত্তেজিত হইয়া একদল নবীন সন্ন্যাসী তীর্থযাত্রায় বহির্গত হইলেন।

মধ্য এসিয়ার বিচিত্র ইতিহাস বহুবিস্ময়ের আধার। ভারতবর্ষের ইতিহাসের সহিত মধ্য এসিয়ার বহু জনপদের ইতিহাস একসূত্রে গ্রথিত। একদা এই সকল দেশে সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে শিল্প বিজ্ঞান জ্ঞান ও ধম্মচৰ্চ্চা কিরূপ উন্নতিলাভ করিয়াছিল, তাহার কিছু কিছু পরিচয় ক্রমশঃ প্রকাশিত হইতেছে। মহাচীনের পশ্চিম সীমা হইতে কাস্পিয়ান হ্রদের উপকূল পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগ এক সময়ে বহুরাজ্যে ও রাজধানীতে সুশোভিত ছিল। তাহার দক্ষিণে ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমা হইতে ভূমধ্যসাগরতীর পর্যন্ত সমগ্র ভূভাগ সেইরূপ বহুরাজ্য ও বহুরাজধানীতে পরিপূর্ণ ছিল। এই দ্বিধা বিভক্ত বিস্তীর্ণ জনপদে অতি পুরাকাল হইতে ভারতীয় বাণিজ্যের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। সে বাণিজ্যে পুরাকালের প্রসিদ্ধ রাজ্যমাত্রেই সমুন্নত হইয়াছিল। এই বাণিজ্যপথের আধিপত্যলাভের জন্য এক জাতির পর অন্য জাতি সমরক্ষেত্রে অগ্রসর হইয়াছে। সুতরাং এই সকল জনপদে কখন চীন, কখন তাতার, কখন তুরাণ, কখন ইরাণ, কখন বা গ্রীসিয় যবন অধিকার বিস্তার করিয়া কিয়কালের জন্য সুখসৌভাগ্য উপভোগ করিয়াছে। এই সকল বিপ্লবে রাজ্য ও রাজধানী নিয়ত পরিবর্তিত হইয়াছে;–আজ যেখানে দুর্ভেদ্য দুর্গ, কাল সেখানে বিজন বন; আজ যেখানে দুর্গম গহন, কাল সেখানে। বিচিত্র রাজধানী জল বুদ্বুদবৎ উত্থিত ও পতিত হইয়াছে। এই সকল বিপ্লবের মধ্যেও ভারতীয় বাণিজ্য স্রোত শুষ্ক হয় নাই কেন, আজকাল তাহা ক্রমশঃ আলোচিত হইতেছে। রাজ্যের জন্য কেহ রাজ্যাক্ৰমণ করিত না; বাণিজ্য পথের আধিপত্যলাভের জন্যই লালায়িত হইত; সুতরাং বাণিজ্য স্রোত রক্ষা করাই সকলেরই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। সে বাণিজ্য প্রবাহের সঙ্গে ভারতীয় শিক্ষা ও সভ্যতা বহুবিপ্লবের মধ্যেও অব্যাহত গতিতে দেশে দেশে প্রবাহিত হইত।

ফা হিয়ান খৃষ্টীয় ৩৯৯ অব্দে তীর্থযাত্রা করেন। তখন চীনসাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমায় এইরূপ একটি রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটিত হইতেছিল,–তজ্জন্য সে পথে নিঃশঙ্কচিত্তে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তৎকালে বৌদ্ধশ্রমণের সন্ন্যাসবেশ সকল দেশেই সমাদর লাভ করিত বলিয়া ফা হিয়ান ও তাঁহার সহযাত্রিগণ সাহস করিয়া মঠ হইতে বহির্গত হইয়াছিলেন।

অতঃপর ফা হিয়ানের জীবন কাহিনী তাঁহার তীর্থভ্রমণ কাহিনীর সহিত মিশ্রিত হইয়া গেল। তিনি বহুক্লেশে ভারতবর্ষে উপনীত হইয়া পুণ্যতীর্থ পৰ্যটন ও ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করিয়া চতুর্দশ বর্ষের তীর্থ ভ্রমণের পর সমুদ্র পথে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহার সঙ্গে বহুগ্রন্থ চীনদেশে উপনীত হয়। যে সকল গ্রন্থ এখন ভারতবর্ষেও দুষ্প্রাপ্য তাহা চীন জাপান তিববৎ ব্রহ্ম ও সিংহলে অনুসন্ধান করিয়া ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হইবার ইহাই প্রধান কারণ। যাঁহারা ভারতবর্ষে তীর্থযাত্রা করিতেন, তাঁহারাই কিয়ৎপরিমাণে গ্রন্থসংগ্রহ করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করিতেন। তথায় এই সকল গ্রন্থ পুরাভূমি হইতে আনীত বলিয়া জনসাধারণের নিকট সবিশেষ সমাদর লাভ করিত। তাহারা অদ্যাপি এই সকল পুরাতন গ্রন্থের পূজা করিয়া থাকে।

ভারতীয় ধৰ্ম্ম পুস্তকরাশির অনুবাদ সম্পাদন করিতেই ফা হিয়ানের অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত হয়। তিনি এই কাৰ্যে শেষ পর্যন্ত যেরূপ উৎসাহ ও অধ্যবসায়ের পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহা ভাবিলেও বিঘ্নিত হইতে হয়। এই কাৰ্যে একজন ভারতবাসী বৌদ্ধ ফা হিয়ানের সহায়তা করিয়াছিলেন। তিনি তৎকালে ধর্ম প্রচারার্থ চীন দেশে অবিস্থিতি করিতেন। ফা হিয়ান তাঁহাকে শাক্য বংশীয় বলিয়া পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। এই বৌদ্ধাচার্য্যের নাম–বুদ্ধভদ্র। কত দেশে এইরূপ ভারতনিবাসী বৌদ্ধসন্ন্যাসী ধর্মপ্রচারে ও ধর্মগ্রন্থানুবাদে কত জাতির কিরূপ সহায়তা সাধন করিয়া ছিলেন, তাহার ইতিহাস বর্তমান থাকিলেও সেকালের বহু বৃত্তান্ত অবগত হইবার সুবিধা হইত। যাঁহারা এইরূপে ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সভ্যতা সুবিস্তৃত করিয়া জন্মভূমির গৌরব বর্ধন করিয়াছিলেন, ইতিহাসের অভাবে ভারতবর্ষের সাহিত্য সেবকগণ তাঁহাদের পুণ্যনামের স্মৃতি সমাদর রক্ষা করিতে পারেন নাই।

ফা হিয়ান এইরূপে আজন্ম-সন্ন্যাসব্রত উদযাপন করিয়া ৮৬ বৎসর বয়সে নিৰ্ব্বাণ লাভ করেন। ফা হিয়ানের স্বদেশ ত্যাগ করিয়া মধ্যভারতে উপনীত হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইয়াছিল।–ইহাতেই তাঁহার ভ্রমণক্লেশের কথঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যাইতে পারে। তিনি ত্রিশটি বিভিন্ন দেশ পর্যটন করিয়া স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হইয়াছিলেন এবং এই দীর্ঘযাত্রার সহস্র পরিশ্রমে কিছুমাত্র পরিশ্রান্ত না হইয়া, বৃদ্ধবয়সে শাস্ত্রানুবাদে নিযুক্ত হইয়াছিলেন, ইহাতেই তাঁহার জ্ঞানানুরাগ ও স্বদেশ বাৎসল্যের কথঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যাইতে পারে। ফা হিয়ানের স্বদেশের লোকে নানাকারণে তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ রহিয়াছেন– আমরা ভারতবাসী হইয়াও তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ।

যাত্রারম্ভ

ফা-হিয়ান ও তাঁহার সহযাত্রী বৌদ্ধশ্ৰমণগণ খৃষ্টিয় ৪০০ অব্দে চীনদেশের অন্তর্গত চাঙ্গন নামক স্থান হইতে তীর্থযাত্রা করেন। পথে বর্ষাকালে বিশ্রাম করিয়া তাঁহারা চীনসীমান্তস্থিত চাঙ্গীয়ে নামক দুর্গদ্বারে উপনীত হইলে দেখিতে পাইলেন যে,–রাজপথ অবরুদ্ধ। তৎকালে সীমান্তসমর সম্পূর্ণ নিরস্ত না হওয়ায় রাজা তীর্থযাত্রিগণকে তথায় অবস্থিতি করিতে আজ্ঞা করিয়া স্বয়ং তাঁহাদের পরিচয্যায় নিযুক্ত হন। এই স্থানে আরও কতিপয় তীর্থযাত্রী ফা হিয়ানের দলভুক্ত হইলেন। বর্ষাকাল অতীত হইবামাত্র যাত্রিদল রাজ কর্মচারিবর্গের সহায়তায় টুনওয়াঙ্গ নামক পান্থদুর্গে উপনীত হইয়া তথা হইতে চীন সাম্রাজ্যসীমা উল্লঙঘন করিয়া মরু মধ্যে প্রবেশ করিলেন।

এই মরুস্থল নবোন্নত বালুকাস্তরে সমাচ্ছন্ন,–তাহার উপর নিরন্তর উষ্ণবায়ু প্রবাহিত। যে দিকে যতদূর দৃষ্টিনিক্ষেপ কর, মরুস্তর ধু ধু করিতেছে,–পথ নাই, পথের চিহ্নমাত্রও বর্তমান নাই; কেবল স্থানে স্থানে অস্থিরাশি প্রদর্শনার্থ ইতস্ততঃ পতিত রহিয়াছে। তীর্থযাত্রিগণ সপ্তদশ দিবস এই দুর্গম মরুমধ্যে অগ্রসর হইবার পর লোকালয়ের দর্শনলাভ করিলেন। তাঁহারা যে রাজ্যে উপনীত হইলেন তাহার নাম–সেনসেন। চীনসাম্রাজ্য অতিক্রম করিবার পর ইহাই সৰ্ব্বপ্রথম পররাজ্য।

এ রাজ্য বন্ধুর ও অনুৰ্ব্বর। জনসাধারণ চীনরাজ্যের লোকের ন্যায় বসনভূষণ ব্যবহার করিত এবং ভারতবর্ষীয় বৌদ্ধধর্মের অনুশীলন করিত। এখানে চারি সহস্র হীনযান-সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসী ছিলেন; তাঁহারা এবং বৌদ্ধমতাবলম্বিমাত্রেই ভারতীয় গ্রন্থাদির আলোচনা করিতেন। এই মরুপ্রান্তনিহিত অনুব্বর দূরদেশে কি সূত্রে ভারতীয় বৌদ্ধমত ও ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য প্রবেশলাভ করিয়াছিল, ফা হিয়ান তাহার কোন তথ্য লিপিবদ্ধ করিয়া যান নাই। আধুনিক রুষীয় পরিব্রাজকগণ এই দেশ পরিদর্শন করিয়াছেন। ইহার আধুনিক নাম–লিওলান।

এই স্থান হইতে প্রচলিত ভাষার পরিবর্তন আরম্ভ হয়; কোন দেশে কিরূপ ভাষা সচরাচর কথোপকথনে ব্যবহৃত হইত, ফা হিয়ান তাহার কোন পরিচয় প্রদান করেন নাই। লিখিত ভাষায় যে ভারতীয় ভাষাই ব্যবহৃত হইত, তাহার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই বন্ধুর রাজ্য হইতে উত্তর পশ্চিম দিকে পঞ্চদশ দিবস পৰ্যটন করিয়া তীর্থযাত্রিগণ উঁকি নামক দেশে উপনীত হন।

উঁকি দেশ নানা সময়ে নানা নামে কথিত হইত। পরবর্তী তীর্থযাত্রিগণ ইহাকে উঁকিনী অথবা অগ্নি দেশ বলিয়া গিয়াছেন। ইহা টেঙ্গিস হ্রদের নিকটস্থ কারসহর নামক স্থান। ফা হিয়ান এই রাজ্যের বর্ণনায় কেবল এইমাত্র লিখিয়া গিয়াছেন :

এখানে হীনযান-সম্প্রদায়ভুক্ত চারি সহস্র সন্ন্যাসী বাস করিতেন; তাঁহাদের আচার ব্যবহার চীন দেশের সন্ন্যাসীদিগের অজ্ঞাত বলিয়া বিশেষ অসুবিধা ঘটিত। তিনি রাজার অনুরোধে দুই মাস কয়েকদিবস অবস্থিতি করিয়া দক্ষিণ পশ্চিমে গমন করেন। তাঁহার সহযাত্রিবর্গের মধ্যে কেহ কেহ অগ্নিদেশের ব্যবহারে বিরক্ত হইয়া তাঁহার সঙ্গ ত্যাগ করেন।

হিয়াঙ্গ থসাঙ্গের ভ্রমণকাহিনীতে এই দেশের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি এ দেশে পদার্পণ করিয়া লিখিয়া গিয়াছেন :

এখানে বহু সংখ্যক নদী মিলিত হওয়ায় লোকে পয়ঃপ্রণালীযোগে ক্ষেত্রে জলসিঞ্চন করে। এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে গোধূম খর্জুর, দ্রাক্ষা প্রভৃতি শস্য ও ফল উৎপন্ন হয়। বায়ু সুখকর ও কোমল। লোকচরিত্র সরল। লিখিত অক্ষর প্রায় ভারতীয় অক্ষরের অনুরূপ। লোকে কার্পাস বা পশমী বস্ত্র ব্যবহার করে, মস্তকে উষ্ণীষ ব্যবহার করে না। বাণিজ্যে স্বর্ণ রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। এ দেশের ইতিহাস নাই;–রাজবিধি সুগঠিত হয় নাই; রাজা সাহসী হইলেও সমরকুশল বলিয়া বোধ হয় না।

অগ্নি রাজ্য হইতে দক্ষিণ পশ্চিমে একমাস পাঁচ দিবস নানাক্লেশে পথ পর্যটন করিয়া ফা হিয়ান খোটানে উপনীত হন। তিনি খোটানে আসিয়া ভারতীয় সভ্যতার প্রথম আভাস প্রাপ্ত হন। এই রাজ্য তৎকালে সবিশেষ সমৃদ্ধিশালী ছিল এবং জনসাধারণ বৌদ্ধমতেরই সমাদর করিত। সন্ন্যাসিগণ মহাযান সম্প্রদায়ভুক্ত– তাঁহাদের সংখ্যা নির্ণয় করা অসম্ভব ছিল। অধিবাসিগণ গৃহদ্বারে মন্দিরচূড়ার ন্যায় অত্যুচ্চ প্রাসাদচূড়া নিৰ্মাণ করিত–তাঁহাতে নগরশোভা সবিশেষ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইত। এই স্থানে ফা হিয়ান গোমতী নামক বিখ্যাত সংঘারামে আতিথ্য লাভ করেন। তথাকার পুরোহিতগণ ভোজনাগারে প্রবেশ করিয়া নীরবে আহার করিতেন। ফা হিয়ান ও তাঁহার সহযাত্রিগণ এই স্থানে তিনমাস কয়েকদিবস অতিবাহিত করেন। খোটানের রথযাত্রা দেখিবার জন্যই এতদিন অপেক্ষা করিয়াছিলেন;–এই রথযাত্রার বিবরণ বিস্তৃতভাবে লিখিত রহিয়াছে। বর্তমান সময়ের রথযাত্রা যে বৌদ্ধপর্বের অনুকরণ মাত্র, প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণ তাহার অনেক প্রমাণের উল্লেখ করিয়া থাকেন। ভারতবর্ষ হইতে বৌদ্ধশিক্ষা তিরোহিত হইবার সময়ে অনেক বৌদ্ধমত বৌদ্ধাচার বৌদ্ধপৰ্ব্ব ও বৌদ্ধপূজা এ দেশের হিন্দুমত ও হিন্দু যাত্রামহোৎসবের অঙ্গীভূত হইয়া গিয়াছিল। খোটানে বহুদিন পর্যন্ত বৌদ্ধমত প্রচলিত ছিল; তাহার নিদর্শন কালক্রমে মরুভূমির বালুকাস্তূপে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। এক্ষণে তাহার কিছু কিছু নিদর্শন পুনরায় লোকলোচনের সম্মুখীন হইতেছে। এই দেশে বৌদ্ধমূৰ্ত্তি, বৌদ্ধমঠ ও বৌদ্ধ বিদ্যালয়ের অভাব ছিল না। এখানে রাজানুকম্পায় অশীতিবৎসরের পরিশ্রমে নবসংঘারাম নামক একটি মন্দির নির্মিত হইয়াছিল, তাহার কড়িকাঠ, স্তম্ভরাজি, দ্বার ও গবাক্ষপার্শ্ব স্বর্ণমণ্ডিত ছিল। চীন দেশের অনেক তীর্থযাত্রী খোটানে পদার্পণ করিয়াছিলেন। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রারম্ভে চীন সাম্রাজ্যের মহারাণীর প্রেরিত রাজদূত সন্ন্যাসী সঙ্গ ইউন খোটানে উপনীত হইয়াছিলেন। তাঁহার ভ্রমণ বৃত্তান্তে দেখিতে পাওয়া যায়– খোটানরাজ স্বর্ণমুকুট পরিধান করিতেন; জনসাধারণ মৃতদেহের অগ্নিসঙ্কার করিত। এই দেশ বহুপুরাতন নহে।

সঙ্গ ইউন খোটানে বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত হইবার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তিনি বলেন :

খোটান রাজ্য সংগঠিত হইবার ১৬৫ বৎসর পরে রাজপুত্র বিজয়সম্ভব সিংহাসনে আরোহণ করেন। তৎকালে জনৈক বিদেশীয় বণিক বৈরোচন নামক বৌদ্ধভিক্ষুককে খোটানে রাখিয়া যান। বৈরোচনের চেষ্টায় রাজা ও প্রজাবর্গ বৌদ্ধমতে দীক্ষিত হয়।

ভারতবর্ষের লোকেই যে খোটানের রাজ্য সংস্থাপন ও বৌদ্ধধর্ম প্রচলনের মূল, তাহা অন্যান্য কারণেও সত্য বলিয়া বোধ হয়। খোটানের নিকটবর্তী মরুস্থল হইতে যে সকল মুদ্রা ও পুরাতন গ্রন্থ আবিষ্কৃত হইয়াছে তদ্বারা দুইটি ঐতিহাসিকতথ্য লাভ করা যায়। মুদ্রাগুলির কতক পালি কতক গ্রীক কর্তৃক চীন অক্ষরে খোদিত; এবং গ্রন্থগুলি কাগজে মুদ্রিত–হস্তলিখিত নহে। অলবেরুণীর “ইণ্ডিকায়” দেখিতে পাওয়া যায়, মধ্যএসিয়া হইতেই কাগজ প্রস্তুতের কৌশল সমগ্র মোসলমান রাজ্যে প্রচারিত হয়। এই দেশের অক্ষর পালি গ্রীক ও চীনের অক্ষরের মিশ্রণোদ্ভূত বলিয়াই বোধ হয়।

খোটানের রথযাত্রা শেষ হইবার পর সাঙ্গ সাউ নামক ফা হিয়ানের সহযাত্রী কাবুলাভিমুখে প্রস্থান করেন; অন্যান্য সহযাত্রী সঙ্গে ফা হিয়ান ইয়ারকন্দের দিকে অগ্রসর হইতে থাকেন। পঞ্চবিংশতি দিবস পৰ্য্যটনের পর ফা-হিয়েন ইয়ারকন্দে উপনীত হন। তথায় রাজা প্রজা সকলেই বৌদ্ধ মতাবলম্বী ও পুরোহিতগণ মহাযান-সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। এখানে একপক্ষ বিশ্রাম করিয়া ফা হিয়ান সুঙ্গলিঙ্গ পৰ্বতে আরোহণ করেন। পৰ্ব্বত লঙঘন করিয়া পঞ্চবিংশতি দিবস পৰ্য্যটনের পর তীর্থযাত্রিগণ কিয়েশা দেশে উপনীত হন। এই দেশ বহু পুরাতন। রাজা পঞ্চবর্ষা পরিষৎ নামক মহোৎসব করিতেন; তদুপলক্ষে বহুদেশের বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী সমবেত হইত। এই দেশ পাৰ্ব্বত্য ও শীতপ্রধান–শস্যের মধ্যে কেবল গোধূম উৎপন্ন হয়। এই স্থানের পর হইতেই বৃক্ষ লতাদি বিভিন্ন জাতীয় বলিয়া পরিচিত। ইহার পরই উত্তরভারত–তথায় গমন করিবার সময়ে তীর্থযাত্রিগণকে চির তুষারাবৃত পৰ্ব্বতচূড়া অতিক্রম করিতে হইয়াছিল।

ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমা ও পূৰ্ব্বসীমা কতদূর বিস্তৃত ছিল তাহা কালক্রমে বিস্মৃতি-সাগরে বিলীন হইয়া গিয়াছে। উত্তরকালে সিন্ধুনদই ভারতসীমারূপে সুপরিচিত হয়। কিন্তু মহাচীনের তীর্থযাত্রিগণের ভ্রমণ কাহিনীতে অন্যরূপ দেখিতে পাওয়া যায়। তাঁহারা সিন্ধুর পশ্চিমস্থ আফগানিস্থান বেলুচিস্থান ও তুর্কিস্থানের কিয়দংশকেও উত্তর ভারতের অন্তর্গত বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। এই সকল স্থান পাৰ্ব্বত্য শীতপ্রধান রাজ্য–তথায় বহু সংখ্যক গ্রাম নগর বিদ্যমান ছিল। বলা বাহুল্য যে উত্তর ভারতের সকল সভ্যজনপদেই বৌদ্ধমত প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল; এবং তদ্দেশের পণ্ডিতবর্গ অনেক ধর্মগ্রন্থ রচনা করিয়া যশস্বী হইয়াছিলেন। কালক্রমে ইসলামের ধর্ম বৌদ্ধমতকে তিরোহিত করিবার পরেও কিয়ৎকাল এই সকল রাজ্যে ভারতবর্ষের রীতি নীতি প্রচলিত ছিল;–এক্ষণে সৰ্ব্বত্রই মোসলমান ধর্ম ও মোসলমান আচার ব্যবহার প্রচলিত হইয়াছে।

উত্তর ভারত

চৈনিক তীর্থযাত্রীদিগের নিকট সিন্ধুর পশ্চিমপারস্থিত কতিপয় রাজ্য ‘উত্তর ভারত’ নামে পরিচিত ছিল; তন্মধ্যে পূৰ্ব্বতীরস্থ কিয়ৎপরিমাণ ভূভাগও পরিগণিত হইত। এই সকল পুরাতন রাজ্যের মধ্যে টোলি, উদ্যোগ, গান্ধার, তক্ষশিলা, পুরুষপুর ও নগরহার সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

উত্তর ভারতের উত্তরপশ্চিমাংশে টোলি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল;–ইহার পূৰ্ব্বভাগে সিন্ধুনদ, পশ্চিমে দুরারোহ পৰ্বতমালা। এই দেশে হীনযান সম্প্রদায়ের আধিপত্য ছিল; এবং একটি ৮০ ফিট উচ্চ কাষ্ঠমূর্তির জন্য টোলি রাজ্য বৌদ্ধতীর্থের মধ্যে পরিগণিত হইত। এই মূর্তি–মৈত্রেয় বোধিসত্বের। ফা হিয়ান বলেন :

শাক্যসিংহের নিৰ্ব্বাণলাভের তিনশত বৎসর পরে কোনও অর্হৎ কর্তৃক এই কাষ্ঠমূৰ্ত্তি সংস্থাপিত হয়। তদুপলক্ষে বৌদ্ধশাস্ত্র সিন্ধুপারে নীত হইয়া অন্যান্য দেশে প্রচারিত হয়।

হিয়ঙ্গ থসাঙ্গের ভ্রমণকাহিনীতে দেখিতে পাওয়া যায়,–এই রাজ্য তাঁহার সময়ে স্বর্ণের আকর ও কুঙ্কমের উদ্ভবক্ষেত্র বলিয়া পরিচিত ছিল। লোকে বলিত অর্হৎ মধ্যান্তিকের যত্নে মৈত্রেয় বোধিসত্বের কাষ্ঠমূৰ্ত্তি সংস্থাপিত হইয়াছিল। অহৎ মধ্যান্তিক একজন সুবিখ্যাত বৌদ্ধ প্রচারক,–তিনি যে কাশ্মীর ও হিমবৎ রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন, বৌদ্ধদিগের মধ্যে সকলেই তাহা লিখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু এই প্রচারকাল লইয়া এখনও তর্ক বিতর্ক চলিতেছে। উদীচ্য বৌদ্ধমতে মধ্যান্তিক আনন্দের শিষ্য, তিনি গুরুর নির্বাণলাভের পর বারাণশীতেই বসতি করিতেন। তথায় জনসাধারণ বৌদ্ধদিগের ব্যবহারে উত্যক্ত হইতেছে দেখিয়া মধ্যান্তিক যোগবলে দশসহস্র শিষ্য সমভিব্যাহারে কাশ্মীরে উপনীত হইয়া পাৰ্ব্বত্য জাতির মধ্যে ধর্মপ্রচারে নিযুক্ত হন। দাক্ষিণাত্য বৌদ্ধমতানুসারে পরিনির্বাণের তিনশত বৎসর পরে মধ্যান্তিক কাশ্মীরে প্রচারযাত্রা করেন। যাহা হউক,–এই বৌদ্ধ প্রচারকই যে উত্তর ভারতে বৌদ্ধমত প্রচারের পথ প্রদর্শক তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই।

ফা হিয়ান টোলি হইতে উদ্যানরাজ্যে গমন করেন, শুখায় বর্ষাকাল অতিবাহিত করিয়া দক্ষিণাভিমুখে আসিয়া গান্ধার রাজ্যে উপনীত হন, তথা হইতে তক্ষঃশিলা ও পুরুষপুর দর্শন করিয়া নগরহার রাজ্যে প্রবেশ করেন। এই স্থানে সহযাত্রিবর্গের মধ্যে অনেকের তীর্থযাত্রার শেষ হয়। কেহ কেহ চীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, কেহ বা উত্তর ভারতেই দেহত্যাগ করিতে বাধ্য হন।

উদ্যান রাজ্য সিন্ধুতীরে সংস্থাপিত ছিল। তথায় মধ্যভারতের ন্যায় সুসভ্য জনোচিত অশন বসনও সুমার্জিত ভাষার পরিচয় পাইয়া ফা-হিয়ান উদ্যানরাজ্যের অনুরক্ত হইয়াছিলেন। এই রাজ্যে পাঁচশত সংঘারাম ছিল যাঁহারা ভারতভূমি দর্শন কামনায় কত ক্লেশে এতদূর অগ্রসর হইয়াছেন; তাঁহারা উদ্যানে আসিয়া মধ্যভারতের কিয়ৎপরিমাণে পরিচয় পাইয়া যে নিরতিশয় উৎফুল্ল হইবেন, তাহাতে সন্দেহ কি? পরবর্তী তীর্থযাত্রিবর্গের মধ্যে সঙ্গ ইউম এবং হিয়ঙ্গ থসাঙ্গের গ্রন্থেও উদ্যানের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। সঙ্গ ইউম বলেন :

উদ্যানের রাজা নিরামিষভোজী ছিলেন। তিনি প্রভাতে সায়াহ্নে শঙ্খ, বংশী, বীণা ও ডঙ্কানিনাদে বুদ্ধসেবা করিতেন; অপরাহ্নে রাজকার্য পরিদর্শনার্থ সভাসীন হইতেন। সায়ংকালে বহুসংখ্যক শঙ্ঘন্টানিনাদে চতুর্দিকস্থ আকাশ প্রতিধবনিত হইত।

উদ্যান রাজ্যের উৎপত্তি ও তদ্দেশে বৌদ্ধধর্ম বিস্তৃতি বিষয়ে হিয়ঙ্গ থসাঙ্গ একটি আখ্যায়িকার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। একদা বিরুদ্ধক রাজা শাক্যরাজ্য আক্রমণ করিয়া শাক্যগণকে পরাস্ত করিলে, উত্তরসেন নামক শাক্যরাজকুমার উদ্যানরাজ্যে পলায়ন করিয়া হ্রদতীরে নিদ্রাভিভূত হন। সে দেশে নাগজাতি বাস করিত; তাহাদের বেশভূষা আচার ব্যবহার অসভ্যের ন্যায় ভয়াবহ ছিল। উত্তরসেন নাগকন্যার প্রণয়বিমুগ্ধ হইয়া তাঁহার পাণিগ্রহণ করিয়া তদ্দেশে রাজ্য সংস্থাপন করেন। শাক্যসিংহ নিৰ্ব্বাণলাভ করিলে যে সকল রাজন্যবর্গ তাঁহার চিতাভস্ম গ্রহণ করিবার জন্য কুশিনগরে সমবেত হন তন্মধ্যে উত্তরসেনও একজন। তিনি চিতাভস্ম আনিয়া উদ্যানে চৈত্য নির্মাণ করেন। এই আখ্যায়িকা অনুসারে উদ্যানে নির্বাণের সমসময়েই বৌদ্ধমত প্রচারিত হওয়ার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়।

গান্ধার একটি বহু পুরাতন রাজ্য–একদিকে কাবুলনদ অন্য দিকে সিন্ধুনদ, ইহার মধ্যে গান্ধার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। বর্তমান পেশোয়ার নগর সেকালে পুরুষপুর নামে গান্ধারের রাজধানী বলিয়া সুপরিচিত ছিল। ফা হিয়ান বলেন, মহারাজ অশোকের পুত্ৰ ধৰ্ম্মবর্ধন এই রাজ্যের শাসনভার পরিচালনা করিতেন। ফা হিয়ানের সময়ে গান্ধার স্বাধীন ও সম্পন্ন জনপদ বলিয়া পরিচিত ছিল। কিন্তু হিয়ঙ্গের সময়ে গান্ধার হৃতসৰ্ব্বস্ব পরিত্যক্ত শ্মশানভূমির ন্যায় কপিশারাজ্যের উপরিভাগ রূপে শাসিত হইত। ফা হিয়ানের সময়ে গান্ধারে বৌদ্ধধর্মের প্রবল প্রতাপ পরিলক্ষিত হইত; হিয়ঙ্গের সময়ে তথায় বৌদ্ধসংখ্যা অধিক ছিল না; অধিকাংশ লোকেই বৌদ্ধমত পরিত্যাগ করিয়াছিল। গান্ধার শাস্ত্রচর্চা ও জ্ঞানানুশীলনের জন্য খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। হিয়ঙ্গ থসাঙ্গ লিখিয়া গিয়াছেন যে– পুরাকাল হইতে তাঁহার ভ্রমণ কাল পৰ্য্যাপ্ত গান্ধারনিবাসী অধ্যাপকবর্গ বহুশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছিলেন। তন্মধ্যে নারায়ণ দেব, অসঙ্গবোধিসত্ব, বসুবন্ধু বোধিসত্ব, ধৰ্মত্ৰাত, মনোহৃত এবং পার্শ্ব অথবা আৰ্যপার্শ্বিক সুবিখ্যাত। ইহাদের জন্মভূমি বলিয়া গান্ধারের যে গৌরব ছিল, হিয়ঙ্গের সময়ে তাহা বিলুপ্তপ্রায় হইয়াছিল। তকালে পরিত্যক্ত বৌদ্ধপ ক্রমশঃ ভগ্নস্তূপে পরিণত হইতেছিল, তাহার স্থলে দেবমন্দির প্রতিষ্ঠিত হইয়া গান্ধারে হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান সাধন করিতেছিল। এই বৌদ্ধ জনপদে বুদ্ধদেবের ভিক্ষাপাত্র সযত্নে রক্ষিত হইত;–বহুশতাব্দী লোকে সেই পাত্র পূজা করিবার জন্য গান্ধারে গমন করিত। হিয়ঙ্গের সময়ে ঐ ভিক্ষাপাত্র পারস্য দেশে নীত হইয়াছিল। ফা হিয়ান গান্ধারেই ভিক্ষা পাত্র দর্শন করিয়াছিলেন।

এই দেশে মহানিৰ্বাণের চারিশত বৎসর পরে কণিষ্ক নামক রাজা একটি অত্যুচ্চ চৈত্য নির্মাণ করেন। কণিক্ষের ইতিহাস অদ্যাপি সম্পূর্ণরূপে পরিজ্ঞাত হয় নাই। কণিক্ষের নাম সমগ্র বৌদ্ধ সাহিত্যে বৰ্ত্তমান। তাঁহার নামাঙ্কিত মুদ্রাও আবিষ্কৃত হইয়াছে। কিন্তু তিনি কোন সময়ে প্রাদুর্ভূত হন, তদ্বিষয়ে এখনও বাদ প্রতিবাদের অবসান হয় নাই। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস লেখক হৃস ডেভিডের মতে খৃষ্টপূর্ব ৪১২ অব্দের সমসময়ে শাক্যসিংহ নিৰ্ব্বাণ লাভ করেন। ইহা ঠিক হইলে ফা হিয়ানের মতানুযায়ী কণিষ্কের রাজত্বকাল খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর অন্তর্গত হয়। অধ্যাপক লাসেনও এই মতের সমর্থন করেন। তিনি বলেন, কণিষ্ক খৃষ্টীয় ১০ হইতে ৪০ অব্দের মধ্যে প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকিবেন। অন্যান্য লেখকগণের বিশ্বাস, কণিষ্ক খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর শেষ ভাগের লোক;–খৃষ্টীয় ৭৮ অব্দ হইতে ভারতবর্ষে শকাব্দর প্রচলন হইয়াছে, তাহা কণিষ্কের রাজ্যকাল হইতেই আরম্ভ হয়। কণিষ্ক গান্ধারের রাজা হইলেও বহুদেশ বাহুবলে করপ্রদ করিয়াছিলেন; জনশ্রুতি তাঁহার রাজ্যসীমা চীনদেশেও প্রসারিত করিয়া দিয়াছে। হিয়ঙ্গ থসাঙ্গ বলেন,–কণিষ্ক পরিনির্বাণের চারিশত বৎসর পরে প্রাদুর্ভূত হইয়া সমগ্র জম্বুদ্বীপ করতলগত করিয়াছিলেন। কণিষ্ক প্রথমে বৌদ্ধমতে বিশ্বাসী ছিলেন না;–একটি রাখাল বালক তাঁহাকে বলিয়াছিল যে, শাক্যসিংহ কণিষ্কের আবির্ভাব ও কীর্তিকলাপের কথা কহিয়া গিয়াছেন। ভগবান বুদ্ধদেবের ন্যায় সাধু পুরুষ চারিশত বৎসর পূর্বে ভবিষ্যবাণী প্রচার করিয়া গিয়াছেন শুনিয়া কণিষ্ক আত্মপ্রসাদে উৎফুল্ল হইয়া বৌদ্ধধর্মে আস্থাবান হন। তিনি যে জনৈক প্রবল প্রতাপাম্বিত বৌদ্ধ নরপতি বলিয়া পুরাকালে সকল দেশেই সুপরিচিত ছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই। যে সকল নরপালের সহায়তায় বৌদ্ধধৰ্ম্ম জগদ্ব্যাপ্ত হয়, তন্মধ্যে অশোক ও কণিষ্কের নাম সুপরিচিত।

কণিষ্কের অত্যুচ্চ বৌদ্ধস্তূপের ন্যায় তাঁহার সংস্থাপিত সংঘারামও বৌদ্ধ সাহিত্যে সুপরিচিত। গান্ধারের সাধু পুরুষবর্গের পবিত্র স্মৃতি এই মন্দিরে সংরক্ষিত হইত। হিয়ঙ্গ ইহার ভগ্নাবস্থা দর্শন করেন। এই মন্দিরের একটি কক্ষ পার্শ্বিকের স্মৃতি রক্ষা করিত। পার্শ্বিক ব্রহ্মন্যধর্মে সুশিক্ষিত ছিলেন, তিনি অশীতি বর্ষ বয়ঃক্রমে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করিয়া তিন বৎসরে সমগ্র বৌদ্ধসাহিত্য অধ্যয়ন করিয়া জ্ঞানলাভ করেন। পার্শ্বিকের স্মৃতিকক্ষের নিকটস্থ একটি পুরাতন মন্দিরে বসুবন্ধু অহধৰ্ম্ম মোক্ষ শাস্ত্র নামক গ্রন্থরচনা করেন। এই মন্দিরের দক্ষিণস্থ অন্য একটি মন্দিরে মনোহৃত বাস করিয়া বিভাসা শাস্ত্র প্রণয়ণ করেন। ইনি নিৰ্ব্বাণের পরবর্তী সহস্র বৎসরের মধ্যে প্রাদুর্ভূত হন। নির্বাণের পরবর্তী পাঁচশত বৎসর বৌদ্ধসাহিত্যে “শাস্ত্রযুগ” ও তৎপরবর্তী সহস্র বৎসর “মূৰ্তিযুগ” নামে কথিত। মনোহৃত মুর্তিযুগে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। হিয়ঙ্গ থসঙ্গ ইহার একটি আখ্যায়িকা লিখিয়া গিয়াছেন, তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায়, মনোহৃত বিক্ৰমদিত্যের সভায় অন্যায় তর্কে পরাস্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করেন। পরবর্তী সম্রাট শিলাদিত্যের সভায় মনোহৃতের শিষ্য বসুবন্ধু। ব্রাহ্মণগণকে পরাস্ত করিয়া প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। বিক্রমাদিত্যের সভায় ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ উভয় মতেরই পণ্ডিত ছিলেন। হিয়াঙ্গ ভারতবর্ষে উপনীত হইবার ষষ্টি বৎসর পূর্বে শিলাদিত্যের মৃত্যু হয়। চৈনিক ভ্রমণকারিদিগের মতে এই শিলাদিত্যের পূর্ববর্তী রাজার নামই–বিক্রমাদিত্য। হিয়াঙ্গ খৃষ্টীয় ৫০৩ অব্দে জন্মগ্রহণ করিয়া ৬৬৮ অব্দে প্রাণত্যাগ করেন। তাঁহার বর্ণনানুসারে খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে বিক্রমাদিত্য প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন।

গান্ধারের প্রাচীন রাজধানীর নাম পুস্কলাবতী বা পুস্করাবতী;–সূৰ্য্যবংশাবতংশ রামচন্দ্রের ভ্রাতা ভরতের পুত্র পুস্কল বা পুস্করের এই রাজ্য সংস্থাপন করার কথা শুনিতে পাওয়া যায়। পুষ্কলাবতী একসময়ে বৌদ্ধশিক্ষার কেন্দ্রস্থল বলিয়া পরিচিত ছিল। কণিষ্কের শাসনসময়ে বসুমিত্র নামক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই নগরে অবস্থান করিয়া বিখ্যাত অভিধৰ্ম্মপ্রকরণপাদ নামক বৌদ্ধগ্রন্থ রচনা করেন। পুষ্কলাবতী বহু বিপ্লবের লীলাভূমি। একদা ব্ৰহ্মণ্যধৰ্ম্মের কেন্দ্র বলিয়া পরিচিত থাকিয়া পরে বৌদ্ধধর্মের আশ্রয়স্থান হয়; তদবস্থায় সেকেন্দার শাহ পুষ্কলাবতী অবরোধ ও অধিকৃত করিয়া সঞ্জয় নামক ব্যক্তিকে সিংহাসনে স্থাপিত করেন। হিয়ঙ্গের সময়ে এখানে পুনরায় বৌদ্ধমত তিরোহিত হইতেছিল। এখন ইহা মোসলমানের আবাসভূমি।

গান্ধার রাজ্যের ন্যায় তক্ষশিলাও বৌদ্ধ সাহিত্যে সুবিখ্যাত। একদা তক্ষঃশিলা কপিশারাজ্যের করপ্রদ ছিল; পরে কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত হইলে বিমাতার কৌশলে অশোক পুত্র কুণাল এই স্থানের শাসনভার প্রাপ্ত হন। যুবরাজ কুণালের চক্ষুদ্বয় উৎপাটনের জন্য তাঁহার বিমাতা রাজার অজ্ঞাতে এক রাজাজ্ঞা প্রেরণ করেন। কুণাল রাজাজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়া পিতৃ আজ্ঞা সৰ্ব্বথা শিরোধার্য বলিয়া অম্লানচিত্তে চক্ষুদয় উৎপাটিত করিতে দেন। যাহারা এই চক্রান্তে লিপ্ত ছিল, তাহারা সকলেই দণ্ডিত হইয়াছিল, অশোক এই অশ্রুতপূর্ব পিতৃভক্তি রক্ষা করিবার জন্য এইস্থানে একটি ‘কুণাল চৈত্য” নিৰ্মাণ করিয়াছিলেন। ফা হিয়ান তাহার উল্লেখ না করিলেও হিয়াঙ্গ এই আখ্যায়িকা বিস্তৃতভাবে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।

উপগুপ্ত

ফা হিয়ান সিন্ধুনদ অতিক্রম করিয়া বহুযোজন ভ্রমণের পর যমুনাতীরসংস্থিত মথুরা নগরে উপনীত হন। মুথায় উপনীত হইবার পূৰ্ব্বে পথিমধ্যে কোন স্থানে দীর্ঘকাল বিশ্রাম করিয়াছিলেন বলিয়া বোধ হয় না। সিন্ধুতীর হইতে মথুরা পর্যন্ত সকল স্থানেই বৌদ্ধমত প্রচলিত ছিল।

মথুরা প্রাচীন সুরসেনক রাজ্যের রাজধানী বলিয়া পরিচিত। পুরাকাল হইতে বহু তপস্বী মথুরায় তপস্যা করিতেন; বৌদ্ধধর্ম প্রচলিত হইবার পরও বৌদ্ধসন্ন্যাসিগণ মথুরায় তপস্যা করিতে নিরস্ত হন নাই। মথুরা বহু সাধকের পদধূলি প্রাপ্ত হইয়াছিল; তন্মধ্যে শারীপুত্র, মুদগল পুত্র, পূর্ণমৈত্রেয়ানীপুত্র, উপালি, আনন্দ, রাহুল এবং সঞ্জুশ্রীর স্মৃতিসমাদর রক্ষার্থে মথুরার স্তূপ নির্মিত হইয়াছিল।

যাহারা অভিধর্মের অনুরাগী তাঁহারা শারীপুত্রের, যাঁহারা যোগমার্গ প্রবাসী তাঁহারা মুদগলপুত্রের, যাঁহারা সূত্রানুরাগী তাঁহারা পূর্ণ মৈত্রেয়ানীপুত্রের ও যাঁহারা বিনয় মতাবলম্বী তাঁহারা উপালির পূজা করিতেন। শ্ৰমণগণ রাহুলের ও ভিক্ষুণীগণ আনন্দের পূজা করিতেন;–এইরূপে বৌদ্ধমতের সকল সম্প্রদায়ের নরনারীর পক্ষেই মথুরা একটি পুণ্যতীর্থ বলিয়া পরিচিত ছিল।

মথুরা সমগ্র বৌদ্ধসাহিত্যে উপগুপ্তের সাধনক্ষেত্র বলিয়া সবিশেষ পরিচিত। উপগুপ্তের ইতিহাসের সহিত বৌদ্ধমতবিস্তারের ইতিহাস চিরসংযুক্ত, তিনি জাতিতে শূদ্র ছিলেন; সপ্তদশবর্ষ বয়ঃক্রম কালে বৌদ্ধমতে দীক্ষিত হইয়া মথুরায় তপস্যা করিতে আরম্ভ করেন। উপগুপ্ত তরুণজীবনেই জিতেন্দ্রিয় যোগী বলিয়া খ্যাতিলাভ করেন এবং মহারাজ অশোকের আমন্ত্রণে পাটলিপুত্রে গমন করিয়া রাজার ধর্মোপদেষ্টা হন। ইহারই মন্ত্রণাবলে অশোক বৌদ্ধধর্ম প্রচারে ব্রতসংকল্প হন।

তিববত চীন ও যাপনের বৌদ্ধসাহিত্যে উপগুপ্তের নাম সুপরিচিত। শাক্যসিংহের নিৰ্বাণলাভের শতবর্ষপরে তাঁহার অভ্যুদয় কীৰ্ত্তিত হইয়াছে। সুবিখ্যাত বৌদ্ধলেখক অশ্বঘোষ উপগুপ্তের যোগসাধনের কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তিনি বৌদ্ধজগতে “অলক্ষণক বুদ্ধ” নামে পূজিত। ডাক্তার বিল বলেন,–সিংহলে উপগুপ্তের নাম অজ্ঞাত। এ কথা ঠিক নহে। সিংহলের মহাবংশ নামক প্রসিদ্ধ ইতিহাসে যিনি মোগগলিপুত্ত নামে পরিচিত, তিনিই যে মুদগলপুত্র সন্ন্যাসী উপগুপ্ত, তাহা সম্প্রতি প্রমাণীকৃত হইয়াছে। সৰ্ব্বজগতে উপগুপ্তের ন্যায় জিতেন্দ্রিয় নির্লিপ্ত সন্ন্যাসির সংখ্যা অধিক নহে। ইহার জীবনের সহিত দেশ বিদেশে বৌদ্ধমত প্রচারের ইতিহাস সংযুক্ত বলিয়া অশোকের ন্যায় উপগুপ্তেরও বিস্তৃত জীবনী সঙ্কলিত হওয়া আবশ্যক। ধৰ্ম্মরাজ্যে শাস্ত্র ও সদুপদেশ অপেক্ষা ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত অধিক উত্তেজনা আনিয়া থাকে। শাক্যসিংহের জীবনে ও কার্য্যে এমন তন্ময়ত্ব ছিল যে, যিনি তাঁহার সংস্পর্শে আসিতেন, তাঁহাকেই সে দিব্যভাব স্পর্শ করিত। মহানিৰ্ব্বাণের পর কিয়ৎকাল শাক্যসিংহের সমসাময়িক শিষ্যবর্গ ধৰ্ম্মজগতে জীবনগত সাধু দৃষ্টান্ত দ্বারা বৌদ্ধমত প্রচারিত করেন। তাঁহাদের তিরোধানের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধমত পুস্তকগত ধর্মোপদেশে পৰ্য্যবসিত হইত। কিন্তু উপগুপ্তের দৃষ্টান্ত বৌদ্ধধর্মের মধ্যে পুনরায় নববল সঞ্চারিত করিয়া দিয়াছিল। এই জন্য তিনি দ্বিতীয় বুদ্ধরূপে পূজিত। বঙ্গসাহিত্যসেবকগণের মধ্যে সুকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপগুপ্তের স্মৃতিসমাদরবৰ্ধনার্থ একটি কবিতায় তাঁহার ধৰ্ম্মজীবনের কথঞ্ছিৎ পরিচয় প্রদান করিয়াছেন।

বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তিত হইবার পূর্বেও ভারতবর্ষে কঠোর সন্ন্যাস ও যোগসাধনের অভাব ছিল না। সে সকল যোগী লোকালয় হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া অরণ্যবাস অবলম্বন করিতেন। ব্রাহ্মণ ভিন্ন ক্ষুদ্রাদির পক্ষে সন্ন্যাস গ্রহণের অধিকার ছিল না। সংস্কৃত ভিন্ন সচরাচর কথিত ভাষায় ধর্মালোচনার রীতি ছিল না। তাহাতে জনসাধারণ সাধুসজ্জন হইতে পৃথক হইয়া সমাজের ভিন্নস্তরে স্থানলাভ করিয়াছিল। বৌদ্ধমতের বিশেষত্ব এই যে, শাক্যসিংহ ভারতবর্ষের এই সকল পূৰ্ব্বসংস্কার বিদূরিত করিয়া স্ত্রী শূদ্র সকলের পক্ষেই সন্ন্যাস ও ধর্মালোচনার পথ উন্মুক্ত করিয়া দেন; সংস্কৃতের পরিবর্তে কথোপকথনের প্রচলিত ভাষায় উপদেশ বিতরণ ও গ্রন্থরচনার ব্যবস্থা করিয়া সকলের পক্ষেই ধর্মালোচনায় হস্তক্ষেপ করিবার সুবিধা করিয়া দেন;–তাহাতে অতি অল্পদিনের মধ্যে সর্বত্র বৌদ্ধমত বিস্তৃত হইয়া পড়ে। ব্রাহ্মণগণ আপন প্রাধান্য রক্ষার্থ বৌদ্ধগণকে চোর ভণ্ড প্রভৃতি বিশেষণে বিভূষিত করিয়াও বৌদ্ধমতের প্রবল প্রবাহের গতিরোধ করিতে পারেন না। শূদ্র উপগুপ্ত বৌদ্ধবির্ভাবের পূর্বে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করিলে, সেবাবৃত্তি ও সংসারধর্ম লইয়াই জীবন বিসর্জন করিতে বাধ্য হইতেন। তিনি বৌদ্ধাবির্ভাবের পূৰ্ব্বে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করায় সমগ্র বৌদ্ধজগতে জগদগুরুর ন্যায় পূজালাভে সক্ষম হইয়াছিলেন। বৌদ্ধমত যেন চিররুদ্ধ পর্বতগুহার দ্বারোদঘাটন করিয়া নিঝরস্রোত উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছিল,–সে স্রোত যত প্রবল হইতে প্রবলতর হইতে লাগিল, ততই দেশের পর দেশ প্লাবিত হইয়া গেল। উপগুপ্ত আবির্ভূত হইবার পূৰ্ব্বেই ভারতবর্ষে জন্মগত প্রাধান্য মন্দীভূত হইয়া জীবনগত পূণ্যপ্রভার সমাদর সংস্থাপিত হইয়াছিল। বৌদ্ধমত প্রবর্তিত হইবার পূৰ্ব্বে, ভারতবর্ষের নরপতিকে লোকরহ্মার্থ রাজধর্মের কঠোরকর্তব্যপালনের জন্য শূদ্রসন্ন্যাসীর মুণ্ডচ্ছেদ করিতে হইত; বৌদ্ধমত প্রবর্তিত হইবার পর ভারতবর্ষের সুবিখ্যাত সম্রাট অশোক মুথরার শূদ্র সন্ন্যাসীর সন্ধান পাইয়া তাহাকে দেবতার ন্যায় পূজা ও সম্বৰ্ধনার সহিত রাজধানীতে আনয়ন করিয়াছিলেন। এই নবধর্ম তখন পর্যন্তও সংকীর্ণতায় সীমাবদ্ধ হয় নাই;–তখনও শতশাস্ত্রবিজড়িত ক্রিয়াকলাপের অনুষ্ঠানের তুলনায় জীবনগত সদাচারই ধৰ্ম্মাচরণের প্রকৃত পন্থা বলিয়া পরিচিত ছিল।

উপগুপ্ত যোগমার্গের পথপ্রদর্শক বলিয়া বৌদ্ধসাহিত্যে সুপরিচিত। বৌদ্ধ মতাবলম্বিগণ তাঁহাকে অদ্বিতীয় গুরুরূপে গ্রহণ করিয়া নববল প্রাপ্ত হন। উপগুপ্তের ধর্মবলের সহিত অশোকের রাজশক্তি সম্মিলিত হইবার পর হইতেই বৌদ্ধধর্মের বহুবিস্তৃতির সূত্রপাত হয়। পূৰ্ব্বপ্রচলিত ধর্মসাধনে ভারতবর্ষনিবাসী সকলজাতির তুল্য অধিকার স্বীকৃত হইত না; সুতরাং সে ধৰ্ম্ম ভারতবর্ষের বাহিরে অশিক্ষিত হুন শক যবন কিরাতাদির মধ্যে প্রচার করিবার প্রয়োজন বা প্রলোভন ছিল না। শাক্যসিংহের নবধর্ম কাহাকেও হীন বলিয়া মনে করিত না; বরং লোকহিতকামনা ধর্মসাধনের অঙ্গ বলিয়াই গ্রহণ করিয়াছিল। সুতরাং স্বদেশে এবং বিদেশে ধর্মপ্রচার করিবার জন্য ব্যাকুলতা জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। এই ব্যাকুলতা বৌদ্ধপ্রচারকবর্গের জীবনের সহিত মিশ্রিত হইয়া তাঁহাদিগকে অসাধ্য সাধনেও উত্তেজিত করিয়াছিল। তাঁহারা মরুগিরি সাগর প্রান্তর অতিক্রম করিয়া পরিত্রাণের সুসমাচার বিতরণ করিবার জন্য দ্বীপে দ্বীপে দেশে দেশে ধাবিত হইয়াছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বৌদ্ধধৰ্ম্মই সৰ্ব্ব প্রথম প্রচারের ধর্ম; সে ধর্মের প্রচারকবর্গের মধ্যে উপগুপ্ত সৰ্বশ্রেষ্ঠ উত্তেজক শক্তি।

উপগুপ্তের উৎসাহে ও উত্তেজনায় বৌদ্ধমত বহুবিস্তৃত হইবার সময়ে বহুসংখ্যক বৰ্ব্বরজাতির মধ্যে সভ্যতাবিস্তারের সূত্রপাত হয়। মানবসমাজের ক্রমোন্নতির ইতিহাসে উপগুপ্তের প্রভাব এখনও লিখিত বা স্বীকৃত হয় নাই। কিন্তু ভারতবর্ষ কিরূপ ক্রমশঃ মধ্যএসিয়াকে সমুন্নত করিয়াছিল, মধ্যএসিয়া কিরূপে ইসলামকে সুশিক্ষিত করিয়াছিল, এবং ইসলাম কিরূপে ইউরোপকে জ্ঞানদান করিয়া সভ্যতাসোপানে অগ্রসর হইবার সহায়তা করিয়াছিল,–তাহার ইতিবৃত্ত সঙ্কলিত হইলে ভারতীয় বৌদ্ধমতের প্রতি দৃষ্টি নিপতিত হইবে; এবং তাহার মূলশক্তির আলোচনা করিবার সময়ে শাক্যসিংহের নামের সঙ্গে উপগুপ্তের নামও সম্মিলিত করিতে হইবে।

ফা হিয়ান, হিয়ঙ্গ থসাঙ্গ প্রভৃতি বিদেশের তীর্থযাত্রিগণ এই মহাপুরুষের আরাধনা করিবার জন্য মথুরায় পদার্পণ করিয়াছিলেন। ফা হিয়ানের সময়ে মথুরায় যমুনার উভয়তীরে বিংশতি বৌদ্ধসংঘারামে তিন সহস্র পুরোহিত বাস করিতেন; হিয়ঙ্গের সময়ে তথায় পাঁচটি দেবমন্দিরও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ফা হিয়ান যখন মথুরায় উপনীত হন, তৎকালে মথুরার নিকটবর্তী মরুভূমির পশ্চিমে সকল স্থানেই বৌদ্ধমত প্রচলিত ছিল;–সে সকল জনপদের রাজারাও বৌদ্ধমতের প্রতি সমাদর প্রদর্শন করিতেন। এই স্থান হইতে মধ্যদেশ পৰ্য্যন্ত সমতল ক্ষেত্রে জনসাধারণ পরমসুখে কালাতিপাত করিত। ফা হিয়ান স্বচক্ষে তাহাদের যেরূপ অবস্থা দেখিয়াছিলেন তাহা লিপিবদ্ধ করিবার সময়ে বলিয়াছেন :

লোকের অবস্থা স্বচ্ছল। কোনরূপ রাজকর নাই। যাহারা ভূমিকৰ্ষণ করে তাহাদিগকেই কেবল শস্যের অংশ রাজভাণ্ডারে প্রদান করিতে হয়। রাজা কোনরূপ শারীরিক দণ্ডদান করেন না; কেবল পুনঃপুনঃ রাজবিদ্রোহী হইলে দক্ষিণহস্ত ছেদন করিয়া থাকেন! সমস্ত দেশে লোকে জীবহিংসা ও সুরাপান পরিত্যাগ করিয়াছে; চণ্ডাল ভিন্ন আর কেহ লশুনাদি আহার করে না। বাজারে মদের দোকান দেখিতে পাওয়া যায় না। কেহ কাহারও ভূমিহরণ করিবার সম্ভাবনা নাই–খোদিত লিপি দ্বারা তাহা নির্দিষ্ট ও বংশানুক্রমে সম্মানপ্রাপ্ত হইতেছে।

বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তিত হইবার পূৰ্ব্বে জীবহিংসা ও সুরাপান প্রচলিত ছিল;–শাস্ত্রে তাহার নিন্দা ও প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা থাকিলেও লোকসমাজে তাহা প্রচলিত হইয়া পড়িয়াছিল। বৌদ্ধমত প্রচলিত হইবার পর জীবহিংসা ও সুরাপান নিবারিত হইয়া যায়। যাঁহারা খৃষ্টীয়ান সুসভ্যসমাজের সুরাপান নিবারণের জন্য অক্লান্ত অধ্যবসায়ে প্রচারকার্য্যে অগ্রসর হইয়াছেন, তাঁহাদের চেষ্টা এ পর্যন্ত সুশিক্ষিত ইউরোপ ও আমেরিকাকে সুরাত্যাগে সম্মত করিতে পারে নাই। যে ধৰ্ম্মমত ভারতবর্ষের ন্যায় বিস্তৃত দেশ হইতে সেকালে জীবহিংসা ও সুরাপান নিৰ্ব্বাসিত করিয়া জনসাধারণের রোগ দারিদ্র গৃহকলহ ও জঘন্যজীবনের পরিবর্তে সুখ শান্তি ও পুণ্যকীৰ্ত্তি আনয়ন করিয়াছিল, সে ধর্মের প্রচারকবর্গের জয় ঘোষণা করিতে কাহার না আনন্দ হয়?

ফা হিয়ান যখন এই দেশে পদার্পণ করেন, তখন চতুর্দিকে বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিহারের বিবরণে দেখিতে পাওয়া যায়–সন্ন্যাসিগণ বিহারে বাস করিবার সময়ে শয্যা আসন, অশন বসনের জন্য নিশ্চিন্ত থাকিতেন। যোগাভ্যাস, শাস্ত্রাভ্যাস, ধর্মালোচনা, উপদেশ দান–ইহাই তাঁহাদের নিত্য কর্মের মধ্যে

পরিগণিত ছিল। ধর্মাচাৰ্যবর্গের পরিচর্যার জন্য রাজা প্রজা সকলেই বিহারের ব্যয় নিৰ্ব্বাহের ভার গ্রহণ করায়, একদল সংসারাসক্তিশূন্য পুণ্যপ্রয়াসী সন্ন্যাসী দেশে দেশে ধর্মপ্রচারে নিযুক্ত হইয়াছিল।

উৎসাহ, মাঘ, ফাল্গুন, ১৩০৭ ও বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৮

তথ্যসূত্র

১ Buddhist books began to be imported into China during the closing period of the first century of our era. –Dr. Beal’s Buddhist Records of the Western World, Vol, I. Introduction.

২ Never did more devoted pilgrims leave their native country to encounter the perils of travel in foreign and distant never did disciples more ardently desire to gaze on the secred vestiges of their religion; never did men endure greater sufferings by desert, mountain and sea than these simple-minded earnest Buddhist priests.–Dr. Beal’s Buddhist Records of the Western World, Vol. I. Introduction.

চৈনিক তীর্থযাত্রী

মহাচীন হইতে যে সকল বৌদ্ধশ্ৰমণ ভারতবর্ষাভিমুখে তীর্থযাত্রা করিতেন, তাঁহাদের গ্রন্থে ভারতবর্ষের অতীত কাহিনীর বিস্তৃত বিবরণ প্রাপ্ত হইবার আশায় দুইচারিজন পাশ্চাত্য পণ্ডিত যে সকল চৈনিক গ্রন্থের অনুবাদ করিতে সক্ষম হইয়াছেন, তাহাই এখন পর্যন্ত আমাদের একমাত্র অবলম্বন। সেকালের চৈনিক শ্ৰমণগণ ভারতীয় বৌদ্ধভূমি পরিক্রমণ করিয়া পুণ্যসঞ্চয়নের আশায় যেরূপ অধ্যবসায়ে ও কায়ক্লেশে মরুগিরিসাগরোস্মি অতিক্রম করিয়া এদেশে উপনীত হইতেন, একালের আমরা স্বদেশের বিলুপ্ত কাহিনীর উদ্ধার সাধন করিয়া পুণ্যসঞ্চয় কামনায় তাহার শতাংশের একাংশমাত্র অধ্যবসায় লইয়া চৈনিক সাহিত্যের আলোচনায় নিযুক্ত হইলে, এতদিনে অনেক পুরাতত্ত্বের লুপ্তোদ্ধার সাধিত হইতে পারিত। চৈনিক সাহিত্যে আমাদের পুরাতত্ত্ব-সংগ্রহের কিরূপ সম্ভাবনা আছে তাহার আভাস দিবার জন্য সুবিখ্যাত ডাক্তার সামুয়েল বিল অনেকগুলি চৈনিক গ্রন্থের ইংরাজী অনুবাদ প্রকাশিত করিয়াছেন;–দুর্ভাগ্যক্রমে সে সকল সহজলভ্য গ্রন্থও আমাদের দেশের সৰ্ব্বত্র সুপরিচিত হয় নাই।

খৃষ্টধর্ম প্রবর্তিত হইবার পূৰ্বেই ভারতীয় বৌদ্ধমত এসিয়াখণ্ডের জলে স্থলে পরিব্যাপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল, কি সূত্রে ভারতীয় বৌদ্ধমত মহাচীন সাম্রাজ্যে প্রথম প্রবেশলাভ করে, তাহার সন্ধান প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা নাই; তাহা এরূপ শনৈঃ শনৈঃ সংসাধিত হইয়াছিল যে, কেহ সে কথা লিপিবদ্ধ করিবার অবসর প্রাপ্ত হয় নাই। খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত চীন দেশের কোন বৌদ্ধশ্রমণের ভারতবিবরণী লিপিবদ্ধ করিবার সন্ধান পাওয়া যায় না; কিন্তু তৎকালে মহাচীন সাম্রাজ্যে বৌদ্ধমত বৌদ্ধাচার বৌদ্ধশিক্ষা ও বৌদ্ধসাহিত্য যে বহুল পরিমাণে প্রচলিত হইয়াছিল, তাহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়।

ভারতীয় সমুদ্রপথে মালয়, সুমাত্রা, যবদ্বীপ অতিক্রম করিয়া চীনদেশে বাণিজ্য করিতে গমনাগমন করিতেন। ভারতীয় শ্রেষ্ঠী-সম্প্রদায়ের নিকট এই জলপথ সুপরিচিত হইলেও, এ পথে পদে পদে বিপন্ন হইবার আশঙ্কা ছিল। সুতরাং চীনদেশের লোকে সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে আসিতেন না।

চৈনিক শ্ৰমণদিগের মধ্যে শাক্যপুত্র ফাহিয়ান সৰ্ব্বপ্রথম তীর্থযাত্রা লিপিবদ্ধ করেন বোধ হয়। তিনি খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রারম্ভে মধ্য এসিয়ার বিস্তৃর্ণ ভূখণ্ড উত্তীর্ণ হইয়া ভারতবর্ষে উপনীত হন। দীর্ঘকাল ভারতভ্রমণ ও শিক্ষা লাভ করিয়া ফা হিয়ান সমুদ্রপথে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া সুবিখ্যাত হিয়ঙ্গি থসাঙ্গ মধ্যএসিয়ার মরুপথে ভারতবর্ষে প্রবেশ করিয়া মধ্যএসিয়ার পথেই খৃষ্টীয় ৬৪৫ অব্দে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ফাহিয়ান ও হিয়াঙ্গ থসাঙ্গের দৃষ্টান্তে উত্তরকালে বহু বৌদ্ধশ্ৰমণ চীন হইতে ভারতবর্ষে উপনীত হইয়াছিলেন, তন্মধ্যে কেহ বা স্বদেশে প্রত্যাবৃত্ত হন, কাহারও জীর্ণ কঙ্কাল ভারতবর্ষের ধূলির সঙ্গে মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে।

এ পর্যন্ত ন্যূনাধিক ৪৫ জন চৈনিক ভ্রমণকারীর ভারত ভ্রমণকাহিনীর সন্ধান পাওয়া গিয়াছে;–তদ্বারা খৃষ্টীয় পঞ্চম হইতে সপ্তম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তিনশত বৎসরের ভারতবিবরণী সংকলনের অনেক উপাদান সংগৃহীত হইয়াছে।

খৃষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র মধ্য এসিয়া বৌদ্ধমন্ত্রে অনুপ্রাণিত ছিল;–দেশে দেশে বৌদ্ধবিহার, বৌদ্ধচৈত্য, বৌদ্ধশিক্ষা ও বৌদ্ধসাহিত্য সমাদৃত হইত। সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে আরবীয়গণ ইসলামের নামে মধ্য এসিয়া আক্রমণ করেন,–তকালে মধ্যএসিয়ায় মহাবিপ্লবের সূচনা হয়। সে সময়ে সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে যাতায়াত করাই চীনদেশের তীর্থযাত্রিবর্গের পক্ষে সহজ ও নিরাপদ বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিল।

এই সকল তীর্থযাত্রিবর্গের মধ্যে ফা হিয়ান ও হিয়াঙ্গ থসাঙ্গের নাম সুপরিচিত; অন্যান্যের কথা অনেকের অজ্ঞাত, সুতরাং ফা হিয়ান ও হিয়াঙ্গ থসাঙ্গের কথা ছাড়িয়া দিয়া পরবর্তী তীর্থযাত্রিবর্গের কথাই সংক্ষেপে আলোচিত হইল। এই সকল পরবর্তী তীর্থযাত্রিবর্গের মধ্যে সর্বপ্রধান আই-সিঙ্গ।

খৃষ্টীয় ৬৬৪ অব্দে হিয়াঙ্গ থসাঙ্গের মৃত্যু হয়; তৎকালে আই-সিঙ্গ নিতান্ত বালক ছিলেন। তথাপি তাঁহার হৃদয়ে ভারতভ্রমণ কামনা জাগিয়া উঠিয়াছিল। তিনি খৃষ্টীয় ৬৭২ অব্দে ৩৭ জন সহযাত্রী লইয়া ভারতযাত্রায় বহির্গত হন। তৎকালে ক্যান্টন নগরে ভারতবাণিজ্যের বন্দর ছিল; তথায় বাণিজ্যোপলক্ষে ভারতীয় অর্ণবপোত যাতায়াত করিত। তাহারা যে পথে মহাসমুদ্রে ধাবিত হইত, চীনদেশের লোকে তাহাকে “দক্ষিণ সমুদ্রপথ” বলিয়া সভয়ে বিস্ময়ে অর্ণবপোতের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেন। এই সমুদ্রপথ একটি নির্দিষ্ট মার্গ অবলম্বনে নির্দিষ্ট ছিল; –চীন হইতে ক’ন্ডর দীপপুঞ্জ, তথা হইতে সুমাত্রা দীপস্থ শ্রীভোজবন্দর ও তথা হইতে কোয়েদাবন্দর পর্যন্ত এই পথ পরিচিত ছিল। কোয়েদা হইতে তিনটি পৃথক পথ গৃহীত হইত; এক পথে সিংহল, অন্য পথে আরাকাণ ও মধ্যপথে নাগপত্তনে উপনীত হইত। এই সকল বিভিন্ন পথে পৰ্যটন করিয়া অর্ণবযান যথাকালে তাম্রলিপ্তির প্রসিদ্ধ বন্দরে সমবেত হইত। এই সমুদ্রপথ কামরূপেশ্বর ভাস্কর বর্মার অধিকৃত ও তদীয় রাজকীয় অর্ণবযানে সুরক্ষিত থাকিবার সময়ে আই-সিঙ্গ সমুদ্রযাত্রা করেন। এই পথ যে বহু পুরাতন, ফা হিয়ান তাহার পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। ইহার আদি যেরূপ অন্ধকারে লীন হইয়া রহিয়াছে, কবে কি সূত্রে বাঙ্গালীর এই চিরপ্রচলিত সমুদ্রযাত্রা বিলুপ্ত হইয়া গেল, তাহাও সেইরূপ অন্ধকারে আচ্ছন্ন! আমাদের সাহিত্যে ইহার সন্ধান-লাভের আশা নাই। সুমাত্রা ও যবদ্বীপাদির ইতিহাস ও চৈনিক ভ্রমণকারীদের ভ্রমণবৃত্তান্ত না থাকিলে, এই পুরাকাহিনী স্বল্পকাহিনীর ন্যায় অলীক বলিয়াই প্রতিভাত হইত। এখনও অনেকের এইরূপ ধারণা আছে–এই সকল অর্ণবপোত কেবল সমুদ্রের কূলে কূলে তীরভূমি চুম্বন করিয়া নদীপথগামী নৌকার ন্যায় চলাচল করিত, তাহাতে সমুদ্রযাত্রার গাম্ভীৰ্য্য, পোতচালনার কৌশল, বাণিজ্য বিস্তারের সাহস, বাহুবল ও অধ্যবসায়ের কিছুমাত্র পরিচয় ছিল না। এই সিদ্ধান্ত যে সত্য নহে, ফা হিয়ান তাহা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। কোয়েদা হইতে যে সকল পোত আরাকাণের পথে তাম্রলিপ্তিতে গমনাগমন করিত এবং সিংহল হইতে যে সকল পোত নেগপত্তনের পথে তাম্রলিপ্তিতে যাতায়াত করিত, তাহারা প্রায়ই কূলে কূলে চালিত হইত; কিন্তু ক্যান্টন হইতে কভুর, কন্ডুর হইতে শ্রীভোজ, শ্ৰীভোজ হইতে তাম্রলিপ্তি ও সিংহল গমনাগমনে তীরভূমির আশ্রয় লাভের সম্ভাবনা ছিল না। এই পথে ঝটিকা ঝঞ্ঝাবাত সহ্য করিয়া নক্ষত্রমাস সহায় ও সাহসমাত্র অবলম্বন যাহাদের সমুদ্রযাত্রার সম্বল ছিল, তাহারা কোন শ্রেণীর নাবিক ও কিরূপ সমাদর লাভের পাত্র বাঙ্গালীর সাহিত্যে তাহার পরিচয় নাই বলিয়া পৃথিবীর ইতিহাসে তাহারা অপরিচিত;–তাহাদের বংশধর বর্তমান বঙ্গীয় লস্করগণ এখন সম্পূর্ণ পৃথক জাতি বলিয়াই পরিচিত। আই-সিঙ্গ ভারতভ্রমণ সম্পন্ন করিয়া সমুদ্রপথেই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রত্যাবর্তনকালে তিনি শ্রীভোজে পোতারোহণে বিলম্ব করায় কিয়ৎকাল তদ্দেশে অপেক্ষা করিতে বাধ্য হন। এই সময়ে তিনি স্বদেশের তীর্থযাত্রিগণের অবগতির জন্য “দক্ষিণ সমুদ্রযাত্রা”র বৃত্তান্তমূলক একখানি পুস্তক রচনা করেন; তাহা অদ্যাপি অনুবাদিত হয় নাই। আই-সিঙ্গ ৫৬ জন বৌদ্ধতীর্থযাত্রীর ভারতভ্রমণকাহিনী অবলম্বন করিয়া একখানি সুবৃহৎ গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া গিয়াছেন; এই গ্রন্থ অনুবাদিত ও প্রকাশিত হইলে ভারতীয় সমুদ্রযান ও সমুদ্রযাত্রার সম্পূর্ণ

কাহিনী সভ্যজগতের সম্মুখীন হইবে। এই গ্রন্থের নাম “কাউ-কায়ো-সাঙ্গ-চু”।

উৎসাহ, অগ্রহায়ণ, ১৩০৭

বঙ্গে তুর্কী আক্রমণ
বঙ্গভূমি ও বাঙ্গালী

Reactions

0
0
0
0
0
0
ইতিমধ্যে এই পোস্টের জন্য প্রতিক্রিয়া করা হয়েছে।

Nobody liked ?

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

GIF