রচনা গল্প

পুতুলের বিয়ে: এক নারীর জীবনসংগ্রামের করুণ আখ্যান (১ম অংশ)

0

পুতুলের শৈশব ও অবুঝ বয়সে বিয়ে

এটা কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা পুতুল নয়। কোনো কুমোরের হাতে তৈরি নয়। নয় কোনো শিশুর খেলনা। এটা বিধাতার নিপুণ হাতে সৃষ্টি সুন্দর, কোমল, চাঁদের জোছনার মতো ঝলমলে মুখখানি দেখলেই যেন সবার মায়া লেগে যায় মনে। গোলাপ ফুলের পাপড়ির মতো নরম তার হৃদয়খানি। কোনো ঈর্ষা জন্ম নেয় না যে হৃদয়ে, শুধু ভালোবাসা উজাড় করে দেওয়ার মন-মানসিকতা। সে যে আর কেউ নয়, সে হচ্ছে একটি পুতুল—রক্তে-মাংসে গড়া পুতুল।

বাড়ন্ত বয়স, উৎফুল্ল মন। বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত, কখনো লুকোচুরি, গোল্লাছুট, কানামাছি, কখনো খাঁ-খাঁ দুপুরে পুকুরে ঝাঁপ, কখনো বা আবার ঘরে বসে পুতুলের বিয়ে-বিয়ে খেলত পুতুল মেয়েটা। এভাবেই হেসে-খেলে দিন কেটে যেতে লাগল।

হঠাৎ একদিন তার মা পুতুলকে বলল, “পুতুল রে, তোর বাবা তোকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একটা পাত্র ঠিক করেছে।”

মায়ের কথা না বুঝে সে হাসল। পুতুল বলল, “তাই নাকি?”

সে বুঝতেই পারল না যে তার মা তাকে কী বলছেন।পুতুল মেয়েটা শুধু নিজের খেলার পুতুলের বিয়ে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

বন্ধু-বান্ধবীদের দাওয়াত করল। বলল, “কালকে আমার পুতুলের বিয়ে। তোরা সবাই আমার পুতুলের বিয়েতে আসবি অবশ্যই। তোরা আসলে আমি খুব খুশি হব।”

বিয়ে উপলক্ষে সে নতুন জামা-কাপড় তৈরি করল। কচুরিফুল, লতা-পাতা ছিঁড়ে এনে পুতুলের ঘর সাজাল। মহা ধুমধাম করে পুতুলের বিয়ে দেবে সে।

বয়স তখন মাত্র এগারো বছর। গ্রামের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে পুতুল মেয়েটা। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে তার বান্ধবীরা হাসি-ঠাট্টা করতে লাগল। বলল, “হ্যাঁ রে পুতুল, তোর বাবা নাকি তোকে বিয়ে দেওয়ার জন্য একটা পাত্র ঠিক করেছেন?”

সে মন খারাপ করে বলল, “আমি জানি না। তবে আমার মা আমাকে একথা বলেছেন।”

কয়েক দিন পর হঠাৎ করে সত্যিকারের পুতুলকে বিয়ে দেওয়ার জন্য মহা ধুমধাম করে আয়োজন শুরু করল তার বাবা। বিয়ে দিয়ে তাকে পরের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো।

তার বাবা শুধু নামেমাত্র শিক্ষিত মানুষ ছিলেন।

প্রকৃত শিক্ষায় যে গুণ থাকা দরকার, তার কোনোটাই তার মধ্যে ছিল না। তার বাবার তো টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। তিনি ছিলেন আশপাশের আট-দশটি গ্রামের মধ্যে একজন নামকরা ধনী ব্যক্তি এবং সচ্ছল গৃহস্থ। আশপাশের আট-দশটি গ্রামের লোক তাকে এক নামে চিনত ও জানত। তিনি ছিলেন একটি পাঠশালার প্রধান শিক্ষক।

তার মেয়ে পুতুলের বিয়ের কথা শুনে কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে বিয়ে না দেওয়ার জন্য বোঝালেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা বাবা কারও কোনো নিষেধই শুনলেন না। জোর করে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।

যেদিন তার বিয়ে দেওয়া হলো, সেদিনও সে ভাবল—তার খেলনাগুলো, পুতুলগুলো গোছানো আছে কি না। সে চলে যাওয়ার সময় তার মাকে বলল, “মা, আমার খেলনাগুলো যত্ন করে রেখে দিও। আমি যখন আবার ওখান থেকে ঘুরে আসব, তখন খেলনাগুলো দিয়ে খেলব।”

বুকভরা ব্যথা নিয়ে মা বলল, “পুতুল রে, তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

মায়ের প্রশ্নের জবাবে সে বলল, “মা, আমি শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছি।”

মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, মাকে জড়িয়ে ধরে পুতুল কাঁদতে লাগল। আর বলল, “মা, আমাকে দোয়া করো।”

সে সত্যিকার অর্থে বুঝতেই পারল না যে সেদিন থেকে তার আর লুকোচুরি, কানামাছি, কচুরিফুল ও লতা-পাতা ছিঁড়ে এনে পুতুলের ঘর সাজানো কিংবা পুতুলের বিয়ে—কোনোটাই থাকবে না।

সে বুঝতেই পারল না যে তার বাবা তাকে পরের ঘরে দিয়ে চলেছেন। পর কী? আপন কী? সে বুঝতে পারত না যে সে অন্য কারও বাড়ির বউ। সে শুধু জানত, কয়েক দিন পরই সে ঘুরে আবার মায়ের কোলে ছুটে চলে আসবে।

কোনো প্রকার খেলাধুলা কিংবা খাঁ-খাঁ দুপুরে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া—কোনোটাই তার আর সম্ভব হবে না।

পারিবারিক মানসিকতা ও নারীর ওপর মানসিক-শারীরিক নির্যাতন

বেশ কিছুদিন পর যখন পুতুল শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে মায়ের কোলে ফিরে এল, সে আর সেখানে যেতে চাইল না। খুব কান্না করল। সে বলল, “মা, আমি শুধু পুতুলের বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমার পুতুল কই?”

মা বলল, “কলা গাছের খোলে বানানো ভেলায় সেগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছি।”

একথা শোনা মাত্রই তার সব খেলার স্বপ্ন তৎক্ষণাৎ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অন্তর ফেটে কান্না আসতে লাগল। তার মা তাকে অনেক বোঝাতে চাইল, কিন্তু কিছুতেই সে বুঝতে চাইলো না।

সে শুধু তার মাকে বলল, “শ্বশুরবাড়ি মানে তো পরের বাড়ি। আর পরের বাড়ি মানে তো হায়নার খাবারের মতো মনে হয় আমার। আমার খুব ভয় লাগে, মা। আমি আর কোনো দিনও সেই পরের বাড়ি যাব না। মা, আমাকে শক্ত করে ধরে রেখো। আমাকে যেন কেউ তোমার বুক থেকে কেড়ে নিয়ে যেতে না পারে।”

মা বলল, “আমিও তো পরের বাড়িতে এসেছি। আমিও তো মা হয়েছি। তুইও একদিন আমার মতো মা হবি, তখন সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তোর ভয় করবে না।”

সে মনে মনে ভাবল, “আমি যদি সত্যিকারের পুতুল হয়ে যেতাম, তাহলে আমাকে কেউ আর জোর করে কেড়ে নিতে পারত না। আমি পুতুল হলাম ঠিকই, কিন্তু রক্তে-মাংসে গড়া পুতুল হলাম কেন?”

এভাবে কয়েক দিন যেতে না যেতেই পুতুলের শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক হাজির হলো তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ খবর শুনে সে আড়ালে লুকিয়ে থাকল, কেউ যেন দেখতে না পায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পুতুলকে ধরে এনে আবারও জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

যাওয়ার সময় ছোট ছোট ভাই-বোনদের বলল, “আমি তো তোদের সঙ্গে খেলতে, পড়তে আর ঘুরে বেড়াতে চাই।”

ছোট ভাই-বোনরা বলল, “তাহলে বুবু, তুমি বিয়ে করলে কেন?”

প্রশ্নের জবাবে পুতুল বলল, “আমি আগে বুঝতাম নাকি যে শ্বশুরবাড়ি হয় পশুর বাড়ির মতো! আমি যদি আগে বুঝতাম, তাহলে বিয়েই করতাম না।”

আমি মনে করেছিলাম, শ্বশুরবাড়ি মানে আমি যেমন পুতুলের বিয়ে দিয়ে তাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখি, ঠিক তেমন। ওখানে আমাকে কেউ আদর করে না, ভালোবাসে না; সবাই শুধু শাসন করে। বিয়ে মানে আমি পুতুলের বিয়ে মনে করেছিলাম। ওখানে আমার কোনো স্বাধীনতা নেই। তোদের ছেড়ে যেতে আমার মোটেও ইচ্ছে করছে না।

ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে মনের যত কথা আছে, সে সবই বলছিল। এমন সময় তার মা বলল, “তুমি আজকে ওখানে যাও। না গেলে তোমার বাবার মান থাকবে না। তোমার বাবা রাগ করবেন। শুধু আজকের দিনটা থাকবে, আগামীকালই তোমাকে তোমার বাবা নিয়ে আসবেন।”

এই বলে পুতুলকে বুঝিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

দিন যায়, রাত যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। এভাবে বেশ কয়েক মাস পর পুতুলের বাবা তার মেয়েকে দেখতে তার শ্বশুরবাড়ি গেলেন। সেখানে গিয়ে বাবা দেখলেন, তার মেয়ের মুখে কোনো হাসি নেই। চাঁদের জোছনার মতো মুখখানি অমাবস্যার চাঁদের মতো কালো হয়ে আছে।

বাবা পুতুলকে নিয়ে নিজের বাড়িতে এলেন। মায়ের কাছে পুতুল কিছুদিন থাকার পর আবার শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। সেই সঙ্গে তার মুখের কথাও আগের চেয়ে অনেক কমে গেল।

খুব প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে সে আর বেশি কথা বলে না। এভাবে দিন কেটে যেতে লাগল।

বছর দুই যেতে না যেতেই সে সন্তানসম্ভবা হয়ে গেল। যখনই এ খবর তার স্বামীর কানে পৌঁছাল, সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামীর চরিত্র দানবের মতো হয়ে উঠল। বউকে দেখে তার পছন্দ হয়নি। সেই মানুষরূপী পশুটাকে নাকি তার বাবা জোর করে বিয়ে দিয়েছে। তাই সে সেই সন্তান চায় না।

তাই সে গ্রামের ডাক্তারের মাধ্যমে সন্তান মেরে ফেলার আদেশ দিল। তার আদেশমতো ডাক্তার পুতুলের গর্ভের সাত মাসের বাচ্চাকে মেরে ফেলার ওষুধ দিলেন।

তার বাচ্চা গর্ভের ভেতরে মারা যাওয়ার ফলে মেয়েটার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। গর্ভের সেই বাচ্চাকে ডাক্তার ভালোভাবে প্রসব করাতে না পারায় বাধ্য হয়ে বাচ্চার হাত কেটে বাচ্চাকে গর্ভ থেকে বের করলেন।

মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল মরা মানুষের মতো। ডাক্তার সুস্থ হওয়ার জন্য ইনজেকশন ও স্যালাইন পুশ করলেন এবং বললেন যে রোগীকে বেড রেস্টে থাকতে হবে।

তখন পুতুলের বাবা-মাকে খবর দেওয়া হলো। খবর পেয়ে বাবা-মা পাগলের মতো ছুটে এসে পুতুলকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং সেবা-যত্ন করে মেয়েকে সুস্থ করে তুললেন।

মা-বাবা ঠিক করলেন যে মেয়েকে আর সেখানে পাঠাবেন না। সুস্থ হওয়ার কথা শুনে পুতুলের শ্বশুর দেখতে এলেন এবং তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে গেলেন। তার বাবা-মা রাজি না থাকা সত্ত্বেও শ্বশুর এসে অনেক বুঝিয়ে তাকে নিয়ে গেলেন।

সংসারে ক্ষণস্থায়ী সুখ, দাম্পত্য কলহ ও যৌথ পরিবারের কুৎসিত রূপ

সংসারে ক্ষণস্থায়ী সুখ, দাম্পত্য কলহ ও যৌথ পরিবারের কুৎসিত রূপ
“মা পুতুলের নীরব কষ্ট দেখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই নিষ্পাপ সন্তানের চোখে ফুটে ওঠা গভীর উদ্বেগ।”

পুতুলের শ্বশুর পুতুলকে খুব ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। তাই সে তার শ্বশুরের কথা রাখতে বাধ্য হলো। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তার আগের চেয়ে ভালোই লাগল। তার স্বামীও তাকে আগের চেয়ে অনেক যত্ন নিতে লাগল, তার সবকিছু খুব খেয়াল রাখত।

এভাবে এক বছর পরই আবার সে সন্তানসম্ভবা হলো। এ খবর শুনে তার শ্বশুরবাড়ির সবাই খুব খুশি হলো এবং তাকে অনেক যত্ন করতে লাগল। এভাবে দিন ভালোভাবেই কাটতে লাগল।

পুতুলের স্বামী কোনো কিছুতেই কোনো কমতি রাখেনি—ভালো ভালো খাবার, পোশাক, ওষুধপত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের।

এরপর আরও একটি ভালো খবর শুনে তার আনন্দের আর শেষ রইল না। সুসংবাদ হলো, পুতুলের স্বামীর একটি সরকারি চাকরি হয়ে গেল। এখন সে ব্যবসা ছেড়ে চাকরিতে চলে গেল এবং বাড়ির সবাইকে বলে গেল, তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা; তাই যেন সবাই তার স্ত্রীর দিকে খেয়াল রাখে।

এরপর দুই-তিন মাস পর পুতুলের বাবা এসে পুতুলকে নিয়ে গেলেন তার বাবার বাড়িতে। কারণ গ্রামের ডাক্তার পুতুলের চেকআপ করে প্রসবের তারিখ বলে দিয়েছিলেন।

নির্দিষ্ট সময়ে তার কোল আলো করে জন্ম নিল একটি ফুটফুটে, চাঁদের মতো পুত্রসন্তান। পুত্রসন্তান জন্মের খবর শুনে পুতুলের স্বামী খুব খুশি হলেন এবং নবজাতক পুত্র ও স্ত্রীর জন্য অনেক উপহার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে পাঠিয়ে দিলেন।

তার শিশুর বয়স যখন চার মাস, তখন তার স্বামী যেখানে চাকরি করতেন, সেখানে তাদের বাসায় নিয়ে গেলেন। এভাবে খুব সুখে-শান্তিতে তাদের জীবন কাটতে লাগল।

এভাবে দুই বছর যেতে না যেতেই পুতুলের শাশুড়ি ও জায়েরা তার সুখ-শান্তি কেড়ে নেওয়ার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র শুরু করল। পুতুলকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হলো বাধ্য হয়ে।তার বাচ্চাটা গ্রামে চলে আসায় শরীর খুব একটা ভালো থাকত না। তাই বাচ্চা কান্না করত। ফলে সে সংসারের কাজগুলো ভালোভাবে করতে পারত না।

এতে শাশুড়ি গালমন্দ করত, জায়েরা তার সঙ্গে হিংসা করত এবং তার সঙ্গে ঝগড়া করত। পুতুলের স্বামী মাঝে মাঝে চাকরি থেকে ছুটি পেয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসত স্ত্রী ও বাচ্চাটাকে দেখতে।

এভাবে কয়েক বছর পার হয়ে গেল। পুতুল বয়সেও ছোট এবং সাংসারিক কাজকর্মেও অদক্ষ ছিল। তাই তার শাশুড়ি তার সংসারটি আলাদা করে দিল।

পুতুল তার সংসার নতুন করে সাজাল এবং তার স্বামীও তাকে সংসার সুন্দর করে সাজাতে সাহায্য করল। এতে তার সংসারটি অনেক সুন্দর হয়ে উঠল। এটা দেখে জায়েরা এবং শাশুড়ি খুব হিংসা করতে লাগল। তার সংসার ভাঙার ষড়যন্ত্র করতে লাগল।

পুতুলের কোল আলো করে আরেকটি কন্যাসন্তানের জন্ম হলো। পুতুলের একটি পুত্র ও একটি কন্যা নিয়ে ছোট সংসারটিতে যেন সুখের কোনো কমতি ছিল না। এটা দেখে হিংসুটেদের হিংসাও যেন আর ফুরাত না।

তার শাশুড়ি এবং জায়েরা তাকে খুব নির্যাতন করতে লাগল। তার নামে মিথ্যা দুর্নাম রটাতে লাগল এবং তার সম্পর্কে তার স্বামীর কাছে খারাপ খারাপ মন্তব্য করতে লাগল।

পুতুলের স্বামী যখন বউ ও বাচ্চাদের দেখতে আসত, ঠিক তখনই তার শত্রুরা এবং জায়েরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিতে থাকত। এভাবে বেশ কয়েক মাস চলে গেল।

তারপর পুতুলের বাচ্চারাও বেশ বড় হয়ে উঠল। হেসে-খেলে তার ছোট্ট সংসারটি যেন ফুলের বাগানের মতো সুন্দর ও হাসি-খুশিতে ভরপুর হয়ে উঠল। কোনো কিছুর অভাব নেই সংসারে, যেন স্বর্গের সুখ সবটুকুই পেয়েছে সে।

বাড়ির আঙিনায় হাঁস-মুরগি, গোয়ালে গরু-ছাগল, গোলাভরা ধান, পুকুরে মাছ, ঘরের পাশে ফুল, ফল ও সবজির বাগান। ঘরের কোণায় কোণায় বিভিন্ন রকমের বাচ্চাদের চাটনি ও খাবারে ভরপুর।

এটা দেখে পুতুলের মাও খুব খুশি হলো।

এভাবে তার এই স্বর্গীয় সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ওদিকে তার শাশুড়ি ও জায়েরা গভীর ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে বসে থাকল। তার স্বামী যেখানে চাকরি করত, সেখানে তার কানে পৌঁছে দিতে লাগল সব রকমের মিথ্যা ও বানোয়াট খারাপ ঘটনা।

এ কাজ আরও সহজ হয়ে গেল, যখন জায়ের ভাইয়ের সঙ্গে তার স্বামীর রাস্তায় দেখা হলো। পুতুলের স্বামীও সেসব কথা শুনে বিশ্বাস করতে পারছিল না। বেশ কিছুদিন ধরে তার বিরুদ্ধে বারবার আরও লোক প্রেরণ করতে লাগল তার জায়েরা।

তার গ্রামের কোনো এক মুরব্বি লোকও তার স্ত্রী সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে লাগল। এসব শোনার পর সে তার স্ত্রী সম্পর্কে খারাপ ধারণা করতে শুরু করল এবং তাকে অবিশ্বাস করতে লাগল। এমনকি তার সন্তানদেরও সে ভুলে গেল।

সে তো এটাই আশা করেছিল।

ওদিকে পুতুলের স্বামী যে বাসায় ভাড়া থাকত, তার পাশে এক সহকর্মীর বোন বেড়াতে এল এবং পুতুলের স্বামীর সঙ্গে তার আলাপ হলো।

যত দিন যেতে লাগল, তার স্বামী মদ্যপান করতে লাগল এবং পুতুলকে ভুলে গিয়ে নতুন করে সংসার গড়ার পরিকল্পনা করতে লাগল। সেই মহিলার সঙ্গে পুতুলের স্বামী ফষ্টিনষ্টি করতে লাগল এবং তাকে নিয়ে বেড়াতে যেত। তার সঙ্গে পুতুলের স্বামীর একটি আলাদা সম্পর্ক তৈরি হলো এবং শেষ পর্যন্ত তাকে বিয়ে করল।

যে মহিলা পুতুলের স্বামীকে বিয়ে করল, সে কিন্তু পুতুল সম্পর্কে সব কথাই জানত। পুতুলের বাচ্চাদের ব্যাপারেও জানত। এমনকি পুতুলের স্বামী যে আবার দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, একথা তার শাশুড়ি, জায়েরা এবং ননদ-নন্দাইও জানত। জেনে-শুনে সবাই চুপ করে থাকল।

ওদিকে নিষ্পাপ পুতুল ও তার সন্তানেরা বুঝতেই পারল না যে তাদের জীবনে কালবৈশাখীর ঝড় শুরু হয়ে গেছে।

এক বছর পর যখন পুতুলের স্বামী গ্রামে এল, তখন সে লক্ষ্য করল, তার স্বামী আর আগের মতো নেই। তার এবং তার বাচ্চাদের নামও নেয় না। সরাসরি তার মায়ের ঘরে উঠে যায়, সেখানেই থাকে এবং খাওয়া-দাওয়া করে।

ছোট ছোট বাচ্চারা বড় আশা নিয়ে বসে থাকে—কখন বাবা আসবে, আদর করে কোলে তুলে নেবে, বাবা আদর করে চুমু দেবে, চকলেটের প্যাকেট হাতে তুলে দেবে। সেই আশাতেই থাকে বাচ্চা দুটো।

পরদিন যখন বাবা দেখা করতে এল না, তখন ছেলে বাবাকে ডাকল, “বাবা, আপনি খাবেন? চলেন।”

ছেলের জবাবে বাবা বলল, “আমাকে বাবা বলো না। আমি তোমার আঙ্কেল।”

ছেলে খুব বুদ্ধিমান ছিল। তাই কিছু না বলে চলে গেল। ছেলে এটা বুঝতে পারল যে তার বাবা—‘আঙ্কেল’ মানে—বহুদূর চলে গেছে। মরে গেলে যেমন মানুষ আর কোনো দিন ফিরে আসে না, ঠিক তেমনি তার বাবার দেহটা এখানে আছে ঠিকই, কিন্তু তার আত্মাটা দেহ থেকে অনেক দূরে চলে গেছে।

খুব দ্রুত মায়ের কাছে চলে গেল এবং এক কথা বলল। বুদ্ধিমান ছেলের বুদ্ধিমতী মা সেই কথার মানেটা আগেই বুঝতে পেরেছিল।

জীবনের কঠিন সংগ্রাম, বাঁচার অনুপ্রেরণা ও চিরদিনের গৃহত্যাগ

এভাবে দুই বছর পার হয়ে গেল। পুতুলের স্বামী আর আসে না। কোনো কিছু দেওয়া তো দূরের কথা, কোনো খোঁজখবরই নেয় না।

যত দিন যায়, তার মন ও শরীর দুটোই খারাপ অবস্থার দিকে যেতে থাকে। পুতুলের মেয়েটার বয়স যখন তিন, তখন তার ছেলের বয়স আট বছর। মেয়েটা তো ভালো-মন্দ বুঝতে শেখেনি। কিন্তু ছেলেটা খুব বুদ্ধিমান ছিল। সবকিছু বুঝতে পারত।

তার বাবা যখন তাদের বাড়িতে আসত, তখন রান্না করা খাবার এবং সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র বাইরে ছিটকে ফেলে দিত এবং ভাঙচুর করত। এটা দেখে ছেলের বুক ধরফড় করত। সে ভয়ে থাকত, তার বাবা তাকে না আছাড় মেরে ফেলে দেয়।

এদিকে পুতুল এই রকম অশান্তি দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকত। এই দুরবস্থা প্রতি মাসেই হতো এবং প্রায় এক বছর চলতে থাকল।

মাঝে মাঝে সে নিশ্চুপ হয়ে থাকে এবং মনে মনে ভাবে, “এই তো জীবন। জীবন মানে বেঁচে থেকে মরণযন্ত্রণা ভোগ করা। এই ভোগটা না জানি কতকাল আমাকে সহ্য করতে হবে।”

এভাবে আর জীবন চলে না।

সে ঠিকমতো খায় না, গোসল করে না। মনমরা হয়ে শুধু কী যেন চিন্তা করে। এটা দেখে তার ছেলে বলে, “মা, তুমি চিন্তা করো না। আমি বড় হয়ে তোমার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেব। তোমাকে আমি নতুন শাড়ি কিনে দেব। তোমার মাথার তেল, সাবান কিনে দেব। তুমি আর কোনো চিন্তা করো না।”

ছেলের কথা শুনে মায়ের সব দুঃখ দূর হয়ে যায়। মা আবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সব দুঃখকে জয় করে বাঁচার শক্তিটুকু ফিরে পায়।

মা ভাবে, হয়তো স্বামীর কাছ থেকে সুখ হবে না, কিন্তু ছেলে দিয়ে হবে। এ কথা মনে মনে ভাবে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

কিছুদিন ভালোভাবে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সুখে কাটে। আবার অভাব এসে ঘরের দরজায় যখন কড়া নাড়ে, তখন তার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

সে মনে দুঃখ-কষ্ট চাপা রেখে নতুন উদ্যমে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গরু-ছাগল পালন, হাঁস-মুরগি দেখা এবং জমি চাষ—সব কাজই করতে থাকে।

মাঝে মাঝে কাজ করতে করতে তার শক্ত মন আবার নরম হয়ে যায়। হাত ফসকে কাজগুলো হাত থেকে মাটিতে পড়ে যায়। আবারও হাতটা মুছে, চোখ দুটো মুছে কাজে লেগে পড়ে।

এভাবে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে সে।

কিন্তু এই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তার শত্রুরা ছায়ার মতো লেগে থাকে। তার শত্রুরা ভাবে, এভাবে ছেলেটাকে কষ্ট করে মানুষ করতে পারলেই তো পুতুলের সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে। কিন্তু তা হতে দেওয়া যাবে না।

“ওর ঘর ভেঙেছি, কিন্তু বাড়ি ছাড়া করতে পারিনি। এবার বাড়ি ছাড়া, ঘরছাড়া করব ওকে।”

একদিন হঠাৎ করে পুতুল সন্ধ্যাবেলা মাথা ঘুরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। এ অবস্থায় তার ছেলে কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না। সে এদিক-ওদিক দৌড়াতে লাগল। কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে—ভেবে না পেয়ে চাচার কাছে গেল এবং বলল, “চাচা, আমার মা ভীষণ অসুস্থ। ডাক্তার ডাকতে হবে।”

চাচা তখন তার কথা শুনে ডাক্তার আনতে গেলেন। ডাক্তার এসে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর সে একটু সুস্থ হলো। ডাক্তার তাকে বিশ্রামে থাকতে বলে চলে গেলেন।

পরদিন সকালে পুতুলের মা মেয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে দেখতে এলেন। নাতি-নাতনি তাদের নানিকে দেখে খুব খুশি হলো এবং সব ঘটনা খুলে বলল।

এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ তিনি সেখানে মেয়ে ও নাতি-নাতনির দেখাশোনা করার জন্য থেকে গেলেন।

পুতুল একটু সুস্থ হলে তার মা মেয়েকে বললেন, “মা রে, তোমার দুটো চাঁদের মতো নিষ্পাপ সন্তান আল্লাহ দান করেছেন। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং ওদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। তোমার মনকে আরও শক্ত করতে হবে। তোমার মন খারাপ থাকলে ওরা যে কষ্ট পাবে।”

মায়ের কথা শুনে পুতুল পিছনে ফিরে না তাকিয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মনকে শক্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু মন সে আর বাধা মানে না, শক্ত থাকতে চায় না। তার অন্তর যে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

তার স্বামী যে তার এবং সন্তানদের থেকে অনেক দূরে চলে গেছে, সেটা সে স্পষ্ট করে বুঝে গেছে।

পুতুলের মা বাড়িতে চলে যাওয়ার সময় তার শাশুড়ি বলল, “আপনার মেয়েকে নিয়ে যান। আবার অসুস্থ হলে কিংবা কোনো খারাপ কিছু হলে আমরা দায়ী থাকব না।”

একথা শুনে পুতুলের মা মেয়ের কথা ভেবে মেয়েকে নাতি-নাতনিসহ নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন।পুতুল তার বাবার বাড়িতে চলে গেল এবং বেশ কয়েক দিন সেখানে থাকল। এরই মধ্যে তার স্বামী এসে ঘরের দরজায় বড় দুটি তালা ঝুলিয়ে দিয়ে গেল।

পুতুল কিছুদিন পর বাচ্চাদের সঙ্গে করে আবার যখন নিজের বাড়িতে এল, দেখল তার দরজায় যে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তার সঙ্গে আরও বড় দুটি তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে তার স্বামী। তাই সে ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারল না।

তার শাশুড়িকে একথা জানাতেই তার শাশুড়ি বলল, “তোমার তো এ বাড়িতে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমার ছেলে তো তোমার সঙ্গে সংসার করবে না। তুমি ফিরে যাও।”

তার স্বামী তাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে—এটা সে আগেই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু তাকে যে সংসার ছেড়ে একেবারে চিরদিনের জন্য চলে যেতে হবে, সেটা তার ধারণায় ছিল না।

সে শুধু তার সংসারের মায়ায় আবদ্ধ ছিল। কত কষ্ট করে তিলে তিলে গুছিয়ে রেখেছে সংসারটাকে। অনেক যত্ন করে, পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সংসারটাকে বড় করেছে। সাজিয়ে-গুছিয়ে রেখেছে।

সংসারের মায়া সে ছাড়তে পারে না। বারবার বাড়ির দিকে, ঘরের দিকে, তার নিজের হাতে লাগানো ফুল, ফল ও সবজির বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকে অবাক চোখে।

সংসারটা বোঝাই থাকল, শুধু থাকল না পুতুল নামের মা ও তার দুটো মিষ্টি সন্তান।

এত বড় এই বাড়িতে সবার জায়গা হলো, শুধু একটু জায়গা হলো না পুতুল ও তার দুটো মিষ্টি বাচ্চার।

সে নিরুপায় হয়ে তার সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে চিরদিনের জন্য সেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

তার হৃদয়ে যে কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছিল, সেই ঝড়ে তার সবকিছু এক নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।সে নিশ্চুপ হয়ে বোবার মতো কাউকে কিছু না বলে বাচ্চাদের নিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেল শ্বশুরবাড়ি নামক বাড়ি থেকে। এবার তার নতুন বাড়ি—বাবার বাড়ি। সেখানে গিয়ে উঠল এবং মায়ের সঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করল।

বাংলা সাহিত্যের ৫ উজ্জ্বল নক্ষত্র ও তাঁদের অমর সৃষ্টিসমূহ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম: একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ

Reactions

0
0
0
0
0
0
ইতিমধ্যে এই পোস্টের জন্য প্রতিক্রিয়া করা হয়েছে।

Nobody liked ?