বস্ত্রশিল্প

বস্ত্রশিল্প

পট্টবস্ত্র

রেশমতত্ত্বঞ্জ ফরাসি পণ্ডিত মসিয় রভোনানাদিদেশের রেশমশিল্পের যে সকল গুহ্যতত্ত্ব প্রকাশিত করিয়াছেন, তৎপ্রতি বাঙ্গালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্য, কৃষিতত্ত্ববিৎ সুপণ্ডিত নিত্যগোপাল মুখোপাধ্যায় মহাশয় যত্নের ত্রুটি করেন নাই; কিন্তু তাহার চেষ্টা সফল হইয়াছে কি না সে বিষয়ে সমূহ সন্দেহ!

বাঙ্গালী শিল্প বাণিজ্যের জন্যই পুরাকালে সমধিক খ্যাতি লাভ করিয়াছিল। সে খ্যাতি এখন ক্রমেই জনশ্রুতিমাত্ৰে পৰ্য্যবসিত হইতেছে;–যাহাদের শিল্পদ্রব্যের সন্ধান লাভ করিয়া ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায় দলে দলে এদেশে উপনীত হইত, তাহারাই এখন অন্নাভাবে হায় হায় করিয়া চাকরীর আশায় দেশে দেশে ছুটিয়া বেড়াইতেছে!

কেন এমন হইল, তাহার কথা কয়জন বাঙ্গালী চিন্তা করিয়া থাকেন? আমাদের আন্দোলনস্পৃহা বিবর্ধিত হইয়াছে বলিয়া চারিদিকেই জনরব শুনিতে পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের শিল্পবাণিজ্যের অধোগতি হইল কেন,–তাহার জন্য ত দেশব্যাপী আন্দোলন দেখিতে পাই না?

এক সময়ে রেশমের জন্য বাঙ্গালীর নাম দেশ বিদেশে বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিল; সে শিল্পও এখন যায় যায় হইয়া উঠিয়াছে! কেন এমন হইল, তাহারই যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা করিব।

পৃথিবীর সকল দেশেই কিছু না কিছু রেশম উৎপন্ন হইয়া থাকে, এবং সভ্যজনপদের অধিবাসিমাত্রেই কোনো না কোনো আকারে রেশম-শিল্পজাত দ্রব্যাদি ব্যবহার করিয়া থাকেন। সুতরাং একদিকে রেশমের আদর যেমন পৃথিবীব্যাপী, অন্যদিকে রেশম-ব্যবসায়ে প্রতিদ্বন্দ্বীও প্রায় দেশে দেশেই শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছে। ইউরোপখণ্ডের রেশম ব্যবসায়ীগণ বৈজ্ঞানিক শক্তিবলে বলীয়ান হইয়া আমাদের রেশম-ব্যবসায়ের ক্ষতি করিতে সক্ষম হইয়াছেন, কিন্তু নূতন শিক্ষা বলিয়া তাঁহারা এখনও আমাদিগকে সম্পূর্ণ পরাজিত করিতে পারেন নাই। আমরা যদি এখন হইতে বৈজ্ঞানিক প্রণালীর অনুসরণ করিতে শিখি, কালে হয়ত আবার আমাদের রেশমশিল্প সর্বোচ্চস্থান অধিকার করিতে পারিবে।

এসিয়া ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে কেবল একটি মাত্র দেশে রেশম উৎপন্ন হয় না; তাহার নাম–ইউরোপীয় রুশিয়া কিন্তু সে দেশেও রেশমের ব্যবহার প্রচলিত আছে। উৎপন্ন দ্রব্যের হিসাবে চীন সৰ্ব্বপ্রধান, তাহার পর ইতালি; তাহার পর জাপান, তাহার পর মধ্য এসিয়া, তাহার পর মালয়, তাহার পর এসিয়াটিক তুরস্ক, তাহার পর ফ্রান্স, তাহার পর ভারতবর্ষ এবং তাহার পর অন্যান্য দেশ। বিংশতি বিভিন্ন দেশে রেশম উৎপন্ন হইয়া থাকে, তন্মধ্যে সাতটি দেশ ভারতবর্ষকে পশ্চাতে ফেলিয়াছে, দ্বাদশটি দেশ এখনও ভারতবর্ষের সমকক্ষ হইতে পারে নাই। এই দ্বাদশ দেশে ও রুযিয়ায় রেশম বিক্রয় করিয়া আমাদের অন্নসংস্থান হইতে পারে, তাহাতে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সংখ্যা অধিক নাই।

চীন দেশে বিদেশজাত রেশমের আমদানী হয় না; তদভিন্ন পৃথিবীর সকল দেশেই বিদেশের রেশমের আমদানী হইয়া থাকে। আমদানীর হিসাবে ফ্রান্স সৰ্বশ্রেষ্ঠ। তাহার পর ইংলণ্ড, তাহার পর সুইটজলন্ড, তাহার পর জৰ্ম্মনী, তাহার পর আমেরিকার যুক্তরাজ্য ও কানে, তাহার পর ইতালি, তাহার পর ভারতবর্ষ, তাহার পর অষ্ট্রিয়া ও অন্যান্য দেশ। এই সকল দেশের মধ্যে ইতালি এবং ফ্রান্সে ভারতবর্ষ অপেক্ষা অধিক রেশম উৎপন্ন হইলেও ভারতবর্ষ অপেক্ষা অধিক বিদেশের রেশমের আমদানী হইয়া থাকে। ইহাতে বোধ হইতে পারে যে, এই সকল দেশে রেশমের ব্যবহার বোধ হয় বেশী। বাস্তবিক তাহা নয়। এই সকল দেশ স্বদেশে রেশম উৎপন্ন করিয়া এবং বিদেশের রেশম আমদানি করিয়া তাহা হইতে বিবিধ শিল্পদ্রব্য প্রস্তুত করিয়া বিদেশে বিক্রয় করিয়া অর্থোপার্জন করে।

রপ্তানীর হিসাবে চিন সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়াছে। ভারতবর্ষে যথেষ্ট রেশম উৎপন্ন হয়, অথচ সেই ভারতবর্ষেই চিনাসাটী বোম্বাই ও পারসী শাড়ী নাম ধরিয়া ঘরে ঘরে বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহার অপেক্ষা বহুগুণে শ্রেষ্ঠ দেশীয় রেশমের শাড়ীগুলির আদর হইতেছে না! মহিলামণ্ডলীর নিকট হতাদর হইয়া দেশের রেশম অল্পমূল্যে বিদেশে চলিয়া গিয়া বিদেশীয় লোকের ধনবৃদ্ধির সহায়তা করিতেছে, আমাদের নিকট হইতে বোম্বাই ও পারসী শাড়ী বেচিয়া চিন দেশের কারিগরেরা বেশ দুপয়সা রোজগার করিয়া আমাদিগকে ঠকাইয়া খাইতেছে। ইহাতে ম্যাঞ্চেষ্টারের সংস্রব নাই; শুল্কের উপদ্রব নাই; ইংরাজকে গালিগালাজ দিয়া। কৰ্তব্য শেষ করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিবার উপায় নাই। আমাদের মহিলামণ্ডলী দেশের রেশম ফেলিয়া বিদেশের রেশমকে সমাদর প্রদর্শন করিতেছেন কেন? তাঁহারা জিজ্ঞাসা না করিতেই বলিয়া উঠিবেন–বম্বাই সাটী, পারসী সাটী কেমন সুন্দর! সুন্দর হউক, টেকসহী নয়। না হউক–সুন্দর ত বটেই! আমরা তর্কযুদ্ধে পরাস্ত হইতে বাধ্য। কিন্তু আমরা কি দেশের রেশম দিয়া বোম্বাই বা পারসী সাটী প্রস্তুত করিতে পারি না? সে কথা কয় জন লোকে ভাবিয়াছে?

যত জনের সঙ্গে আলাপ করিয়া দেখিয়াছি, সকলেরই এইরূপ ধারণা যে আমাদের কার্পাসবস্ত্রের ন্যায় পট্টবস্ত্রেরও হীনাবস্থা ও তাহাকে আর উন্নত করিবার উপায় নাই। ইহারা সকলেই খুব বিজ্ঞজনোচিত গাম্ভীৰ্য প্রকাশ করিয়া ধীরে ধীরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানিয়া এই জ্ঞানগর্ভ কথাগুলি উচ্চারণ করিয়া থাকেন; কিন্তু তাঁহাদের এরূপ ধারণা কেন হইল তাহার কারণ কেহই বুঝাইয়া দিতে পারেন না। এরূপ ধারণা যে নিতান্ত অমূলক তাহাই নহে, ইহা আমাদের রেশমশিল্পের উন্নতির পথে কন্টকস্বরূপ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

রেশম শিল্পে ইংলণ্ডের প্রতিযোগীতা নাই; বরং ভারতবর্ষের রেশম পৃথিবীর মধ্যে সৰ্ব্বোৎকৃষ্ট হইলেই ইংলণ্ডের লাভ। ভারতবর্ষ ভিন্ন ইংরাজাধিকৃত রাজ্যের অন্য কোনো স্থানে রেশম জন্মাইবার সুবিধা নাই। এত বড় রেশমের জন্মভূমি করতলগত থাকিতেও যে ফ্রান্স ইতালি চিন জাপান ইংলণ্ডকে পশ্চাতে ফেলিয়া চলিয়াছে ইহা শিল্প-বিশারদ ইংরাজবণিকের গৌরবের কথা নহে। তাই ইংরাজরাজ এদেশের রেশমশিল্পের উন্নতিসাধনের সর্বপ্রধান উৎসাহদাতা ও সহায় হইয়া উঠিয়াছেন এবং বেঙ্গল গভর্ণমেন্ট তজ্জন্য বর্ষে বর্ষে বহু অর্থব্যয় করিতেছেন।

আমাদের রেশমতত্ত্ব আলোচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় আমরা কয়েকটি কারণে বিদেশের লোকের নিকট অপদস্থ হইতেছি। প্রথম, বৈজ্ঞানিক উপায়ে রেশমকীট পালন করিতে জানি না বলিয়া সময়ে সময়ে বিস্তর কীট নষ্ট হইয়া যায়, আশানুরূপ রেশম উৎপন্ন হয় না! দ্বিতীয় কারণ সূত্ররঞ্জন কাৰ্য বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পাদন করিতে জানিনা বলিয়া বিদেশের শিল্পকারিগরদিগের মত নয়নমনোহর চাকচিক্যময় পট্টবস্ত্র বয়ন করিতে পারি না। তৃতীয় কারণ–এদেশে এখনও যেখানে যাহা কিছু উৎপন্ন হয় বিজ্ঞাপন দিবার প্রথা শিল্পকারদিগের নিকট নিতান্ত অজ্ঞাত বলিয়া শিল্পজাত দ্রবের তেমন আদর হয় না।

এই সকল অসুবিধা দূর করিবার জন্য গভর্ণমেন্ট স্থানে স্থানে কোষকৃমিপালনের বৈজ্ঞানিক কৌশল শিখাইবার আয়োজন করিয়াছেন। মুরশিদাবাদ, মালদহ ও রাজসাহী প্রদেশে বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে যে সকল কৃষক বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে রেশম কীট পালনের কৌশল শিক্ষা করিয়াছে তাহারা উন্নতি লাভ করিতেছে। কিন্তু তাহারা কেবল কৃমিকোষ উৎপন্ন করিয়াই নিরস্ত হইতেছে–রেশম সূত্রগুলি বিদেশে চলিয়া গিয়া তথা বস্ত্রাদি রূপে রূপান্তরিত হইয়া আবার এদেশে ফিরিয়া আসিতেছে! ইহাদিগকে কৃমি পালন, সূত্রোপাদন, রঞ্জন ও বস্ত্রবয়ন প্রভৃতি রেশম শিল্প সংক্রান্ত সমস্ত শিক্ষা বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিতরণ করিতে পারিলে এদেশের রেশম ব্যবসায়ের এখনও আশা আছে। এই সকল উদ্দেশ্যে শতবর্ষে রাজসাহীতে একটি রেশম তন্তু শিক্ষার কৃষিশিল্পের উৎকৃষ্ট বিদ্যালয় সংস্থাপিত হইয়াছে, দেশের প্রধান প্রধান জমিদারবর্গ মুক্তহস্তে অর্থদান করিয়া এবং গভর্ণমেন্ট যথোপযুক্ত উৎসাহবৰ্দ্ধন করিয়া নবজাত শিল্পবিদ্যালয়ে এদেশের একটী প্রধান অভাব দূরীকরণের সহায়তা করিয়াছেন। কিন্তু এ সকল বিষয়ে আমাদের শিক্ষিত সমাজেও এতদূর অজ্ঞতা বর্তমান যে, সংবাদপত্রে ইহার বিজ্ঞাপন দেখিয়া কত ভাল ভাল লোকে লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন–”তোমরা অসাধ্যসাধনের জন্য অর্থের অপচয় করিতেছ কেন? ঐ টাকা অধ্যাপক জগদীশ বসুকে দিয়া তাহার বৈজ্ঞানিক তত্ত্বানুসন্ধানের সহায়তা সাধনার্থ একটি পাঠাগার নির্মাণ করিয়া দেও!”

শিল্পোন্নতির জন্য এই তিনটি বিষয়ের বর্তমানতা আবশ্যক; যথা–(১) শিল্পোৎপাদন (২) শিল্পনিপুণতা (৩) শিল্পজাত দ্রব্যের ব্যবহার। যে সকল দেশে আজকাল রেশম শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হইয়াছে, সে সকল দেশের মধ্যে অনেক দেশেই এই তিনটি সুবিধা নাই। কোন দেশে হয়ত শিল্পনিপুণ শ্রমজীবি আছে, কিন্তু উপাদানের অত্যন্ত অভাব। কোন দেশে বা শিল্পজাত দ্রব্যের ব্যবহার থাকায় উৎপন্ন দ্রব্য অন্যদেশে বহন করিয়া বেড়াইতে হইতেছে। আমাদের দেশে একাধারে তিনটি সুবিধাই বর্তমান। সুতরাং রেশম ব্যবসায়ে ভারতবর্ষের ন্যায় উন্নতি লাভ করিতে অল্প দেশই সক্ষম। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সংখ্যা অল্প, শিল্পজাত দ্রব্য স্বদেশে ও বিদেশে বিক্রয় করিবার অসুবিধা নাই; কেবল উৎকৃষ্ট প্রণালীতে রেশম ও রেশমজাত শিল্পদ্রব্য প্রস্তুত করিতে পারিলেই হইল।

আমাদের দেশে রেশমের “পট্টবস্ত্র” প্রস্তুত করাই রীতি ছিল; এখন ‘ফ্যাসান” বদলাইয়া গিয়া তাহার আদর বড়ই কম হইয়া পড়িয়াছে। এখন কোট প্রস্তুতের উপযোগী মোটা কাপড় ও রুমাল শাড়ী ওড়না প্রভৃতির উপযোগী নূতন ধরণের সরু কাপড় প্রস্তুত করিতে পারিলে তাহার যথেষ্ট আদর হইতে পারে। দৃষ্টান্তস্থলে একটিমাত্র ঘটনার উল্লেখ করিয়া প্রবন্ধের উপসংহার করিব। গতবর্ষে দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে মুরশিদাবাদ অঞ্চলে কোটের উপযোগী মোটা রেশমী কাপড় প্রস্তুত হইয়াছিল, উহা কলিকাতার হোয়াইটওয়ে লেডলা কোম্পানী ও অস্ট্রেলিয়ার লোকেই অধিক ক্রয় করেন এবং এরূপ কাপড় প্রস্তুত করিতে পারিলে একমাত্র অস্ট্রেলিয়া দেশেই যে বিস্তৃত বাণিজ্য প্রচলিত হইতে পারে তাহারও পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু মূলধনের অভাবে, উৎসাহের অভাবে, শিক্ষার দোষে বাঙ্গালীরা এ বিষয়ে উদাসীন হইয়া পড়িয়াছে। যাহারা পুরুষানুক্রমে রেশম উৎপাদন ও বস্ত্রবয়ন করিত, তাহাদের সন্তানগণ এখন বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করিয়া চাকরীর উমেদারীতে নিযুক্ত হইয়াছে।

ভারতী, আষাঢ়, ১৩০৫

বস্ত্ররঞ্জন-বিদ্যা

এক সময়ে এ দেশের লোকে বস্ত্ররঞ্জন পারদর্শী বলিয়া সবিশেষ খ্যাতি লাভ করিয়াছিল। সে দিন চলিয়া গিয়াছে। ১৮৯১ খৃষ্টাব্দের জনসংখ্যা নির্ণয় করিবার সময়ে দেখা গিয়াছে যে, এখন এদেশে ২০৭৮৬ জন মাত্র নরনারী বস্ত্ররঞ্জন কাৰ্য্যে জীবিকা আহরণ করিতেছে! সে জীবিকাও মুষ্টিভিক্ষার অধিক নহে;–একজন বস্ত্ররঞ্জকের মাসিক আয় গড়পড়তায় দশ বারো টাকার অধিক হয় না!

সেকালে বঙ্গ বিহার উড়িষ্যার সর্বত্রই বস্ত্ররঞ্জকের ব্যবসায় চলিত, এখন বিহার ভিন্ন অন্যান্য স্থান হইতে তাহাদের অন্ন উঠিয়া গিয়াছে। কি হিন্দু কি মুসলমান সকলেই বস্ত্ররঞ্জকের ব্যবসায় করিয়া অর্থোপার্জন করিত; আধুনিক বস্ত্ররঞ্জকদিগের মধ্যে বস্ত্ররঞ্জন বিদ্যা সেকালের মতো সমাদর লাভ করিতেছে না।

আমাদের বস্ত্ররঞ্জন বিদ্যার এমন অবনতি হইল কেন? যে দেশে রঞ্জন দ্রব্যের কিছুমাত্র অসদ্ভাব নাই, সে দেশে রঞ্জনবিদ্যার অবনতি হওয়া কি বিস্ময়ের বিষয় নহে?

একটু অনুধাবন করিয়া দেখিলে ইহার কারণ নির্ণয় করিতে বিলম্ব হইবে না। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মানুসারেই যে আমাদের বস্ত্ররঞ্জন বিদ্যার ক্রমশ অবনতি হইতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই। তজ্জন্য অন্য লোকের অপরাধ কি? যাহা কিছু অপরাধ সমস্তই আমাদের নিজের। বিলাতে সুশিক্ষিত পণ্ডিতগণ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় রঞ্জন কার্যে নিযুক্ত হইয়া নিত্য নূতন রঞ্জন প্রণালীর আবিষ্কার করিতেছেন। আর আমাদের দেশে কেবল কতকগুলো নিরক্ষর বস্ত্ররঞ্জক তাহাদের পিতৃপিতামহগত পুরাতন রঙ্গের পুঁটুলি সযত্নে বাঁধিয়া বসিয়া রহিয়াছে! এরূপ ক্ষেত্রে বিলাতের সহিত প্রতিযোগিতায় আমাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। আমাদের কৃতিবিদ্য যুবকগণ কুড়ি টাকার স্কুল মাষ্টারীর জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলিতে লালায়িত; শতকরা একজন মাত্রও শিল্পানুশীলনে জীবিকা আহরণ করিতে সম্মত নহে!

আধুনিক রাসায়নিক প্রণালীর বস্ত্ররঞ্জন কৌশল আবিষ্কৃত হইবার পরে এখন আর আমাদের পুরাতন পদ্ধতির অনুসরণ করিবার আবশ্যক কি–হয়ত প্রবন্ধারম্ভে অনেকেই এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিবেন। তাঁহাদের কৌতূহল নিবারণ করিতে হইলে সব্বাগ্রে পুরাতনের সহিত নূতনের তুলনায় সমালোচনা করা আবশ্যক। আধুনিক রাসায়নিক প্রণালী সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া সর্বত্র সমাদৃত হইলে আমাদের পুরাতন পদ্ধতি একেবারেই পরিত্যক্ত হইত এবং তজ্জন্য কেহই হায় হায় করিত না। কিন্তু বিলাতি রং অত্যুজ্জল ও হৃদয়মনোমোহন হইলেই বহুদোষদুষ্ট। তাহা স্থায়ী বলিয়া খ্যাতিলাভ করিতে পারে নাই; তদ্বারা ঔজ্জ্বল্যের বৃদ্ধি হইলেও বস্ত্রাদি অল্প সময়ের মধ্যই জরাজীর্ণ হইয়া পড়িতেছে। এই দোষে আধুনিক ইউরোপীয় বস্ত্ররঞ্জন কৌশল আমাদের নিকট বাহাদুরী লইতে পারিতেছে না। আমাদের প্রণালী নিতান্ত হাতগড়া রকমের। কিন্তু তাহার প্রধান গুণ এই যে তদ্বারা বস্ত্ররঞ্জন করিলে বস্ত্রাদি জীর্ণ হয় না। এই গুণের পরিচয় পাইয়া বিলাতি কারিগরগণ আমাদের রঞ্জন কৌশলের গূঢ়তথ্য সংগ্রহ করিবার চেষ্টা করিতেছেন। গবর্ণমেন্টও এ বিষয়ে নিতান্ত উদাসীন নহে। আমাদের এ বিষয়ে যাহা কিছু প্রাধান্য ছিল তাহার গুমর ছুটিয়া গিয়াছে। গবর্ণমেন্টের চেষ্টায় আমাদের রঞ্জন কৌশলের সমস্ত গুপ্ত রহস্য ছাপার কাগজে উঠিয়া ইংরাজের করতলগত হইয়াছে।

সেকালে কেবল চাকচিক্যময় অত্যুজ্জ্বল মৌলিক রংগুলির সমধিক সমাদর ছিল। ধপধপে সাদা, টকটকে লাল, মিশমিশে কালো বড়ই আদরের বস্তু বলিয়া পরিচিত ছিল। এখন সভ্যসমাজে বর্ণগত রুচির অনেক পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। এখন নানারূপ ফিকে রঙ্গেরই বাহার বাহির হইয়াছে। বিলাতি রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সহস্র সহস্র ফিকে রং ফলিতেছে বলিয়া আমাদের পুরাতন পদ্ধতির আদর চলিয়া গিয়াছে। অল্পব্যয়ে অল্পসময়ে অল্প পরিশ্রমে বিলাতি রং জলে গুলিয়া কাপড় ডুবাইয়া লইলেই রঞ্জন কাৰ্য্য সুসম্পন্ন হইতে পারে বলিয়া বিলাতী প্রথার অনুকরণ না করিলেও যে বিলাতী ফিকে রং ফলাইতে পারা যায় তাহা নিরক্ষর রঞ্জকগণ ধীরভাবে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে চাহে না।

বিলাতী রঞ্জনদ্রব্যের অধিকাংশই সুতীব্র রাসায়নিক পদার্থ, তাহাতে কার্পাস বা পট্টবস্ত্রের সূক্ষ্ম সূত্রনিচয় জরাজীর্ণ হইবে না কেন? আমাদের রঞ্জনদ্রব্যের মধ্যে ফুল ফল বৃক্ষত্বক ও বৃক্ষ নির্যাসই প্রধান, তাহাতে রাসায়নিক তীব্রতা নাই। আর একটি কথা,–আধুনিক সুতীব্র রাসায়নিক রঞ্জনদ্রব্যে কেবল যে বস্ত্রাদি জীর্ণ হইয়া যায় তাহাই নহে; তাহাতে রেশমাদি উজ্জ্বল বস্তুর স্বাভাবিক উজ্জ্বল্য নষ্ট হয় বলিয়া আবার কৃত্রিম উপায়ে উজ্জ্বল করিয়া লইতে হয়। আমাদের রঞ্জনদ্রব্যের এরূপ কোন দোষ দেখিতে পাওয়া যায় না।

আমাদের দেশে রঞ্জনদ্রব্যের অভাব নাই; রাসায়নিক উপায়ে নবাবিষ্কারের জন্য পরীক্ষাক্ষেত্রে দণ্ডায়মান হইলে অনেক নূতন নূতন রঞ্জনদ্রব্যেরও পরিচয় পাওয়া যাইতে পারে। নবাবিষ্কারের কথা আপাততঃ বন্ধ রাখিয়া প্রচলিত রঞ্জনদ্রব্যের কথারই আলোচনা করা যাক।

প্রচলিত রঞ্জনদ্রব্যের মধ্যে : নীল, হরিদ্রা, লাক্ষা, কুসুম, পলাশ, সেফালিকা, কমলাগুড়ি, লটকট, বকম, হরিতকি, বহড়া, আমলকি, দারুহরিদ্রা ইত্যাদি প্রধান। এই সকল রঞ্জনদ্রব্যের মধ্যে কেবল হরিদ্রা ও নীল উৎপাদনের জন্যই রীতিমত চাষ হইয়া থাকে; অন্যান্য দ্রব্য স্বচ্ছন্দবনজাত বৃক্ষাদি হইতে সংগৃহীত হয়। চাষ করিলে তাহারও অনেক উন্নতি সাধিত হইতে পারে এবং রঞ্জনদ্রব্য ভিন্ন তাহা হইতে আরও অনেক মূল্যবান বস্তু প্রাপ্ত হওয়া যায়।

নীল : নীলের চাষের কথা লিখিবার প্রয়োজন নাই। নীলের রং কাঁচা, ধৌত করিলেই উঠিয়া যায়। উহাকে পাকা করিবার জন্য আমাদের বস্ত্ররঞ্জকগণ নীলের সহিত আরও দুই একটি দ্রব্য মিশাইয়া লয়। নীলের আবাদে বিলক্ষণ লাভ হইয়া থাকে এবং নীলের প্রধান ব্যবহারই রঞ্জন কাৰ্য্য।

হরিদ্রা : হরিদ্রার চাষের কথাও লিখা অনাবশ্যক। হরিদ্রার রং কাঁচা হইলেও অনেক পাকা রং ফলাইতে হরিদ্রা মিশাইয়া লইতে হয়। রঞ্জনকার্যে হরিদ্রার ব্যবহার নিতান্ত অল্প নহে।

লাক্ষা : লাক্ষা একশ্রেণির কীটের পরিত্যক্ত বাসা। এই কীট (coccus Lacca) অশ্বত্থ, বদরিকা, পলাশ ও কুসুম বৃক্ষে বাসা বাঁধিয়া বাস করে, যখন চলিয়া যায় বাসাগুলি ভাঙ্গিয়া লইলেই লাক্ষা প্রাপ্ত হওয়া যায়। পলাশ ও কুসুম বৃক্ষোৎপন্ন লাক্ষাই সর্বোৎকৃষ্ট, সেকালে ইহার চাষ হইত, এখনও কোন কোন স্থানে অল্পমাত্রায় চাষ হইয়া থাকে। রাঢ় দেশেই লাক্ষার প্রিয়তম জন্মস্থান। গাছ হইতে লাক্ষা কুড়াইয়া লইতে অধিক খরচ হয় না, চাষ করিলেও অল্পব্যয়েই লাক্ষা সংগ্রহ করিতে পারা যায়। বৃক্ষোৎপন্ন লাক্ষা গুঁড়া-করিয়া জল ঢালিয়া তাহার রং বাহির করার প্রণালী খুব সহজ। রং বাহির করিয়া লইলে যে শিটি বা ছিবড়ে পরিত্যক্ত হয়, তাহা হইতে গালা প্রস্তুত হয়। লাক্ষার রং ঘন করিয়া রঞ্জনকার্যের জন্য বিক্রিত হয় এবং তরল রঙ্গে তুলা ভিজাইয়া লইয়া ‘আলতা’ প্রস্তুত করা হইয়া থাকে। লাক্ষার বৃক্ষে কাষ্ঠাদি, লাক্ষা হইতে গালা, আলতা এবং লাক্ষা রং এই কয়েকটি পদার্থ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইহার সকলগুলিই মূল্যবান। সুতরাং লাক্ষার চাষ করিলে ক্ষতি হইবার কথা নাই। সুশিক্ষিত মহিলা মণ্ডলী অলক্তকের সমাদর রক্ষাৰ্থ জুতা মোজা পরিত্যাগ করিতে সম্মত না হইলেও ক্ষতি নাই; একমাত্র গালা হইতে চুড়ি বলয়, খেলনা ইত্যাদি প্রস্তুত করিয়া অর্থোপার্জন করার অসুবিধা নাই।

কুসুম : লাক্ষার ন্যয় কুসুমের চাষেও বিলক্ষণ আয় হইবার কথা। আজকাল কুসুমের চাষ একেবারে পরিত্যক্ত হয় নাই; কিন্তু উহার উন্নতি সাধন করিলে ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা নাই। কুসুমের শাক মুখপ্রিয় ভোজ্যদ্রব্য, কুসুমের ফুল বহুমূল্য রঞ্জনদ্রব্য, কুসুমের ফল হইতে অলিভ তৈলের ন্যায় স্বচ্ছ নির্মল সুস্নিগ্ধ তৈল প্রস্তুত হয়, নূতন ফল বাঁটিয়া অতি সুস্বাদু পায়সান্ন প্রস্তুত হইয়া থাকে, এবং কুসুমের শুষ্ক কাষ্ঠ হইতে উৎকৃষ্ট ক্ষার জন্মিতে পারে। ইহার সকল গুণই পরীক্ষা করিয়া দেখা।

পলাশ : পলাশের চাষ হয় না। পলাশের ফুল হইতে কাঁচা রং প্রাপ্ত হওয়া যায়, কিন্তু অনেক পাকা রং ফলাইতে পলাস মিশাল দিতে হয় বলিয়া বস্ত্ররঞ্জনকার্যে পলাশের আদর নিতান্ত অল্প নহে।

সেফালিকা : “সকল বন আকুল করে শুভ্র সেফালিকা” এই কবিকাহিনী নিরর্থক নহে। কিন্তু সেফালিকার ফুল অপেক্ষা বৃন্তের গুণ অধিক। ফুল শুভ্র সুন্দর, বৃন্ত রক্তাভ। উহা হইতে বাসন্তী-রং প্রস্তুত হইয়া থাকে।

কমলাগুড়ি : ইহা এক প্রকার বনজাত ফলের বাহিরাবরণচ্যুত গুড়া মাত্র। তাহা সযত্নে সংগ্রহ করিতে পারিলে বিলক্ষণ লাভ হয় বলিয়া মুরশিদাবাদ অঞ্চলে কেহ কেহ ইহার অল্পবিস্তর আবাদ করিয়া থাকে।

লটকন : লটকনকে কেহ কেহ “বিলাতি হলদী” বলিয়াও নামকরণ করিয়া থাকে। ইহার চাষ হয় না। ফলের ত্বক ও আঁটি উভয় বস্তু হইতেই রং প্রস্তুত হইয়া থাকে। রঞ্জনকার্য্যে লটকনের আদর কম নহে।

বকম : উৎকলাঞ্চলে বকম বৃক্ষের বিশেষ শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছে। চাষ না হইলেও এই বৃক্ষের সংখ্যা নিতান্ত অল্প নহে। “ম্যাজিন্টার” আবির্ভাবের পূৰ্ব্বে বকমের একাধিপতিত্ব ছিল; এখন সস্তায় ম্যাজেন্টার রং ফলিতেছে বলিয়া বকমের কিছু গৌরব নাশ হইয়াছে। কিন্তু বকম হইতে বস্ত্ররঞ্জনের জন্য রং বাহির করিয়া লওয়া ভিন্ন উহা দ্বারা ‘আবির প্রস্তুত হইয়া থাকে বলিয়া বকমের ব্যবসায় একেবারে উঠিয়া যায় নাই। বকমের কাষ্ঠ এবং বৃক্ষত্বক উভয় পদার্থই রঞ্জনদ্রব্যে পরিপূর্ণ বলিয়া বকম কাষ্ঠের ন্যায় বকমত্বকেরও মূল্য আছে।

হরিতকি-বহড়া-আমলকি : এই সকল ফল ভিজাইয়া তাহার ক্কাথ ব্যবহার করা হইয়া থাকে। তদ্বারা কোনো স্বতন্ত্র রং না ফলিলেও অন্যান্য রং ফলাইতে ও পাকা করিতে এই সকল দ্রব্যের প্রয়োজন হইয়া থাকে। ইহা অন্যান্য কাৰ্য্যেও ব্যবহৃত হয় বলিয়া ইহার চাষে লাভ হইবার কথা।

দারুহরিদ্রা : ইহার চাষ হইয়া থাকে। মূল হইতে রঞ্জন দ্রব্য বাহির করিয়া লওয়া হয়।

রঞ্জনপ্রণালী : আমাদের রঞ্জন প্রণালী কিছু কষ্টসাধ্য বটে, কিন্তু বহুব্যয়সাধ্য কঠিন ব্যাপার নহে। অতি অল্পব্যয়ে যে কেহ এই প্রবন্ধ লিখিত রঞ্জন প্রণালীর পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পারেন। কার্পাস বস্ত্ররঞ্জন প্রণালী ও পট্টবস্ত্ররঞ্জন প্রণালী প্রায় একরূপ। কিন্তু কার্পাস বস্ত্ররঞ্জন অপেক্ষা পট্টবস্ত্ররঞ্জন কাৰ্যেই আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব এখনও স্বীকৃত হইয়া থাকে। তজ্জন্য বর্তমান প্রবন্ধে কেবল পট্টবস্ত্ররঞ্জন কৌশলেরই আলোচনা করা হইবে। পরীক্ষার্থ রেশমী রুমাল বা পুরাতন বস্ত্রখণ্ড ব্যবহার করিলেই যথেষ্ট হইবে।

সূত্ররঞ্জন করিয়া রঞ্জিত সূত্রে বস্ত্রবয়ন করা এবং বস্ত্রবয়ন করিয়া পরে তাহাকে রঞ্জন করা এই উভয় প্রণালীই বর্তমান আছে। তন্মধ্যে সূত্ররঞ্জন প্রণালীই শ্রেষ্ঠ। কারণ তদ্বারা টানা ও ভর্ণার সাহায্যে অনেকগুলি মিশ্রবর্ণের উৎপত্তি হইতে পারে। এদেশের পট্টবস্ত্রাদিতে সচরাচর যে সকল রং দেখিতে পাওয়া যায় তাহার কতকগুলি টানা ও ভর্ণার সহায়তায় ফলান হইয়া থাকে। গাঢ় নীল বা কালো, ছায়া রং, লাল ও গোলাপী, বাসন্তী, কমলা, সবুজ, বেগুণী, সুরমা ইত্যাদি রং কেবল রঞ্জন কৌশলেই ফলিয়া থাকে। পীতাম্বরী, সোনালী, হিরামনকণ্ঠী, ময়ূরকণ্ঠী, ধূপছায়া, আসমানী ইত্যাদি রং বয়ন কৌশলে টানা ভর্ণার সাহায্যে ফলান হইয়া থাকে। বয়ন কৌশলোৎপন্ন বর্ণ বিস্তারের কথা ছাড়িয়া দিয়া কেবল রঞ্জন কৌশলোৎপন্ন পট্টবস্ত্রের কথাই লিখিত হইতেছে।

ক্ষারীকরণ : বাংলা দেশের রেশমের রং হরিদ্রা বর্ণের; উহা স্বাভাবিক রং হইলেও স্থায়ী নহে এবং ঐ রং উঠাইয়া না ফেলিতে পারিলে রেশমে অন্য রং ধরে না। তজ্জন্য রেশমকে ক্ষারী করা প্রয়োজন। ক্ষারী করা ব্যয় সাধ্য নহে; একসের রেশম ক্ষারী করিবার ব্যয় তিন আনার অধিক নহে। ক্ষারী করা আর কিছুই নহে, রেশমকে ক্ষার জলে কাচিয়া লওয়া। এই কার্যে যে জল ব্যবহৃত হয় তাহা প্রস্তুত করিয়া লইতেই যাহা কিছু ব্যয়। একসের রেশম ক্ষারী করিতে হইলে অর্ধমন ক্ষার জলে সিদ্ধ করিয়া লইয়া পরিস্কার জলে কাচিয়া ধুইয়া শুকাইয়া লইতে হয়। কলাপাতার ক্ষার এই কার্য্যের বিশেষ উপযোগী বলিয়া প্রসিদ্ধ। ঐ ক্ষার এক পোয়া এবং সাজি মাটি আধ পোয়া জলে গুলিয়া ছাঁকিয়া লইতে হয়। পুনঃ পুনঃ ছাকিতে ছাকিতে ক্ষারজল তৈলবৎ হইয়া উঠে। তাহাই অৰ্দ্ধমন জলে মিশাইয়া লইলেই ক্ষার জল হইল। ক্ষারী করিলে রেশম সাদা হইয়া থাকে এবং স্পর্শে কোমলতা অনুভব করা যায়। ইহাতে সের প্রতি এক পোয় ওজন কমিয়া যায়। ক্ষারী করা রেশমে যে কোন রং ইচ্ছামত ধরাইতে পারা যায়।

ফিটকারী খাওয়ান : ক্ষারী করা রেশমে পাকা রং ফলাইতে হইলে তাহাকে ফিটকারী খাওয়াইয়া লইতে হয়। একসের ক্ষারী করা রেশমের জন্য দশ তোলা ফিটকারী হইলেই যথেষ্ট হয়। ঐ পরিমাণ ফিটকারী দশসের আন্দাজ জলে গুলিয়া জ্বাল দিতে হয় এবং চুল্লি হইতে নামাইয়া সেই ফুটন্ত জলেই ক্ষারী করা রেশম ডুবাইয়া আধ ঘন্টা কাল ঘুরাইয়া ফেরাইয়া ফিটকারী খাওয়াইয়া লইতে হয়। রং করিবার সমস্ত সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখিয়া ফিটকারী খাওয়ান ভালো; ফিটকারী ভাণ্ড হইতে তুলিয়াই একেবারে রং ভাণ্ডে ফেলিলে বেশ রং ফলিয়া যায়। ফিটকারী খাওয়াইবার খরচ অবশ্যই অধিক নহে।

বর্ণবিন্যাস : পট্টবস্ত্রে নানারূপ রং ফলাইতে পারা যায়; তন্মধ্যে যে গুলি পাকা তাহারই আদর অধিক। মহিলামণ্ডলিক নিকট বাসন্তী রং সৰ্বজন পরিচিত প্রিয়পদার্থ বলিয়া এই প্রবন্ধে সৰ্ব্বগ্রে বাসন্তী রং ফলাইবার কথাই লিখিত হইতেছে।

বাসন্তী : গাঢ় হরিদ্রাবর্ণকে ‘বাসন্তী’ বলে। হরিদ্রা দ্বারা রং করিলে সুন্দর বাসন্তী রং ফলিতে পারে, কিন্তু উহা কাঁচা রং বলিয়া বাসন্তী রং ফলাইবার জন্য পুরাকাল হইতে নানা দ্রব্যের ব্যবহার প্রচলিত হইয়া আসিয়াছে। মাঙ্গলিক ব্যাপারে দরিদ্রেরা হরিদ্রা দ্বারা ও ধনবানেরা জাফরানের দ্বারা বাসন্তী রঙ্গে বস্ত্ররঞ্জন করিতেন; এখনও ইহার কিছু কিছু পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। হরিদ্রার রং অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী করিতে হইলে তাহার সঙ্গে সাজিমাটি ও লেবুর রস মিশাল দিতে হয় কিন্তু হরিদ্রা দ্বারা পট্টবস্ত্র রঞ্জন করা উচিত নহে।

পট্টবস্ত্রে বাসন্তী রং ফলাইতে হইলে সচরাচর লটকন, কমলাগুঁড়ি ব্যবহার করা হইয়া থাকে। বর্তমান প্রবন্ধে উক্ত উভয় পদার্থের রঞ্জন প্রণালীই লিখিত হইতেছে। কমলাগুঁড়ি এখন বড়ই দুষ্প্রাপ্য হইয়া উঠিয়াছে বলিয়া কমলাগুঁড়ির আদর কমিয়া গিয়াছে। কিন্তু লটকনের রং ক্রমে কাচিতে কাচিতে ফিকা হইয়া যায় বলিয়া কমলাগুঁড়িই প্রশস্ত। লটকান বা কমলগুড়ি অপেক্ষা কাঁঠাল কাঠের দ্বারা স্থায়ী উজ্জ্বল বাসন্তী রং প্রস্তুত হইতে পারে।

বৌদ্ধ ফুঙ্গী ও তদীয় শিষ্যগণ বাসন্তী রং ব্যবহার করেন বলিয়া চট্টগ্রাম প্রদেশে বহুদিন হইতেই কাঁঠাল কাষ্ঠের বাসন্তী রং ফলাইবার প্রথা প্রচলিত আছে। কাঁঠাল কাষ্ঠের সারভাবা জলে ভিজাইয়া কাথ বাহির করতঃ ফুঙ্গীগণ বাসন্তী রং প্রস্তুত করিতেন। আমাদের দেশের রেশমবস্ত্র বিক্রেতাগণ তাহা অপেক্ষা সহজ উপায়ে কাঁঠাল কাষ্ঠ হইতে বাসন্তী রং ফলাইয়া থাকে। কাঁঠাল কাষ্ঠে যে রঞ্জন দ্রব্য আছে তাহা বাহির করিয়া লইবার উপায় এইরূপ। চারিসের কাঁঠাল কাষ্ঠের করাতের গুড়া ও এক সের বাকসের পাতা মাটির হাঁড়িতে জল দিয়া সিদ্ধ করিতে করিতে যখন বেশ ঘন ক্বাথ বাহির হইয়া আসে সেই সময়ে ছাঁকিয়া লইতে হয়, কাথ সুন্দর বাসন্তী রঙ্গের। উহাতে ক্ষারী করা ফিটকারী খাওয়ান পট্টবস্ত্র ডুবাইয়া ঘুরাইয়া রঞ্জিত করিতে হয়। তাহার পর নিংড়াইয়া লইলেই হইল। ইহাতে যে রং ফলে তাহা দেখিতে বড়ই সুন্দর। খরচ এত যৎসামান্য যে তাহার উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন।

কমলাগুড়ি দুষ্প্রাপ্য হইলেও রেশমরঞ্জনের পক্ষে সর্বোৎকৃষ্ট পদার্থ। বটফলের উপরিভাগে যেরূপ গুঁড়া গুঁড়া পদার্থ দেখা যায় কমলাগুঁড়ির ফলের উপরেও সেইরূপ। বটফলের গুঁড়া হইতেও রং হয়, তাহা ভালো নহে। কমলাগুড়ির ফল পাকিবার সময়েই তাহা গুড়া সংগ্রহ করিতে হয়, এই গুড়ার ৭৫ ভাগ রঞ্জন দ্রব্য। ইহাতে বস্ত্ররঞ্জন করিলে শুষ্ক খড়ের ন্যায় রং ফলে। সেই রং আরও ঘোরালো করিতে হইলে অন্যান্য দ্রব্য মিশাইতে হয়। এক পোয়া সাজিমাটি ও এক পোয়া লোধের গুঁড়া একত্র মিশাইয়া দশ বারো সের জলে সিদ্ধ করিয়া লইতে হয়। ঐ জল ছাঁকিয়া ফুটন্ত অবস্থায় উহাতে একপোয়া কমলগুড়ি আধ তোলা সর্ষপ তৈল মিশাইয়া ক্ষারী করা ফিটকারী রেশম রঞ্জিত করিয়া লইতে হয়। ইহাকে বস্ত্ররঞ্জকেরা জরদ রং খাওয়ান বলিয়া থাকে।

লটকট হইতেও জরদ রং ফলান হয়, কিন্তু উহা কমলাগুঁড়ির মত পাকা হয় না। দেড় পোয়া লটকনের বীজ দশ পনের সের জলে সিদ্ধ করিয়া উহাতে সাজিমাটির জল দিতে হয় ও ফুটাইতে হয়। ঐ জল ছাঁকিয়া লইলেই বস্তুরঞ্জনের উপযোগী হয়।

সবুজ রং সহজে পাকা হয় না। ইহার কারণ আর কিছুই নহে,-সবুজ একটি মৌলিক রং নহে, হরিদ্রা ও নীলের সমকারে উৎপন্ন বলিয়া কালসহকারে বিশ্লিষ্ট হইয়া পড়ে। কাশ্মীরী শালের হাঁসিয়া কলকা ইত্যাদির সবুজ রং সর্বাগ্রে জ্বলিয়া যায় ইহা বোধ হয় অনেকেই লক্ষ্য করিয়াছেন। সবুজ রং ফলান খুব সহজ, যে কোন উপায়ে বাসন্তী রং ফলাইয়া তাহাতে বস্ত্ররঞ্জন সমাধা হইলে সেই রঞ্জিত বস্ত্র নিস্তেজ নীলভাণ্ডে ডুবাইয়া লইলেই সবুজ হয়।

বাসন্তী রং হইতে যেমন নীল সংযোগে সবুজ হয়, লাল রং হইতে সেইরূপ নীল সংযোগে বেগুনী ও ফিকা নীল সংযোগে সুরমা রং ফলিয়া থাকে। লাল রং ইহাদের মূল বলিয়া লালের রঞ্জন প্রণালী লিখিত হইল।

রেশমের পক্ষে লাল রং ফলাইবার প্রধান উপকরণ লাক্ষা। বাজারে অকৃত্রিম লাক্ষা পাওয়া দুর্লভ হইয়া উঠিয়াছে। বিশুদ্ধ লাক্ষায় যে সকল আলতা প্রস্তুত হইত তাহার মধ্যেও এখন কৃত্রিমতা প্রবেশ করিয়াছে। লাক্ষা কিনিয়া রং বাহির করিয়া লওয়া সহজ নহে; কিন্তু এখন তাহা ভিন্ন আর উপায় নাই। লাক্ষার রং বাহির করিবার জন্য আমাদের দেশের তাঁতিরা একরূপ হাঁড়ি প্রস্তুত করিয়া লইত, উহার ভিতরে পাথরের কুঁচি বসাইয়া লইত বলিয়া তন্মধ্যে লাক্ষাচুর্ণ ও জল দিয়া মন্থন করিলে সহজেই রং ঘর্ষণবলে বাহির হইয়া আসিত। এই রং জ্বাল দিবার সময়ে উহাতে মধ্যে মধ্যে লোর্ধের গুঁড়া ফেলিয়া দিতে হয়। ইহার উদ্দেশ্য–”বোল’ ঠিক করা। এক ফোঁটা রং এক পেয়ালা জলের উপর ফেলিয়া দিলে যদি রং ঘুরিতে ঘুরিতে চক্রাকারে নীচে পড়িয়া যায় তবেই বুঝিতে হইবে যে “বোল” ঠিক হইয়াছে। এই জল একদিবস রাখিয়া পরদিবস আবার জল দিয়া তাহাতে ছাঁকা তেঁতুলের জল মিশাইয়া ক্ষারী করা রেশম (ফিটকারী না খাওয়াইয়া) রং করিতে হয়। জ্বাল না দিলে রং ধরিতে বিলম্ব হয়। রং ঠিক ধরিয়াছে দেখিলে তাহার মধ্যে ফিটকারী ফেলিয়া দিয়া পুনরায় জ্বাল দিতে হয়। কেহ কেহ ফিটকারী ব্যবহার না করিয়া আধ পোয়া হলুদ বাটার সঙ্গে আধপোয়া লোথ্র মিশাইয়া পনেরো সের জলে সিদ্ধ করিয়া লয়; রঞ্জিত রেশম ঐ জলে ডুবাইয়া লইলেও ফিটকারী খাওয়ানোর ফল হয়, অর্থাৎ রং পাকা হইয়া থাকে।

আমাদের দেশে বস্ত্ররঞ্জনের যে সকল উপায় প্রচলিত আছে তাহার উন্নতি সাধনের জন্য কৃতবিদ্য ব্যক্তিগণের সহায়তা আবশ্যক। তাঁহারা প্রত্যেক পদার্থের দোষ গুণ বিচার করিয়া পরীক্ষালব্ধ ফল প্রকাশ করিতে থাকিলে আমাদের বস্ত্ররঞ্জনবিদ্যার আবার গৌরববৃদ্ধি হইতে পারে।

ভারতী, শ্রাবণ, ১৩০৫

মন্তব্য করুন