পরিশিষ্ট : পত্রাবলি

পরিশিষ্ট ১

রবীন্দ্রনাথকে লেখা অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র পত্রাবলি

বাঙ্গালা ইতিহাসে তিনি [অক্ষয়কুমার] যে স্বাধীনতার যুগ প্রবর্তন করিয়াছেন সেজন্য তিনি বঙ্গসাহিত্যে ধন্য হইয়া থাকিবেন। –রবীন্দ্রনাথ, ১৩০৫

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনায় বাংলাদেশের মনীষীসমাজে সাহিত্য শিল্প ইতিহাস ও বিজ্ঞান-চর্চায় এই একটি ভাব প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল যে, “ভারতবর্ষের যথার্থভাবে আত্মপরিচয় দিবার সময় আসিয়াছে”, “বিশ্বসভায় ভারতবর্ষের অমরবাণী উচ্চারণ করিবার সময় উপস্থিত’–”বিপুল মানবশক্তি বাংলা সমাজের মধ্যে প্রবেশ করিয়া কাজ আরম্ভ করিয়াছে… এ আমাদের সংকীর্ণতা আমাদের আলস্য ঘুচাইয়া তবে ছাড়িবে। আমাদের মধ্যে বৃহৎ প্রাণ সঞ্চার করিয়া সেই প্রাণ পৃথিবীর সহিত যোগ করিয়া দিবে।”

এই “নবজাতির জন্মসংগীত’-এর প্রধান উদগাতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ–”আমার তো আশা হইতেছে আমাদের মধ্যে এমন সকল বড়লোক জন্মিবেন যাঁহারা বঙ্গদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রের সামিল করিবেন ও এরূপে পৃথিবীর সীমানা বাড়াইয়া দিবেন”–প্রথমযৌবনের এই কল্পনাকে তিনি সাধনা দ্বারা নিজের জীবনে যেমন সার্থক করিয়া তুলিয়াছিলেন, তেমনি বন্ধুসমাজে যেখানেই প্রতিভার দীপ্তি লক্ষ্য করিয়াছেন সকলকেই “পতাকা হস্তে অগ্রসর হইতে” আহ্বান করিয়াছেন –”স্বদেশের আহ্বান প্রত্যহই পরিস্ফুটতর ভাবে ধবনিত হইয়া উঠিতেছে– আপনি যে এই আহ্বানের লক্ষ্য আছেন তাহা আমি কবির চক্ষে দেখিতেছি এবং একদিন যে আপনি সংগ্রাম হইতে ফিরিয়া আসিয়া স্বদেশের ললাটে নূতন যশোমাল্য স্থাপন করিতেছেন তাহাও আমি দেখিতে পাইতেছি”, এবং প্রবল উৎসাহে তাঁহাদের কার্যে প্রেরণা সঞ্চার করিতে উদযোগী হইয়াছেন।*

এই বন্ধুগোষ্ঠীর পুরোভাগে আচার্য জগদীশচন্দ্র, অক্ষয়কুমারও (১৮৬১-১৯৩০) এই গোষ্ঠীর অন্যতম। অক্ষয়কুমারের ইতিহাসচর্চায় রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে জয়ধবনি কি অকৃপণ অবিরল ভাবে ঘোষিত হইয়াছিল তাহার নিদর্শন একত্র সংকলিত হইয়াছে রবীন্দ্রনাথের সম্প্রতি-প্রকাশিত ‘ইতিহাস’ গ্রন্থে, এবং তাহার বিশদ বিবরণ গ্রথিত হইয়াছে শ্রীপ্রবোধচন্দ্র সেনের ‘বাংলার ইতিহাস-সাধনা’ পুস্তকে, এখানে তাহার বিস্তৃত পুনরুক্তি বাহুল্য।

ইতিহাস-প্রসঙ্গ ছাড়া, দেশের আর-একটি মঙ্গলকার্যেও অক্ষয়কুমারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগ হইয়াছিল। ইতিহাস-আলোচনা ব্যতীত নানা স্বদেশহিতকর অনুষ্ঠানের সঙ্গে অক্ষয়কুমারের যোগ ছিল, রেশম-শিল্পের উন্নতিচেষ্টা তাহার অন্যতম। “রেশম-শিল্পের সকল বিষয়েই ইনি অভিজ্ঞ’–’পট্টবস্ত্র’, ‘এণ্ডি’ সম্বন্ধে তিনি রবীন্দ্র-সম্পাদিত ‘ভারতী’তে (১৩০৫) প্রবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলেন; রাজসাহীতে রেশম-শিল্পবিদ্যালয় অক্ষয়কুমারের উদযোগেই পরিচালিত হয়, “ইনি পাঁচ বৎসর কাল এই বিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।” রেশম-শিল্পের উন্নতিকল্পে তাঁহার আগ্রহ ও উদযোগের বিশেষ পরিচয় এই চিঠিগুলিতে লিপিবদ্ধ আছে।

এ সবই স্বদেশী আন্দোলনের পূর্বেকার কথা। স্বদেশী শিল্পবাণিজ্য প্রসারে, দেশীয় শিল্পের পুনরুদ্ধারে উৎসাহ-উদ্যম, ও সেজন্য ক্ষতিস্বীকারের প্রবৃত্তি ঠাকুর পরিবারে দীর্ঘকাল ধরিয়াই বর্তমান ছিল; এই পত্রালাপকালে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে জমিদারিতে বাস করিতেন, পল্লীর উন্নতিকল্পে এই সময়ে তিনি নানারূপ পরীক্ষা শুরু করেন, ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ পুস্তিকায় (৭ পৌষ ১৩৫৮) তাহার কিছু বিবরণ তিনি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন; অক্ষয়কুমারের উৎসাহের আকর্ষণে রেশমের গুটির চাষ করিতে প্রবৃত্ত হইয়া তাঁহাকে কিরূপ ক্ষতি স্বীকার করিতে হইয়াছিল তাহার আভাসও এই রচনায় আছে; ইহাদের উৎসাহে রেশমের কীটপালনে জগদীশচন্দ্রও আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। অক্ষয়কুমারের পরিচালিত শিল্প-বিদ্যালয়কেও তিনি যথাসাধ্য উৎসাহিত করিতেন– অক্ষয়কুমারের চিঠিতে যে কাপড় পাঠানোর কথা আছে তাহা তিনি নিজেও ব্যবহার করিতেন, বন্ধুজনকেও উপহার দিয়া ব্যবহারে উৎসাহিত করিতেন– ত্রিপুরার মহিমচন্দ্র ঠাকুরকে একখানি চিঠিতে (৩০ চৈত্র, ১৩০৫) তিনি লিখিতেছেন :

মহারাজার জন্য সব্বানন্দের হস্তে একটি সাদা রেশমের থান পাঠাইলাম।

আপনার জন্যও রাজসাহী শিল্পবিদ্যালয় হইতে মটকার থান প্রস্তুত হইয়া আসিয়াছে উপহার পাঠাইব–ইহার প্রস্তুত এক সুট সাজ পরিয়া আমার সহিত শিলাইদহে যখন সাক্ষাৎ করিতে আসিবেন বিশেষ আনন্দ লাভ করিব।

শিল্পবিদ্যালয়কে উৎসাহ দিবার জন্য সেখান হইতে আমি সর্বদাই রেশমের বস্ত্রাদি ক্রয় করিয়া থাকি–দোষের মধ্যে লোক ও সামর্থ্য অল্প হওয়াতে তাহারা শীঘ্র ও অধিক পরিমাণে কাপড় যোগাইতে পারে না, বন্ধুদের নিকট আমার এই সকল বস্ত্র উপহার কেবল আমার উপহার নহে তাহা স্বদেশের উপহার। অতএব আশা করি আপনারা তুচ্ছ বলিয়া ইহাকে অনাদর করিবেন না।**

অক্ষয়কুমারের লিখিত ১-সংখ্যাঙ্কিত চিঠিখানিতে, তৎকালীন বঙ্গসাহিত্যসমাজের একটি বিতর্কের ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বর্তমান কালে সাহিত্যপরিবারের… গৃহবিচ্ছেদের বিবরণ সংক্ষিপ্ত হইয়া আছে। কাব্যে উপন্যাসে ইতিহাসের বিকার ঘটিলে, বিশেষত কোনো চরিত্রের অসংগত লাঘব হইলে, অক্ষয়কুমার তীব্র ভাষায় তাহার প্রতিবাদ করিয়াছেন–বঙ্কিম-নবীনের রচনাও অব্যাহতি লাভ করে নাই। ‘পলাশির যুদ্ধ’ (কাব্য) গ্রন্থে (১২৮২) নবীনচন্দ্র কর্তৃক ‘কাল্পনিক সিরাজ-কলঙ্ক’ প্রচারিত হইয়াছে, এই অভিযোগ অক্ষয়কুমার করেন ভারতী পত্রের মাঘ ১৩০৩ সংখ্যায়, তাঁহার সুবিখ্যাত ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থের পলাশির যুদ্ধ’ অধ্যায়ে। পরবৎসর (১৩০৪) ভারতী পত্রে মীরকাশিম সম্বন্ধে অক্ষয়কুমারের আলোচনা ধারাবাহিক প্রকাশিত হইতে আরম্ভ করে; বৈশাখ সংখ্যায় উপক্রমণিকাতেই তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে আক্রমণ করেন, চন্দ্রশেখর উপন্যাসে মীরকাশিম ও তকি খাঁর চরিত্র অন্যায় ও অনৈতিকহাসিকভাবে অশ্রদ্ধেয় করিয়া অঙ্কিত করিবার অভিযোগে; অক্ষয়কুমারের পত্রে এই রচনার প্রসঙ্গই উল্লিখিত। এই অভিযোগের প্রতিবাদ প্রকাশিত হয় পূর্ণিমা পত্রের ১৩০৫ শ্রাবণ সংখ্যায়, ‘বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সম্প্রদায়’ প্রবন্ধে। ভারতী-সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ ১৩০৫ শ্রাবণ সংখ্যা ভারতী-তে ‘সাময়িক সাহিত্য’-সমালোচনা বিভাগে পূর্ণিমার এই প্রবন্ধ উল্লেখ করিয়া যে মন্তব্য করেন নীচে তাহা মুদ্রিত হইল :

মীরকাসিম লেখকের প্রতি, মতবিরোধ লইয়া, অবজ্ঞা প্রকাশের অধিকার কাহারও নাই। বঙ্কিমবাবুর প্রতি ভক্তি সম্বন্ধে আমরা সমালোচ্য প্রবন্ধলেখকের অপেক্ষা ন্যূনতা স্বীকার করিতে পারি না, তাই বলিয়া মীরকাসিম লেখক শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্র মহাশয়ের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন আমরা উচিত বোধ করি না। কারণ ক্ষমতাবলে তিনি বঙ্গসাহিত্যহিতৈষীগণের সম্মান ভাজন হইয়া উঠিতেছেন। কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে অন্য হিসাবে অক্ষয়বাবুর সহিত আমাদের সহানুভূতি নাই। কালানুক্রমে ভূপঞ্জরের যেরূপ স্তর পড়িয়াছিল হিমালয় পর্বতে তাহার অনেক বিপর্যয় দেখা যায়, তাই বলিয়া কোন ভূতত্ত্ববিৎ হিমালয়কে খর্ব করিলেও কালিদাসের নিকট তাহার দেবাত্মা গুপ্ত থাকে না। বঙ্কিমবাবুর উপন্যাসে ইতিহাস যদি বা বিপর্যস্ত হইয়া থাকে তাহাতে বঙ্কিমবাবুর কোন খৰ্ব্বতা হয় নাই। উপন্যাসের বিকৃতি হইয়াছে বলিয়া নালিশ করাও যা, আর ধান্যজাত মদিরা অন্ন হইয়া উঠে নাই বলিয়া রাগ করাও তাই। উপকরণের মধ্যে ঐক্য থাকিতে পারে কিন্তু তবুও অন্ন মদ্য নহে এবং মদ্য অন্ন নহে, একথাটা গোড়ায় ধরিয়া লইয়া তবে বস্তু-বিচার করা উচিত। অক্ষয়বাবু জিজ্ঞাসা করিতে পারেন যে, যদি ইতিহাসকে মানিবে না তবে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিবার প্রয়োজন কী? তাহার উত্তর এই যে, ইতিহাসের সংশ্রবে উপন্যাসে একটা বিশেষ রস সঞ্চার করে, ইতিহাসের সেই রসটুকুর প্রতি ঔপন্যাসিকের লোভ, তাহার সত্যের প্রতি তাঁহার কোন খাতির নাই। কেহ যদি উপন্যাসে কেবল ইতিহাসের সেই বিশেষ গন্ধটুকু এবং স্বাদটুকুতে সন্তুষ্ট না হইয়া তাহা হইতে অখণ্ড ইতিহাস উদ্ধারে প্রবৃত্ত হন তবে তিনি ব্যঞ্জনের মধ্যে আস্ত জিরে ধনে হলুদ শর্ষের সন্ধান করেন। মসলা আস্ত রাখিয়া যিনি ব্যঞ্জনে স্বাদ দিতে পারেন তিনি দিন, এবং যিনি বাঁটিয়া ঘাঁটিয়া একাকার করিয়া স্বাদ দিয়া থাকেন তাঁহার সঙ্গেও আমার কোন বিবাদ নাই, কারণ স্বাদই এস্থলে লক্ষ্য, মসলা উপলক্ষ্য মাত্র। কিন্তু ইতিহাস অক্ষয়বাবুর এতই অনুরাগের সামগ্রী যে ইতিহাসের প্রতি কল্পনার লেশমাত্র উপদ্রব তাঁহার অসহ্য, সিরাজদ্দৌলা গ্রন্থে নবীনবাবু তাহা টের পাইয়াছেন। ইতিহাস-ভারতীর উদ্যানে চঞ্চলা কাব্য-সরস্বতী পুষ্পচয়ন করিয়া বিচিত্র ইচ্ছানুসারে তাহার অপরূপ ব্যবহার করিয়া থাকেন, প্রহরী অক্ষয়বাবু সেটা কোনোমতেই সহ্য করিতে পারেন না– কিন্তু মহারাণীর খাস হুকুম আছে। উদ্যান প্রহরীরই জিম্মায় থাক, কিন্তু এক সখীর কুঞ্জ হইতে আর এক সখী পূজার জন্য হৌক বা প্রসাধনের জন্য হৌক যদি একটা ডালি ফুল পল্লব তুলিয়া লইয়া যায় তবে তিনি তাহার কৈফিয়তের দাবী করিয়া এত গোলমাল করেন কেন? ইহাতে ইতিহাসের কোন ক্ষতি হয় না অথচ কাব্যের কিছু শ্রীবৃদ্ধি হয়। বিশেষ স্থলে যদি শ্ৰী সাধন না হয় তবে কাব্যের প্রতি দোষারোপ করা যায় সৌন্দৰ্য্য হানি হইল বলিয়া, সত্য হানি হইল বলিয়া নহে।

এই মন্তব্য সম্বন্ধে অক্ষয়কুমার রবীন্দ্রনাথকে লেখেন যে, “কবিকল্পনার সীমা কোথায় তাহার মীমাংসা করিতে গিয়া আপনি তাহাকে যতদূর প্রসর দিয়াছেন তাহাতে আমার নালিশের সুবিচার হয় নাই।” রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেন আশ্বিন ১৩০৫ সংখ্যা ভারতী পত্রে, “ঐতিহাসিক উপন্যাস” প্রবন্ধে; রচনাটি তাঁহার সাহিত্য গ্রন্থে মুদ্রিত আছে। এই প্রবন্ধে তিনি বলেন–

আমাদের অলঙ্কারে নয়টি মূলরসের নামোল্লেখ আছে। কিন্তু অনেকগুলি অনির্বচনীয় মিশরস আছে অলঙ্কার শাস্ত্রে তাহার নামকরণের চেষ্টা হয়। নাই।…সেই সমস্ত অনির্দিষ্ট রসের মধ্যে একটিকে ঐতিহাসিক রস নাম দেওয়া যাইতে পারে। এই রস মহাকাব্যের প্রাণস্বরূপ।…

সেকসপিয়ারের অ্যান্টনি এবং ক্লিয়োপেট্রা নাটকের যে মূল ব্যাপারটি তাহা সংসারের প্রাত্যহিক পরীক্ষিত ও পরিচিত সত্য। অনেক অখ্যাত অজ্ঞাত সুযোগ্য লোক কুহকিনী নারীমায়াজালে আপন ইহকাল পরকাল বিসৰ্জন করিয়াছে; এইরূপ ছোটোখাটো মহত্ত্ব ও মনুষ্যত্বের শোচনীয় ভগ্নাবশেষে সংসারের পথ পরিকীর্ণ।

আমাদের সুপ্রত্যক্ষ নরনারীর বিষামৃতময় প্রণয়লীলাকে কবি একটি সুবিশাল ঐতিহাসিক রঙ্গভূমির মধ্যে স্থাপিত করিয়া তাহাকে বিরাট করিয়া তুলিয়াছেন। হৃদবিপ্লবের পশ্চাতে রাষ্ট্রবিপ্লবের মেঘাড়ম্বর, প্রেমদ্বন্দ্বের সঙ্গে একবন্ধনে বদ্ধ গ্রীসের প্রচণ্ড আত্মবিচ্ছেদের সমরায়োজন। ক্লিায়োপেট্রার বিলাসকক্ষে বীণা বাজিতেছে, দূরে সমুদ্রতীর হইতে ভৈরবের সংহারশৃঙ্গধবনি তাহার সঙ্গে একসুরে মন্দ্রিত হইয়া উঠিতেছে। আদি এবং করুণ রসের সহিত কবি ঐতিহাসিক রস মিশ্রিত করাতেই তাহা এমন একটি চিত্তবিস্ফারজনক দূরত্ব ও বৃহত্ত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে।

গ্রীস ইতিহাসবেত্তা মমসেন পণ্ডিত যদি সেকসপিয়রের এই নাটকের উপর প্রমাণের তীক্ষ্ণ আলোক নিক্ষেপ করেন তবে সম্ভবতঃ ইহাতে অনেক কালবিরোধদোষ (Anachronism) অনেক ঐতিহাসিক ভ্রম বাহির হইতে পারে। কিন্তু সেকসপিয়র পাঠকের মনে যে মোহ উৎপাদন করিয়াছেন, ভ্রান্ত বিকৃত ইতিহাসের দ্বারাও যে একটি অনির্বচনীয় ঐতিহাসিক রসের অবতারণা করিয়াছেন তাহা ইতিহাসের নূতন তথ্য আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হইবে না।…

অর্থাৎ লেখক ইতিহাসকে অখণ্ড রাখিয়াই করুন আর খণ্ড করিয়াই করুন সেই ঐতিহাসিক রসের অবতারণায় সফল হইলেই হইল।

তাই বলিয়া কি রামচন্দ্রকে পামর এবং রাবণকে সাধুরূপে চিত্রিত করিলে অপরাধ নাই? অপরাধ আছে। কিন্তু তাহা ইতিহাসের বিরুদ্ধে অপরাধ নহে কাব্যেরই বিরুদ্ধে অপরাধ। সৰ্বজনবিদিত সত্যকে একেবারে উলটা করিয়া দাঁড় করাইলে রসভঙ্গ হয়, হঠাৎ পাঠকদের যেন একেবারে মাথায় বাড়ি পড়ে। সেই একটা দমকাতেই কাব্য একেবারে কাৎ হইয়া ডুবিয়া যায়।…

অক্ষয়কুমার বিষয়টি পুনরুত্থাপন করেন ১৩০৮ ভাদ্র সংখ্যা প্রদীপ পত্রে, রবীন্দ্রনাথের কথা-কাব্যের (১৩০৬) আলোচনায়। এই গ্রন্থের দীর্ঘপ্রশস্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন—

…কিছুদিন বঙ্গসাহিত্য বহু পথে ধাবিত হইয়া অবশেষে কোকিল-কূজন, ভ্রমর গুঞ্জন ও মানভঞ্জনের তরল তরঙ্গের রঙ্গরসেই সমধিক মত্ত হইয়া উঠিতেছিল, তখন সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টির অনুরোধে কল্পনার উদ্ধৃঙ্খল নখরাঘাতে বহু ঐতিহাসিক চরিত্র শতধা বিদীর্ণ হইতে আরম্ভ করিয়াছিল। সুতরাং স্বদেশের ইতিহাস হইতে আদর্শ সংগ্রহ করিয়া তাহাকে অক্ষত কলেবরে কবিতা নিবদ্ধ করিলেও যে সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টির বাধা হয় না, তাহার দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়া কবি বঙ্গ-সাহিত্য-সেবকগণের সম্মুখে এক অভিনব চেষ্টার দ্বার উদঘাটিত করিয়া দিয়াছেন।

ঐতিহাসিক চিত্ৰচয়নে কবিকল্পনা যে সৰ্ব্বথা নিরঙ্কুশ হইতে পারে না, তদ্বিষয়ে একবার কর্তব্যানুরোধে তীব্রভাষা লিপিবদ্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। রবীন্দ্রনাথ এই নূতন কবিতাপুস্তকের ভূমিকায় যেন তৎপ্রতি কটাক্ষ করিয়াই লিখিয়াছেন, –”মূলের সহিত এই কবিতাগুলির কিছু কিছু প্রভেদ লক্ষিত হইবে, আশা করি সেই পরিবর্তনের জন্য সাহিত্যনীতিবিধানমতে দণ্ডনীয় গণ্য হইব না।” আমি কবিকুলকে ঐতিহাসিক হইবার জন্য তাড়না করি নাই; কিন্তু ঐতিহাসিক আদর্শ অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য সকলকেই আগ্রহে অনুরোধ করিয়াছিলাম। যাহার যে চরিত্র তাহার মূল প্রকৃতি অক্ষুণ্ণ রাখিয়া গল্পাংশ সরল সরস ও সহজে বোধগম্য করিবার জন্য অবান্তর বিষয়ের কিছু কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করিলে ইতিহাসের ক্ষতি নাই– সাহিত্যের বিলক্ষণ লাভ। কবি বর্তমান পুস্তকে ঐতিহাসিক চরিত্রের মূল প্রকৃতির কিছুমাত্র পরিবর্তন করেন নাই; সুতরাং অবান্তর বিষয়ে যাহা কিছু ইতর বিশেষ করিয়াছেন, তজ্জন্য কেহ তাঁহাকে দণ্ডাৰ্হ মনে করিতে পারিবেন না।…

ঐতিহাসিক চিত্র-কাৰ্যালয়।
ঘোড়ামারা, রাজসাহী।
[১৩০৫]

প্রীতিনমস্কার নিবেদনমেতৎ– শ্রা

বণের ভারতী পড়িয়া আনন্দলাভ করিলাম। শ্ৰীযুক্ত আবদুল করিমের ইতিহাসের সমালোচনায় এবং প্রসঙ্গ কথায় এবার ভারতী-সম্পাদক ঐতিহাসিক তত্ত্বালোচনায় যে কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন তাহাতে বাংলা সাময়িকপত্রের গৌরব বৰ্ধিত হইয়াছে; এমন সুচিন্তাপ্রসূত প্রবন্ধ বাংলা সাময়িকপত্রে সর্বদা প্রকটিত হইলে আমাদের সাময়িক সাহিত্যের প্রতি শিক্ষিত সমাজের শ্রদ্ধা স্বতঃই আকৃষ্ট হইবে। আপনি ঐতিহাসিক চিত্রের সূচনা লিখিবার যোগ্যপাত্র বলিয়াই সে ভার আপনাকে দিয়াছি, এখন আর বলিতে পারিবেন না যে আমি সে গান গাহিতে শিখি নাই। আপনার প্রবন্ধ না পাইলে কাৰ্যারম্ভ হইবে না, সুতরাং একটু চেষ্টা করিয়া যথাসম্ভব সত্বর হইবেন। ছবি ক্ষোদাই ও কাগজ ক্রয়ের জন্য প্রকাশক কলিকাতায় গিয়াছেন; তিনি প্রত্যাগত হইলেই কাৰ্যারম্ভ করিব।

এবারকার সাময়িক সাহিত্য সমালোচনা উপলক্ষে আমার কথা কিছু বেশী বলিয়া ফেলিয়াছেন, উহা আপনার স্নেহোদ্ভূত ভিন্ন আমার ন্যায্যপ্রাপ্য প্রশংসা বলিয়া গ্রহণ করিলাম না। কবিকল্পনার সীমা কোথায় তাহার মীমাংসা করিতে গিয়া আপনি তাহাকে যতদূর প্রসর দিয়াছেন তাহাতে আমার লালিশের সুবিচার হয় নাই। ইতিহাসে যাহার যে স্বাদ উপন্যাসেও তাহার সেই স্বাদ রাখিতে হইবে, যে ইতিহাসে মহাবীর উপন্যাস তাহাকে কাপুরুষ সাজাইতে পারিবে না,–ইহাই আমার মূল বক্তব্য। উপন্যাসে কল্পনা নানারূপ ঘটনা সৃষ্টি করুক, তাহাতে কেহ বাধা দিতে চাহে না কিন্তু কাল্পনিক ঘটনাসৃষ্টির ক্ষমতা থাকিলেও মূল চরিত্র বিকৃত করিয়া দিবার কাহারও ক্ষমতা নাই। বিদ্যাসাগর মহাশয় এদেশের আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক ব্যক্তি; তাঁহার সম্বন্ধে সহস্র কাল্পনিক ঘটনা সৃষ্টি করিয়া কবিকল্পনা তাঁহার ঐতিহাসিক চরিত্রকে উজ্জ্বল করিতে চাহে ত করুক, কিন্তু কবিকল্পনা যদি তাঁহাকে কাল্পনিক ঘটনা সৃষ্টি করিয়া মূৰ্থ নিষ্ঠুর নীচমনা ও দুর্জন বলিয়া লোকসমাজে তাঁহাকে চিত্রিত করিয়া ফেলে তবে কি তাহাকে সংযত করা আবশ্যক হইবে না? দুর্ভাগ্যক্রমে মীরকাশিমের উপক্রমণিকায় আমার পূৰ্ব্বলিখিতাংশের সহিত শ্রীমতী সরলাদেবীর সংকলিত বহু কথা সংযুক্ত হইয়া উহাকে নিতান্ত অসংযত লেখনীর দৃষ্টান্তস্বরূপ করিয়া তুলিয়াছে, সুতরাং আমাকে পূর্ণিমা-লেখকের লগুড়াঘাত পৰ্য্যন্ত সহ্য করিতে হইতেছে। কিন্তু মূল বিষয়টির প্রতি আপনারা দৃষ্টিপাত না করিয়াই মপস্বলের হাকিমের মতো নথী না দেখিয়াই বিচার করিতেছেন। আপনি কি ইংরাজী ও পারস্য ইতিহাসে মীরকাশিম ও তকি খাঁর চিত্র পড়িয়া তাহার সহিত চন্দ্রশেখরের ছবি মিলাইয়া কোন কথা বলিয়াছেন? অবশ্যই তাহা করেন নাই–কলমের মুখে যাহা আসিয়াছে লিখিয়া চলিয়া গিয়াছেন। ঐটুকুই আমার নালিশের প্রধান অজুহাত। দেখুন, একে আমাদের দেশে লোকশিক্ষার উপাদান অল্প, ইতিহাস হইতে আত্মত্যাগ স্বদেশপ্রেম শিখাইবার সম্ভাবনা কম তাহার উপর যে দুই একটি চরিত্রে সে সকল গুণ বিকশিত হইয়াছিল কল্পনাবলে তাহা বিনষ্ট করিলে দাঁড়াইবার স্থান থাকে না।

যাহা সুন্দর তাহার আদর কে না করিবে? কিন্তু সৌন্দৰ্যসৃষ্টির জন্য বাস্তবকে নষ্ট করা অন্যায়। ইতিহাসের পায়সান্ন হইতে রসাহরণ করিয়া উপন্যাস লিখিবার স্বাধীনতা সকলেরই আছে, কিন্তু তাহার রস পায়সান্নের ন্যায় মধুর না করিয়া তিক্ত করা অন্যায়, তাহাতে রসভঙ্গ হয়, সৌন্দৰ্য্য নষ্ট হইয়া কুরুচি প্রকাশিত হইয়া পড়ে।

আপনি ত অনেক প্রখ্যাত বীর সন্তানকে লইয়া কল্পনাবলে সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টি করিয়াছেন। ধরুন, আপনার চিত্রাঙ্গদা। বাঙ্গালী তাহার যথোচিত আদর করে নাই বলিয়া এমন ভাবিবেন না যে তাহা অসুন্দর–উহা আপনার একখানি অত্যুত্তম চিত্র। উহাতে অর্জুনকে আপনি কল্পনাবলে যত সাজ সজ্জায় সাজাইয়া তুলিয়াছেন তৎসত্ত্বেও অর্জুনকে অৰ্জ্জুন বলিয়াই চিনিয়া লওয়া যায়, বরং কল্পনা তাহাতে আমাদের সহায় হইয়াছে, অর্জুনকে বেশ উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছে। আপনি যদি তাহা না করিয়া গাণ্ডীবধন্বকে কাপুরুষ সাজাইতেন সে কল্পনার কেহ প্রশংসা করিত না, বলিত–এরূপ কল্পনাবিস্তারে আপনার অধিকার নাই। মুসলমানের প্রাণ আছে, তাই তাহারা মহম্মদকে রঙ্গভূমিতে আনিতে দেয় না; আমাদের প্রাণ নাই তাই আমরা বুদ্ধ চৈতন্য রাম লক্ষ্মণ সকলকেই রঙ্গভূমিতে যথেচ্ছ প্রদর্শিত হইতে দিয়া তাহাদিগকে কত না নাস্তানাবুদ করিয়াছি। যে সকল ঐতিহাসিক চরিত্র লোকশিক্ষাবিধানের সময়ে ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা বিস্তার করিতে পারিত, তাহাদিগকে খাট করিয়া বিকৃত করিয়া, নিরন্তর মুখরোচক উপন্যাস বা নয়নবিমোহন অভিনয়াদি দ্বারা আমরা ক্রমশঃ মাটি করিয়া ফেলিতেছি। লোকে উপন্যাস ও রঙ্গভূমির সাহায্যে তাহাদের যে চিত্র স্মৃতিপটে দৃঢ়মুদ্রিত করিতেছে তাহা সহজে দূর হইবার নহে। কবিকল্পনা যদি সে সকল চরিত্র অবিকৃত রাখিয়া প্রবাহিত হয় তবেই ভাল, নচেৎ কবিকল্পনা অনিষ্টসাধন করে, সুন্দরকে কুৎসিত সাজাইয়া সৌন্দৰ্যবিকাশের পরিবর্তে কুরুচির প্রশ্রয় দেয়।

আমি আর নালিশ করিয়া কি করিব? বেচারা বহু বৎসর মরিয়া গিয়াছে, ইংরাজেরা তাহার বীরকীৰ্ত্তির সম্মান রক্ষা করিয়াছেন, আবার স্বদেশের কবিকুল যদি তাহাকে কল্পনাবলে পঙ্কলিপ্ত করিয়াই সুখী হন তবে আমি আর কি বলিব? আর বলিলেই বা আমার কথা কে শুনিবে? যখন এদেশের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হইবে তখন লোকে আপনা হইতেই তকি খাঁর মতো বীরের মস্তকে বারাঙ্গনার পদাঘাত দেখিয়া করতালি প্রদান করিবে না, রঙ্গালয় পদাঘাতে চূর্ণ করিয়া দিবে–ইত্যলম

ভবদীয়
শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ঐতিহাসিক চিত্র-কাৰ্যালয়।
ঘোড়ামারা, রাজসাহী।
[১৩০৫]

প্রীতিনমস্কারনিবেদনং—

আপনার উপদেশমত ত্রিপুরায় পত্র লিখিলাম। নাটোর শীঘ্রই টাকা পাঠাইবেন বলিয়া পত্র লিখিয়াছেন। প্রথম সংখ্যা বাহির না হইলে অপরিচিতের দ্বারস্থ হইতে ভয় হয়; এত লোকে এত ধূয়া ধরিয়া চাঁদা সাধিয়া বেড়াইতেছে যে, লোকে। সহসা আমাদিগকেও ধড়িবাজ মনে করিয়া প্রত্যাখ্যান করিতে পারে। ইহার সঙ্গে আপনার নামের সংযোগ আছে, আপনাকে আর নাস্তানাবুদ করিতে পারি না। এখন ভিক্ষার ঝুলিটা কাজেই তুলিয়া রাখা ভাল মনে করিতেছি।

আমি ঠাকুরবংশকে টানিব না, সে বিষয়ে–মা ভৈঃ। স্যার মহারাজ যতীন্দ্রমোহন একখানি “ঠাকুর বংশাবলী” উপহার দিয়াছেন সেই কথাই লিখিয়াছিলাম। আমার বর্তমান লক্ষ্য স্থানীয় রাজবংশ ও পুরাতন জমিদারবংশ।

আপনি এবারকার ভারতীতে ঐতিহাসিক নামাদির বর্ণবিন্যাস সম্বন্ধে প্রসঙ্গ কথায় কিছু লিখেন ত আমার মতটি সংক্ষেপে নিবেদন করিয়া রাখি।

গ্রীক, চীন, ব্ৰহ্ম ও সিংহলদেশীয় পরিব্রাজকেরা আমাদের বৌদ্ধযুগের কোন কোন কথা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন এবং সংস্কৃত গ্রন্থেও ফ্লেচ্ছ রাজগণের উল্লেখ আছে। বিদেশের লোকে তাঁহাদের স্ব স্ব ভাষায় আমাদের নামাদি বিকৃত করিয়াছেন, আমরাও তাঁহাদের নামাদি বিকৃত করিয়া লইয়াছি। ফল এই হইয়াছে যে এখন আর মাথা কুটিয়াও মিল করা ঘটিতেছে না। দুই একটা উদাহরণ লউন :

মুদ্রারাক্ষস নামক কবি বিশাখদত্ত রচিত সংস্কৃত নাটকে চন্দ্রগুপ্তের সমসাময়িক পাঁচটি প্রধান ম্লেচ্ছ-রাজের নাম চিত্ৰবৰ্মা, সিংহনাদ, সিন্ধুষেন, পুষ্কর ও মেঘাক্ষ বলিয়া লিখিত হইয়াছে, এখন আর কিছুতেই তাহাদিগকে চিনিবার উপায় হইতেছে না। মেগাস্থিনিস লিখিয়াছেন গঙ্গা ও এরণবস নদীর সংযোগস্থলে পালিবোম্রা নগরে সন্দ্রকোজ্ঞস নামে রাজার রাজধানী সংস্থাপিত ছিল। স্যর উইলিয়ম জান্স এসিয়াটিক রিসার্জের দ্বিতীয় খণ্ডে বহু তর্কে প্রতিপন্ন করিয়াছেন যে গঙ্গা ও হিরণ্যবাহুর সংযোগস্থলে পাটলিপুত্র নগরে চন্দ্রগুপ্ত নামক রাজার রাজধানী সংস্থিত ছিল তাহাই মেগাস্থিনিসের বক্তব্য। আমাদের গৌতমবুদ্ধকে ব্রহ্মদেশীয় লোকে গন্দামা Gandama বলিয়া নামকরণ করিয়াছে। চীনেরা আরও কত অদ্ভুত শব্দ সংযোগ করিয়া আমাদিগকে গোলে ফেলিয়াছে। গ্রীকভাষার বর্ণমালায় চন্দ্রগুপ্ত, পাটলিপুত্র ও হিরণ্যবাহু লেখা অসম্ভব ছিল না, তাহা লিখিলে কোনই গোল হইত না। ইহা হইতে ঠেকিয়া শিখিয়া আমি এই বলিতে চাই যে বিদেশের নাম তাহাদের উচ্চারণ কৌশলে যেরূপ উচ্চারিত হয় ঠিক সেই শব্দসাদৃশ্য অবিকৃত রাখিয়া আমাদের অক্ষরে বর্ণবিন্যাস করা উচিত।

গির্ণারে ও উৎকলে যে অশোকস্তম্ভলিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহাতে ‘আন্টিয়কো যোনরাজ” শব্দ উৎকীর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়, উহা “Antiochus যবনরাজ”। নানা ফড়নবীশ Nana Fernvis হইয়াছেন, উহাকে এখন নানা ফরনভিন্স করিলে গোল বাধিবে। w কে ব করিয়া William ঝুলিয়ম হইলে কালে বিস্তর গোলযোগ হইবার আশঙ্কা। আমি সেই জন্যই বলিতে চাই যাহার নাম যে দেশে যেরূপ উচ্চারিত হয় সেই উচ্চারণ যতটা বাংলায় উতরাইতে পারা যায় সেইভাবে তাহার নামের বর্ণবিন্যাস করা উচিত। আমার মত সংক্ষেপে লিখিলাম, আপনি যেরূপ ভালো মনে করেন লিখিবেন।

সূচনা সুবিধামত পাঠাইবেন, ভারতীর জন্য বিরত, তাহার উপর আমি হয়ত তাগিদ পাঠাইয়া আরও বিব্রত করিয়াছি। প্রকাশক এখনও কলিকাতায় আছেন, সুতরাং ভারতীর কাজ সারিয়া আমার সূচনা দিলেও চলিবে। ইতি

ভবদীয়
শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ওঁ

ঐতিহাসিক চিত্র কাৰ্যালয়
ঘোড়ামারা, রাজসাহী।
৯ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ ইং
[২৫ ভাদ্র ১৫০৫]

প্রীতিনমস্কার নিবেদনমেতৎ

ঐতিহাসিক চিত্র-সংক্রান্ত ব্যবস্থাদি শেষ করিয়া পত্র লিখিব বলিয়া কয়েকদিন কোনো উত্তর দেই নাই–ছাপার কাজ আরম্ভ হইয়াছে কিন্তু ছবি খোদাই হইয়া আসে নাই। ১০ ফর্মা পরিমিত ‘কপি’ ঠিক হইয়াছে–অবশিষ্ট কপিও পাই নাই; সম্মুখে পুজাবকাশ–সুতরাং ঠিক পূজার পর ভিন্ন আগে কাগজ বাহির হইল না। ত্রৈমাসিক কাগজ সুতরাং ভবিষ্যতেও যাহাতে পূজার বন্ধের সময় কোন সংখ্যা বাহির করিতে না হয় তাহার ব্যবস্থা এখন হইতেই করা কর্ত্তব্য; তজ্জন্য অগ্রহায়ণে বৎসরারম্ভ করিলে মন্দ হইবে না; আগামী বর্ষে তাহাই করা যাইবে এবার প্রথম সংখ্যা কার্তিকে বাহির হইবে এই বন্দোবস্তে ছাপা চলিতেছে নমুনা পাঠাইলাম দেখিবেন।

আমি ইতিমধ্যেই পত্ৰসম্পাদনের গুরুত্ব কিছু কিছু অনুভব করিতেছি– পুলিশের ইনেসপেকটার সৰ্ব্বদা তত্ত্ব লইতেছেন–কলিকাতায় দুই একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ লেখকও ইহার উদ্দেশ্য উল্টা করিয়া বুঝাইবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। আপনাকে আর গোপন করিয়া কি করিব, প্রবীণ ঐতিহাসিক…র বৈঠকে নাকি কথা উঠিয়াছে যে, ঠাকুরবংশের কীৰ্ত্তিঘোষণার উদ্দেশ্যেই তাঁহাদের চেষ্টায় আমার নামমাত্র সম্পাদকতায় এই নূতন কাগজ বাহির হইতেছে–আমার ‘সম্পাদকের নিবেদন” ছাপা শেষ হইয়া যাই নাই, সুতরাং লোকে যাহাতে ভুল না বোঝেন তাহার কৈফিয়ৎ দিয়া দিব। আমাদের দেশের অবস্থা এইরূপ ইহা বলিয়া আর দুঃখ করিয়া কি করিব?

মটকার কাপড়ের নমুনা পাঠাইয়াছি। কোট প্রস্তুতের জন্য অষ্ট্রেলিয়া মটকা ক্রয় করিবার জন্য আমাদের শিল্পবিদ্যালয়ে নমুনা পাঠাইয়াছে, ঐ নমুনার কাপড় এ দেশের অর্থাৎ রাজসাহী, বহরমপুর ও মালদহের তাঁতিরা সহজেই প্রস্তুত করিতে পারিবে। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়ে ত বড় কারখানা নাই, তাঁহারা মাসে ৫০০০ হাজার থানও লইতে পারেন। তিন জেলাতেও অত কাপড় গরীব তাঁতিরা বুনিয়া উঠিতে পারিবে না। কোন ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ এই সময়ে দাদনসূত্রে কাপড় প্রস্তুতের কারখানা খুলিলে বাঙ্গালীর একটা মস্ত বাণিজ্যের দ্বার খুলিয়া দিতে পারেন, ইহাতে কাহারও প্রতিযোগিতা নাই। আমি যতদূর পারি এ দেশের তাঁতিদের সুবিধা করিয়া দিতেছি। বহরমপুরের Messrs Furgussen & co অষ্ট্রেলিয়ায় মাল চালান দিবার কারবার করিবেন বলিয়া তাঁহাদের লোক নানা স্থানে পাঠাইতেছেন। মটকার কাপড়ে বৈদেশিক বাণিজ্যে যাহা কিছু লাভ হইবার কথা তাহা ফরগুসন কোম্পানীরই হইবে, তাঁতিরা খাঁটিয়া খুটিয়া চারিটী উদরান্ন মাত্র পাইবে, অথচ দেশ ঘুমাইয়া আছে–শুধু বক্তৃতায় ইহার আর কি হইবে? স্বদেশীভাণ্ডার যদি অষ্ট্রেলিয়ার সহিত এই কারবার চালাইতে প্রস্তুত হইতেন ত আমি যথাসাধ্য মালপত্তর সংগ্রহ করিয়া দিতাম–এক্ষণে Fergussen কোং officially লিখায় যদি কিছু করিয়া দিতে পারি সে ফল তাঁহারাই ভোগ করিবেন।

আমি দিন কতকের জন্য একবার মপস্বলে যাইব। ভারতী এখনও পাই নাই। ভরসা করি আপনি স্বাস্থ্যের দিকে একটু নজর রাখিয়া খাঁটিবেন।

ভবদীয়
শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ঐতিহাসিক চিত্ৰ কাৰ্যালয়
ঘোড়ামারা, রাজসাহী।
১১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ ইং
[২৭ ভাদ্র ১৩০৫]

প্রীতিনমস্কারনিবেদনমেতৎ

আপনাকে পত্র লিখিবার পর ভাদ্রের ভারতী পাইয়াছি। উহার কবিতাটি অতি সুন্দর হইয়াছে, মুখুয্যে বনাম বাঁড়ুয্যে বিশেষ শিক্ষাপ্রদ হইয়াছে, এবং প্রসঙ্গ কথা আমার পক্ষে কিছু অতিরিক্ত আশার উদ্রেক করিয়া কুণ্ঠিত থাকিবার কারণ জন্মাইয়াছে। ভাদ্রের ভারতীর প্রবন্ধগুলি সমস্তই চিন্তাশীলতার পরিচায়ক, এখন সহযোগী সমালোচকগণ যাহাই বলুন।

আপনি যে পুরাতন পুস্তকের তালিকা পাঠাইয়াছিলেন ঐ তালিকার অনেক পুস্তকই আমি পড়িয়াছি কোন কোন পুস্তক কিনিয়াছি ও কোন কোন পুস্তক ধার লইয়াছি। ঐ সমস্ত পুস্তকই উক্ত তালিকার লিখিত মূল্যাপেক্ষা অল্পমূল্যে কলিকাতায় অন্য লোকের নিকট পাওয়া যায়।

আমি ঐতিহাসিক চিত্রের প্রথম সংখ্যায় প্রবন্ধাদির সমস্ত দেখাশুনা শেষ করিতে পারিলেই দিনকতকের মতো একটু অবসর প্রাপ্ত হইব, সম্প্রতি পুজাবকাশ নিকটবর্তী বলিয়া কাজেরও কিছু চাপাচাপি ও সম্পাদকীয় কর্তব্যেরও কিছু গুরুভার পতিত হইয়াছে, তজ্জন্য রীতিমত পত্রাদি লিখিতে পারি না।

শিল্পবিদ্যালয়ের কাপড়ের যে নমুনা পাঠাইয়াছি তাহা কেমন হইয়াছে ইত্যাদি লিখিবেন। চাদর প্রস্তুত হইয়াছে, তাহারও একখানা নমুনা যথাসময়ে পাঠাইব। কোট প্রস্তুতের কাপড়েরও নমুনা দিব। এতন্মধ্যে যাহা কলিকাতায় চলিতে পারে জানাইবেন।

ভবদীয়
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ওঁ

ঘোড়ামারা রাজসাহী
১৫/৯/১৯ ইং
[৩০ ভাদ্র ১৩০৬]

প্রীতিনমস্কার নিবেদনমেতৎ

বলেন্দ্রবাবুর অকালমৃত্যুতে আমরা সকলেই নিরতিশয় সন্তপ্ত হইয়াছি। আমার সঙ্গে অনেক দিনের পরিচয়, তৎসূত্রে যে আত্মীয়তা জন্মিয়াছিল তাহাতে তাঁহাকে নিতান্ত আপনার জন বলিয়াই স্নেহমমতা করিতাম। তাঁহার উদার স্বভাব, নিৰ্ম্মল চিত্ত ও স্বদেশহিতাকাঙ্ক্ষার চেষ্টা আমি কখনও ভুলিতে পারিব না। কেবল আপনারা কেন সমগ্র দেশের লোকেই তাঁহার অকালমৃত্যুতে একটি আত্মীয় হারাইয়াছে। আমাদের দেশের কথা আর কি বলিব–অতি অল্প লোকেই দেশের জন্য প্রকৃত পন্থায় পরিশ্রম করিয়া থাকেন; যে দুই চারিজন করেন, তাঁহাদের এইরূপ অকালমৃত্যু অন্যের উৎসাহ অবসন্ন হইয়া পড়ে। সেই শীতের সময় যে কলিকাতায় গিয়াছিলাম–সেই শেষ সাক্ষাৎ হইবে, এমন মনেও করি নাই!

আপনি কোথায় আছেন জানিতাম না এবং এই শোকের সময়ে পত্র লিখিতেও সাহস করি নাই। আমরা এখানে বড় বিব্রত–জ্বরে সপরিবারে সহরস্থ ভদ্রমণ্ডলী প্রায় সকলেই শয্যাগত, তাহার উপর ওলাওঠা মহামারীভয়ের আকার ধারণ করিয়া চারিদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। ইহার মধ্যে নিত্যনৈমিতিক কাৰ্য্য সম্পাদন করিবার পর অন্য কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিবার সময় হয় নাই। তথাপি আপনার কর্মচারীর পত্র পাওয়া মাত্র আমি সুতা পাঠাইবার হুকুম লিখিয়া দিয়াছিলাম। শিক্ষক তখন মফস্বলে ছিলেন, নগদ টাকা ভিন্ন হাটে সুতা কেনা যায় না–একথা আমাকে তখন জানায় নাই। তাই বিলম্ব ঘটিয়া গিয়াছে বলিয়া আমি দুঃখিত ও লজ্জিত হইয়া পড়িয়াছি। কুষ্টীয়ার কেদারচন্দ্র লাহিড়ীর নিকট রেল পার্শেলে কিছু সুতা গিয়াছে, এবং সুতা কিনিবার জন্য হুকুম দিয়াছি, যত চাহেন পাঠাইতে পারিব। আমার ইচ্ছার ত্রুটি নাই, ইচ্ছা করে দশহাতে আপনাদের দশজনের সেবা করি, কিন্তু দুখানি হাতে পারিয়া উঠি না তজ্জন্য লোকের নিকট লাঞ্ছিত হইয়া কত না মর্মপীড়া অনুভব করি। এই এক মাসের মধ্যে ঐতিহাসিক চিত্রের তৃতীয় সংখ্যায় সমস্ত কপি ঠিক করিয়া ছাপিবার জন্য কলিকাতায় সান্যাল কোম্পানীর কাছে পাঠাইয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছিলাম, কিন্তু প্রকাশকের বাড়ীতে ওলাওঠা লাগিয়া গিয়াছে; এবং পাবনার ম্যাজিস্ট্রেট শেষমুহূর্তে মাধাইনগরের তাম্রফলকখানির ফটো পাঠাইয়াছেন। এবার ফটো যাইতেই পারে না, কিন্তু প্রবন্ধটি দিতেই হইতেছে। সুতরাং কাজ একটু দেরীতে ভিন্ন আর হইয়া উঠে না। আমার কাজ আমি সারিয়া রাখি–চতুর্থ সংখ্যার পৰ্য্যন্ত কপি ঠিক আছে; কিন্তু অন্যান্য ক্রমশঃ প্রকাশ্য প্রবন্ধের লেখকগণ যে কি অলস–কত পত্র ও টেলিগ্রাম দিয়াও চেতনা করিতে পারি না–দেখিয়া শুনিয়া মনে হয় এ বোঝা অর্ধপথে নামাইয়া দিয়া বাঙ্গালীজন্মের পরিচয় দেই। কেবল রণে ভঙ্গ দেওয়া অভ্যাস নাই বলিয়াই পারি না। কিন্তু আমি সব কাজ করিলেও কোন কাজই যথাসময়ে করিয়া উঠিতে পারিতেছি না, তাহা আপনারা সকলেই বুঝিয়াছেন। তাহার কারণ আর কিছুই নয় –মানুষ একা, কাজ অনেক। এ মানুষকে দিয়া কাজ করাইতে হইলে সহিয়া লইতে হইবে, নচেৎ এ বেচারা পারিয়া উঠিবে কেন? আমি যে উদরান্নের জন্য নিত্যই অপরিমিত শ্ৰম করিতে বাধ্য তাহা ভুলিবেন না। কিন্তু এমনও বিশ্বাস করিবেন না যে আমি তজ্জন্য কেবল কালে ভদ্রে অন্য কাজে হস্তক্ষেপ করি। প্রতিদিনই সাহিত্য শিল্প ও অপরাপর ওকালতির বাহিরের কাজ করিয়া থাকি, যাহা কেবল আমার উপর নির্ভর করে তাহা একরূপ নামাইয়া দিতে পারি, যাহা দশজনের উপর নির্ভর করে তাহা পারি না। কী করিব?

পূজার ছুটি সম্মুখে। দেশে যাইবার ইচ্ছা নাই। সেখানেও ম্যালেরিয়া ঢুকিয়াছে। কোথায় যাইব এখনও স্থির করি নাই, আপনার সঙ্গে দেখা করিবার পূজার ছুটি ভিন্ন সময় ঘটিয়া উঠিবে কিনা জানি না সুতরাং আপনার ওখানে যাওয়ার বিশেষ ইচ্ছা, কিন্তু শিলাইদহে যাইতে হইলে পাবনায় এবং কুমারখালীতে না গিয়া উপায় নাই–মোটেই তাহা ভাল দেখায় না। তাহাতে কিন্তু বেশী সময় লাগিবে। যদি ততটা সময় ও সুযোগ ঘটে তবে অবশ্যই যাইব।

তাঁতি শিক্ষককে বলিবেন তাহার বাড়ীর মঙ্গল। সে যেন নিপুণ হইয়া নিশ্চিন্ত মনে আপনার কার্য সম্পন্ন করে–পলায়ন না করে। আজ তবে এইখানে বিদায় হই, আশা করি আপনার পত্র এখন রীতিমত পাইব। নিবেদনমিতি

ভবদীয় শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ওঁ

ঘোড়ামারা রাজসাহী
১২/১২/১৯ ইং
[২৭ অগ্রহায়ণ ১৩০৬]

প্রীতিনমস্কার নিবেদনমেতৎ

আপনার ‘কণিকা’ পাইয়া সাদরে গ্রহণ করিলাম। কেহ কেহ হাত ঝাড়িলেই পৰ্বত হয়–আপনার ‘কণিকা’ই তাহার প্রমাণ। কথায় ছোট হইলেও কাজ কম নহে, ইহাতে আমাদের সাহিত্যের একটি প্রধান অভাব দূর করিবে। আমরা দশজনে সন্ধ্যার ছায়ায় একত্র মিলিত হইয়া বাঙ্গালা কবিতা হাতে করিলেই সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের গুরুমহাশয়কে ডাকিতে হয়। জলের মত সরল, জ্যোৎস্নার মত নিৰ্ম্মল, প্রিয়জনের মত সুন্দর বলিয়া ‘কণিকা’র কবিতা সহজেই সকলকে পুলকিত করিতে পারিবে।১৩

যদি লক্ষ্ণৌ যাই তবে, হয়ত বড়দিনে কলিকাতায় দেখা করিতে পারিব না। ঐতিহাসিক চিত্র বাহির হইল–দু একদিনের মধ্যেই পাইবেন। নিবেদনমিতি।

ভবদীয়
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

সংযোজন

১-সংখ্যক পত্রে, ও পত্রাবলীর ভূমিকায় কাব্য উপন্যাস ও ইতিহাসের ক্ষেত্র ও সম্পর্ক সম্বন্ধে অক্ষয়কুমার ও রবীন্দ্রনাথের যে আলোচনা মুদ্রিত হইয়াছে সেই প্রসঙ্গে, অবনীন্দ্র-শিষ্য সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় অঙ্কিত সুবিখ্যাত “লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন”-চিত্র উপলক্ষে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধাবলীও স্মরণীয়। এই চিত্র প্রকাশিত হইলে, লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন-কলঙ্ক ‘অলীক’,

‘সুনিপুণ চিত্রকর’-অঙ্কিত এই চিত্র ‘সর্বথা কাল্পনিক’, এই মর্মে অক্ষয়কুমার রাজসাহী শাখা-সাহিত্য-পরিষদে এক প্রবন্ধ পাঠ করেন, ১৩১৫ মাঘ সংখ্যা ‘প্রবাসী’তে উহা (“লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন-কলঙ্ক”) মুদ্রিত হয়। ১৩১৬ বৈশাখ সংখ্যা প্রবাসীতে “কলঙ্কভাজন’ প্রবন্ধে (সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে লিখিত পত্রে) অবনীন্দ্রনাথ ইহার উত্তর দেন–”ইতিহাসের রাজ্য আর শিল্পের রাজ্য এক নয়। পলায়নকলঙ্কস্বরূপ অসহ্য পঙ্ককে আশ্রয় করিয়া তোমার মনোমৃণাল অবাধে সিধা গিয়া ঠিক জায়গায় বিকাশলাভ করিয়াছে, বঙ্গরাজশ্রীর একটি নিষ্কলঙ্ক করুণ বিদায়চ্ছবিতে। তোমার এ লক্ষ্মণ সেন ইতিহাসের ছায়া নয় কিন্তু কালচক্রের মর্মভেদী ঝনঝনার সুস্পষ্ট প্রতিধবনি মাত্র।”

বিশ্বভারতী পত্রিকা, দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, বৈশাখ-আষাঢ়, ১৩৬৩

তথ্যসূত্র

* তুলনীয় ভাস্কর মহ্মাত্রে গঠিত মূর্তি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আলোচনা, “মন্দিরাভিমুখে”, ‘প্রদীপ’, পৌষ ১৩০৫-”আধুনিক ভারতবর্ষে যাঁহারা মাঝে মাঝে এই আশার আলোক জ্বালিয়া তুলিতেছেন তাঁহারা যদি বা আমাদের সূৰ্য্যচন্দ্র নাও হন তথাপি আমাদের স্বদেশের অন্ধ রজনীতে তাঁহারা এক মহিমান্বিত ভবিষ্যতের দিকে আমাদিগকে পথ দেখাইয়া জাগিতেছেন। সম্ভবতঃ সেই ভবিষ্যতের আলোকে তাঁহাদের ক্ষুদ্র রশ্মিটুকু একদিন ম্লান হইয়া যাইতে পারে কিন্তু তথাপি তাঁহারা ধন্য।

“ভারতবর্ষ আজ পৃথিবীর সমাজচ্যুত। তাহাকে আবার সমাজে উঠিতে হইবে। কোন একসূত্রে পৃথিবীর সহিত তাহার আদান-প্রদান আবার সমানভাবে চলিবে, এ আশা আমরা কিছুতেই ছাড়িতে পারি না। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আমরা কবে ফিরিয়া পাইব এবং কখনও ফিরিয়া পাইব কিনা সে কথা আলোচনা করা বৃথা। কিন্তু নিজের ক্ষমতায় জগতের প্রতিভারাজ্যে আমরা স্বাধীন আসন লাভ করিব এ আশা কখনই পরিত্যাগ করিবার নহে।

“রাজ্যবিস্তারমদোদ্ধত ইংলণ্ড আজকাল উষ্ণমণ্ডলবাসী জাতিমাত্রকে আপনাদের গোষ্ঠের গোরুর মতো দেখিতে আরম্ভ করিয়াছেন। সমস্ত এসিয়া এবং আফ্রিকা তাঁহাদের ভারবহন এবং তাঁহাদের দুগ্ধ যোগাইবার জন্য আছে, কিড প্রভৃতি আধুনিক লেখকগণ ইহা স্বতঃসিন্ধ সত্যরূপে ধরিয়া লইয়াছেন।

“অদ্য আমাদের হীনতার অভাব নাই একথা সত্য কিন্তু উষ্ণমণ্ডলভুক্ত ভারতবর্ষ চিরকার পৃথিবীর মজুরী করিয়া আসে নাই।…”

দ্র হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সংকলিত বঙ্গভাষার লেখক পুস্তকে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সম্বন্ধে প্রস্তাব।

দ্র রবীন্দ্রনাথকে লিখিত জগদীশচন্দ্রের পত্র, ২৫ এপ্রিল ১৮৯৯, প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৩

** দ্র রবীন্দ্রস্মৃতি পূৰ্বাশা।

১ আধুনিক সাহিত্য ও ইতিহাস গ্রন্থে সংকলিত।

২ এই প্রসঙ্গ কথার প্রথমাংশ রবীন্দ্র-রচনাবলী দশম খণ্ডে (পৃ.৫৫৫-৬২) সংকলিত হইয়াছে। পরাংশ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রণীত ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থ সম্বন্ধে “কোন আংলোইন্ডিয়ান পত্র” যে “ক্রোধ প্রকাশ করিয়াছেন” তাহার আলোচনা। ইতিপূর্বে রবীন্দ্রনাথ ১৩০৫ জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ভারতী-তে উক্ত গ্রন্থের আলোচনা করিয়াছিলেন। উভয় প্রবন্ধ রবীন্দ্র-রচনাবলী নবম খণ্ড আধুনিক সাহিত্য অংশে ও ইতিহাস গ্রন্থে সংকলিত।

৩ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সম্পাদিত ঐতিহাসিক চিত্র পত্রের প্রথম সংখ্যায় (জানুয়ারি ১৮৯৯) প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের এই ‘সূচনা’ ইতিহাস গ্রন্থে সংকলিত হইয়াছে। ১৩০৫ ভাদ্র সংখ্যা ভারতী পত্রেও রবীন্দ্রনাথ ঐতিহাসিক চিত্র সম্বন্ধে আলোচনা করেন–দ্রষ্টব্য পাদটীকা ১১।

৪ এই পত্রাবলির ভূমিকায় পুনর্মুদ্রিত ও আলোচিত। ৫ নাটোরের মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়।

৬ “যাঁহারা আধুনিক রাজা বা জমিদার, তাহাদের কথা নানা কারণে ভবিষ্যতের ইতিহাসে স্থান পাইবে। সে ভার ভবিষ্যতের ইতিহাসলেখকের হস্তে রহিয়াছে। ঐতিহাসিক চিত্র-র সহিত তাহার কিছুমাত্র সংশ্রব নাই,–পুরাতত্ত্ব সংকলন করাই ইহার একমাত্র উদ্দেশ্য।”

৭ এই প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য–”স্বদেশী বস্ত্রের কারবারে তিনি বেলেন্দ্রনাথ ঠাকুর] প্রথমে হস্তক্ষেপ করেন। এই বাণিজ্যে বলেন্দ্রনাথ ও সুরেন্দ্রনাথ [ঠাকুর] উভয়ে যুক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পরে যোগদান করেন।…বলেন্দ্রনাথের যত্নেই প্রথম স্বদেশী ভাণ্ডার আদির একরূপ সূত্রপাত হয়।”–ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বলেন্দ্রজীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, স্বর্গীয় বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রন্থাবলী (১৯০৭)।

৮ পত্রের এই অনুচ্ছেদে আলোচিত বিষয়-প্রসঙ্গে পত্রাবলির ভূমিকা দ্রষ্টব্য।

৯ ভাষা ও ছন্দ, কাহিনী গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। ১০ রবীন্দ্র-রচনাবলী দশম খণ্ডে সংকলিত।

১১ রবীন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় সম্পাদিত ঐতিহাসিক চিত্র পত্রের ‘সূচনা’ লিখিয়াছিলেন–ঐ পত্রের মুদ্রিত প্রস্তাবনা’ পাইয়া ভারতী পত্রে (ভাদ্র ১৩০৫) সম্পাদকীয় ‘প্রসঙ্গ কথা’য় দীর্ঘ আলোচনা করেন–”নিজের সম্বন্ধে সচেতন হইয়া এক্ষণে আমরা দেশে এবং কালে এক রূপে এবং বিরাট রূপে আপনাকে উপলব্ধি করিতে উৎসুক। …সেই মহৎ আবিষ্কার ব্যাপারের নৌযাত্রার ঐতিহাসিক চিত্র ভারত-ইতিহাসের বন্ধনমোচন জন্য ধর্মযুদ্ধের আয়োজনে প্রবৃত্ত।”

সম্পূর্ণ রচনাটি রবীন্দ্র-রচনাবলী নবম খণ্ডে আধুনিক সাহিত্য অংশে ও ইতিহাস গ্রন্থে সংকলিত।

১২ বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জন্ম ৬ নভেম্বর ১৮৭০, মৃত্যু ২০ আগস্ট ১৮৯৯। দ্রষ্টব্য ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্যসাধক-চরিতমালা ৬০।

১৩ রাজসাহী হইতে প্রকাশিত, অক্ষয়কুমারের রচনায় পরিপুষ্ট, উৎসাহ পত্রের ফাল্গুন-চৈত্র ১৩০৬ সংখ্যায়, কণিকা’র সমাদর পূর্বক লিখিত দীর্ঘ আলোচনা বিনা স্বাক্ষরে প্রকাশিত হইয়াছিল। ১৩০৮ ভাদ্র সংখ্যা প্রদীপ পত্রে অক্ষয়কুমার রবীন্দ্রনাথের কথা কাব্যের যে আলোচনা করেন তাহা এই পত্রাবলীর ভূমিকায় অংশতঃ উদ্ধৃত হইয়াছে।

পরিশিষ্ট ২

স্বর্গীয় অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয়ের কয়েকখানি পত্র

অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়

রাজা রাজেন্দ্র “লালা” মিত্রের পর অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের তুল্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বঙ্গদেশে বিরল, একথা অত্যুক্তি নহে। য়ুরোপীয় বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া সংস্কার-বর্জিত বুদ্ধিতে ইতিহাস আলোচনা মৈত্রেয় মহাশয় বঙ্গদেশে প্রথম প্রবর্তন করিয়াছিলেন। মাটি খুঁড়িয়া পাথুরে প্রমাণের বলে ইতিহাসের নূতন উপাদান সংগ্রহে মৈত্রেয় মহাশয় পথ-প্রদর্শন করিয়া দিয়াছেন। গৌড় ও মগধ-শিল্পের আলোচনার সূত্রে প্রতিমা-তত্ত্বের নানা নূতন সত্যের আবিষ্কারের মূলসূত্রগুলি, তিনিই প্রথম নির্দেশ করিয়া যান। বঙ্গদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক ও নানা ধর্ম-প্রভাবের ইতিহাস মৈত্রেয় মহাশয় নানা দিক দিয়া পরিদর্শন করিয়াছিলেন, এবং ধৈর্য ও পাণ্ডিত্যের সহিত তাহার মূল উপকরণাদির তত্ত্ব-সংগ্রহে জীবন উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ইতিহাস ছাড়া আর একটি সংস্কৃতির উপর তাঁহার গভীর প্রণয় ও আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটি গৌড়-শিল্পের উৎপত্তি ও ইতিহাস। এই সূত্রে তাঁহার সহিত পত্র ব্যবহার করিবার সৌভাগ্য আমার ঘটিয়াছিল। এই পত্রাবলীতে তাঁহার গভীর গবেষণা, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, পাণ্ডিত্যের আদর্শ, ও গৌড়শিল্পের উপর অনুরাগের কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যাইবে। আজ বঙ্গদেশে একাধিক পণ্ডিত ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব লইয়া নানা গবেষণা ও আলোচনা করিতেছেন, ভরসা করি তাঁহারা মৈত্রেয় মহাশয়ের উদাহরণ নূতন গৌরবে উজ্জ্বল করিবেন। তাঁহার পত্রে তাঁহার জ্ঞানের যে দিকটি ফুটিয়া উঠিয়াছে, আশা করি তাহার পরিচয়ে আমাদের নূতন ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতেরা নূতন প্রেরণা ও শক্তি পাইবেন। এই ভরসাতেই পত্রগুলি প্রকাশিত হইল। এক শ্রেণির শিল্পী আছেন যাঁহাদের প্রতিভা পরিপুষ্ট চিত্রে (finished paintings) ততটা প্রকাশ পায় না, যতটা ফুটিয়া উঠে তাঁহাদের রেখা পরিকল্পনায় (drawings); তেমনই এক শ্রেণির লেখক আছেন, যাঁহাদের ব্যক্তিত্ব ও মনের ভঙ্গীটি প্রবন্ধ-পুস্তকাদিতে ততটা প্রকাশ পায় না, যতটা আত্মপ্রকাশ করে তাঁহাদের পত্রাবলীতে এই হিসাবে অনেক লেখকের পত্রাবলী কতকটা আত্মজীবন-চরিত। “সিরাজউদ্দৌলা’র লেখকের মানসিকতার একটা নূতন দিক তাঁহার পত্রাবলীতে প্রকাশ পাইয়াছে, যাহা তাঁহার প্রকাশিত পুস্তক-প্রবন্ধাদিতে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এই হিসাবেও মৈত্রেয় মহাশয়ের এই পত্রগুচ্ছের একটা নূতন মূল্য আছে।

গৌড়-শিল্পের উৎপত্তি ও দ্বীপপুঞ্জের শিল্প-কলার সহিত মৈত্রের মহাশয় যে সম্বন্ধ পরিকল্পনা করিয়াছিলেন, তাহা আংশিকভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। সম্ভবতঃ, বঙ্গদেশে নূতন প্রমাণের আবিষ্কারে তাঁহার পরিকল্পনায় অপরাপর অংশ ভবিষ্যতে সুপ্রমাণিত হইবে। মৈত্রেয় মহাশয়ের সহিত যখন আমার প্রথম পরিচয় হয়, তখন আমি ভট্টকর্ণের ছাত্রী শ্রীমতী মার্টিন টয়নট নামী একজন ডচ-মহিলার সাহায্যে যবদ্বীপের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ডচ-ভাষায় লিখিত নানা রিপোর্ট ও monograph অনুশীলন করিতে আরম্ভ করিয়াছি। যবদ্বীপের শিল্পতত্ত্বের উপাদানগুলি তখনও সম্পূর্ণ আয়ত্ত করিতে পারি নাই। আমার অল্পবিদ্যায় শূন্য-গৰ্ব্ব লইয়া মৈত্রেয় মহাশয়ের theory সবেগে আক্রমণ করিয়াছিলাম। মনীষী পণ্ডিত আমার বক্তব্য ধৈৰ্য্য, সৌজন্য ও সহৃদয়তার সহিত আলোচনা করিয়া আমাকে সম্মানিত করিয়াছিলেন। এই পত্ৰব্যবহারের ফলে যবদ্বীপের শিল্পের উৎপত্তি সম্বন্ধে নানা নূতন পথ আমার চক্ষের সম্মুখে তিনি খুলিয়া দিয়াছিলেন। এজন্য আমি তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ। বঙ্গের একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও ঐতিহাসিকের স্মৃতি-রক্ষার যথাযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চয় হইবে, ভরসা করা যায়। ইতিমধ্যে তাঁহার দুই-চারিখানি পত্র প্রকাশ উপলক্ষ্যে আমি তাঁহার স্মৃতি পূত-মন্দিরে এই অর্ঘ্য কয়টি নিবেদন করিয়া ধন্য হইলাম।

ঘোড়ামারা, রাজসাহী,
৮ই বৈশাখ ১৩১৯ বং

প্রীতিনমস্কার নিবেদন

আপনি শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রবাবুকে যে পত্রখানি লিখিয়াছেন, তিনি তাহা আমাকে পাঠাইয়া আপনার সহিত পত্ৰব্যবহারের অনুরোধ জানাইয়াছেন বলিয়া অপরিচিত হইয়াও এই পত্র লিখিতে সাহসী হইলাম। গৌড়ে, বরেন্দ্রে, বিক্রমপুরে ফটো তুলিবার লোকের অভাব নাই এবং অনেক দ্রব্যেরই ফটো তুলিয়াছি, তদ্বিষয়ে আপনাকে আর কষ্টস্বীকার করিতে হইবে না। কিন্তু উড়িষ্যায় যে সকল দ্রব্যের ফটো করিতে পারি নাই, তাহার স্কেচ করাইতে হইবে। তাহার ব্যবস্থা করিতে পারিলে জানাইবেন। কোথায় কোথায় গৌড়শিল্পকলার কি কি নিদর্শন উড়িষ্যায় দেখিয়াছি তাহার তালিকা ও ঠিকানা পাঠাইব। হয়শীর্ষপঞ্চরাত্রে’র একখানা বঙ্গাক্ষরের পুথি পাইয়াছেন জানিয়া আনন্দ লাভ করিলাম। উহা দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিয়া রহিলাম। একখানি মাত্র হস্তলিখিত গ্রন্থের উপর নির্ভর করা যায় না, সুতরাং একখানি পাইয়াছেন বলিয়া সন্ধান লইবার চেষ্টা পরিত্যাগ করিবেন না। আর একখানি হস্তলিখিত পুথির আবশ্যক–তাহার দুই তিন রকমের ছাপা প্রচলিত আছে, সকলগুলিই ভুলভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ, তাহার হস্তলিখিত পুথি না পাইলে, ছাপা দেখিয়া কাজ করা চলে না। পুথিখানির নাম ‘হরিভক্তিবিলাস।’ উহার টীকাও আছে। সটীক হরিভক্তিবিলাসের হস্তলিখিত পুথি খুঁজিয়া বাহির করিতে পারিলে, আমার কাজের সাহায্য হইবে। আপনারা যখন স্বতঃপ্রবৃত হইয়া এ সকল ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করিবেন বলিয়া অভয় দিয়াছেন, তখন আর ভয় না খাইয়া, প্রথম পত্রেই অনেক ফরমাইশ পাঠাইতে সাহসী হইলাম। ভরসা করি পত্রোত্তরে আনন্দদান করিতে বিরত হইবেন না। অলমতি বিস্তরেণ।

ভবদীয়
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ঘোড়ামারা, রাজসাহী
১১ বৈশাখ ১৩১৯

প্রীতিনমস্কার নিবেদন

আপনার পত্র পাইয়া যুগপৎ হর্ষ ও গৰ্ব্ব লাভ করিলাম। আপনার সহিত পূৰ্ব্বপরিচয়ের সৌভাগ্য না থাকিলেও, আপনার শিল্পালোচনার সঙ্গে কিছু কিছু পরিচয় ছিল। আপনার পত্রে তাহার আরও পরিচয় পাইয়াই হর্ষ ও গৰ্ব্ব লাভ করিলাম, আপনারদিগের মত উৎসাহী, অধ্যবসায়ী, এবং একনিষ্ঠ সাধকের সাধনা অবশ্যই সিদ্ধিলাভ করিবে। আমি যখন ভারতশিল্পের তথ্যানুসন্ধানের প্রয়োজন বোধ করি, তখনও গৌড়শিল্পের ইতিহাসের অনুসন্ধানের কামনাই একমাত্র কামনা ছিল, এখনও তাহাই রহিয়াছে। সে অনেক দিনের কথা। গৌড়ের ধবংসাবশেষের মধ্যে পুরাতন শিল্পের নিদর্শন দেখিয়াই আমি তাহার প্রতি আকৃষ্ট হই। আমার পক্ষে সৰ্ব্বদা কলিকাতা যাতাযাত ও তথা হইতে ইচ্ছামত পুস্তকাদি আনিয়া অধ্যয়ন কখনও সুবিধাজনক হয় নাই, ইহাতে বাধ্য হইয়াই আমাকে অন্যান্য উপায়ে এ বিষয়ের অনুসন্ধান করিতে হইয়াছে। আমি কিছু লিখিতাম না, বন্ধুবান্ধবকে ল্যান্টানের সাহায্যে ছবি দেখাইতাম। তাঁহাদিগের উপদ্রবে বঙ্গদর্শনে শ্রীমূর্তি-বিবৃতি নামক প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। তাহার পর বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতি আমাকে গৌড় শিল্পকলার ইতিহাস লিখিবার জন্য তাড়না করায় একালের পর লিখিবার চেষ্টা করিতেছি বলিয়া এখন একটি প্রবন্ধ ছাপিতে দিতেছি। আমি আর আপনাদিগকে কি অভয় দিব, আপনারাই আমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করিবেন বলিয়া অভয় দিয়া আমাকে চিরঋণে আবদ্ধ করিয়াছেন। আমি ইতিহাসের দিক দিয়াই বিষয়টির আলোচনা করিয়াছি–শিল্পসৌন্দর্যের দিক দিয়া সকল বিষয়ের আলোচনা করিবার অধিকার লাভ করি নাই। ইতিহাসের দিক দিয়া আলোচনা করিতে গিয়াই আমি বুঝিয়াছি–শিল্পবিধি প্রথমে কারিকারূপে প্রচলিত ছিল, পরে ক্রমে ক্রমে তাহা সঙ্কলিত হইয়া, বাস্তুশাস্ত্রে, পুরাণে, তন্ত্রে বিবিধভাবে বিবিধ গ্রন্থে স্থান লাভ করিয়াছে। যেমন আগে ভাষা, তাহার পর ব্যাকরণ,–সেইরূপ আগে শিল্প, তাহার অনেক পরে শিল্পশাস্ত্র। সুতরাং শিল্পশাস্ত্রে “ব্যাকার’, বিবরণ, লাভ করিয়া তাহার সাহায্যে শিল্পরীতি অধ্যয়ন করা চলিতে পারে। সকল যুগের সকল শিল্পই শাস্ত্র মানিয়া চলে নাই, স্বাধীন উদ্ভাভনা অনেক সময়ে গণ্ডী ছাড়াইয়া চলিয়া গিয়াছে। এই কথাটি না ধরিয়াই স্যর জর্জ বার্ডউড ভ্রমে পতিত হইয়া রহিয়াছেন। ভাষা বুঝিবার জন্য শিল্প-শাস্ত্রের প্রয়োজন, তাহার অধিক ইহার নিকট কিছু প্রত্যাশা করা যায় না, ইহাই আমার মত। গৌড়-শিল্প কোন শিল্পশাস্ত্র ধরিয়া বুঝিবার চেষ্টা করিব, তখন তাহারই অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হইয়া বুঝিয়াছিলাম– মগধ, উড়িষ্যা, এবং দ্বীপপুঞ্জের শিল্প গৌড়শিল্প। ভাস্কৰ্য্য ও স্থাপত্য একসঙ্গে চলিয়াছে বলিয়া একসঙ্গে বুঝিতে হইলে, সমস্ত উত্তরাপথের (আর্যাবর্তের) শিল্পে বিশ্বকর্মার প্রভাব দেখা যায়–একথা ঢাকা রিভিউ পত্রে লিখিয়াছিলাম। আমাদিগের দেশের নব্য স্মৃতিতে দেখা যায়–হয়শীর্ষপঞ্চরাত্রের প্রভাব এদেশেও বৰ্ত্তমান ছিল। সেই হইতেই উহার সন্ধান করিতেছি, এবং গ্রন্থ না পাওয়ায় উদ্ধৃত শ্লোকাবলী হইতে হয়শীর্ষ মতের পরিচয়লাভের চেষ্টা করিতেছি, এমন সময়ে উড়িষ্যায় গ্রন্থ দেখিলাম। উহার নকল আনিতে পারি নাই। উড়িয়া অক্ষর হইতে বঙ্গাক্ষরে নকল করাইতে ব্যয়বাহুল্য আছে। আমি উড়িষ্যায় ফটোগ্রাফ তুলিতেই ব্যয়বাহুল্য করিয়া ফেলিয়াছিলাম। আমার সাংসারিক অবস্থায় অধিক ব্যয়বাহুল্য সম্ভবে না। আপনি যখন বঙ্গাক্ষরে পুথি দিইয়াছেন তখন আমাকে একবার আদ্যন্ত দেখিতে দিবেন। যে Bibliography প্রস্তুত করিতেছেন তাহা অবশ্যই উপাদেয় হইবে, তাহাও দেখিবার আশায় রহিলাম। বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতি অনেক পুরাণ তন্ত্রের পুথি সংগ্রহ করিয়া ও দক্ষিণাপথ হইতে শিল্পশাস্ত্রের পুথিগুলির নকল ক্রমশঃ আনাইয়া দিবার ব্যবস্থা করিয়া আমার সাহায্য করিতেছেন, আপনার নিকটেও সেইরূপ সাহায্য পাইলে আমার পরিশ্রমের লাঘব হইবার আশা আছে। শিল্পকারগণ অনেক অধ্যাপক অপেক্ষা শিল্পশাস্ত্রের মর্ম ভালরূপ জ্ঞাত আছে। অধ্যাপকবর্গ শিল্পশাস্ত্রে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ বলিলেও অত্যুক্তি হয় না–কারণ প্রয়োজনের অভাবে তাঁহারা এই শাস্ত্র চর্চা ত্যাগ করিয়াই অনভিজ্ঞ হইয়াছেন। আপনি যে পুস্তক রচনা করিতেছেন, তাহা সর্বাঙ্গসুন্দর হউক, ইহাই প্রার্থনা। আমি তাহার কোন কাজে লাগিলে ধন্য বোধ করিব, সুতরাং আমাকে অসঙ্কোচে লিখিবেন।

গৌড়শিল্পের ইতিহাসের আভাসটি এইরূপ–খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দীর পূর্বে আমাদিগের দেশে স্বতন্ত্র শিল্প ছিল না, নিদর্শনও অল্প ছিল, যাহা ছিল তাহাও উৎকৃষ্ট বলিয়া কথিত হইতে পারে না। কিন্তু কিছু নিদর্শন এখানে সংগৃহীত হইয়াছে। অষ্টম হইতে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র উত্তরাপথ [মগধে ও উড়িষ্যায় ত বটেই] গৌড়ীয় পালসাম্রাজ্যের প্রভাব বর্তমান থাকায়, সমগ্র উত্তরাপথের ভাষায়, রচনায়, শিল্পে ও লোকাঁচারে গৌড়ীয় প্রভাব প্রাধান্য লাভ করে; –ইহা ইতিহাসের কথা, তাম্রশাসন শিলালিপি ও পুরাতন গ্রন্থ হইতে ইহা দেখাইয়া যাহা লিখিয়াছি তাহা বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতির প্রথম গ্রন্থে জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রকাশিত হইবে। দ্বীপপুঞ্জের উপনিবেশ যে বাঙালীর উপনিবেশ তাহার প্রমাণ দেখাইয়া গ্রন্থ লিখিতেছি, এবং যবদ্বীপের শিল্প-প্রতিভাশীর্ষক একটি প্রবন্ধ সাহিত্যে পাঠাইয়াছি, তাহাও জ্যৈষ্ঠ মাসেই বাহির হইবে। লামা তারানাথের গ্রন্থের পরে তিববতীয় ভাষায় প্যাগ-সাম-জন-জাঙ্গ নামে আর একখানি গ্রন্থ রচিত হয়। উহাতেও ধীমানের পরিচয় আছে। যে অংশে তাহা আছে তাহার অনুবাদভার রায় বাহাদুর শরচ্চন্দ্র দাসের উপর অর্পিত হইয়াছে। ইহা ছাড়া কোনও সংস্কৃত গ্রন্থে গৌড় শিল্পরীতির উল্লেখ দেখি নাই; নামটি আমিই প্রচলিত করিতেছি, কারণ উহাই প্রকৃত নাম হওয়া উচিত। প্রতিমালক্ষণ বা Iconology ভারতীয় Iconographyর একাংশ বলিয়াই আমি Dawn পত্রে Iconography শব্দেরই ব্যবহার করিয়াছি।

আপনি যেভাবে শিল্পযুগের বিভাগ করিয়াছেন, উহাই প্রচলিত বিভাগ, কিন্তু উহা ঐতিহাসিক বিভাগ নয়–কাল্পনিক। ঐতিহাসিক বিভাগ ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক যুগ ধরিয়া করিতে হইবে। যে যুগে যে কারণে মূর্তিকল্পনা যে ধারা অবলম্বন করিয়াছিল, সেই যুগের সকল সম্প্রদায়ের মূর্তিতেই তাহা দেদীপ্যমান। সুতরাং সম্প্রদায়-অনুসারে যুগের নামকরণ করিলে, তাহা ইতিহাসের বিচারে টিকিতে পারিবে না।

উড়িষ্যার দেবমূর্তিগুলির মধ্যে যাহার ছবি বা স্কেচ পাইলে আমার উপকার হইতে পারে তাহার তালিকা এইরূপ — (১) যাজপুরের মাতৃকা মূর্তি, (২) পুরীর মার্কণ্ডেয় সরোবরতীরে একখানি চালাঘরে রক্ষিত মাতৃকামূর্তি, (৩) পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের বাহিরের বৃহৎ বরাহ ও নৃসিংহমূর্তি, (৪) সাক্ষী গোপালের মূর্তি। শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়কে তাহার কথা লিখিয়াছি।

আমার পত্রও দীর্ঘ হইয়া পড়িল। যত কথা বলিব, তত কথা বলা হইল না। আর দুই একটা কথা বলিয়া এবার বিদায় লইব। আপনি বাঙ্গালা দেশের গৌড়শিল্পের নিদর্শনের তালিকা চাহিয়াছেন, তাহা বৃহৎ। আমরা তাহার magic lantern slide করিয়াছি ও করিতেছি। কলিকাতার যাদুঘরে কিছু আছে, কিন্তু বেশি আছে বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতির সংগ্রহ-মন্দিরে। তাহার ব্লক হইতেছে, একসঙ্গে গৌড় শিল্পকলা পুস্তকে বাহির হইবে। গৌড়শিল্পরীতি সম্বন্ধে আমার অভিমত কি তাহার একটা ‘নোট’ চাহিয়াছেন। সংক্ষেপে লিখিলে তাহা বৃহৎ ‘নোট’ হইবে। এক কথায় বলিতে গেলে মহাযান-সম্প্রদায়ের অধ্যাত্মবাদের পরিণামই গৌড়ীয় শিল্পরীতি রূপে আকার-গ্রহণের চেষ্টা করিয়াছিল। পঞ্চপাল নয়পালের সময় পর্যন্ত সেই অধ্যাত্মবাদ বিশুদ্ধি রক্ষা করিয়া ক্রমে অবসন্ন হয়, শিল্প তাহার অনুগমন করে। বরেন্দ্রের যে শিল্পরীতির উদ্ভব তাহা উড়িষ্যায়, মগধে, দ্বীপপুঞ্জে গিয়াছিল। মগধ ও গৌড় একসূত্রে গ্রথিত থাকায়, মহাযান মতের অধোগতির সঙ্গে এই দুই স্থানের শিল্পরীতি ক্রমে অবনতি লাভ করিতে থাকে; কিন্তু উড়িষ্যায় ও দ্বীপপুঞ্জে সেরূপ কারণ বর্তমান না থাকায়, তদ্দেশে উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করে। বরেন্দ্রে উদ্ভব–উড়িষ্যায় শক্তিলাভ–দ্বীপপুঞ্জে পরিণতি, ইহা গৌড়ীয় শিল্পকলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। ভুবনেশ্বরে বসিয়া ইহার পরিচয় লাভ করা যাইতে পারে। ফাগুসনের নূতন সংস্করণের দ্বিতীয় ভাগে উড়িষ্যার স্থাপত্যের কাল নির্ণয়াত্মক তালিকা দেখুন,–যবদ্বীপের উৎকৃষ্ট মূর্তিগুলির রচনাকালের কথা চিন্তা করুন, সহজেই ইতিহাসের সূত্র ধরিতে পারিবেন। প্রাদেশিক রচনারীতি মূলরচনা রীতিকে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত করিলেও আচ্ছন্ন করিতে পারে না। কোনটি মূল, কোনটি প্রাদেশিক, তাহা বাছিয়া বাহির করিবামাত্র, উড়িষ্যার এবং দ্বীপপুঞ্জের শিল্পরীতি যে গৌড়শিল্পরীতি তাহা বুঝিতে বিলম্ব ঘটিবে না। এ বিষয়ে আমি অল্পে অল্পে অনেক লিখিয়াও কিছুই লিখিতে পারিলাম না। সাহিত্যে মাসে মাসে কিছু কিছু লিখিব মনে করিয়াছি, তাহাতেই আমার বক্তব্যের আভাস পাইতে পারিবেন। এখন বিদায় গ্রহণের সময়ে প্রার্থনা জানাইয়া রাখি–আপনি যে শিল্পগ্রন্থের নকল আনাইয়াছেন, সেগুলি রেজেষ্টারী ডাকে অথবা লোক মারফত ক্রমে ক্রমে আমাকে দেখিতে দেন এবং যে সকল ক্ষেত্রে আবশ্যক তাহা সংগ্রহ করিয়া দেন, আমি তদবলম্বনে আপনাদের প্রস্তাবিত শিল্পসূত্ৰসংগ্রহ নামক গ্রন্থ সঙ্কলনের চেষ্টা করি। অলমতি বিস্তরেণ।

ভবদীয়
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

পুনঃ নিঃ। বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতির সংগৃহীত গৌড়শিল্পের নিদর্শনের একটি নমুনা পাঠাইলাম। উহা গৌড়শিল্পকলা পুস্তকে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে এবং বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি কর্তৃক উহা প্রথমে প্রকাশিত হইবে। সুতরাং এই চিত্র আপনি ব্যবহৃত করিবেন না, আপনাকে সেরূপ অধিকার দানের অধিকার আমার নিজেরই নাই। কেবল আপনাকে গৌড়শিল্প চিনিবার উপযোগী একটি নিদর্শন দিবার জন্য তাহা পাঠাইলাম। আপনি শিল্পী, এই চিত্র সম্বন্ধে আপনার সমালোচনা জানিবার জন্য আশান্বিত হইয়া রহিলাম। কি গুণে গৌড়শিল্প আমার মত একজন শুষ্ক ঐতিহাসিককেও রসসিক্ত করিয়াছে, ইহাতে তাহার কিঞ্চিৎ পরিচয় পাইবেন। ইতি

ঘোড়ামারা, রাজসাহী
১৫ বৈশাখ ১৩১৯

প্রীতিনমস্কার নিবেদন

আপনার উপদেশপূর্ণ পত্র পাইয়া আনন্দ লাভ করিলাম। আপনি সাবধান না করিলেও, আমার পক্ষে যাহা তাহা a priori সিদ্ধান্ত ধরিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়া, দীর্ঘকালের ইতিহাসচর্চার গৌরব ক্ষুণ্ণ করিবার সম্ভাবনা নাই। আমার অজ্ঞতাই আমার সাবধানতার অবলম্বন। যতক্ষণ না বুঝিতে পারি, ততক্ষণ বুঝিবারই চেষ্টা করি। যবদ্বীপাদির উপনিবেশ যে হিন্দু উপনিবেশ তাহা শুনিয়া তৃপ্তি হয় না, কাহাদের উপনিবেশ জানিতে ইচ্ছা করে। এ বিষয়ে আমি যে সকল প্রমাণের যে ভাবে আলোচনা করিতেছি, তাহা কাহারও অভিমতের প্রতিধবনি নহে; আমার নিজের অভিমত এবং তাহা কেবল প্রমাণের উপরেই প্রতিষ্ঠিত; a priori সিদ্ধান্ত নহে। পত্রে তাহার পরিচয় প্রদান করা অসম্ভব। তাহা প্রবন্ধে ও গ্রন্থে ক্রমশঃ প্রকাশিত হইবে।

খ্রিষ্টিয় অষ্টম হইতে দ্বাদশ শতাব্দী গৌড়শিল্পের উত্থান-পতনের ঐতিহাসিক কাল। এই কালের মধ্যে যে শিল্পকলা গৌড়ে উদ্ভূত, উড়িষ্যায় শক্তিপ্রাপ্ত ও যবদ্বীপেপরিণতাবস্থায় আরূঢ় হইয়াছিল, তাহাকেই আমি গৌড়শিল্পকলা” বলিয়াছি। তাহার মধ্যে পূর্বকালবর্তী পদ্ধতির ধারা অবশ্যই কিছু কিছু লক্ষিত হইতে পারে, তাহাতে গৌড়শিল্পের নিজের অস্তিত্ব নষ্ট হয় না। গৌড়শিল্পই যে ভারতবর্ষের সকল যুগের সকল শ্রেণির শিল্পের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট, আমি এমন দাবী উপস্থিত করিতে পারি না; কেহ করেন কিনা জানি না। গৌড়শিল্প যে ভাবটির অভিব্যক্তি, তাহাকে ইতিহাসের মধ্যেই সন্ধান করিয়া বাহির করিবার চেষ্টা করিতেছি। তর্কস্থলে যদি আমার এই সিদ্ধান্তটি মানিয়া লওয়া যায়, তাহা হইলে গৌড়ের, উড়িষ্যার ও যবদ্বীপের শিল্পনিদর্শনগুলি এই সিদ্ধান্তের অনুকূল হয় কি না, শিল্পের দিক দিয়া আপনারা তাহার বিচার করিয়া দেখিতে পারেন। সেদিকে যদি এমন কিছু দেখিতে পাওয়া যায়, যে কিছুতেই আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষিত হয় না, তখন না হয় শিল্পসৌন্দর্য্যের প্রমাণের বলে ভিন্নরূপ সিদ্ধান্তের অবতারণা করিবেন। একটা theory না হইলে বিচার চলে না। আপনারা আপাততঃ আমার অভিমতটিকে একটা theory মাত্র মনে করিয়াও বিচার করিয়া দেখিতে পারেন। তাহার অধিক আর কিছু বর্তমান অবস্থায় দাবি করিতে চাহি না–আমাদের সম্পাদক মহাশয় ছবি দাগাইয়া যে কি অপকর্ম করিয়াছেন তাহা আপনার পত্র হইতে তাঁহাকে শুনাইলাম। আমাদের সংগৃহীত নিদর্শনগুলি ‘আমাদের’, আমার নহে। সমিতির অনুমতি না পাইলে, তাহার ফটো ইত্যাদি দিতে পারি না ও কাহাকেও দেখাইতে পারি না। সমিতি পুস্তক লিখিতেছেন বলিয়াই এরূপ সাবধানতার প্রয়োজন বুঝিয়াও আমার অধিকার অতিক্রম না করি, এই আশঙ্কায় আপনাকে পূর্বপত্র লিখিয়াছি। আপনার পত্রখানি সমিতিতে পেশ করিয়া, অনুমতি লইয়া, তালিকা ইত্যাদি পাঠাইব। গৌড়শিল্পের নিদর্শনগুলি নানা দেশে চলিয়া যাইতেছে বলিয়া আমরা তাড়াতাড়ি সংগ্রহ করিয়া রাখিতেছি–সে কেবল আপনাদের জন্যই। যোগ্য ব্যক্তি আসিয়া তাহার আলোচনা করিবেন, ইহাই উদ্দেশ্য। ইহার জন্য আমরা অনাহারে অকথ্য ক্লেশে নানা স্থানে যাতায়াত করিয়া ম্যালেরিয়াগ্রস্ত হইয়াছি। ইহাও আপনাদের জন্যই। আমরা কোথায় কি পাইলাম, কেমন করিয়া পাইলাম, কাহার নিদর্শন পাইলাম,–তাহাই লিখিয়া রাখিতেছি। তারানাথ যে ধীমানের কথা লিখিয়া গিয়াছেন, তিনি কোথায় উদ্ভূত হইয়াছিলেন, তাঁহার শিল্পের নিদর্শন কোনগুলি–আমরা এখন কেবল এই সকল বিষয়েরই প্রমাণ সংগ্রহ করিতেছি। সে শিল্পের মূল্য কি, সমগ্র ভারতশিল্পে তাহার স্থান কোথায়, তাহা আমাদিগের আলোচ্য নয়। যাহা কেবল আমাদিগেরই আলোচ্য এবং আমরা না করিয়া গেলে, আপনাদের পক্ষে করা একরূপ অসম্ভব দাঁড়াইতে পারে, আমরা আপনাদের জন্য সেই “ভূতের বেগার” খাঁটিতেছি। ইহার অধিক আমাদের কাজের মূল্য নাই। আপনি তাহাকে কল্পনাবলে ও সদাশয়তাগুণে বহুমূল্য মনে করিবেন না। আমি পূর্বেই নিবেদন করিয়া রাখিয়াছি–আমি শুষ্ক ঐতিহাসিক। তবে আমার দাবি একটু আছে, একটু মাত্র, সেটুকু স্বীকার করিতেই হইবে। আর কিছু নয়–যাহা ইতিহাস ধরিয়া বুঝিতে হইবে, সেইটুকু আমরা ইতিহাস ধরিয়া বুঝাইবার চেষ্টা করিয়া যাইব। Architecture and History সম্বন্ধে spectator পত্রে বাদানুবাদ চলিতেছে ২৩ মার্চ সংখ্যক পত্রে তাহা দেখিবেন। সুতরাং আমাদের “অনুসন্ধান-চেষ্টা আরও কয়েক শতাব্দী ক্ষান্ত থাকিলে, গৌড় শিল্পের আলোচনার পথ আপনাদের পক্ষে সুগম হইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস নাই। মাটির নীচে হইতে খুঁড়িয়া তুলিবার সময় নাসিকাচ্ছেদ হইয়াছে বলিয়া পরিতাপ করিলেও বলিতে হইবে–মাটিচাপা অপরিজ্ঞাত অবস্থায় থাকিলেও লাভ হইত না। এ সকল অনিবার্য বিষয়কে একটু ক্ষমার চক্ষে, একটু সহৃদয়তার চক্ষে দেখিয়া দণ্ডের ব্যবস্থা করিবেন।

আমাকে তালিকা পাঠাইতে লিখিয়াছেন, তালিকা পাঠাইলাম। যথা– (১) উড়িষ্যাশিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শনের ছবি, (২) মাতৃকামূর্তির ছবি, যাজপুর ও পুরীধামের, (৩) কোণার্কের নবগ্রহের ছবি, (৪) পুরীর ভোগমন্দিরের বিশেষ বিশেষ ছবি, (৫) শিল্পগ্রন্থের তালিকা, (৬) হয়শীর্ষপঞ্চরাত্রের প্রতিমালক্ষণের নকল এবং (৭) হরিভক্তিবিলাসের একখানি হস্তলিখিত পুথি। কশ্যপ, অগস্ত্য ও অত্রি প্রণীত গ্রন্থ বঙ্গদেশে প্রচলিত ছিল কি না সন্ধান পাই নাই, তবে তাঁহাদের কারিকা উদ্ধৃত হইতে দেখিয়াছি। পঞ্চরাত্র গ্রন্থ একশ্রেণীর তন্ত্রগ্রন্থ–উহা একটি বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের গ্রন্থ–সুতরাং হয়শীর্ষপঞ্চরাত্রের ঐতিহাসিক মূল্য আছে। সমস্ত গ্রন্থেরই নকল রাখা উচিত।

অনুসন্ধান সমিতির প্রধান নায়ক কুমার শরৎকুমার এখন কলিকাতার। তিনি সপ্তাহ মধ্যে দেশে ফিরিবেন। তিনি আসিবার পর আমাদের বৈঠক হইবে। তাহার পর আপনার “আবেদনের তালিকার” অনুরোধ করিতে পারিব। নটরাজ ও নৃত্যগণেশের ধ্যান দাক্ষিণাত্য হইতে সংগৃহীত পুথিতে পাইয়াছি, নকল আমাদের সম্পাদকের হস্তে, উহাও একসঙ্গেই পাঠাইতে পারিব। বাঙ্গালার নটরাজ একটু পৃথক–তাহার নৃত্য ভঙ্গীও পৃথক–এবং তাহার একটি ভগ্নমূর্তি আমরা পাইয়াছি। ভুবনেশ্বরে [মুক্তেশ্বরের আঙ্গিনায় আর গাছের নীচে ও ছোট ছোট মন্দিরে] যে সকল মূর্তিমধ্যে একটি নটরাজ মূর্তি ছিল, সেটি কলকাতা মিউজিয়ামে আসিয়াছে; — আমি সেদিন উহা দেখিয়া আসিয়াছি তাহার ছবি না লওয়া থাকিলে, লইবেন। শিল্পের হিসাবেও হয়ত অসুন্দর মূর্তির প্রয়োজন থাকে, উদ্ভাবন বা অবনতির পরিচয় দিবার সময়ে তাহার দরকার হয়। ইতিহাসের হিসাবে তাহার প্রয়োজন আরও অধিক সুতরাং কেবল সুন্দর লইয়াই আমার ঘরকন্না নয়, তাহাতে যাহা আছে, কবির ভাষায় তৎসম্বন্ধে বলিতে হয়–”তোমরা সবাই ভাল।” পত্র দীর্ঘ হইয়াগেছে, অতএব এইখানেই বিদায় গ্রহণ করিতেছি। নিবেদনমিতি।

ভবদীয়
শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

পুঃ নিঃ। ভিন্সেন্ট স্মিথের নূতন গ্রন্থের ২৬৪ পৃষ্ঠায় ১৯৯ নং “সরস্বতীমূত্তি” দেখিয়া তৎসম্বন্ধে এই পত্রের উত্তরেই আপনার অভিপ্রায় জানাইবেন। মূর্তিটি আদৌ স্ত্রী-মূর্তি নয়, সরস্বতী হওয়া ত দূরের কথা। ইহা জন্তল মূর্তি কি না মিলাইয়া দেখুন এবং পরীক্ষার ফল কি হইল লিখুন।

ক্রোড়পত্র

অভয় পাইয়াছি বলিয়া কতকগুলি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতেছি। আপনি অনেক দেখিয়াছেন, আপনি আমার কৌতূহল চরিতার্থ করিতে পারিবেন। যে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন, তাহাও লিখিয়া জানাইবেন–

১ কীর্তিমুখ কোন কোন প্রদেশের প্রস্তরমূর্তিতে দেখিয়াছেন? উহা কোন কোন প্রদেশের স্থাপত্যে দেখিয়াছেন?

২ যেগুলি দেখিয়াছেন, তাহা কোন শতাব্দীর নিদর্শন? ৩ সকল স্থানে সকল যুগে একরূপ দেখিয়াছেন, কি ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখিয়াছেন।

ভিন্ন ভিন্ন type দেখিয়া থাকিলে, কোন টাইপ আদি টাইপ ও ক্রমে তাহার কি কি বিবর্তন লক্ষ্য করিয়াছেন? উহা প্রথমে স্থাপত্যে কিম্বা ভাস্কর্যে [প্রতিমায়] ব্যবহৃত হইয়াছে, তদ্বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান করিয়াছেন কি না? করিয়া থাকিলে তাহার ফল কি? কীর্তিমুখের কথা কোন শিল্পশাস্ত্রে পাইয়াছেন; বচন উদ্ধৃত করুন। কীর্তিমুখ সম্বন্ধে অনেক জিজ্ঞাস্য আছে; উপরে একটু নমুনা দিলাম। আমার সিদ্ধান্ত বা অভিমত কি তাহা বলিব না, তাহাকে theory বলিয়াই বলিব। আমার theory এই যে, উহা প্রথমে স্থাপত্যের জন্য উদ্ভাবিত হইয়াছিল; খিলানের মধ্যশীর্ষকে শোভন করিবার জন্য উহা উত্তরকালে উদ্ভাবিত হইয়াছিল, ৮ম শতাব্দীর পূর্বে উহা উদ্ভাবিত হয় নাই, উদ্ভাবনার পর উহা ক্রমে নানারূপে বিবর্তিত হইয়াছে। যে দেশে গৌড়ীয় প্রভাব বর্তমান, কেবল সেখানেই উহার নিদর্শন পাওয়া যায়, অন্য প্রদেশে পাওয়া যায় না। আমি যাহা দেখিয়াছি, তাহার উপর এই theory দাঁড় করাইয়াছি। আমার পক্ষে দেখার সঙ্গে যদি আপনার দেখাও মিলিয়া যায়, তবে তাহা একটি fact-রূপে গণ্য করিতে পারা যাইবে। সেই fact ধরিয়া অন্যান্য কথার বিচার চলিতে পারিবে। ইহা fact কিনা আগে তাহা স্থির করিয়া দেন, পরে এই fact হইতে কি সিদ্ধান্ত হইবে তাহা আপনা হইতেই নির্ণীত হইতে পারিবে। ইহার জন্য স্কেচ চাই, ফটোতে ইহার অনুসন্ধান চলিতে পারে না। এই কারণে আপনার ন্যায় আমার পক্ষে স্কেচকে একেবারে অবজ্ঞা করিবার উপায় নাই। আমার অনুসন্ধান-প্রণালী ঐতিহাসিক; তাহার এই সামান্য নমুনা দিলাম। আমার উত্তরগুলিও লিখিতেছি।

১ কীর্তিমুখ গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের সকল স্থানে, [বরেন্দ্রে ও মগধে বেশি] দেখা গিয়াছে, দ্বীপপুঞ্জেও দেখা গিয়াছে।

২ খ্রিষ্টিয় অষ্টম হইতে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত দেখা গিয়াছে।

৩ ভিন্ন ভিন্ন type দেখা গিয়াছে, স্কেচ দ্বারা দেখান যাইতে পারে। কেবল মুখ, মুখবিবর হইতে দোদুল্যমান মালা ইত্যাদি বিভিন্ন type etc.etc. প্রথমে স্থাপত্যে, পরে প্রতিমায় চালির স্থাপত্যে উহা ব্যবহৃত হইয়াছে–উহা স্থাপত্যেরই অলঙ্কার। কোনও শিল্পশাস্ত্রে পরিচয় পাই নাই। উহা শিল্পীর প্রতিভা হইতে উদ্ভাবিত–সে উদ্ভাবনার আদিক্ষেত্র বরেন্দ্র, ধীমানের জন্মভূমি।

এই সকল উত্তর যদি যথার্থ হয়, তবে শিল্পশাস্ত্রে অনুক্ত স্থাপত্যের এই ‘টেকনিক’টি যেখানে যেখানে দেখা যায় সকল স্থানেই যদি একই যুগের নিদর্শন হয়, তবে সেই যুগে সেই সকল স্থানের মধ্যে শিল্প টেকনিকের সামঞ্জস্য কিরূপে আসিল? এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয় কি? আমার উত্তরগুলির কোথায় ভুল আছে, তাহা দেখাইয়া দিলেও উপকার হইবে। আমি একা মফঃস্বলে পড়িয়া অসহায় অবস্থায় অনুসন্ধান করিতেছি, এ সকল কথা স্মরণ করিয়া ইহার উত্তর দানে সাহায্য করিবেন। আমি a priori ভাবে চলিতেছি কিনা, ইহাতে তাহারও প্রমাণ পাইবেন।

আর একটি আর এক শ্রেণির প্রশ্ন করিব। J. R. A. S., New Series, Vol. VII. p. 191 “ওঙ গামুঙ গণপতয়ে নমঃ” ইহার “গ’মুঙটি কি? ২০৮ পৃষ্ঠার Resikesah রেসিকেশঃ যে হৃষিকেশঃ তাহা স্পষ্টই দেখা যাইতেছে। ভারতের কোন প্রদেশের কোন খ্রিস্টাব্দে হৃষিকেশের এরূপ বর্ণবিন্যাসের প্রমাণ পাইয়াছেন জানাইবেন। আরও একটা প্রশ্ন আছে। শিবশাসন তন্ত্রই বলীদ্বীপের প্রধান তন্ত্র– উহা ভারতবর্ষের কোন প্রদেশের কোন যুগের গ্রন্থ? এ সকল আলোচনা কোনও গ্রন্থে দেখিয়াছেন কি? দ্বীপপুঞ্জের উপনিবেশ কাহাদের উপনিবেশ এই সকল এবং এইরূপ অগণ্য প্রশ্নের মীমাংসার উপরই তাহা নির্ভর করিতেছে। ইহাকে priori ভাবের আলোচনা বলা যায় কি?

আমার অনুসন্ধান-পদ্ধতির একটু নমুনা দিতে গিয়া আপনাকে কত কথা লিখিতে হইল; পত্রে এ সকল আলোচনা চলে না। ভিন্সেন্ট স্মিথের ন্যায় যাঁহারা পুরুষ-মূর্তিকে স্ত্রী-মূর্তি বলিয়া ইতিহাস রচনা করেন, তাঁহাদের সভ্যসমাজে প্রতিষ্ঠা আছে বলিয়াই তাঁহাদের অভিমতকে আমরা বিনা-বিচারে গ্রহণ করি। তাঁহারা দ্বীপপুঞ্জকে [অগৌড়ীয়] ভারতবর্ষের পৃথক প্রদেশের উপনিবেশ বলায়, সেরূপ বলিবার প্রমাণ কি কি, তাহা a priori কিনা, তাহার অনুসন্ধান না করিয়া, আমরা তাহাকে ঐতিহাসিক সত্যরূপে ধরিয়া লইয়া আসিতেছি। দ্বীপপুঞ্জের উপনিবেশ যে ‘‘অগৌড়ীয়” তাহার প্রমাণ নাই। প্রমাণ যদি আপনার জানা থাকে, আমার ভ্রম সংশোধন করিয়া দিবেন। এ সকল বিষয়ে আমি অজ্ঞ, সর্বদা উপদেশের ও শিক্ষার প্রার্থনা রাখি। শিল্প-সাদৃশ্য সম্বন্ধে ভিন্সেন্ট স্মিথ একটি পাদটীকায় একটা কথা লিখিয়াছেন–পশ্চিমভারতের গুহার মূর্তির সঙ্গে যবদ্বীপের মূর্তির সাদৃশ্য আছে বলিয়া ফর্গসন একটা অভিমত প্রকাশিত করিয়া গিয়াছেন, তাহাই প্রচলিত মত হইয়া দাঁড়াইয়াছে। স্মিথ বলেন–The differences rather than the resemblances impress my mind. একথা কি সত্য? সত্য হইলে ফর্গসনের সিদ্ধান্ত উল্টাইয়া যায়; মিথ্যা হইলেও জিজ্ঞাস্য,–পশ্চিম-ভারতের যে সকল মূর্তির সঙ্গে মিল আছে, সে সকল কোন কোন যুগের কোন মূর্তি,–তাহা কোন শিল্পের নিদর্শন? এ সকল বিষয়ে এ পর্যন্ত যাহা লিখিত হইয়াছে তাহাতে a priori সিদ্ধান্তের আতিশয্য। আমি বরং প্রমাণের অনুসন্ধান করিতেছি–প্রচলিত মতে সংশয় প্রকাশ করিতেছি–সংশয়চ্ছেদের আশায় আপনাদের শরণাপন্ন হইতেছি। ইত্যলম

ঘোড়ামারা, রাজসাহী

২। ৬। ১২ ইং–
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

প্রীতিনমস্কার নিবেদন–

পত্র পাইয়া অনুগৃহীত হইলাম। অতি শীঘ্র এখানে আসিতেছেন জানিয়া নিরতিশয় আনন্দ লাভ করিলাম। সম্প্রতি এখানে আসিবার পথ একটু ক্লেশকর, আর তিন সপ্তাহমধ্যে স্টীমার হয়ত সহরের নীচে আসিবে এই সময়ে আসিলে কষ্ট হইবে না, এখন আসিতে হইলে বড় পথক্লেশ ঘটিবে। আমি আগামী কল্য হইতে দিন কয়েক বগুড়ায় থাকিব এবং ৮ জুন হইতে আবার এখানে থাকিব জ্ঞাতার্থে নিবেদন করিলাম।

আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর পত্রে লিখা অসম্ভব। কাজেই উত্তর দিয়া সন্তুষ্ট করিতে পারিব না। সাগরিকায় ক্রমশঃ সকল কথাই লিখিতেছি। ভারত দ্বীপপুঞ্জের উপনিবেশ ভারতবর্ষের কোন প্রদেশের উপনিবেশ তাহার অনুসন্ধানকার্যে ব্যাপৃত হইয়া যে সকল প্রমাণ পাইয়াছি তাহা লিখিতেছি। তদ্বারা প্রদেশ স্থির হইবার পর শিল্পেও তাহার কি কি পরিচয় পাওয়া যায়, তাহা লিখিব। আর আর সিদ্ধান্ত অপনাকে পূর্বেই জানাইয়াছি। বরেন্দ্রে যাহার উদ্ভব, মগধে উৎকলে তাহারই বিকাশ–এ পর্যন্ত স্মিথও একথা স্বীকার করিয়াছেন। তাহারই পরিণতি যবদ্বীপে ইহাই আমার বক্তব্য। এ পর্যন্ত যে সকল ছবি বাহির হইয়াছে, দেখিয়াছি। তাহাতে কি কি পাওয়া যায়, তাহা একে একে দেখাইবার চেষ্টা করিব।

আপনি বরেন্দ্র-অনুসন্ধান সমিতিকে একটু অনুযোগ দিয়াছেন। সমিতি অনেকের, আমার একার নয়। যাহা বহু ক্লেশে সংগৃহীত হইতেছে, তাহার প্রথম বিবরণ সমিতি লিখিবেন, এরূপ নিয়ম নূতন নিয়ম নয়। সৰ্ব্বদাই এইরূপ। সমিতি যাহা লিখিবেন আপনারা তাহারই সমালোচনা করিতে পারিবেন। আর যদি এখনি তৎসম্বন্ধে লিখিতে চান, সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়া লিখুন। ইহা আমার বিবেচনায় আসার প্রস্তাব বলিয়া বোধ হয় না। যাহা হউক, আপনার ন্যায় মনীষিগণের তিরস্কারও আমাদের পক্ষে পুষ্পাঞ্জলি। আমাদের চেষ্টা শিল্প-সৌন্দর্য সমালোচনার চেষ্টা নয়, ইতিহাসের উপাদান সঙ্কলনের চেষ্টা। মূর্তিগুলি যে ভাবসম্পদের বাহ্যস্ফুর্তি, সেই ভাবসম্পদ কোন সময়ে কিরূপে বিকাশ লাভ করিয়াছিল, তাহার অনুসন্ধান চেষ্টাই আমাদিগের প্রধান চেষ্টা।

Iconography সম্বন্ধে ষোড়শ শতাব্দীর গোপাল ভট্টের হরিভক্তিবিলাস নিবন্ধই শেষ নিবন্ধ–সনাতন গোস্বামী উহার টীকা লিখিয়াছিলেন। ইহা ভিন্ন টীকাসংযুক্ত আর কোনও নিবন্ধ দেখি নাই। আমি এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য পূর্বেই লিখিয়াছি ছাপার পুথিতে অনেক ভুলভ্রান্তি আছে। সনাতনের টীকাটি বড় সারগর্ভ–অধ্যয়নে আনন্দ লাভ করা যায়।

আপনার প্রেরিত ফটো অদ্যও পাইলাম না। বগুড়া যাইতে ব্যস্ত আছি বলিয়া দীর্ঘপত্র লিখিতে পারিলাম না, ক্ষমা করিবেন।

বরেন্দ্রের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলি বৃহৎ বলিয়া নানাস্থানে পড়িয়া আছে, সংগ্রহ করা হয় নাই–যথাস্থানে গিয়া দেখিতে হয়। যাহা এখানে আনা হইয়াছে তাহা অল্প, তাহাতে কেবল type সংগ্রহের চেষ্টাই অধিক। তন্মধ্যে সকল type-এরই কিছু কিছু নমুনা আছে। অলমতি বিস্তরেণ।

ভবদীয়
শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ঘোড়ামারা, রাজসাহী
১ লা কার্তিক

প্রীতিনমস্কার নিবেদনমিদং

আপনার অনুগ্রহ লিপি পাইয়া আনন্দ লাভ করিলাম। আমার কাজের সুবিধা করিয়া দিবার জন্য আপনি গ্রন্থাদি দিলে ও প্রয়োজনমত গ্রন্থাদি হইতে কিছু কিছু সংকলন করিয়া দিলে আমার প্রচুর উপকার হইবে। আপনার নিমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। অল্পকাল কলিকাতায় থাকা হইবে। তার মধ্যে নানাস্থানে দেখাশুনা করিব; সুতরাং নিমন্ত্রণ গ্রহণ না করার জন্য অপরাধ লইবেন না। আমি অবশ্যই দেখা করিব এবং আপনার নিকট পুস্তকাদি ও প্রয়োজনীয় উপদেশ সাদরে গ্রহণ করিব। আমি কোনও ব্যক্তিগত কাজ করিতেছি না, ইহা সকলেরই কাজ। কিন্তু এ কার্যের মর্যাদা বুঝিয়া সাহায্য ও উপদেশ দিবার মত লোক অল্প। এরূপ অবস্থায় আপনার মত অভিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট অবশ্যই উপনীত হইব।

আগামী কল্য পূজার নিমন্ত্রণ রক্ষাৰ্থ নাটোর, দীঘাপতিয়া প্রভৃতি স্থানে যাইতেছি; সেখান হইতে বিজয়ার পরই কলিকাতায় পৌঁছিব ও দেখা করিব। একখানা পুস্তিকা পাঠাইয়াছি, বোধ হয় পাইয়াছেন। আমাকে যাহা যাহা দিবেন কলিকাতায় গিয়াই লইব। ডাকে পাঠাইবেন না। অলমতি বিস্তরেণ।

ভবদীয়
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

ঘোড়ামারা, রাজসাহী
১৭। ১১। ১৭ ইং

সবিনয় নিবেদন

অনেক দিনের পর আপনার পত্র পাইয়া আনন্দলাভ করিলাম। আমাদের সংগৃহীত দ্রব্যাদির সংখ্যা ক্রমে বাড়িয়া যাইতেছে বলিয়া একটি স্বতন্ত্র মিউজিয়ম বাটী প্রস্তুত করা হইতেছে। এই কার্য শেষ না হইলে আমরা অন্য ব্যয়সাধ্য কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে পারিতেছি না, গ্রন্থাদি প্রকাশের ইহাই একটি প্রধান বাধা। আমাদের সংগ্রহকার্যের সঙ্গে অনুসন্ধানকার্য সংযুক্ত থাকায় সংগ্রহ কার্য সর্বদাই চলিতেছে তজ্জন্য পূর্বাপেক্ষা অনেক নূতন মূর্তিও সংগৃহীত হইতেছে। সার জন উড্রফ মহোদয় আপনার গ্রন্থখানা দেখিতে দিয়াছিলেন, তাহার পর গভর্ণমেন্ট হইতে আমরা উহার একখণ্ড প্রাপ্ত হইয়াছি। আমার শরীর এবার বড় ভাল নাই। আশা করি আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল। নিবেদনমিতি।

ভবদীয়
শ্ৰীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

প্রবাসী, আষাঢ়, ১৩৩৭

মন্তব্য করুন