চিত্রা নদীর পারে

60
0

চিত্রা নদীর পারে

আমি বারবারই বলি আমাদের জেনারেশনটা নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের রুচি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা সমসাময়িক বিভিন্ন পুরস্কার ও কন্টেন্টের ভিউ এর দিকে তাকালেই বুঝা যায়। অথচ আমাদের কত কত অসাধারণ চলচ্চিত্র পড়ে আছে সেটা এই জেনারেশন জানেই না।পড়ে থাকে বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড নামক যত্তেসব বস্তাপচা নাটক, চলচ্চিত্র, সিরিজে। ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ এসব নির্মাণ যুগ যুগ গেলেও রুচিশীল মানুষজন দেখবে আর বাহবা দিবে আর সমসাময়িক একই ঘটনার আবহে নির্মানের দিকে একসময় মানুষজন মুখ ফিরেও তাকাবে না তাই সিদ্ধান্ত আপনার? এদেশের পরিচালক ও দর্শকের রুচিবোধে যে গুনে ধরেছে তা সত্যিই কষ্টদায়ক।

হালকা স্পয়লার,

চিত্রা নদীর পাড়ে আমার ভীষণ প্রিয় একটি চলচ্চিত্র। এটাকে শুধু চলচ্চিত্র বললে ভুল হবে এটা আপনার আবেগকে আপনার চেতনাকে উথাল পাতাল করে দিতে পারে এমন একটি অনবদ্য নির্মাণ। দেশভাগ নিয়ে যতগুলো চলচ্চিত্র আছে তাদের মধ্যে এটা অন্যতম। সেই সাথে সেই সময়ে ৭টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের মতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা ১০ চলচ্চিত্রের একটি।

আমাদের সেই ছেলেবেলাগুলো মনে পড়ে? গ্রামের সেই নদীরপাড় ধরে সকলে একসাথে কত রকমের খেলাই না খেলতাম। আজ আমরা কত বড় হয়েছি, আমাদের জীবনের শুরুটা যেখানে শেষটাও কি ঠিক সেখানে? আনাদের এই অল্প কয়দিনের পৃথিবীতে কত কিছুই না ঘটে যায়। আমরা আমাদের জন্মভূমিকে মনের অজান্তেই কতটা ভালোবাসি তা কি কখনো অনুভব করেছি? পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যতই স্বর্গের মত থাকুক না কেন জন্মভূমির সাথে কি কখনো কারোর তুলনা হয়? স্নিগ্ধ বাতাসে নদীরপাড় ধরে হাটা আশেপাশের মানুষের সাথে কতো সম্প্রতি, তা কি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আপনার ক্ষেত্রে এমনই থাকবে?

তাইতো চিত্রা নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা শশীকান্তও চান না প্রিয় এই জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যেতে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তখনকার ছোট্ট শহর নড়াইলের চিত্রা নদীকে ঘিরে ছোট্ট ছোট্ট ঘটনার আবহে গল্পটার ভিতরে এতো পরিমাণ মেসেজ দেওয়া হয়েছে যা সত্যিই মুগ্ধ করার মত। প্রেম ভালোবাসা,অসাম্প্রদায়িকতা,মমতা,দেশাত্মবোধ কি নেই এতে? আমাদের চিরাচরিত শৈশব থেকে শুরু করে শেষপর্যন্ত আপনাকে কতটা আবেগের ভিতর দিয়ে কোথায় নিয়ে যাবে সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। এর আবহে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য।

বাদল আর মিনতির কথোপকথন গুলো শুনেছেন? একজন অন্যজনের প্রতি স্নেহমাখা কতাগুলো শুনলে মনে হয় কেন আমার জন্ম ৯০ এর দশকে হলো না? একজন অন্যজনের প্রতি কত মমতা কতটা টান৷ এই যুগে কয়েক সেকেন্ডে প্রিয় মানুষটার কাছে বার্তাটা পৌঁছালেও হয়ত ভালোবাসাটা পৌঁছায় না। চিঠির সেই মায়াজড়ানো চুপিচুপি একজনের কাছে লেখা পত্র গুলোতে থাকা ভালোবাসাগুলো আর পাওয়া যায় না। এই মুভিটার প্রতিটা মিনিটকে নিয়ে ১০ লাইন করে লিখলেও শেষ হবেনা।

তাছাড়া মার্শাল বিরোধী কর্মকান্ড, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন তা সবকিছুই ফুটে উঠেছে এই চলচ্চিত্রে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের দেশটা কতটা ত্যাগ ও কষ্টের বিনিময়ে তৈরী তা কি এ যুগের বিভিন্ন দলের মানুষেরা জানে? যেই গনতন্ত্রের জন্য আমাদের এত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে সেই গনতন্ত্রের কতটা মূল্য আমরা দিতে পেরেছি? একদিকে কয়েকজন মুসলিম যুবক একজন হিন্দু বিধবা নারীর উপর নির্যাতন চালায়। এবং অপর দিকে এলাকার কিছু মুসলিম যুবক রাতের বেলায় শশীকান্তকে ডেকে বলে, “কাকা বাবু, আমরা এলাকা পাহারা দিচ্ছি। কোন চিন্তা করবেন না কাকাবাবু। এমন দৃশ্যে আমার গায়ের লোম দাড়িয়ে গিয়েছিলো, আহা।

ছবির শেষদিকে এক আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। মিনতির করুণ চাহনি তার শেষপর্যন্ত কোথায় স্থান হবে? কলকাতা নাকি তার অনেকদিনের বেড়ে ওঠা জায়গা তার শৈশবের স্মৃতি জড়ানো প্রিয় চিত্রা নদীর পাড়ে? নিয়তি তাকে শেষপর্যন্ত কোথায় নিয়ে যায়? আবেগ অনুভুতিকে উথাল পাথাল করা এরকমই এক মন ছুঁয়ে যাওয়া ছবি “চিত্রা নদীর পাড়ে”।

এই মুভিটি আমি ঠিক কতবার দেখেছি তা মনে নেই, তবে আমি মনে করি প্রত্যেকটা বাংলাদেশীর এই চলচ্চিত্রটি একবার হলেও দেখা দরকার। এ যুগের ৫০টা নাটক থেকে যা শেখা যায়না সেখানে এটাতে তারচেয়েও বেশি জিনিস আপনার অনুভূতিতে জানান দিবে। তানভীর মেকাম্মেল যে একজন গুণী নির্মাতা এতে কেন সন্দেহ নেই। আর মিনতি চরিত্রের মেয়েটাকে আমি যত দেখি ততই মুগ্ধ হই, একটা মানুষ কিভাবে এত সুন্দর করে কথা বলে? এসব নির্মাণকে কখনো রেটিং দেওয়া যায় না রওশন জামিলের মত মানুষেরা বারবার আসে না।

সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রই পারে সুস্থ একটি সমাজ গড়তে। সুস্থ নির্মাণগুলো দেখে সুস্থ মানসিকতায় থাকুন ভালো থাকুন। ধন্যবাদ সবাইকে।

মন্তব্য করুন