বঙ্গে তুর্কী আক্রমণ

বঙ্গে তুর্কী আক্রমণ

বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গ-বিজয়

সচরাচর যে সকল গ্রন্থ বাঙলার ইতিহাস বলিয়া বিদ্যালয়ে অধ্যাপিত হইয়া থাকে, তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায়, ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে পাঠান-সেনাপতি বক্তিয়ার খিলিজি সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া বাঙলার রাজধানী নবদ্বীপনগরে উপনীত হইবামাত্র, নবদ্বীপাধিপতি বৃদ্ধ লাক্ষ্মণ্য সেন রাজ্য ও রাজধানী পরিত্যাগ করিয়া, অন্তঃপুর হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করেন।

এই কাহিনী বাঙালীর পুরাতন সাহিত্যে দেখিতে পাওয়া যায় না। কিন্তু ইহা আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের পদ্যে-গদ্যে গল্পে-উপন্যাসে পাঠকসমাজে সুপরিচিত হইয়াছে। বঙ্গদেশের পুরাতন জনশ্রুতি হইতে এই কাহিনী গৃহীত হইলে, পুরাতন সাহিত্যেও ইহার আভাস থাকিত। অন্য কোনো প্রমাণ না থাকিলেও, এ দেশে পুরাতন জনশ্রুতি বলিয়া ইহাকে ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে হইত।

কোন সময়ে কি সূত্রে এই কাহিনী বঙ্গসাহিত্যে প্রথমে স্থান প্রাপ্ত হয়, তাহা নির্ণয় করা কঠিন নহে। যাঁহারা বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাস আলোচনা করিয়া দেখিবেন, তাঁহারা সকলেই স্বীকার করিবেন,–আধুনিক বঙ্গবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়া তাহাতে ইতিহাস অধ্যাপিত হইবার পূর্বে এই কাহিনী বঙ্গসাহিত্যে প্রবেশলাভ করে নাই। প্রথমে বিদ্যালয়ে, পরে শিক্ষিত সমাজে এবং ধীরে ধীরে জনসাধারণের মধ্যে এই কাহিনী ক্রমশ বিস্তৃতিলাভ করিয়াছে।

যাঁহারা প্রাচীন গ্রীক ও রোমক সাম্রাজ্যের ইতিহাস অধ্যয়ন করিয়া, বাঙালীর ইতিহাস না জানিয়া, বাঙালীকে ভীরু ও কাপুরুষ বলিয়া গ্রন্থরচনা করিতে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন, তাঁহারা এই কাহিনীর উল্লেখ করিয়া স্বমত-সমর্থনের সুযোগ প্রাপ্ত হন। যাঁহারা তাহাতে মর্মাহত, তাঁহারা নবদ্বীপাধিপতির নামোল্লেখ করিয়া নানা কটুকাটব্য প্রয়োগে মৰ্ম্মদাহ শান্ত করিবার চেষ্টা করেন। যাঁহারা এরূপ অসম্ভব কথা মানিয়া লইতে অসম্মত, অথচ প্রমাণ প্রয়োগে প্রতিবাদ করিবার জন্য চেষ্টাশূন্য, তাঁহারা একজন হিন্দুনরপতির এরূপ দুরপনেয় কলঙ্ক কিয়ৎপরিমাণে অপনোদন করিবার আশায় লিখিয়া যান,–বৃদ্ধ নরপতির বিশেষ অপরাধ ছিল না; কৃতঘ্ন মন্ত্রিদলের বিশ্বাসঘাতকতায় এবং ব্রাহ্মণগণের উপদেশে এরূপ ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। এইরূপে বঙ্গসাহিত্যে ব্যক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয়ব্যাপার নানাভাবে কীৰ্তিত হইয়া বাঙালীর পরাজয় কলঙ্ক দুরপনেয় করিয়া তুলিয়াছে।

যাঁহারা বঙ্গসাহিত্যের অধিনায়ক, সেই সকল খ্যাতনামা লেখক এইরূপে বাঙলার শেষ স্বাধীন হিন্দুনরপতির কলঙ্কঘোষণা করায়, তাহা এক্ষণে প্রবাদবাক্যের ন্যায় সর্বত্র স্বীকৃত হইয়া পড়িয়াছে। এ কলঙ্ক আদৌ সত্য কি না এবং সত্য হইলে ইহার কতটুকু সত্য, এখন আর সে কথার বিচার করিবার জন্য বিশেষ আগ্রহ দেখিতে পাওয়া যায় না। ইতিহাস যাহার ললাটে ভীরু ও কাপুরুষ বলিয়া দুরপনেয় কলঙ্কচিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিয়াছে, সে সভ্যজগতের নিকট লজ্জায় মুখ তুলিয়া দাঁড়াইবার সাহস হারাইয়া, মুখ ফুটিয়া প্রতিবাদ করিতে না পারায়, এ বিষয়ের প্রকৃত তথ্য নির্ণীত হইবার অসুবিধা হইয়াছে। এই কাহিনী যখন বঙ্গসাহিত্যে প্রথমে প্রবেশলাভ করে, তখন ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধানের আগ্রহ সমুচিতভাবে বিকশিত হয় নাই। এখনও অনেকের নিকট হস্তলিখিত বা মুদ্রিত পুস্তকের কথা অকাট্য প্রমাণ বলিয়া পরিচিত। কোনো পুরাতন পুস্তকে কিছু লিখিত থাকিলেই হইল, তাহার সত্যমিথ্যার আলোচনা অনাবশ্যক, মিথ্যা হইলে পুস্তকে লিখিত বা মুদ্রিত হইবে কেন, অনেকে এখনও এরূপ তর্ক উত্থাপন করিয়া থাকেন। সুতরাং এই কাহিনী বঙ্গসাহিত্যে প্রবেশ করিবার সময়ে ইহার সত্যমিথ্যার বিচার হয় নাই বলিয়া বিস্মিত হইবার কারণ নাই।

বিচারে বিলম্ব ঘটিয়া তথ্যনির্ণয়ের অসুবিধা হইয়াছে। কিন্তু বিলম্ব ঘটিয়াছে বলিয়া তথ্যনির্ণয়ের আশা একেবারে তিরোহিত হয় নাই। বিচারে প্রবৃত্ত হইলে, যে সকল প্রশ্নের মীমাংসা করা প্রয়োজন হইবে, তাহা এই :

(১) এই কাহিনীর মূল কোথায়? (২) বৃদ্ধ পলায়নপর নবদ্বীপাধিপতির নাম কী? (৩) কোন সময়ে এই ঘটনা সংঘটিত হয়? (৪) তৎকালে নবদ্বীপে রাজধানী ছিল কি না? (৫) নবদ্বীপ কোন সময়ে কি সূত্রে মুসলমানের হস্তগত হয়?

এই সকল প্রশ্ন জটিল হইলেও, পুরাতত্ত্বানুসন্ধানপরায়ণ পণ্ডিতবর্গের অধ্যবসায়ে এপর্যন্ত যে সকল প্রমাণ আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা এই কলঙ্কক্ষালনের পক্ষে যথেষ্ট।

বক্তিয়ার খিলিজি সম্বন্ধে শিশুপাঠ্য ইতিহাসে বিশেষ কিছু জানিবার উপায় নাই। সুতরাং তাঁহার নামে কেহ কোনো রচা-কথা প্রচার করিলেও, তাহার প্রতিবাদ করা কঠিন হইয়া পড়ে। বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয়সম্বন্ধে ঐতিহাসিক তথ্য-নির্ণয়ের উপযোগী যে সকল প্রমাণ এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হইয়াছে, তারা যে সকল সিদ্ধান্ত অনিবাৰ্য বলিয়া স্বীকার করিতে হয়, তাহা এই :

(ক) সপ্তদশ অশ্বারোহীর নবদ্বীপ অধিকারের কাহিনী জনৈক বৃদ্ধ মুসলমান সৈনিকের মুখে শ্রবণ করিয়া মিনহাজ উদ্দীন স্বকৃত “তবকাৎ-ই-নাসেরী” নামক ঐতিহাসিক গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করেন। তাহার অন্য কোনো প্রমাণ নাই। সেই প্রথম, সেই শেষ। পরবর্তী গ্রন্থকারগণ তাহারই পুনরুক্তি করিয়া গিয়াছেন।

(খ) লাক্ষ্মণ্যনামক কোনো নরপতির বঙ্গদেশের অধিপতি থাকার প্রমাণ নাই। সেনরাজবংশে এই নামের কেহ সিংহাসনে আরোহণ করেন নাই।

(গ) ১২০৩ খৃষ্টাব্দে বক্তিয়ারের বঙ্গাগমন বিশ্বাস করা যায় না। কারণ, মুসলমান ইতিহাসলেখকের মতে ব্যক্তিয়ার দ্বাদশ বৎসর বঙ্গদেশ শাসন করিয়া ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশেই পরলোকগমন করেন। সুতরাং ১২০৩ খৃষ্টাব্দের পূৰ্ব্বেই ব্যক্তিয়ার বঙ্গদেশে উপনীত হন।

(ঘ) বক্তিয়ার খিলিজির মৃত্যুকাল পর্যন্ত নবদ্বীপ হিন্দুরাজ্যভুক্ত একটি বিভাগ বা “বিষয়” ছিল, তথায় কোনো রাজা বা রাজধানী ছিল না। লক্ষ্মণাবতী, লক্ষ্ণৌর ও বিক্রমপুরে তিনটি রাজধানী ছিল।

(ঙ) বক্তিয়ার খিলিজি সম্রাট কুতবউদ্দীনের নিকট যে সনন্দ প্রাপ্ত হন, তাহাতেও তাঁহাকে লক্ষ্মণাবতী অধিকারের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। তাহাতে নবদ্বীপের নামোল্লেখ নাই।

(চ) তৎকালে লক্ষ্মণাবতীর অধীন বরেন্দ্রভূমি, লক্ষৌর রাজধানীর অধীন রাঢ়ভূমি ও বিক্রমপুরের অধীন বঙ্গভূমি (পূৰ্ব্ববঙ্গ) অবস্থিত ছিল। বাগড়ি অর্থাৎ মধ্য ও দক্ষিণবঙ্গের কিয়দংশ রাঢ় ও কিয়দংশ বঙ্গের অন্তর্গত ছিল। সুতরাং সেকালের নবদ্বীপ রাঢ়ের অধিকারভুক্ত ছিল। তাহা কোনো সময়েই বরেন্দ্রভূমির বা লক্ষ্মণাবতীর অন্তর্গত ছিল না।

(ছ) বক্তিয়ার খিলিজি জীবিত থাকিতে বরেন্দ্রের কিয়দংশমাত্রই মুসলমানের অধিকারভুক্ত হয়। তাঁহার মৃত্যুর পর রাঢ় পরাজিত হয় এবং বক্তিয়ারের বঙ্গাগমনের ৬০ বছর পরেও মুসলমান ইতিহাসলেখক বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ) হিন্দুরাজার অধিকারভুক্ত থাকে, ইহা স্বচক্ষে দর্শন করিয়া স্বরচিত ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।

এই সকল সিদ্ধান্ত কোন কোন প্রমাণমুলে কীরূপ পণ্ডিতসমাজে স্বীকৃত হইয়াছে, তাহার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইবার পূৰ্ব্বে ব্যক্তিয়ার খিলিজির সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনীর আলোচনা করা আবশ্যক। এই আলোচনায় প্রবৃত্ত হইবার পূর্বেই বলিয়া রাখি, মুসলমানলিখিত ইতিহাসে বাঙালীর পুরাবৃত্ত নিতান্ত সংক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হইয়াছে; তাহাতে অনুসন্ধিৎসা পরিতৃপ্ত হয় না। সে যুগে যাঁহারা ইতিহাসরচনা করিয়া গিয়াছেন, তাঁহারা বিচারবুদ্ধির সহায়তা গ্রহণ করেন নাই; যাহা শুনিয়াছেন, যাহা জানিয়াছেন, যাহা দেখিয়াছেন এবং যাহা অনুমান করিয়াছেন, তাহাই অবলীলাক্রমে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রসঙ্গক্রমে যিনি বঙ্গভূমির কথা যতটুকু লিখিয়া গিয়াছেন, তাহাই বাঙলার ইতিহাসের অবলম্বন। ব্যক্তিয়ার খিলিজির সমসময়ে কোনো মুসলমান লেখক বাঙলার স্বতন্ত্র ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন নাই; করিয়া থাকিলেও সেরূপ গ্রন্থ বৰ্ত্তমান নাই, সুতরাং ব্যক্তিয়ার খিলিজির দিগ্বিজয়সম্বন্ধে অধিক কিছু জানিবার উপায় নাই।

১২৬০ খ্রিস্টাব্দের সমকালে আবু-উমর-মিনহাজ উদ্দীন ‘তবকাৎ-ই-নাসেরী” নামক ইতিহাসের বিংশতিতম অধ্যায়ে বঙ্গভূমির যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহাই মুসলমানলিখিত বাঙলার ইতিহাসের আদিগ্রন্থ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মালদহপ্রবাসী গোলাম-হোসেন সঙ্কলিত “রিয়াজ উস সলাতিন” নামক গ্রন্থ ভিন্ন বাঙলার আদ্যন্তের ধারাবাহিক আর কোনো গ্রন্থ মুসলমানকর্তৃক লিখিত হয় নাই। মিনহাজের গ্রন্থের ইংরাজী ও গোলাম হোসেনের গ্রন্থের বাঙলা অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু ইহার কোন গ্রন্থেই গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস প্রাপ্ত হওয়া যায় না। অনুমান প্রমাণবলে সেকালের ইতিহাসের ছায়ামাত্র ঈষৎ প্রতিভাত হইতে পারে।

মুসলমান-শাসন প্রবর্তিত হইবার অব্যবহিত পূৰ্বে আৰ্য্যাবৰ্ত্তের পূর্বাঞ্চলে নানা রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটিত হইয়াছিল। তাহাতে পুরাতন মগধ, কান্যকুজ ও গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের সীমা ও অধিকার বহুবার বিপর্যস্ত ও পরিবর্তিত হইয়া যায়। কান্যকুজ প্রবল হইয়া মগধের পশ্চিমাঞ্চল অপহরণ করায়, পলায়নপর মগধেশ্বর গৌড়ের কিয়দংশ অধিকার করেন, পরে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যে পাল ও সেন বংশীয় নরপালবর্গের কলহবিবাদ নিরস্ত হইলে, গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য সেনরাজবংশের অধিকারভুক্ত হয়। সেনরাজবংশের অধিকারসময়েই ব্যক্তিয়ার খিলিজি গৌড়রাজ্য আক্রমণ করেন।

তৎকালে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য রাঢ়, বরেন্দ্র ও বঙ্গ নামক তিনটি প্রধান বিভাগে বিভক্ত ছিল এবং লক্ষ্মণাবতী, লক্ষৌর ও শ্রীবিক্রমপুরে এই তিন বিভাগের রাজধানী ছিল। সমগ্ৰ গৌড়ীয় সাম্রাজ্য নানা উপবিভাগে অর্থাৎ “বিষয়” নামক খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত ছিল। এই সকল বিষয় বা উপবিভাগ বিষয়পতির দ্বারা শাসিত হইত। গৌড়েশ্বর সাধারণত রাজধানীতে বাস করিতেন। তিনটি রাজধানীর মধ্যে লক্ষ্মণাবতী গঙ্গাতীরে অবস্থিত থাকায় এবং পুরাতন গৌড়রাজ্যের রাজধানী বলিয়া সৰ্ব্বত্র সমাদর লাভ করায়, লক্ষ্মণসেনদেব শেষজীবন তথায় বাস করিয়া নিজনামানুসারে তাহাকে “লক্ষ্মণাবতী” নাম প্রদান করেন। মুসলমানের আদি ইতিহাসে লক্ষ্মণাবতী “লক্ষ্ণৌতি” নামে পরিচিত; তাহাতে গৌড়নামের উল্লেখ নাই।

মিনহাজের গ্রন্থ রচিত হইবার সময়ে এই তিনটি পুরাতন হিন্দুরাজধানীর মধ্যে শ্রীবিক্রমপুর হিন্দুরাজার অধিকারভুক্ত ছিল; অপর দুইটি মুসলমানের হস্তগত হইয়াছিল। মুসলমানলিখিত ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায়, বক্তিয়ার খিলিজি লক্ষৌতি অধিকার করেন, এবং তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার সেনাপতি মহম্মদ শেরান কর্তৃক লক্ষৌর অধিকৃত হয়। কীরূপে এই দিগ্বিজয় সাধিত হইয়াছিল, তাহার বিস্তৃত বিবরণ প্রাপ্ত হইবার উপায় নাই। মিনহাজ ও তাঁহার পরবর্তী মুসলমান ইতিহাসলেখকগণের গ্রন্থে ব্যক্তিয়ার খিলিজি ও তাঁহার রাজ্যবিস্তারের যতদূর বিবরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাই আমাদের প্রধান অবলম্বন।

মহম্মদ ঘোরীর ক্রীতদাস ও প্রধান সেনাপতি কুতবউদ্দীন দিল্লীর সিংহাসনে উপবেশন করিবার সময়ে এদেশে কি অভূতপূৰ্ব্ব পরিবর্তনই না সাধিত হইয়াছিল। তুর্কিস্থানের কোনো এক অজ্ঞাতকুলশীল দরিদ্র পরিবারে কুতুবের জন্ম হয়। তাঁহাকে শৈশবে দাসবিপণীতে বিক্রীত হইতে হইয়াছিল। ভারতবর্ষের প্রথম মুসলমান সম্রাট এইরূপে দাসবিপণী হইতে প্রভুগৃহে ও তথা হইতে ক্রীতদাসরূপে ক্রমে মহম্মদ ঘোরীর নিকট উপঢৌকনদ্রব্যের সঙ্গে প্রেরিত হইয়াছিলেন। তাঁহার কনিষ্ঠাঙ্গুলি নষ্ট হইয়াছিল বলিয়া সুলতান তাহাকে আইবক বলিয়া ডাকিতেন। আইবক যে একদিন দিল্লীর সিংহাসনে উপবেশন করিবেন, তাহা কে জানিত?

বক্তিয়ার খিলিজির বাল্যজীবনও কুতবউদ্দীনের ন্যায় অজ্ঞাত। তিনি ঘোর প্রদেশের খিলিজিবংশে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু কদাকার বলিয়া কোনোস্থলেই তাঁহার প্রতিভার সমাদর হইত না। মহম্মদ ঘোরী এবং কুতবউদ্দীন উভয়েই কুলশীল অপেক্ষা প্রতিভার সমাদর করিতেন বলিয়া বক্তিয়ার বড়ো আশা করিয়া প্রথমে ঘোরীর নিকট, পরে কুতবের নিকট উপনীত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার খৰ্ব্ব স্কুল কদাকার দেহ উভয় স্থলেই তাঁহার সকল আশা নষ্ট করিয়া দিয়াছিল। তাঁহার সাহস ছিল, বাহুবল ছিল, রণকৌশল ছিল, কিন্তু কদাকার বলিয়া তিনি সুলতানের বা দিল্লীশ্বরের সেনাদলে প্রবেশ করিতে পারেন নাই। অবশেষে দোয়াবপ্রদেশের অভিনব মুসলমানরাজ্যে তিনি জায়গীর প্রাপ্ত হইয়া প্রতিভার পরিচয়দানের অবসর লাভ করিয়াছিলেন।

ভারতবর্ষে মুসলমান শাসন বিস্তৃত হইবার সময়ে জায়গীর ও সনন্দ দানের প্রথাই রাজ্যবিস্তারের প্রধান সহায় হইয়া উঠিয়াছিল। এখন ইউরোপীয়গণ যেমন অসভ্যদেশগুলি আপনাদের রাজ্য মনে করিয়া আপনাদের মধ্যে তাহার অধিকার বন্টন করিয়া লইতেছেন, সেকালে মুসলমান সুলতানও সেইরূপ করিয়াছিলেন। সুলতান মহম্মদ ঘোরী কুতবউদ্দীনকে সমগ্র ভারতবর্ষ দান করেন। বলা বাহুল্য, তখন পর্যন্ত ভারতের অত্যল্প ভাগই মুসলমানের অধিকারভুক্ত হইয়াছিল। কুতবউদ্দীন আবার নিজ পাত্রমিত্র, সেনাপতি বা সাহসী মুসলমানবীরকে ভারতের নানা অংশ দান করিতে আরম্ভ করেন। বক্তিয়ার খিলিজি একজন সমরকুশল সেনাপতিরূপে পরিচিত হইবামাত্র, সম্রাট তাঁহাকে লাহোরে আহ্বান করিয়া, তাঁহাকে বিহার ও মুঙ্গেরের শাসনকর্তৃত্বের সনন্দ দান করিলেন। বলা বাহুল্য, বিহার ও মুঙ্গেরে তখনও মুসলমানশাসন প্রবর্তিত হয় নাই।

বক্তিয়ার এইরূপে প্রথমে জায়গীর এবং পরে বিহার ও মুঙ্গেরের শাসনকর্তৃত্ব লাভ করিয়া যুদ্ধসজ্জায় নিযুক্ত হন। সম্রাট তাঁহাকে ডাকিয়া লইয়া সনন্দ না দিলে, তিনি জায়গীরদার থাকিয়াই জীবনবিসৰ্জন করিতেন। বক্তিয়ার সনন্দ লাভ করিয়া কিরূপে কতদিনে বিহার জয় করেন, মুসলমান-লিখিত ইতিহাসে তাহার দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ দেখিতে পাওয়া যায়; তাহার একটি মিনহাজকর্তৃক সঙ্কলিত জনশ্রুতি; অপরটি সমসাময়িক লেখকগণের সুবিজ্ঞাত ঐতিহাসিক তথ্য। মিনহাজের সঙ্কলিত জনশ্রুতি এদেশের জনশ্রুতি নহে; তিনি বক্তিয়ারের বিহারবিজয়ের প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে (১২৪৩ খ্রিস্টাব্দে) নিজামুদ্দীন ও সামসুদ্দীন নামক বক্তিয়ারের সেনাদলভুক্ত দুই ভ্রাতার নিকট গল্প শুনিয়াছিলেন,–”বক্তিয়ার দুইশত অশ্বারোহী লইয়া দুর্গদ্বারে উপনীত হইবামাত্র বিহারজয় সুসম্পন্ন হয়।” অন্যান্য ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায়, বিহার জয় এরূপ অবলীলাক্রমে সম্পন্ন হয় নাই; দুই বৎসরের অবিশ্রান্ত বধ, যুদ্ধ ও লুণ্ঠনের পর বিহার বক্তিয়ারের করতলগত হইয়াছিল, এবং তাহাকে সম্পূর্ণরূপে অধিকারভুক্ত করিয়া মুসলমান শাসন প্রবর্তিত করিতে আরও একবৎসর অতীত হইয়াছিল। তিন বৎসরব্যাপী অসংখ্য সংগ্রাম কলহের বিস্তৃত বিবরণ প্রাপ্ত হইবার উপায় নাই; কিন্তু মুসলমানলিখিত ইতিহাসেও দেখিতে পাওয়া যায়–বিহাররক্ষাৰ্থ লক্ষ লক্ষ লোক জীবন বিসর্জন করিয়াছিল। অবশেষে তোরণ, প্রাচীর, দুর্গ, প্রাসাদ, সমস্ত চূর্ণবিচূর্ণ হইলে, বিহার বিজেতার করতলগত হয়। দুইশত অশ্বারোহীর এত কাৰ্য্য সম্পন্ন করা আরব্যোপন্যাসের গল্পে শোভা পায়; ইতিহাস তাহাকে সত্য ঘটনা বলিয়া গ্রহণ করিতে সম্মত হইবে না।

মিনহাজের ইতিহাসের অনুবাদক মেজর রাভাটি ও অধ্যাপক ব্লকম্যান উভয়েই সুলতানের সনন্দবলে বক্তিয়ারের রাজ্যবিস্তারের কথায় আস্থাস্থাপন করেন নাই। তাঁহারা বলেন,–বক্তিয়ার স্বতন্ত্রভাবেই দেশজয় করিয়াছিলেন; কেবল সুলতানের প্রজা বলিয়া তিনি উপটৌকনাদি প্রেরণ করিয়া মৌখিক অধীনতা স্বীকার করেন। যাহা হউক, বিহারবিজয়ের পর বক্তিয়ার খিলিজির সম্বন্ধে মিনহাজের গ্রন্থে আর একটি গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়; তাহা অনেক পরবর্তী মুসলমানলেখকের গ্রন্থে এবং বাঙালীর উপন্যাসে স্থান প্রাপ্ত হইয়া সুপরিচিত হইয়াছে। গোলাম হোসেন উক্ত কাহিনী এইরূপে বর্ণনা করিয়াছেন :

মহম্মদ বক্তিয়ার বিহার জয় করিয়া সুলতানের নিকট আগমন করিলেন এবং প্রধান-অমাত্যশ্রেণিভুক্ত হইলেন। তাঁহার অলোকসামান্য বীরকীৰ্ত্তি ও বর্ধমান সৌভাগ্যশ্রী সাম্রাজ্যের স্তম্ভতুল্য প্রধান রাজপুরুষগণেরও বিষম ঈর্ষার বিষয় হইয়া পড়িল। তাঁহারা বক্তিয়ারের সর্বনাশসাধনে একমত হইলেন। একদিন রাজসভায় বক্তিয়ারের শৌর্য্য ও কাৰ্যপটুতার বিস্ময়কর বিবরণ কথিত হইতেছিল, এমন সময়ে বক্তিয়ারের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ অমাত্যগণ কৌশলে তাঁহার ধবংসসাধনের নিমিত্ত সুলতানের নিকট একবাক্যে কহিলেন, ‘মহম্মদ বক্তিয়ার স্বীয় অসীম শক্তির পরিচয়প্রদানের জন্য মত্তহস্তীর সহিত যুদ্ধ করিতে ইচ্ছা করেন।’ কুতুবউদ্দীন বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,–’সত্যই কি বক্তিয়ার মনুষ্যের অসাধ্য-সাধনে ইচ্ছুক হইয়াছেন?’ গৌরবলোপভয়ে মুখতাবশত বক্তিয়ার তাহা অস্বীকার করিতে পারিলেন না। কিন্তু পরিশেষে জানিতে পারিলেন যে, তাঁহারই বিনাশসাধনের জন্য অমাত্যগণ এই চক্রান্ত করিয়াছেন। যাহা হউক, অতঃপর নির্দিষ্টদিবসে সন্ত্রান্ত ও সাধারণ জনগণ দরবারে উপস্থিত হইলেন। এক বলবান মত্তহস্তীকে সাদা কুঠীতে (কসবেসফেদ) উপস্থিত করা হইল। বক্তিয়ার সসজ্জ হইয়া গদাহস্তে হস্তীর সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া তাহার শুণ্ডে বিষম প্রহার করিলেন। সে আঘাতে চিৎকার করিয়া হস্তী রণভূমি ত্যাগ করিল। দর্শকগণ উচ্চৈঃধবনিতে বক্তিয়ারে বিজয়শ্রীর সম্বর্ধনা করিলেন। সুলতান কুতবউদ্দীন লোকাতীত পরাক্রম দর্শন করিয়া বিস্ময় ও আনন্দের সহিত বক্তিয়ারকে বহু মহার্ঘ উপহার ও প্রচুর অর্থ প্রদান করিলেন। সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষগণও সম্রাটের আদেশে বক্তিয়ারকে বহু অর্থ উপহার দিতে বাধ্য হইলেন। মহম্মদ বক্তিয়ার নিজ হইতে আরও কিছু অর্থ দিয়া ঐ সকল অর্থ ও দ্রব্যাদি সমাগত জনগণকে বিতরণ করিলেন। বক্তিয়ারের বীরত্ব ও মহত্ত্ব দর্শনে কুতবউদ্দীন বিহার ও লক্ষ্ণৌতির অধিকার তাঁহার হস্তে অৰ্পণ করিয়া নিশ্চিন্তমনে দিল্লী-অভিমুখে গমন করিলেন।

এই কাহিনীর মূল কোথায়, তাহা এতকাল পরে নির্ণয় করা অসম্ভব। ইহার মূলে কোনো সত্য থাকিলে, তাহা অতিরঞ্জিত আকারে ইতিহাসে স্থানলাভ করায়, তদ্বারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে সাহস হয় না। তথাপি তর্কস্থলে বলা যাইতে পারে, সুলতান কুতবউদ্দীন বিহার ও লক্ষ্মণাবতী জয়ের ভার প্রদানের জন্য অলৌকিক বীরত্বের অপেক্ষা করিতেছিলেন; বক্তিয়ার খিলিজি সেইরূপ বীর বলিয়া পরিচয় পাইবার পর তাঁহাকে সনন্দ দান করেন। এই অনুমান সত্য হইবে, তাহা বাঙালীর বাহুবলের ও বঙ্গবিজয়ে মুসলমানের পক্ষে অলৌকিক শৌর্যবীৰ্য্য প্রদর্শনের প্রয়োজন থাকা প্রকাশিত করে।

প্রকৃতভাবে দুই বৎসরের রণশ্রমে বিহার অধিকৃত হইলেও, দুইজন সৈনিকের অতিরঞ্জিত গল্পগুজবে মিনহাজ দুইশত অশ্বারোহীর দ্বারা বিহারবিজয় সুসম্পন্ন হওয়া লিপিবদ্ধ করিয়া ইতিহাসে যে অলৌকিকত্বের স্থানদান করিয়াছেন, বঙ্গবিজয়ের বর্ণনা করিবার সময়েও সেইরূপ সৈনিকের গল্পগুজব অবলম্বন করিয়া সপ্তদশ অশ্বারোহীর নবদ্বীপ-অধিকারের এক অসম্ভব কাহিনী ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। প্রকৃতিপ্রস্তাবে কতদিনে কি উপায়ে বঙ্গভূমির কোন অংশ অধিকার করিতে বক্তিয়ার খিলিজি কৃতকার্য হন, তাহার আলোচনা করিলে সপ্তদশ অশ্বারোহীর অলৌকিক বীরত্ব নিতান্ত গল্পগুজব বলিয়াই প্রতিভাত হয়।

যে কারণেই হউক, বিহারবিজয়ের পরেই যে বক্তিয়ার বাঙলার সনন্দলাভ করেন, সে কথা মুসলমানের ইতিহাসে সৰ্ব্ববাদিসম্মত ঐতিহাসিক সত্যরূপে স্বীকৃত। এই সনন্দ লাভ করিবার সময়ে বঙ্গভূমি স্বাধীন; লক্ষ্মণাবতী বা গৌড় সে স্বাধীনরাজ্যের ভারতবিখ্যাত রাজধানী; তজ্জন্য বক্তিয়ারের সনন্দে নবদ্বীপের পরিবর্তে লক্ষৌতী অর্থাৎ লক্ষ্মণাবতীর উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই লক্ষ্মণাবতী অধিকারের জন্যই সনন্দ প্রদত্ত হয়। নবদ্বীপ রাজধানী থাকিলে সনন্দে নবদ্বীপের নামই উল্লিখিত হইত।

লক্ষ্মণাবতী উত্তরবঙ্গের সুবিখ্যাত রাজধানী। তাহার পশ্চিমে মিথিলা এবং কান্যকুজান্তৰ্গত জয়চন্দ্রের কাশীরাজ্য। জয়চন্দ্রের রাজ্য ইতিপূৰ্ব্বে মুসলমানের অধিকারভুক্ত হওয়ায়, মিথিলার সীমা পর্যন্ত মুসলমানসেনার আক্রমণপথ পরিষ্কৃত হইয়াছিল। বিহার এবং মুঙ্গের মুসলমানের করতলগত হওয়ায়, লক্ষ্মণাবতীর নিতান্ত নিকটবর্তী স্থানে সেনাসমাবেশ করিবারও সুযোগ উপস্থিত হইয়াছিল। নবদ্বীপ-আক্রমণের পক্ষে এরূপ সুযোগ বর্তমান ছিল না। তাহা বাগড়ীর অন্তর্গত বলিয়া, উত্তরে লক্ষ্মণাবতী ও পশ্চিমে রাঢ়রাজ্য দ্বারা স্বভাবতই সুরক্ষিত ছিল। প্রথমে উত্তরবঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গ অধিকার না করিলে, নবদ্বীপ আক্রমণ ও অধিকার করিবার উপায় ছিল না। সুতরাং বঙ্গভূমির মধ্যে প্রথমে নবদ্বীপ মুসলমান কর্তৃক সহসা আক্রান্ত হওয়ার কথা নিতান্তই রচা-কথা। বক্তিয়ার জীবিত থাকিতে রাঢ় অধিকার করিতে না পারায়, তাঁহার দ্বারা নবদ্বীপ অধিকৃত হওয়ার কাহিনীও নিতান্ত অবিশ্বাসজনক বলিয়া বোধ হয়। নবদ্বীপে রাজধানী থাকা সত্য হইলে, মুসলমানবীর বক্তিয়ার খিলিজি নবদ্বীপেই রাজধানী স্থাপন করিতেন। কিন্তু মুসলমানের ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায়, লক্ষ্মণাবতীতেই মুসলমানের প্রথম রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। অতঃপর বক্তিয়ার খিলিজি যে যে স্থানে যুদ্ধকলহে লিপ্ত হইয়াছিলেন, সে সমস্তই উত্তরবঙ্গে, মুসলমানগণ দেশজয় করিয়া পাত্রমিত্র ও সেনানায়কগণকে জায়গীর দিয়া দেশ শাসন করিতেন; উত্তরবঙ্গেই এইরূপ অতি পুরাতন মুসলমান জায়গীরের সন্ধান প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই প্রদেশ প্রথমে মুসলমানের করতলগত হইলেও, সহসা সমস্ত স্থান অবলীলাক্রমে অধিকৃত হয় নাই; দ্বাদশ বৎসরের আক্রমণ ও রণকোলাহলেও উত্তর ও পূৰ্ব্বাংশ স্বাধীন থাকিয়া বক্তিয়ারের অলৌকিক শৌর্যবীৰ্য প্রতিহত করিতে সক্ষম হইয়াছিল। মুসলমানের ইতিহাস অবলম্বন করিয়া এখনও তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ সঙ্কলন করা যাইতে পারে।

২.

অতি পুরাকাল হইতে পৌণ্ড্রবর্ধনরাজ্যের সুখৈশ্বর্য্যের কথা ভারতবর্ষে সুপরিচিত ছিল। পদ্মাবতীর তীরবর্তী উত্তরবঙ্গের উৰ্ব্বরক্ষেত্ৰ ধনধান্যে পরিপূর্ণ বলিয়া পার্বত্য অসভ্যজাতির উপদ্রবের অভাব ছিল না। তাহারা সময়ে সময়ে উত্তর ও পূৰ্বাঞ্চল হইতে সহসা আপতিত হইয়া দেশলুণ্ঠন করিয়া পলায়ন করিত। এই উপদ্রব নিবারণের জন্য উত্তরবঙ্গের অধিপতিকে নিয়ত যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকিতে হইত। উত্তরবঙ্গের পূৰ্ব্বাংশে সেকালের কামরূপরাজ্য করতোয়া-নদীর পূর্ধ্বতীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কামরূপের সহিত পৌণ্ড্রবর্ধনরাজ্যের যুদ্ধবিগ্রহের অভাব ছিল না। এই সকল বিপ্লবে নিয়ত বিপর্যস্ত হইয়া উত্তরবঙ্গ দীর্ঘকাল শান্তিসুখে বঞ্চিত থাকিয়া গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়। তৎকালে বিহার, মিথিলা, রাঢ়, বাগঢ়ী, বঙ্গ ও বরেন্দ্র এক শাসনক্ষমতার অধীন হইয়া আৰ্যাবৰ্ত্তের পূৰ্ব্বপ্রান্তের বিখ্যাত সাম্রাজ্য বলিয়া পরিচিত হইয়াছিল। এই সাম্রাজ্যের শাসনকৌশল ও বাহুবলের কথা এখনও কোনো কোনো পুরাতন খোদিতলিপিতে দেখিতে পাওয়া যায়। সে সকল কবিতানিবদ্ধ সুখপাঠ্য বর্ণনায় নানা অতিশয়োক্তি প্রবিষ্ট হইয়া থাকিলেও, তাহার মূলে কিছু-না-কিছু সত্যসংস্রব থাকা অসম্ভব হইতে পারে না। কিন্তু গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের এই প্রবল প্রতাপ দীর্ঘকাল অক্ষুণ্ণভাবে বর্তমান থাকা বিশ্বাস করা যায় না। পাল-নরপালগণের সহিত সেন-ভূপালগণের সাম্রাজ্য লইয়া যে যুদ্ধকলহের সূত্রপাত হয়, তাহাতে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য আবার বিপ্লবের লীলাভূমি হইয়া উঠিয়াছিল। অবশেষে পাল-নরপালগণের গৌড়ীয় সাম্রাজ্য সেনবংশোদ্ভব ভূপতিবর্গের করতলগত হয়। তাঁহারাই গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের শেষ স্বাধীন নরপতি বলিয়া ইতিহাসে সুপরিচিত। কিন্তু কোন সেনভূপতির শাসনসময়ে বক্তিয়ার খিলিজি বঙ্গদেশে পদার্পণ করেন, তাহা অদ্যাপি নিঃসংশয়িতরূপে নির্ণীত হয় নাই। সাধারণত লক্ষ্মণ সেনের শাসনসময়ে এই বিপ্লব সংঘটিত হইবার কথা ইতিহাসে যাহা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করা সহজ নহে। কারণ লাক্ষ্মণ্য নামক কোনো সেনবংশীয় নরপালের এ দেশের সিংহাসনে আরোহণ করিবার কোনো প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায় না।

সেনরাজবংশের ইতিহাস ক্রমে জনশ্রুতিমাত্রে পরিণত হইয়াছে। তাঁহারা কি সূত্রে কোন সময়ে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যে অধিকারবিস্তার করিয়া কীরূপে এদেশ হইতে অধিকারচ্যুত হন, তাহার সকল কথাই এখন উপকথার ন্যায় নিতান্ত বিস্বয়াবহ হইয়া উঠিয়াছে। ঘটক ও কুলজ্ঞগণের গ্রন্থে এই রাজবংশের যে সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়, তদ্বারা ঐতিহাসিক অনুসন্ধিৎস্য পরিতৃপ্ত হয় না। এ পৰ্য্যন্ত যে সকল পুরাতন লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা ভিন্ন আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বর্তমান নাই। ঐ সকল প্রাচীনলিপি অবলম্বন করিয়া বিচারে প্রবৃত্ত হইলে দেখা যায়, কর্ণাটক্ষত্রিয়বংশে চন্দ্রবংশীয় বীরসেন নামক কোনো ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করেন; তাঁহারই বংশধরগণ কালক্রমে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের অধীশ্বর হইয়াছিলেন। এই বীরসেন কোন সময়ে প্রাদুর্ভূত হন, তিনি কখনও এ দেশে পদার্পণ করিয়াছিলেন কি না, এ সকল বিষয়ে প্রাচীনলিপিতে কোনো পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায় না। তথাপি কেহ কেহ অনুমানবলে বীরসেনকে আদিশূর বলিয়া কল্পনা করিতে ত্রুটি করেন নাই। সমস্ত পুরাতন-লিপিতে বীরসেন সেনবংশের সুবিখ্যাত আদিপুরুষ বলিয়া উল্লিখিত; কিন্তু তিনি কোন পুরাকালে বর্তমান ছিলেন, তাহার পরিচয় কোনো স্থানে প্রাপ্ত হওয়া যায় না।

লক্ষ্মণসেনদেব যে সকল তাম্ৰশাসন খোদিত করাইয়াছিলেন, তাহাতে বীরসেনের নাম প্রাপ্ত হওয়া যায় না। তিনি চন্দ্রবংশের সুবিখ্যাত নৃপতিকুলে সেনরাজবংশের ক্ষেত্রস্বরূপ হেমন্তসেনের জন্মগ্রহণ করিবার কথা লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। যথা :

সেবাবনম্রপকোটিকিরীটরোচি। রম্বুল্লসৎপদনবদ্যুতিবল্লরীভিঃ। তেজোবিষজ্বরমুযযা দ্বিষতামভুবন ভূমিভুজঃ ফুটমথৌষধিনাথবংশে। আকৌমারবিকস্বরৈদিশি দিশি প্রস্যন্দিভিৰ্দোৰ্যশঃ প্রালেয়ৈ রিপুরাজবত্ত নলিনম্লানীঃ সমুন্মীলয়ন। হেমন্তঃ স্ফুটমে সেনজননক্ষেত্রৌঘপুণ্যাবলী শালিশ্লাঘ্যবিপাকপীবরগুণস্তেষামভূদ্বংশজঃ৷৷

এই হেমন্তসেনের পুত্রের নাম বিজয় সেন। তিনি “বিজয়ী” বিশেষণে বর্ণিত হইয়াছেন। বিজয়সেনদেব রাজসাহীর অন্তর্গত বরেন্দ্রভূমে প্রদ্যুম্নেশ্বরনামক-শিব মন্দির প্রতিষ্ঠিত করিয়া তাহাতে যে ফলকলিপি সংযুক্ত করিয়াছিলেন, তাহা আবিষ্কৃত হইয়া এসিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক সুরক্ষিত হইয়াছে। উক্ত ফলকলিখিত কবিতাবলী সুবিখ্যাত উমাপতির রচিত বলিয়া ফলকে খোদিত আছে। তদনুসারে বিজয়সেনদেবের বরেন্দ্রভূমে অধিকার স্থাপন করা জানিতে পারা যায়। বিজয়সেনের পুত্র স্বনামখ্যাত বল্লালসেন যে “দানসাগর” নামক গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে পিতা বিজয়সেনের বরেন্দ্রভূমে প্রাদুর্ভূত হইবার কথা লিখিত আছে। এই সকল কারণে লক্ষ্মণসেনের তাম্রশাসনে বিজয়সেনকে “বিজয়ী” বলিবার বিশেষ কারণ থাকা অনুমান করিতে হয়। এই সকল পুরাতন লিপি সমালোচনা করিয়া স্পষ্টই দেখিতে পাওয়া যায়,–সেনরাজবংশের বিজয়সেনদেবই বরেন্দ্রবিজয়ী প্রথম নরপতি। তাঁহার পুত্র বল্লাল ও পৌত্র লক্ষ্মণ সেন গৌড়রাজ্য সম্পূর্ণরূপে করতলগত করিয়া গৌড়েশ্বর উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। বিজয়সেনও গৌড়েশ্বর উপাধি গ্রহণ করেন, কিন্তু তখনও সমগ্র গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য পালবংশের অধিকারচ্যুত হইয়াছিল বলিয়া বোধ হয় না।

সেনরাজবংশের বিবিধ পুরাতন-লিপি আলোচনা করিয়া যে ঐতিহাসিক তথ্য লাভ করা যায়, তাহাতে বিজয়, বল্লাল ও লক্ষ্মণসেনের সময়ে সেনসাম্রাজ্যের অ্যুদয়ের পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। লক্ষ্মণসেনের সময় কাশীরাজ্য পৰ্য্যন্তও যে তাঁহার প্রবল প্রতাপ জয়যুক্ত হইয়াছিল, লক্ষ্মণসেনের পুত্র বিশ্বরূপ সেনের তাম্রশাসনে তাহারও পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। বিশ্বরূপের তাম্রশাসনে “স গর্গবনান্বয়প্রলয়কালরুদ্ৰো নৃপঃ” বলিয়া বর্ণনা পাঠ করিয়া স্বীকার করিতে হয়, –লক্ষ্মণের পুত্র বিশ্বরূপের সঙ্গে ঘোরীবংশীয়দিগের যুদ্ধকলহ উপস্থিত হইয়া বিশ্বরূপ জয়লাভ করিয়াছিলেন এবং যবনগণ তাঁহাকে প্রলয়কালরুদ্ররূপে দর্শন করিতেন। মুসলমানের ইতিহাসে স্পষ্টত ইহার উল্লেখ না থাকিলেও, প্রকারান্তরে এই কথা স্বীকৃত হইয়াছে। কারণ মুসলমানলেখক মিনহাজউদ্দীন বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গাগমনের ষষ্টিবৎসর পরে এদেশে পদার্পণ করিয়া তখনও পূর্ববঙ্গ সেনরাজবংশের অধিকারভুক্ত আছে, দেখিয়া গিয়াছেন। বাহুবলে বক্তিয়ার খিলিজির আক্রমণ প্রতিহত করিতে না পারিলে, ইহা কদাচ সম্ভব হইত না।

লক্ষ্মণসেনের পর তদীয় পুত্রগণের শাসন সময়েই যে বক্তিয়ার খিলিজি এদেশে অধিকার বিস্তারের আয়োজন করেন, পুরাতন লিপি অনুসরণ করিলে তাহাই বিশ্বাস করিতে হয়। কোন সময়ে বক্তিয়ার প্রথমে এই কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন, তাহাই এক্ষণে বিশেষভাবে আলোচনা করা আবশ্যক।

মুসলমানলিখিত ইতিহাসে খৃষ্টীয় ১২০৫ সালের সমকালে বক্তিয়ার খিলিজির নিহত হইবার কথা দেখিতে পাওয়া যায়; তৎপূৰ্ব্বে তাঁহার দ্বাদশবৎসরকাল বঙ্গদেশ শাসন করিবার কথাও দৃষ্ট হইয়া থাকে। এই বর্ণনা সত্য হইলে, বক্তিয়ার খিলিজির ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশে পদার্পণ করা স্বীকার করিতে হয়। কিন্তু মুসলমান-ইতিহাস সমালোচনা করিয়া বিশেষজ্ঞ মহাত্মা বিভারিজ ও অন্যান্য পণ্ডিতবর্গ ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দের সমসময়ে বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গাগমনের কাল নির্দেশ করিয়াছেন।

সুলতানের নিকট হইতে লক্ষ্মণাবতী অধিকার করিবার ক্ষমতাপত্র পাইবার দ্বাদশবৎসর পরে বক্তিয়ার খিলিজির মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া অনুমান করিতে পারিলে, সামঞ্জস্য রক্ষিত হইতে পারে। তদনুসারে ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে পরলোকগমন স্থির করিতে হয়। ইহাতে বঙ্গাগমনের উদ্যোগে ৫৬ বৎসর অতিবাহিত হওয়া স্বীকার করিতে হয়। তাহার সহিত অষ্টাদশ অশ্বারোহীর বঙ্গবিজয়কাহিনীর সামঞ্জস্য নাই।

এই দ্বাদশ বৎসরের ইতিহাসই প্রকৃতপক্ষে বিশেষভাবে অনুসন্ধান করা আবশ্যক। মিথিলাদেশ একদা গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল; তথায় অদ্যাপি লক্ষ্মণসেনের সংবৎ প্রচলিত আছে। ১১১৯ খ্রিস্টাব্দ হইতে উক্ত সংবৎ প্রচলিত হওয়া অনেকে সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন। তাহা সত্য হইলে, ৮০ লক্ষ্মণ সংবতের সমসময়ে বক্তিয়ারের বঙ্গদেশে পদার্পণ করা স্বীকার করিতে হয়। মিনহাজের গ্রন্থেও এই কথাই লিখিত আছে। মিনহাজ বলেন, এই সময়ে লক্ষ্মণসেন জীবিত ছিলেন। তাহা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া বোধ হয় না। কারণ, লক্ষ্মণসেনদেবের পরিণত বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করিবার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। বল্লাল ও লক্ষ্মণসেনের বিরচিত যে সকল কবিতা অদ্যাপি বিলুপ্ত হয় নাই, তাহাতে এই প্রমাণ দেদীপ্যমান। সুতরাং লক্ষ্মণসেনের পরিণতবয়সে সিংহাসনে আরোহণ করিয়া ৮০ বৎসর রাজ্যভোগ করা সত্য হইলে, তাঁহার পরমায়ু অত্যধিক হইয়া পড়ে।

বল্লালসেন ‘দানসাগর’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁহার পুত্র ও পৌত্রগণও কবি বলিয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছিলেন। লক্ষ্মণসেনদেবের মহাসামন্তাধিপতি বটুদাসের পুত্র শ্রীধরদাস ১২০৫ খৃষ্টাব্দের সমকালে নবদ্বীপে রাজকার্যে লিপ্ত থাকিয়া “সদুক্তি কর্ণামৃত” নামে যে কাব্যসংগ্রহ সঙ্কলিত করেন, তাহাতে লক্ষ্মণ ও তৎপুত্র মাধবসেনের কবিতা সন্নিবিষ্ট আছে। ১২০৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্তও নবদ্বীপ যে মুসলমানের করতলগত হয় নাই, ‘সদুক্তি-কর্ণামৃত”ই তাহার বিশিষ্ট প্রমাণ। লক্ষ্মণসেনের পুত্রদিগের মধ্যে মাধব, কেশব ও বিশ্বরূপের নাম সুপরিচিত। মাধবের নাম সদুক্তি কর্ণামৃতে, কেশবের নাম ঘটকদিগের গ্রন্থে ও বিশ্বরূপের নাম তাম্রশাসনে প্রাপ্ত হওয়া যায়। এই তিন পুত্র পিতৃরাজ্যের তিন বিভাগে রাজকার্য পরিচালনা করিতেন বলিয়া বোধ হয়। ঘটকদিগের গ্রন্থে কেশবের গৌড়ে প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা স্পষ্টই লিখিত আছে। মাধব রাঢ়ে ও বিশ্বরূপ বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কেশবের যবনাক্রমণ ভয়ে ব্রাহ্মণগণ সমভিব্যাহারে পলায়ন করা ঘটকগণের গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায়। মাধব বোধ হয় বক্তিয়ারের পরলোকগমনের পর পরাজিত হইয়াছিলেন; কিন্তু সে কথা কোনো গ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায় না। বিশ্বরূপ যবনাক্রমণ প্রতিহত করিয়া স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছিলেন। এই সকল প্রমাণের আলোচনা করিলে; বৃদ্ধ লক্ষ্মণসেনকে পলায়নকলঙ্কে কলঙ্কিত করিতে সাহস হয় না। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয়েও আস্থাস্থাপন করা কঠিন হইয়া উঠে। রাঢ় ও বরেন্দ্র জয় করিবার পূর্বে প্রথমেই নবদ্বীপ জয় করিবার কথাও বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া স্বীকার করা যায় না।

বাঙলার ইতিহাসের এই অংশ এখনও তমসাচ্ছন্ন। যে সকল তাম্রশাসন, প্রস্তরলিপি ও প্রাচীনপুস্তকে এই সময়ের ঐতিহাসিক তথ্য প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা, সেগুলি জনসমাজে সুপরিচিত না থাকায়, বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে নানা কথা লিখিত হইয়া থাকে।

গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের ইতিহাস সঙ্কলনের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইলে, যে সকল বিষয় অধ্যয়ন ও আলোচনা করা আবশ্যক, তাহা শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। যতদূর প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাতে লক্ষ্মণসেনদেবের শাসনকাল সেনরাজবংশের ইতিহাসের গৌরবোজ্জবল যুগ বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। এই যুগে ধর্মাধিকার হলায়ুধ, বৈয়াকরণ পুরুষোত্তম প্রভৃতি বিবুধমণ্ডলীর পাণ্ডিত্যে বরেন্দ্র দেশ ভারতবিখ্যাত হইয়াছিল; এই যুগে লক্ষ্মণসেনের বাহুবলে কাশী, কলিঙ্গ ও কামরূপ গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের অন্তর্নিবিষ্ট হয়। বক্তিয়ার খিলিজি এই বিপুল সাম্রাজ্যের উত্তরাংশমাত্র অধিকৃত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন;–তজ্জন্য লক্ষ্মণাবতীতেই মুসলমানদিগের প্রথম রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।

৩.

মহানন্দার পূৰ্ব্ব, করতোয়ার পশ্চিম, হিমাচলপদতলগত আরণ্য প্রদেশের দক্ষিণ এবং পদ্মাবতীর উত্তর,–এই চতুঃসীমান্তৰ্গত শ্রীপৌণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তঃপাতী স্থান “বরেন্দ্র” নামে পরিচিত ছিল। অদ্যাপি ইহার অনেক স্থান “বরেন্দ্র” নামেই পরিচিতি। ইহার পশ্চিমে মিথিলা এবং পূৰ্ব্বে কামরূপের রাজ্য। উত্তর ও পূৰ্বাঞ্চল হইতে বিবিধ পাৰ্ব্বত্য দস্যুদল নিয়ত বরেন্দ্রভূমির উৰ্ব্বরক্ষেত্রে আপতিত হইত। তাহাদের আক্রমণ নিবারণ করিবার জন্য করতোয়াতটে নানাস্থানে প্রান্তদুর্গ বর্তমান ছিল। অদ্যাপি বর্ধনকোট ও মহাস্থান নামক পুরাতন দুর্গের ধবংসাবশেষ করতোয়াতটে দেখিতে পাওয়া যায়।

মগধের পূৰ্ব্ব, সমতট বা বাগঢ়ীর পশ্চিম, মিথিলার দক্ষিণ ও ওড্রদেশের উত্তর, –এই চতুঃসীমান্তৰ্গত স্থান “রাঢ়” নামে পরিচিত ছিল, অদ্যাপি সেই নাম প্রচলিত আছে। রাঢ় দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চল হইতে আক্রান্ত হইত বলিয়া, তাহার নানাস্থানে গিরিদুর্গ ও বনদুর্গ বৰ্ত্তমান ছিল।

ব্রহ্মদেশের পূৰ্ব্ব, সমতটের পশ্চিম, কামরূপের দক্ষিণ ও বঙ্গোপসাগরের উত্তর,–এই চতুঃসীমান্তর্গত স্থান “বঙ্গ” নামে পরিচিত ছিল। পূৰ্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল হইতে আক্রান্ত হইবার আশঙ্কা থাকায়, বঙ্গবিভাগেও রণপোতাদি রক্ষিত হইত।

রাঢ়ের পূৰ্ব্ব, বঙ্গের পশ্চিম, বরেন্দ্রের দক্ষিণ এবং সমুদ্রের উত্তর, “এই চতুঃসীমার গর্ত স্থান “সমতট” অথবা “বাগঢ়ী” নামে পরিচিত ছিল। এই সমতট প্রদেশ স্বভাবত সুরক্ষিত বলিয়া, এই বিভাগে কোনো দুর্গাদি বর্তমান ছিল না। এই প্রদেশ অপেক্ষাকৃত আধুনিক।

গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যে বঙ্গ, রাঢ় ও বরেন্দ্র প্রদেশেই প্রাদেশিক রাজধানী সংস্থাপিত হইয়াছিল। সমতট প্রদেশে কখনও কোনো রাজধানী থাকার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায় না। উত্তরকালে কেবল কিছুদিনের জন্য সুন্দরবনান্তর্গত চন্দ্রদ্বীপে রাজধানী সংস্থাপিত হইয়াছিল।

এই সকল কারণে সমতটের অন্তর্গত নবদ্বীপে রাজধানী থাকিবার ইতিহাস বা প্রমাণ বা জনশ্রুতিও প্রাপ্ত হওয়া যায় না। মিনহাজ নিজেও তথায় কোনো রাজধানীর অস্তিত্ব দেখিয়া যান নাই। কেবল বক্তিয়ারের পার্শ্বচর মুসলমানসেনার নিকট গল্প শুনিবার সময় তাহারই মুখে নবদ্বীপে রাজধানী থাকার কথা শুনিয়াছিলেন। মিনহাজ বিচারে বা তথ্যানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলে, প্রকৃত তথ্য জ্ঞাত হইতে পারিতেন। কিন্তু তিনি বিচারবুদ্ধির আশ্রয়গ্রহণ আবশ্যক মনে করেন নাই। যেখানে যাহা শুনিয়াছিলেন, তাহাই লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।

সেনরাজবংশের রাজ্যবিস্তারের পূৰ্ব্বে রাঢ়, বরেন্দ্র, বঙ্গ ও সমতট পালরাজবংশের অধিকারভুক্ত ছিল। তাঁহাদের শাসনসময়ে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্যের নানা রাজধানীর নাম ও পরিচয় পুরাতন তাম্রশাসনে খোদিত হইয়াছিল। তাহাতে দেখা যায়, প্রথমাবস্থায় পাল-নরপালগণ তাঁহাদের ইতিহাসবিখ্যাত পাটলিপুত্রের পুরাতন রাজধানীতে বসিয়াই গৌড়রাজ্য শাসন করিতেন। পরে মুদগগিরি (মুঙ্গের) নগরে রাজধানী স্থানান্তরিত হইয়াছিল। তাহার পর গৌড়ান্তৰ্গত পৌণ্ড্রবর্ধন ও পৌণ্ড্রবর্ধনের নানা উপরিভাগে রাজধানী সংস্থাপিত হয়। কিন্তু পাল-নরপালবর্গের শাসনসময়েও সমতটের অন্তর্গত কোনো স্থানে কোনো রাজধানী সংস্থাপিত হওয়ার প্রমাণ নাই। নারায়ণপালের তাম্রশাসনে দেখা যায়, সমতটনিবাসী শিল্পী ঐ তাম্রশাসনে রাজাজ্ঞা উৎকীর্ণ করিয়াছিল। সেনরাজবংশের অধিকার বিস্তৃত হইয়া সমগ্র গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য তাঁহাদের করতলগত হইবার পর রাঢ়, বরেন্দ্র ও বঙ্গেই রাজধানী সংস্থাপিত হইয়াছিল। তাঁহারাও শ্রীবিক্রমপুরের পুরাতন রাজধানীকেই প্রধান রাজধানী মনে করিতেন।

বক্তিয়ার খিলিজির এদেশে উপনীত হইবার সমসময়ে, সমতটপ্রদেশে কোনো রাজধানী থাকিলে, তাহা জয় করিবার জন্য তাঁহাকে অবশ্যই চেষ্টা করিতে হইত। বক্তিয়ারের বঙ্গবিজয়সম্বন্ধে যতদূর জানিতে পারা সম্ভব, তাহাতে লক্ষৌর, লক্ষ্মণাবতী ও শ্রীবিক্রমপুর আক্রমণের চেষ্টাই জ্ঞাত হওয়া যায়। বক্তিয়ার জীবিত থাকিতে, লক্ষ্মণাবতী ভিন্ন আর কোনো গৌড়ীয় হিন্দুরাজধানী তাঁহার করতলগত হয় নাই। তিনি আর যেখানে গিয়াছেন, সেখানেই পরাস্ত হইয়া প্রত্যাগত হইয়াছেন। বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয় বলিতে কি বুঝিব, তাহা নির্ণয় করিতে হইলে, তাঁহার বঙ্গবিজয়সময়ে এ দেশের অবস্থা কিরূপ ছিল, তাহার আলোচনা করা আবশ্যক। যে সকল প্রমাণ অবলম্বন করিয়া এই আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতে হইবে, তাহা সংক্ষেপে উল্লিখিত হইতেছে।

১ প্রথম প্রমাণ : বিজয়সেনের প্রদ্যুম্নেশ্বরনামক-শিবমন্দিরের প্রস্তরফলকলিপি। ইহা উমাপতিনামক কবির রচিত বলিয়া লিখিত আছে। জয়দেব উমাপতির সমসাময়িক। জয়দেব লিখিয়া গিয়াছেন–”উমাপতি বাক্যকে বড় পল্লবিত করিয়া থাকেন।” উমাপতির এই রচনাতেও পল্লবিত বাক্যাবলীর নির্দশন প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু তাহার অভ্যন্তরে যে কিছুমাত্র ঐতিহাসিক সত্য নাই, এরূপ অনুমান নিতান্ত অসঙ্গত। উমাপতি বিজয়সেনকে বিজয়ী বীর বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। অন্যান্য প্রমাণেও ইহা দৃঢ়ীকৃত হইয়াছে। বিজয়সেন বীর না হইলে, পালবংশের অধিকৃত বরেন্দ্রপ্রদেশে রাজধানী ও রাজ্য সংস্থাপনে কৃতকার্য হইতেন না। সুতরাং অন্য প্রমাণ না থাকিলেও, তাঁহাকে বিজয়ী বীর বলিয়াই স্বীকার করিতে হয়। বিজয়সেন “গৌড়েশ্বর” উপাধি গ্রহণ করিলেও, তিনি যে সমগ্র গৌড়রাজ্য করতলগত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহা সত্য বলিয়া বোধ হয় না। সত্য হইলে, তিনি রাজশাহীর অন্তর্গত গোদাগাড়ীর নিকট বরেন্দ্রনামক স্তানে রাজধানীসংস্থাপন ও শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা না করিয়া, ইতিহাসবিখ্যাত পৌণ্ড্রবর্ধনের পুরাতন রাজধানীতেই সিংহাসনে উপবেশন করিতেন। কিন্তু প্রস্তরলিপিতে বিজয়সেন গৌড়, কলিঙ্গ ও কামরূপ জেতা বলিয়া বর্ণিত। যথা :

“ত্বং নান্যবীরবিজয়ীতি গিরঃ কবীনাং

শ্রুত্বান্যথামননরূঢ়নিগুঢ়দোষঃ।

গৌড়েন্দ্ৰমদ্রবদপাকৃতকামরূপ–

তুপং কলিঙ্গমপি যস্তরসা জিগায়।”

২ দ্বিতীয় প্রমাণ : বল্লালবিরচিত ‘দানসাগর” নামক গ্রন্থের পরিচয়শ্লোকাবলী। তাহাতে বিজয়সেনদেবের বরেন্দ্রে প্রাদুর্ভুত হইবার কথা লিখিত আছে। বিজয়সেন যে সমগ্ৰ গৌড়রাজ্য করতলগত করিতে পারেন নাই, “দানসাগরের” শ্লোকই তাহার বিশিষ্ট প্রমাণ। যথা :

“হেমন্তঃ পরিপন্থিপঙ্কজসরঃ স্বর্গস্য নৈসর্গিকৈ

রুদগীতঃ ঋগণৈরুদাত্তমহিমা হেমন্তসেনোহজনি।’’

“তদনু বিজয়সেনঃ প্রাদুরাসীৎ বরেন্দ্রে

দিশি বিদিশি ভজন্তে যস্য বীরধবজত্বম।”

ইহাতে বিজয়সেন বীর ও বিজয়ী বলিয়াই প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। তিনি বরেন্দ্রে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন–সমগ্র গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য অধিকার করিতে পারেন নাই।

৩ তৃতীয় প্রাণ : লক্ষ্মণসেনদেবের বিবিধ তাম্রশাসন। ইহাতে বিজয়সেনের রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, জানিতে পারা যায়। এ পর্যন্ত লক্ষণসেনদেবের যতগুলি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হইয়াছে, তন্মধ্যে তদীয় রাজ্যাব্দের সপ্তমবর্ষ পৰ্যন্ত তাঁহার শ্রীবিক্রমপুরের রাজধানীতে থাকার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়।

এই সকল তাম্রশাসনে বিজয়সেন “বিজয়ী” এবং বল্লালসেন “সংগ্রামাবতার” বলিয়া কীৰ্ত্তিত। বল্লালই যে সেনরাজবংশের নরপতিবর্গের মধ্যে গৌড়ে রাজধানীসংস্থাপনের পথপ্রদর্শক, গৌড়ের ধবংসাবশেষের মধ্যে বল্লালবাড়ীনামক স্থান অদ্যাপি তাহার সাক্ষ্যদান করিতেছে। লক্ষ্মণসেনদেবের যে তাম্রশাসন মাধাইনগরে প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে, তাহাতে তিনি ‘গৌড়েশ্বর’ বলিয়া আপনার পরিচয়প্রদান এবং কাশীরাজের সহিত সন্ধিস্থাপনের উল্লেখ করিয়াছেন।

৪ চতুর্থ প্রমাণ : লক্ষ্মণসেনের পুত্র বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসন। ইহাতে বিজয় সেন, বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন গৌড়েশ্বর বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইলেও, তাঁহাদের ভিন্ন ভিন্ন উপাধির উল্লেখ আছে। তাহা কবিকল্পনামাত্র বলিয়া প্রত্যাখ্যান করা যায় না। তাহা অবশ্যই কোনো-না-কোনো ঐতিহাসিক তথ্য সুব্যক্ত করিত। উপাধিগুলি এইরূপে কীৰ্ত্তিত, যথা :

১ অরিরাজবৃষভশঙ্কর গৌড়েশ্বর শ্রীমদ্বিজয়সেনদেব।

২ অরিরাজনিঃশঙ্কশঙ্কর গৌড়েশ্বর শ্রীমদ্বল্লালসেনদেব।

৩ অরিরাজমদনশঙ্কর গৌড়েশ্বর শ্রীমল্লক্ষ্মণসেনদেব

এই তিন বিখ্যাত নরপতির মধ্যে লক্ষ্মণসেনদেবের পরিচয়স্বরূপ আরও একটি উপাধির উল্লেখ আছে। লক্ষ্মণসেন “অশ্বপতি-গজপতি-নরপতি রাজত্রয়াধিপতি” বলিয়া পরিকীর্তিত। লক্ষ্মণসেনদেবের শ্রীক্ষেত্রে, কাশীধামে ও প্রয়াগেও “সমরজয়স্তম্ভমালা” স্থাপন করিবার কথা এই তাম্রশাসনে উল্লিখিত আছে। এই কয়েকটি প্রমাণে বিজয়সেন, বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেনের শাসনসময়ে সেনরাজ্যের শৌর্যবীৰ্য্য ও বিজয়কাহিনীর পরিচয় পাওয়া যায়, এবং লক্ষ্মণসেনদেবই যে বাহুবলের জন্য সর্বাপেক্ষা প্রশংসিত ছিলেন, তাহারও প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। ইহা বিশ্বরূপসেনের রাজ্যাব্দের চতুর্দশবর্ষীয় লিপি; তখন লক্ষ্মণসেন স্বর্গারূঢ় ও যবনগণ বিশ্বরূপের নিকট পরাভূত; বিশ্বরূপ তাঁহাদের পক্ষে “প্রলয়কালরুদ্র” নামে পরিচিত। লক্ষ্মণসেন নিতান্ত কাপুরুষের ন্যায় রাজ্য, রাজধানী ও রাজধৰ্ম বিসৰ্জন করিয়া, প্রাণ লইয়া অন্তঃপুর হইতে পলায়নের জন্য ব্যাকুল ছিলেন কি না, তাহার বিচার করা অনাবশ্যক। মুসলমান ইতিহাসলেখক রায়-লছমণিয়া নামক নরপতির স্কন্ধেই পলায়নকলঙ্ক নিক্ষেপ করিয়া গিয়াছেন। এই রায় লছমণিয়া কে ছিলেন? পুরাতত্ত্ববিৎ জেমস প্রিনসেফ প্রথমে এই অনুসন্ধানকার্যে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি সেনরাজবংশের নরপতিবর্গের এক নামাবলী স্থির করিয়া যান। তাহা এইরূপ :

খৃষ্টাব্দ – নরপতির নাম

১০৬৩ বিজয়সেন

১০৬৬ বল্লালসেন

১১১৬ লক্ষ্মণসেন

১১২৩ মাধবসেন

১১৩৩ কেশবসেন

১১৫১ সদাসেন

১১৫৪ নারায়ণ

১২০০ লছমণিয়া

এই তালিকা অনুসারে লছমণিয়া লক্ষ্মণ সেনের বহুপরবর্তী নরপতি বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছিলেন। ইহার পর স্যার আলেকজাণ্ডার কানিংহাম কতকগুলি তাম্রশাসন, প্রস্তরলিপি ও আইন আকবরি অবলম্বনে আর একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। তাহা এইরূপ :

খৃষ্টাব্দ – নরপতির নাম

১০২৫ বিজয়সেন

১০৫০ বল্লালসেন

১০৭৬ লক্ষ্মণসেন

১১০৬ মাধব সেন

১১০৮ কেশবসেন

১১১৮ লছমণিয়া

১১৯৮ বক্তিয়ারের বঙ্গবিজয়

এই তালিকা অনুসারেও লছমণিয়া লক্ষ্মণসেনের বহুপরবর্তী নরপতি বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়াছিলেন। মিনহাজ বলেন, লছমণিয়ার রাজ্যাব্দের ৮০ অব্দে বক্তিয়ার বঙ্গদেশে উপনীত হন। মিথিলাদেশে “লক্ষ্মণাব্দ” নামে এক অব্দ প্রচলিত আছে। খৃষ্টীয় ১১১৯ সাল তাহার আরম্ভকাল। এই প্রমাণ অবলম্বনে বক্তিয়ারের বঙ্গদেশে আগমন ৮০ লক্ষ্মণাব্দে অনুমিত হইলে, কেহ কেহ বলিয়াছিলেন–লছমণিয়াই লক্ষ্মণ সেন। ৮০ বৎসর রাজ্যভোগ করা সচরাচর দেখিয়ে পাওয়া যায় না। লক্ষ্মণসেন পরিণত বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করায়, তাঁহার ১১৯৮ খৃষ্টাব্দে জীবিত থাকা অসম্ভব হইয়া পড়ে। তদীয় রাজ্যাব্দের ৮০ সালে বক্তিয়ারের বঙ্গদেশে উপনীত হওয়া সত্য হইলেও, তৎকালে লক্ষ্মণসেনের জীবিত থাকা সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যায় না।

কিন্তু এই অনুমানই ক্রমে ক্রমে বঙ্গসাহিত্যে ইতিহাস বলিয়া প্রচারিত হইয়াছে। এখন লক্ষ্মণসেনের পুত্ৰ পৰ্যন্ত সেনরাজবংশের নরপতিবর্গের নামাবলী বিবিধ তাম্রশাসনে আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং লক্ষ্মণসেনের পুত্র বিশ্বরূপের যবনসমরে বিজয়ী প্রলয়কালরুদ্র বলিয়া পরিচিত থাকাও প্রকাশিত হইয়াছে। ইহাতে লছমণিয়া যে প্রকৃত নাম নহে, তাহার প্রমাণ প্রাপ্ত হইবামাত্র, কেহ কেহ ঐ নাম, সংশোধনের চেষ্টা করিয়া উহাকে লাক্ষণ্য-আখ্যা প্রদান করেন। লাক্ষ্মণ্য নামও মনঃপুত বা ব্যাকরণসম্মত হইল না; তখন লছমণিয়া “লক্ষ্মণসেন” বলিয়াই অনুমিত হইলেন। এই অনুমান বিগত অর্ধশতাব্দীর মধ্যে বঙ্গসাহিত্যে নানারূপ কবিকল্পনার প্রশ্রয়দান করিয়াছে। সর্বাপেক্ষা আধুনিক কবিতা কবিবর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মহাশয়ের লেখনীপ্রসূত। পরিহাসরসিক দ্বিজেন্দ্রলালের রচনাকৌশল লক্ষ্মণসেনদেবকে সভ্যজগতে নিরবচ্ছিন্ন ঘৃণার পাত্র করিয়া তুলিয়াছে :

“–এই সেই নবদ্বীপ,

সেইখানে বীর আৰ্যকুলের প্রদীপ

বঙ্গেশ লক্ষ্মণসেন, প্রবৃত্ত আহারে,

শুনি সপ্তদশ সেনা উপনীত দ্বারে,

অত্যদ্ভুত-প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব-সহিত,

পশ্চাদ্বার দিয়া, নৌকারূঢ় পলায়িত,–

একেবারে না চাহিয়া দক্ষিণে ও বামে,

একেবারে উপনীত বারাণসীধামে।”

কবিকুল নিরঙ্কুশ : স্বদেশের স্মরণীয় বীরচরিত্র বিকৃত করিবার সময়েও নিরঙ্কুশ! এতই নিরঙ্কুশ যে,–প্রাণভয়ে ভীত পলায়ন-পরায়ণ লক্ষ্মণসেন মুসলমানসেনার আক্রমণে দূরে পলায়ন না করিয়া, মুসলমানের নবাধিকৃত বারাণসীধামে গমন করায়, কাব্য যে কতখানি অসঙ্গত হইয়া উঠিল, তাহার প্রতিও হৃক্ষেপ নাই!

দ্বিজেন্দ্রলালের পূৰ্ব্বে নবীনচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রও লক্ষ্মণসেনকেই পলায়নের কলঙ্কে কলঙ্কিত করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু নবীনচন্দ্র ইহা লইয়া পরিহাসপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করেন নাই; মর্মবেদনা প্রকাশ করিয়াছেন। বঙ্কিমচন্দ্র সে মর্মবেদনার যথাসাধ্য উপশম সাধনার্থ পশুপতির বিশ্বাসঘাতকতা কল্পনা করিয়া যে আসনে একদিন হলায়ুধ উপবেশন করিতেন, তথায় পশুপতি উপবিষ্ট বলিয়া আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। বলা বাহুল্য, এস্থলে পশুপতির নাম গৃহীত না হইলেই ভাল হইত। হলায়ুধের জ্যেষ্ঠের নামই পশুপতি। তিনি বিবিধশাস্ত্রবিশারদ সাধুব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার স্মৃতি বড় নির্দয়রূপে বঙ্গসাহিত্যে পদবিদলিত হইয়াছে।

রেন্দ্রভূমি সেনরাজবংশের আদিরাজ্য ছিল না। বিজয় বল্লাল ও লক্ষ্মণ ক্রমে ক্রমে তাহা পাল-নরপালগণের নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়াছিলেন। বক্তিয়ারের আগমন সময়ে এই প্রদেশে সেনরাজবংশের সুদৃঢ় শাসন প্রতিষ্ঠিত না থাকায়, লক্ষণের পুত্রগণ আদি রাজ্যরক্ষার্থে বরেন্দ্র পরিত্যাগ করায়, বক্তিয়ার তাহা কুড়াইয়া পাইয়াছিলেন। বঙ্গরক্ষাই লক্ষ্মণের পুত্রগণের লক্ষ্য ছিল, তাহাতে তাঁহাদের সম্পূর্ণরূপে কৃতকার্য হইবার কথা মুসলমানের ইতিহাসেই দেখিতে পাওয়া যায়। এরূপ অবস্থায় বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয়ে সেনরাজবংশীয় কোনো নরপতিরই কলঙ্ক ঘোষিত হইতে পারে না। ঘটকদিগের গ্রন্থে যে পুরাতন জনশ্রুতি লিপিবদ্ধ আছে, তদনুসারে লক্ষ্মণসেনের পুত্র কেশবসেনের গৌড়রাজ্য পরিত্যাগ করিবার প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু কেশবসেন গৌড়রাজ্য পরিত্যাগ করিলেও, রাঢ় ও বঙ্গ পরিত্যক্ত হয় নাই। বক্তিয়ার খিলিজি পরিত্যক্ত গৌড়বিভাগই অধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন; অপরিত্যক্ত রাঢ় ও বঙ্গবিভাগ অধিকার করিবার জন্য তাঁহাকে দীর্ঘকাল যুদ্ধ করিয়া পরিশ্রান্ত হইতে হইয়াছিল। রাঢ় বক্তিয়ার খিলিজির জীবিত থাকা পর্যন্ত অধিকৃত হয় নাই; বঙ্গ বক্তিয়ার খিলিজির মৃত্যুর পর অর্ধশতাব্দী পর্যন্তও অধিকৃত হয় নাই;–তাহার প্রমাণ মুসলমানের ইতিহাসেই প্রাপ্ত হওয়া যায়। বঙ্গকবি পলায়নকলঙ্কের সরস কবিতায় বঙ্গসাহিত্য পূর্ণ করিয়াছেন; কীৰ্ত্তিকাহিনী ঘোষণা করিবার জন্য লেখনী চালনা করেন নাই।

লক্ষ্মণসেন দুৰ্ব্বলহস্তে রাজদণ্ড ধারণ করেন নাই। তাঁহার শাসনসময়ে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য দক্ষিণ ও পশ্চিমে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হইবার প্রমাণ পাওয়া যায়। অদ্যাপি মিথিলাদেশে “লক্ষ্মণ-সংবৎসর” প্রচলিত থাকিয়া লক্ষ্মণসেনের রাজ্যবিস্তারের পরিচয় প্রদান করিতেছে। বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে লিখিত আছে

“বেলায়াং দক্ষিণাদ্ধের্ম সলধরদাগাণিংবাসবেদ্যাং

ক্ষেত্রে বিশ্বেষরস্য ফুরদসিবরণ্যশ্লেগঙ্গোৰ্মিভাজি।

তীরোৎসঙ্গে ত্রিবেণ্যাঃ কমলভবমধারনিাজপুতে

যেনোচ্চৈর্যজ্ঞ্যুপৈঃ সহ সমরজয়স্তম্ভমালা ন্যধারি।”

এই বর্ণনার সহিত লক্ষ্মণসেনদেবের “অশ্বপতি-গজপতি-নরপতি রাজত্রয়াধিপতি” নামক সুদীর্ঘ উপাধির সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য দেখিতে পাওয়া যায়। এই সুবিস্তৃত গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য যে প্রণালীতে শাসিত হইত, তাম্রশাসনে তাহার কিছু কিছু পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। লক্ষ্মণশাসনসময়ে গৌড়ীয় হিন্দুসাম্রাজ্য যে সুরক্ষিত ছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চল হইতে মিথিলার পথে কেহ আক্রমণ করিলে, তাহার গতিরোধের কোনো উপায় ছিল না। বনদুর্গে ও গিরিদুর্গে রাঢ়ের পশ্চিমাঞ্চল সুরক্ষিত ছিল; করতোয়ার প্রবল প্রবাহ এবং করতোয়াতাটাবস্থিত প্রান্তদুর্গ উত্তরবঙ্গের পূর্বাঞ্চল সুরক্ষিত করিয়াছিল। কিন্তু উত্তরবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল কাশী পৰ্য্যন্ত সুবিস্তৃত সমতলক্ষেত্র; তাহা কোনোরূপে দুর্গাদিদ্বারা সুরক্ষিত ছিল না। কাশীরাজ্য যবন হস্তে পতিত হইবার পর, কাহারও পক্ষে সহজে মিথিলা ও উত্তরবঙ্গ রক্ষা করিবার সম্ভাবনা ছিল না; তজ্জন্যই তাহা কেশব সেন কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়া সম্ভব। গৌড়ীয় হিন্দু সাম্রাজ্যের শেষ স্বাধীন নরপতির প্রাণভয়ে অন্তঃপুর হইতে পলায়ন করা সত্য হইলে, বক্তিয়ার খিলিজি সমগ্ৰ গৌড়ীয় হিন্দু সাম্রাজ্যেই অধিকার বিস্তার করিতে পারিতেন; তাঁহাকে উত্তরবঙ্গে সীমাবদ্ধ হইয়া থাকিতে হইত না। মিনহাজ পুরাতন সৈনিকের মুখে যে গল্পগুজব শ্রবণ করিয়াছিলেন, তাহা যে গল্পমাত্র, ঐতিহাসিক সত্য নহে, এই ঘটনাই তাহার যথেষ্ট প্রমাণ।

বক্তিয়ার খিলজির উত্তরবঙ্গ অধিকার করিয়া লক্ষ্মণাবতীতে রাজধানী স্থাপন করার কথা মুসলমানের ইতিহাসে লিখিত থাকিলেও, কোন সময়ে এই কাৰ্য্য সাধিত হইয়াছিল, সে বিষয়ে বিলক্ষণ তর্ক-বিতর্ক উত্থাপিত হইতে পারে। বক্তিয়ার খিলজি বিহার অধিকার করিবার পরই উত্তরবঙ্গ অধিকার করেন। কিন্তু তিনি তথায় বাস করিতেন বলিয়া বোধ হয় না। ৫৯৯ হিজরীতে (১২০১ খ্রিস্টাব্দ) সুলতান যখন কালেঞ্জরের দুর্গ জয় করিয়া কালপী অধিকার করেন, তখন বক্তিয়ার খিলিজি বঙ্গবিজয়ের বৃত্তান্ত সম্রাটের গোচর করিয়া উপঢৌকনপ্রদানার্থ তাহার নিকট উপনীত হন। মুসলমান লিখিত ইতিহাসে দেখিতে পাওয়া যায়, বক্তিয়ার এই সময় বিহার হইতেই সম্রাটের নিকট গমন করিয়াছিলেন; এবং সুলতানের নিকট হইতে প্রত্যাগত হইয়া বহুসংখ্যক অপরিশুদ্ধ হিন্দু দেবমন্দির ধবংস ও অচিহ্ন করিয়া পরম পবিত্র মোহম্মদীয় ধর্মের উপাসনাগৃহ নির্মাণ করিয়াছিলেন। সুতরাং ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে বক্তিয়ারের বঙ্গবিজয় এবং তাহার দ্বাদশবর্ষ বঙ্গদেশ শাসনের কথা কেবল কথার কথা।২ ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে উত্তরবঙ্গ আক্রান্ত ও ১২০১ খ্রিস্টাব্দের পর তথায় মুসলমান শাসনের সূত্রপাত হইয়াছিল বলিয়া বোধহয়। গৌড়ীয় হিন্দু সাম্রাজ্যের যে অংশ এই রূপে পরিত্যক্ত হইয়া মুসলমানের করতলগত হয়, তাহা প্রকৃতপক্ষে অধিকার করিতে বক্তিয়ার খিলিজির তিন-চার-বৎসর অতিবাহিত হইয়াছিল। ইহার পর তিনি দুই বৎসর মাত্র জীবিত ছিলেন। সে দুই বৎসরের ইতিহাস কেবল সৈন্য সংগ্রহ, যুদ্ধকলহ, মহানন্দার তীর হইতে করতোয়ার তীর পৰ্য্যন্ত যুদ্ধযাত্রা, করতোয়া উত্তীর্ণ হইবার পর প্রত্যাবর্তন ও পথিমধ্যে মৃত্যু প্রভৃতি বিবিধ বিবরণে পরিপূর্ণ। সুতরাং বক্তিয়ার খিলিজির প্রকৃতপক্ষে উত্তরবঙ্গের একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সসৈন্যে নানাস্থান পরিভ্রমণ করা ভিন্ন যথারীতি শাসনকার্য পরিচালনা করিবার অবসর প্রাপ্ত হওয়া ও দ্বাদশ বত্সর বঙ্গদেশ শাসন করা বিশ্বাস করা যায় না। যাহারা পলায়নপর কাপুরুষ বলিয়া কাব্যে, উপন্যাসে ও ইতিহাসে লাঞ্ছিত, তাহাদের দেশে বক্তিয়ার খিলিজির বীরবাহু দ্বাদশবৎসেরও মুসলমানশাসন প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে নাই। কেন পারে নাই, তাহার কারণপরম্পরার বিস্তৃত বিবরণ বিলুপ্ত হইলেও, তাহা অনুমান করিয়া লইতে কাহারও কষ্ট হইতে পারে না। ইতিহাসে যত কথা লিখিত আছে, তাহা সত্য হইলে, এরূপ ঘটনা সংঘটিত হইত না। বক্তিয়ার খিলিজি যে দুইবৎসর স্বয়ং উত্তরবঙ্গে বিচরণ করিয়াছিলেন, তাহার বিস্তৃত কাহিনী “রিয়াজ উস-সালাতিন” হইতে উদ্ধৃত হইল।

“অতঃপর বখতিয়ার খেতা ও তীববৎ আক্রমণের জন্য ১০/১২ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া বাঙ্গালার উত্তরপূর্ব পার্বত্যপথে গমন করিলেন। পথিমধ্যে কোচ-প্রদেশের আলিমেচ-নামক জনৈক শ্রেষ্ঠব্যক্তি বখতিয়ারের হস্তে পবিত্র ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন। ইনি বখতিয়ারের সৈন্যগণের পার্বত্যপ্রদেশের পথপ্রদর্শক ও অগ্রগামী হইলেন।

“আলিমেচ বখতিয়ারের সৈন্যগণকে অন্য একটি প্রদেশে লইয়া যান। ঐ প্রদেশে আবদ্ধন ও বরমনগতি নামক নগর বর্তমান ছিল। পূর্বতন ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, এই নগর রাজা গরসাসেপের কীর্তি। গঙ্গানদীর ত্রিগুণ গভীরতা ও বিস্তার বিশিষ্ট নমকদ্দী-নাম্নী এক নদী। ঐ নগরের সম্মুখে প্রবাহিত হইত। উহা পার হইবার কোনো উপায় ছিল না। এজন্য বখতিয়ার ঐ স্থান ত্যাগ করিয়া দশদিন পরে অন্য একস্থানে উপস্থিত হইলেন। এই স্থানে নদীর উপর এক বৃহৎ সেতু ছিল; উহা ২৯টি প্রস্তর-নির্মিত খিলানের উপর দণ্ডায়মান।৬

“ঐতিহাসিক পণ্ডিতগণ বলিয়া গিয়াছেন যে, গরসাসেপ যখন হিন্দুস্থান আক্রমণ করেন, তখন ঐ সেতু নির্মাণ করিয়া তিনি কামরূপে আসিয়াছিলেন। মোহম্মদ বখতিয়ার সেতু পথে নদী পার হইয়া অগ্রসর হইলেন। দুই জন অশ্বারোহী কতিপয় সৈনিকসহ পুলের রক্ষাকাৰ্য্যে নিযুক্ত রহিল। কামরূপের রাজা অগ্রসর হইতে বাধা দিয়া কহিলেন, “যদি অধুনা তীববৎ-অভিযানে ক্ষান্ত হইয়া আগামীবর্ষে উপযুক্ত সৈন্য ও দূতসহ বখতিয়ার আগমন করেন, তবে তিনি এসলামসৈন্যের অগ্রগামী হইয়া (তাহাদের সহায়তা সাধনার্থ) পরিশ্রম করিবেন।’ কিন্তু বখতিয়ার কামরূপের রাজার বাক্যে কর্ণপাত না করিয়া অগ্রসর হইলেন এবং ষোড়শ দিবস পরে তীববত-দেশে উপনীত হইলেন। তথায় গরসাসেপ শাহের এক সুদৃঢ় দুর্গে যুদ্ধ আরম্ভ হইল। যুদ্ধে বহু এসলাম-সৈন্য নিহত হইল, তথাপি বখতিয়ার দুর্গ অধিকার করিতে পারিলেন না।

“শত্রুপক্ষীয় যে সকল লোক বন্দী হইয়াছিল, তাহাদের নিকট বখতিয়ার অবগত হইলেন যে, উক্ত দুর্গের পঞ্চক্রোশ দূরে এক বৃহৎ নগর আছে। পঞ্চশতসহস্র ধনুর্ধারী তুর্কী অশ্বারোহী ঐ নগরে অবস্থান করে। প্রত্যহ ঐ নগরের অশ্ববিণীতে ৯৫ শত অশ্ব বিক্রীত হয়। এই স্থান হইতেই লক্ষৌতীদেশে অশ্ব প্রেরিত হইয়া থাকে। বন্দিগণ কহিল, ‘এই সামান্যসৈন্যবলে উক্ত নগর অধিকার করা অসম্ভব।’ বখতিয়ার নগরের দুরাক্রম্যতা চিন্তা করিয়া নিরাশভাবে প্রত্যাবর্তন করিলেন। প্রত্যাবর্তনের সময় তাঁহাকে বিষম দুরাবস্থায় পড়িতে হইয়াছিল। দেশের অধিবাসীগণ খাদ্যদ্রব্য ও গৃহপালিত পশুসহ স্ব স্ব আবাসগৃহসকল দগ্ধ করিয়া আবশ্যক দ্রব্যাদি সঙ্গে লইয়া পৰ্বতগুহায় লুক্কায়িত হইয়াছিল। প্রত্যাগমনের পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত বখতিয়ারের সৈন্য কুত্রাপি মনুষ্য বা পশুর আহাৰ্য্য সংগ্রহ করিতে পারিল না। পঞ্চদশ দিন কেবল পশুমাংসে জীবনরক্ষা করিয়া বখতিয়ার সসৈন্যে সেতুর নিকট উপস্থিত হইলেন। যে দুইজন অশ্বারোহীকে বখতিয়ার সেতুর রক্ষাকার্যে নিযুক্ত করিয়া গিয়াছিলেন পরস্পর বিবাদ করিয়া তাহারা প্রস্থান করিলে, তদ্দেশের অধিবাসীগণ সেতু ভগ্ন করিয়া ফেলিয়াছিল। আশান্বিত হইয়া বখতিয়ার সেতুর নিকট আসিয়াছিলেন, সেতু ভগ্ন দেখিয়া সকলেরই হৃদয় অবসন্ন হইয়া পড়িল। বখতিয়ার চিন্তাসাগরে নিমগ্ন হইয়া ইতিকর্তব্যবিমূঢ় হইলেন। অনেক অনুসন্ধানে সংবাদ পাওয়া গেল যে, নিকটবর্তী একস্থানে একটি বৃহৎ দেবালয় আছে। ঐ দেবালয়ে রৌপ্য ও স্বর্ণ নির্মিত অতি বৃহৎ বৃহৎ নির্জীব মূর্তিসকল দণ্ডায়মান ছিল। ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন যে, ঐ দেবালয়ে সহস্র মণ পরিমিত একটি দেবমূৰ্ত্তি ছিল। বখতিয়ার স্বীয় সৈন্যসহ ঐ দেবালয়ে অবস্থান করিয়া নদী উত্তরণের জন্য তরী নিৰ্মাণ করিতে লাগিলেন।

“কামরূপাধিপতির আদেশে ঐ দেশের সৈন্য ও প্রজাবর্গ দেবালয় অবরোধার্থ তাহার চতুর্দিকে বাঁশের খুঁটিসমূহ প্রোথিত করিয়া প্রাচীরের ন্যায় প্রস্তুত করিল। দেবালয়ে অবস্থান করিলে মৃত্যু নিশ্চিত দেখিয়া বখতিয়ার সসৈন্যে প্রাচীরের দিকে যুদ্ধার্থ ধাবিত এবং এক দিকে ভগ্ন করিয়া দেবালয় হইতে বহির্গত হইলেন। শত্রুসৈন্য নদীকূল পৰ্য্যন্ত তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করিল।

“মোসলমানসৈন্য সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় নদীতীরে দণ্ডায়মান ছিল। তাহাদের কতক সৈন্য তরবারির আঘাতে নিহত, কতক বা নদীজলে নিমগ্ন হইয়া প্রাণত্যাগ করিল। এই সময় হঠাৎ বখতিয়ারের একজন অশ্বারোহী নদীতে অবতরণ করিল। একটি বাণ নিক্ষিপ্ত হইলে যত দূর যায়, জলমধ্যে সে ততদূর হাঁটিয়া যাইতে পারিল। তদ্দর্শনে সমস্ত সৈন্য জলে অবতরণ করিল। নদীর গর্ভকেবল বালুকাময় ছিল, বহুলোকের পদাঘাতে উহার বালুকারাশি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া জলের গভীরতা বৰ্দ্ধিত হওয়ায় বহু সৈন্য জলমগ্ন হইল। কেবল বখতিয়ার ও এক সহস্র অশ্বারোহী (মতান্তরে ৩০০ শত) পরপারে উত্তীর্ণ হইলেন। হতাবশিষ্ট সঙ্গীগণসহ বখতিয়ার ভগ্নহৃদয়ে প্রত্যাবর্তন করিলেন। গুরুতর অবসাদে তাঁহার জ্বর ও কাশরোগ হইল।

তিনি দেবকোটে উপনীত হইয়াই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইলেন।”

বঙ্গদর্শন, ভাদ্র, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, ১৩১০

তথ্যসূত্র

১ কলঙ্ককাহিনী বঙ্গসাহিত্যে সুপরিচিত হইলেও, এই সকল প্রমাণ সুপরিচিত নহে। তজ্জন্য এখনও গল্পে-উপন্যাসে এবং মাসিকপত্রের প্রবন্ধে অনেক বাঙালী লেখক এই কাহিনীকে ঐতিহাসিক সত্যরূপে বিবৃত করিয়া ভবিষ্যৎকালের ইতিহাস লেখকের সমালোচনা-শ্রম বর্ধিত করিতেছেন। বিগত চৈত্রসংখ্যার “নবপ্রভা” পত্রে খ্যাতনামা লেখক শ্ৰীধৰ্মানন্দ মহাভারতী মহাশয় “বল্লাল সেন” শীর্ষক প্রবন্ধেও এই পুরাতন কাহিনীকে ঐতিহাসিক সত্যরূপে মানিয়া লইয়াছেন।

২ এই সকল কারণে ১২০৩ খৃষ্টাব্দে বক্তিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের কথা লিখিত হইয়া থাকিবে।

৩ “When several years had elapsed_he (Bakhtiyar) received information about the territories of Turkistan and Tibet to the east of Lakhnauti and he began to entertain a desire of taking (them). For this purpose he prepared an army of about ten thousand horse.” Tabakht-i Nasiri. Trans.

৪ তুর্কিস্থানের নাম।

৫ গোলাম হোসেন এখানে স্থানের নাম লইয়া গোল করিয়াছেন। অথবা তাঁহার অপরাধ কি? হস্তলিখিত ‘নাসিরী’ পুস্তক এজন্য দায়ী। পরবর্তী লেখকে এগুলি নানারূপে পাইয়াছে। কথিত নগরটি বর্ধনকোট’ ও নদীর নাম ‘বাঘমতী’– নাসিরীগ্রন্থের অনেক খণ্ড মিলাইয়া এরূপ স্থিরীকৃত হইয়াছে। বওড়াজেলার উত্তরাংশে গোবিন্দগঞ্জের নিকট করতোয়া নদী-তীরে প্রাচীন বর্ধনকোটের স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছে। ‘বাঘমতী’ই করতোয়া এবং দশদিন ধরিয়া করতোয়া ও তিস্তা। (তিস্রোতা) নদীর পার্শ্ব দিয়া বখতিয়ারের সৈন্যেরা যাত্রা করে,–পণ্ডিতবর বুকম্যান এইরূপ অনুমান করেন।

৬ ইলিয়ট সাহেবের ইতিহাসের অনুবাদে খিলান সংখ্যা ২০টি এবং স্টুয়ার্টের গ্রন্থে ২২টি, অথচ উভয়েই এক নাসিরীগ্রন্থ অবলম্বন করিয়াছেন। সম্ভবত মূলগ্রন্থের বিংশতাধিক (Twenty odd) কথা নানা জনে নানা ভাবে লইয়াছেন।

৭ বক্তিয়ারের গন্তব্যপথ কাপরূপ রাজ্যের পার্শ্বদেশ ও কথিত সেতু দার্জিলিং এর নিকটবর্তী স্থানে ছিল, ইহাই বুকম্যান সাহেবের বিশ্বাস। বর্তমানেও মেচজাতির বাসস্থান হইতে অন্যান্য পাৰ্ব্বত্যজাতির বাসস্থানের সীমান্তরেখা দার্জিলিং-এর ৬ ক্রোশ দক্ষিণ পাঙ্কাবাড়ী-নামক স্থান।

৮ নাসিরী-পুস্তকে এই নগরের নাম–’করমূবাটান’ বা ‘করবাটান’। ইহার স্থান অদ্যাপি নিৰ্নীত হয় নাই।

৯ এগুলি ‘টাঙ্গট’ ঘোড়া (Tang) বলিয়া নির্দিষ্ট আছে। নাসিরী-পুস্তককার বলিয়াছেন, তীববৎ হইতে কামরূপে আসিতে ৩৫টি পাৰ্ব্বত্য পথ আছে। এই সমস্ত পথ দিয়া এদেশে অশ্ব আনীত হইত।

লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্ক *

প্রথম ভাগ আদৌ লিখিত হয় নাই, অথচ দ্বিতীয় ভাগ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়া গিয়াছে–এরূপ গ্রন্থ সকল দেশের সাহিত্যেই নিতান্ত সুদুল্লভ, কেবল বঙ্গসাহিত্যেই এরূপ একখানি মাত্র গ্রন্থ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার নাম “বাঙ্গালার ইতিহাস’’। পূণ্যশ্লোক বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই ‘অদ্বিতীয়” গ্রন্থ রচনা করিয়া যেরূপ বিচারবুদ্ধির প্রাখৰ্য্য প্রকাশিত করিয়াছিলেন, তাহার প্রকৃত মর্যাদা অনুভব করিতে অসমর্থ হইয়া, তাঁহার জীবিতকালেই অনেক বাঙ্গালার ইতিহাসের “প্রথম ভাগ” রচনা করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহার ফলে, বঙ্গসাহিত্যে এক অলৌকিক উপাখ্যান, ইতিহাসের মর্যাদা লাভ করিয়া, সকলের নিকট সুপরিচিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহা “বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গ-বিজয়,”–অথবা “লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্ক!” এই কলঙ্ককাহিনী বন্যাতাড়িত আবর্জনারাশির ন্যায় রঙ্গালয়ের দ্বারদেশে পুঞ্জীকৃত হইবামাত্র, তদ্বারা অর্থোপার্জনের সুযোগ লক্ষ্য করিয়া, বঙ্গরঙ্গালয় তাহাকে পরম সমাদরে ক্রোড়ে তুলিয়া লইবার পর, তাহা ক্রমে নিরক্ষর নরনারীর নিকটেও সুপরিচিত হইয়া উঠিয়াছে! এত কালের পর সম্প্রতি একজন সুনিপুণ চিত্রকর তাহা লইয়া একখানি চিত্রপট রচনা করিয়া, লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্ক চিরস্মরণীয় করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। যাহা এইরূপে বাঙ্গালীর গৃহে গৃহে চিরপরিচিত হইয়া উঠিয়াছে, তাহা যে সৰ্ব্বথা অলীক, এখন তাহার আলোচনা করা কর্তব্য,যাহা সত্য, তাহা নির্ণয় করিয়া, প্রচলিত ইতিহাসের সংশোধনকার্য্যে হস্তক্ষেপ করা কর্তব্য,কালবিলম্বে অসত্য কখনও সত্যের মর্যাদা লাভ করিতে পারে না। লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্কের মূলে আদৌ কোন সত্য সংশ্রব বর্তমান আছে কিনা, এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে তাহাই সংক্ষেপে আলোচিত হইবে। পূৰ্ব্বে অনেক বার “বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয়” সমালোচনা করিতে গিয়া, প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ্মণসেনের পলায়ন কলঙ্কের কিছু কিছু আলোচনা করিয়াছিলাম। এখন চিত্রপট প্রকাশিত হইতেছে দেখিয়া মনে হইতেছে, বঙ্গসাহিত্যে যাহা প্রকাশিত হয়, সকল শিক্ষিত বঙ্গবাসী তাহা পাঠ করেন কিনা সন্দেহ!

বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গগমনের যষ্টি বর্ষ পরে, সুবিখ্যাত মুসলমান ইতিহাসলেখক মিনহাজ-ই-সিরাজ এদেশে উপনীত হইয়াছিলেন। তিনি “তবকাৎ ই-নাসেরী” নামক দিল্লী-সাম্রাজ্যের যে ইতিহাস রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহার বিংশ পরিচ্ছেদে প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গভূমির কিছু কিছু সংক্ষিপ্ত কাহিনী উল্লিখিত হইয়াছে। তাহাতে লিখিত আছে–বক্তিয়ার সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া “নওদিয়া” নামক রাজধানীতে উপনীত হইবামাত্র, “রায় লছমনিয়া” নামক হিন্দু নরপতি পলায়ন করিয়াছিলেন। মিনহাজ বিচারনিপুণ ঐতিহাসিকের ন্যায় এই কাহিনীর সত্যাসত্য নির্ণয়ে অগ্রসর না হইয়া, লিখিয়া গিয়াছেন–যাহারা বক্তিয়ারের সহিত বিজয়-যাত্রার বহির্গত হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে যাহারা তখন পর্যন্ত জীবিত ছিল, তাহাদের মুখে এই কাহিনী শ্রবণ করিয়াছিলেন। মিনহাজের গ্রন্থ প্রমাণরূপে উল্লিখিত করিয়া, বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে এই কাহিনী সংকলিত হইবার পর, ইহা ক্রমশঃ সৰ্ব্বত্র প্রচারিত হইয়া পড়িয়াছে। ইহার মূল প্রমাণ মিনহাজের গ্রন্থ, একমাত্র প্রমাণ মিনহাজের গ্রন্থ,–তাহারও একমাত্র প্রমাণ বৃদ্ধ সৈনিকের পুরাতন আখ্যায়িকা! বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গগমনের যষ্টিবর্ষ পরে এদেশে আসিয়া, মিনহাজ যে বৃদ্ধ সৈনিকের নিকট এই অলৌকিক কাহিনী শ্রবণ করিয়াছিলেন বলিয়া লিখিয়া গিয়াছেন, তিনি তখন অশীতিপর বৃদ্ধ;–তাঁহার সত্যনিষ্ঠা বা আত্মগৌরব ঘোষণার প্রবল প্রলোভন কতদূর প্রবল ছিল, এতকাল পরে তাহার মীমাংসা করিবার সম্ভাবনা নাই!

মুসলমানাগমনের অব্যবহিত পূৰ্ব্ববর্তী যুগে যাঁহারা এ দেশের রাজসিংহাসন অলংকৃত করিতেন, সেই সকল সুগৃহীতনামা নরপালগণের নানা শাসন-লিপি আবিষ্কৃত হইয়া, আমাদিগের নিকটে যে সকল পুরাতত্ত্বের দ্বার উদঘাটিত করিয়া দিয়াছে, তাহা সপ্তদশ অশ্বারোহীর অলৌকিক দিগ্বিজয়কাহিনীর সামঞ্জস্য রক্ষা করিতে পারে না। বাঙ্গালার ইতিহাসের প্রধান দুর্ভাগ্য সকল যুগেই সমানভাবে বৰ্তমান,–সকল যুগেই তাহা বিজেতার বিদ্বেষ পূর্ণ বিকৃত লেখনী হইতে প্রসূত হইয়াছে,–কোন যুগেই দেশের লোকে দেশের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিবার আয়োজন করেন নাই!

বক্তিয়ার স্বাধীনভাবে প্রাচ্যভারতে সাম্রাজ্যসংস্থাপনে অগ্রসর হইয়া, কিয়ৎপরিমাণে কৃতকার্য হইবামাত্র, দিল্লীর মুসলমান বাদশাহ, তাহাকে দিল্লীসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিলেন। ইহার জন্য প্রথম হইতেই দিল্লীসাম্রাজ্য এবং গৌড়ীয়সাম্রাজ্যের মধ্যে কলহ সংঘটিত হইবার সূত্রপাত হয়, এবং ইহার জন্যই দিল্লীর ইতিহাসলেখকগণ দিল্লীর গৌরব ঘোষণা করিয়া (গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের কলঙ্ক কীৰ্ত্তন করিয়া) ইতিহাস রচনা করিতে প্রবৃত্ত হন। যে সকল মুসলমান বীর শোণিত ক্ষয় করিয়া গৌড়ীয় সাম্রাজ্যে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন, দিল্লীশ্বর তাঁহাদিগের কোনরূপ সহায়তাসাধন না করিয়াই, তাঁহাদিগের বিজয়গৌরবের ফলভোগ করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিলেন। দিল্লীসাম্রাজ্যের ইতিহাস লেখকের পক্ষে এই সকল কারণে গৌড়ীয় মুসলমানগণের দিগ্বিজয় ব্যাপারকে অনায়াসলব্ধ অকিঞ্চিৎকর যুদ্ধগৌরব বলিয়া ব্যাখ্যা করা অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। মিনহাজের কাহিনী আদৌ কোনও বৃদ্ধ সৈনিকের নিকট হইতে সংকলিত, অথবা তাঁহার কপোলকল্পিত মাত্র, তদ্বিষয়েও সন্দেহশূন্য হইবার উপায় নাই!

যাহা হউক, বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গাগমন সময়ে এদেশে রাঢ়, মিথিলা, বরেন্দ্র, বঙ্গ এবং বাগড়ী নামক ভাগপঞ্চকে বিভক্ত থাকিবার কথা আমরা মুসলমান লেখকদিগের গ্রন্থেই দেখিতে পাই। তৎকালে এই পঞ্চবিভাগ গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ও এক রাজার অধীন ছিল। বিক্রমপুর, লক্ষ্মণাবতী এবং লক্ষৌর নামক তিন স্থানে তিনটি রাজধানী প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই বর্ণনায় “নওদিয়া” নামক স্থানে কোনও রাজধানী সংস্থাপিত থাকিবার উল্লেখ নাই। “নওদিয়া” কোথায় ছিল, তাহা রাজধানী হইলে, তৎপ্রদেশে মুসলমান জায়গীর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল কিনা, –রায় লছমনিয়াই বা কাহার নাম–এ সকল প্রশ্নের কোনরূপ সদুত্তর প্রাপ্ত হইবার উপায় নাই।

গৌড়ীয় ধবংসাবশেষের মধ্যবর্তী খালিমপুর নামক আধুনিক গ্রামে ধর্মপাল নামক নরপালের যে তাম্রশাসন আবিষ্কৃত ও স্বর্গীয় উমেশচন্দ্র বটব্যাল মহাশয়ের যত্নে প্রকাশিত হয়, তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায়, ধর্মপালের রাজধানী পাটলিপুত্রেই সংস্থাপিত ছিল। তিনি মগধাধিপতি হইয়াও, গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের কিয়দংশে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন। মুঙ্গেরে আবিষ্কৃত দেবপাল নামক নরপালের তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়,–তৎকালে রাজধানী মুদগগিরি নগরেই সংস্থাপিত ছিল। তাহার পর বঙ্গভূমির নানা স্থানে–পূৰ্ব্ব এবং উত্তর বঙ্গে –পালনরপালগণের রাজ্য ও রাজধানী সংস্থাপিত হইবার পরিচয় নানা শাসনলিপিতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। পাবনার অন্তর্গত মাধাইনগরে আবিষ্কৃত লক্ষ্মণসেন দেবের একখানি তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়, –”কর্নাট ক্ষত্রিয়বংশের” সেন নরপালগণ বঙ্গভূমিতে কিরূপে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন। এই রাজবংশের বিজয়সেন দেব নামক নরপাল রাজসাহীর অন্তর্গত বরেন্দ্র প্রদেশে প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দির নামক মন্দির প্রতিষ্ঠার সময়ে যে ফলকলিপি রচনা করাইয়াছিলেন, তাহাতে বিজয়সেন দেবের বিজয়কাহিনী উল্লিখিত আছে। বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন গৌড়াধিকার করিয়া, “গৌড়েশ্বর” নাম গ্রহণ করেন। তিনিও বীরকীর্তির জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। তাহার পুত্র লক্ষ্মণসেন দেব পশ্চিমে কাশী এবং পূৰ্ব্বে কামরূপ পৰ্য্যন্ত বিজয় লাভ করিয়া, বীরকীর্তির জন্য বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিলেন। মুসলমান ইতিহাসলেখকগণ বলেন,–এই নরপতির নামানুসারেই পুরাতন গৌড়নগরের নাম “লক্ষ্মণাবতী” বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। অনেক দিন পৰ্যন্ত এদেশের মুসলমান রাজ্য দিল্লীর ইতিহাসলেখকদিগের গ্রন্থে “লক্ষ্মণাবতীরাজ্য” বলিয়াই উল্লিখিত আছে। লক্ষ্মণসেনের বীরপুত্র বিশ্বরূপ সেনের শাসনলিপিতে দেখিতে পাওয়া যায়, তিনি বাহুবলে আত্মরক্ষা করিয়া–

“গর্গবন্বয় প্রলয় কালরুদ্র”

নামে পরিচিত হইয়াছিলেন। মিনহাজ যখন এদেশে পদার্পণ করেন, তখনও (বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গগমনের যষ্টিবর্ষ পরেও) পূৰ্ব্ববঙ্গ লক্ষ্মণসেনের পুত্রগণের অক্ষুণ্ণ অধিকারে বর্তমান ছিল,–তদ্দেশে তখন পর্যন্তও মুসলমানশাসন বিস্তৃত। হইতে পারে নাই।

শাসনলিপির ও মুসলমান-ইতিহাসলেখকের এই সকল উক্তির সমালোচনা করিলে বুঝিতে পারা যায়, বক্তিয়ার সহজে এদেশে অধিকার বিস্তার করিতে পারেন নাই;–তিনি যেখানে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন, তাহা লক্ষ্মণাবতীর নিকটবর্তী কয়েকটি পরগণা মাত্র; এবং সেখানেই মুসলমানদিগের সর্বপ্রথম জায়গীর লাভের প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। অধ্যাপক ব্লকম্যান পুরাতন বঙ্গভূমির ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক তথ্য সংকলনের জন্য প্রভূত অধ্যবসায় স্বীকার করিয়া যে প্রবন্ধ রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে তিনিও লিখিয়া গিয়াছেন, –”দিনাজপুরের অন্তর্গত দেবকোট নামক স্থানে একটি সেনানিবাস সংস্থাপিত করিয়া, বক্তিয়ার যুদ্ধকলহে লিপ্ত ছিলেন; এবং সেই সেনানিবাসই তাঁহার বিজয়রাজ্যের পূৰ্বোত্তর সীমা বলিয়া পরিচিত ছিল।” এই সেনানিবাসে ১২০৫ খৃষ্টাব্দের সময়ে বক্তিয়ার খিলিজির মৃত্যু হয়। উত্তর বঙ্গের “রাজ-রাজন্যকগণের” দীর্ঘকাল পর্যন্ত বাহুবলে স্বাধীনতা রক্ষা করিবার কথা অধ্যাপক ব্লকম্যান স্পষ্টাক্ষরে ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন। এই সকল প্রমাণ অতিবৃদ্ধ মুসলমান সৈনিকের অলৌকিক আখ্যায়িকার সামঞ্জস্য রক্ষা করিতে পারে না।

সে আখ্যায়িকায় যে “নওদিয়ার” রাজধানী ও “রায় লছমনিয়া” নামক নরপতির উল্লেখ আছে, তাহার সহিতও শাসনলিপির সামঞ্জস্য দেখিতে পাওয়া যায় না। এরূপ ক্ষেত্রে কেহ কেহ অনুমান করিয়া লইয়াছিলেন, “নওদিয়া” নবদ্বীপের অপভ্রংশ মাত্র, এবং “লছমনিয়াও” তবে লক্ষ্মণ সেনেরই অপভ্রংশ! মিনহাজ লিখিয়া গিয়াছেন,–”রাজ্যাব্দের অশীতিবর্ষে বক্তিয়ার খিলিজির দিগ্বিজয় সুসম্পন্ন হইয়াছিল।” তদনুসারে আরও একটি অনুমানের আশ্রয় গ্রহণ করা অনিবাৰ্য্য হইয়া পড়িয়াছিল। কাহারও পক্ষে অশীতিবর্ষ পৰ্য্যন্ত রাজ্যভোগ করা সম্ভব বলিয়া বোধ হয় না;–শৈশবে সিংহাসনে আরোহণ করিবার অনুমানও লক্ষ্মণ সেনের পক্ষে সুসঙ্গত হইতে পারে না। কারণ তিনি যে পরিণত বয়সেই পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন, তাহার নানা প্রমাণ ও কংবদন্তী সংস্কৃত সাহিত্যে সুপরিচিত। বল্লাল ও লক্ষ্মণসেনের মধ্যে যে সকল কবিতা বিনিময় হইত, তাহা এখনও কণ্ঠে কণ্ঠে ভ্রমণ করিতেছে। এরূপ অবস্থায় একটি অসামান্য অনুমানের অবতারণা করা অনিবাৰ্য্য হইয়া পড়িয়াছিল। সকল রাজার পক্ষেই সিংহাসনে আরোহণ করিবার সময় হইতে রাজ্যাব্দ গণনা করিবার রীতি প্রচলিত ছিল;–কেবল লক্ষ্মণসেনের পক্ষেই তাঁহার জন্মতিথি হইতে অব্দ গণনা করিবার একটি অসামান্য রীতির অনুমান করিয়া লওয়া হইয়াছিল! “লক্ষ্মণ সংবৎ” নামক একটি অগণনারীতি অদ্যাপি মিথিলায় কোন কোন স্থানে প্রচলিত আছে;–এক সময়ে নানা স্থানে এই অব্দ ধরিয়া শিলালিপি খোদিত হইত। শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বুদ্ধগয়ার দুইখানি শিলালিপিতে এইরূপ অব্দ গণনার উল্লেখ দেখিয়া, তাহার সমালোচনা করিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন,–”৫১ লক্ষ্মণাব্দের পূৰ্ব্বে কোনও সময়ে লক্ষ্মণসেনদেবের দেহান্তর সংঘটিত হয়।” মুসলমান-ইতিহাসলেখক লক্ষ্মণসেনকে পলায়ন কলঙ্কে কলঙ্কিত করেন নাই;–তদীয় রাজ্যাব্দের অশীতি বর্ষে দিগ্বিজয়ের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন;–আমরাই তথ্যনির্ণয়ে অগ্রসর না হইয়া, অনুমানবলে “রায় লছমনিয়াকে” লক্ষ্মণসেন বলিয়া ধরিয়া লইয়া, অযথা কলঙ্কে স্বদেশের ইতিহাস মলিন করিয়া তুলিতেছি!

দুঃখ এই–যে বর্ষে এই সকল তথ্য আবিষ্কৃত হইয়া, লক্ষ্মণসেনের অলীক কলঙ্কের অপনোদন করিয়া দিয়াছে, ঠিক সেই বর্ষেই কলাসমিতির পক্ষ হইতে এক চিত্রকরের “পলায়ন কলঙ্ক” নামক একখানি সৰ্ব্বথা কাল্পনিক চিত্র প্রকাশিত হইয়াছে; আর–আর–সেই সুনিপুণ চিত্রকর–একজন বাঙ্গালী!

প্রবাসী, মাঘ, ১৩১৫

* রাজসাহী শাখা-সাহিত্য-পরিষদের তৃতীয়বার্ষিক চতুর্থ অধিবেশনে পঠিত।

মন্তব্য করুন